বাতাসের সূত্রে আইএমএফ ঋণ, বাংলাদেশ তুমি কোন পথে ?

জলের শ্যাওলা- কাগজের সূত্র নাই তবে বাতাসে অনেক তথ্য পাই। সুতরাং সূত্র চেয়ে লজ্জা দিবেন না।

গাও- গ্রামের সুদখোর’ও তাকেই ঋণ দেয় যার অন্তত একটুকরো ভিটেবাড়ি বা একটুকরো জমি অথবা দুটো গাই গরু আছে।  যার নাই, তাকে ঋণ’তো দূরের কথা, কাফনের কাপড়টুকুও দেয় না, বিনা লাভে।

মন্ত্রীদের বেশ বড় গলায় বলতে শুনছি, আইএমএফ আমাদের ঋণ দিতে টাকা নিয়ে বসে আছে। একটি মাত্র চিঠি এবং ঋণ তৈরি। অপরদিকে পাকিস্তান- শ্রীলঙ্কা ঋণের জন্য ধরনা দিয়েও পাচ্ছে না। মোদ্দা কথা বুঝাতে চাচ্ছেন, আমাদের মূল্য আইএমএফ এর কাছে আলাদা। সমস্যা হলো নিচ্ছেন ঋণ, আবার বড় গলা । বলবেন সব রাষ্ট্র ঋণ নেয়। হ্যা নেয় তবে এত বড় গলা করে কি ?

প্রশ্ন করা যাবে কি, মানুষ সত্যি অর্থেই কখন ঋণ করে ? সহজ বাংলায় ঠেলায় পরলে। ঋণ বড় গলায় চাওয়া যায় কি ? উত্তর হলো না। ঋণ নিচু গলাতেই চাওয়া লাগে। গাও- গ্রামে, ভাই- চাচা- দাদা- বাপ বলে চাইতে হয়। আইএমএফ বা বিশ্ব ব্যাংকে  এই প্রসেসটাই লিখিত আবেদনে চাইতে হয়। সেই আবেদনে অনারএবল বা ভিন্ন সৃজনশীল শব্দ লিখতেই হয়। গাও- গ্রামে, ধান উঠানো- মাছ বাঁচানো- গরুর লালন পালন ইত্যাদি ইত্যাদি কারণ নরম সুরেই বলতে হয়। আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক বা বিশ্বের ঋণ সংস্থাগুলোতেও ঋণের কারণ দেখাতে হয়। গাও- গ্রামেও শর্ত থাকে যেমন, বিশ্বের ঋণ সংস্থাগুলোতেও শর্ত থাকে এবং একটু বেশিই থাকে।

ধমক দিয়ে, বাহাদুরি দেখিয়ে, ওই ব্যাটা বলে ঋণ চাওয়া যায় না এবং পাওয়াও যায় না। ঋণের মূলে থাকে শর্ত, বাধিত সময় এবং থাকে নত মাথা। পাকিস্তানকে দেয় নাই, শ্রীলঙ্কাকে দেয় নাই, এগুলো হলো বাড়তি বচন। সহজ বাংলায় শর্ত মানার মতন ভিত্তি থাকতেই হবে এবং  মানবেন’তো ঋণ পাবেন। না মানবেন’তো ফুরুত করেই শেষ। যেখানে শর্তই মেনে নিচ্ছেন, সেখান মন্ত্রীদের বড় গলা বড়ই বেমানান বটে।

আইএমএফ থেকে এই শর্তভুক্ত ঋণ নিতে যে কাজগুলো প্রথম করতে হবে, সেটা হলো গিয়ে কৃষি ও জ্বালানি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে। সুতরাং শুরুতেই সারের মূল্যবৃদ্ধি করা হলো। ফলাফল কি হতে পারে ? দেশে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নষ্ট হবে এবং খাদ্য ঘাটতি শুরু হবে। অথচ এই কৃষিখাতটি আমাদের ঘণ জনবসতির দেশের প্রধান স্তম্ভ অর্থনীতির।

জিনিস পত্রের মূল্য সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।। কেননা ট্রান্সপোর্ট বলে একটি বিষয় থেকেই যায়।

বাতাসের সূত্রে জানলাম, সরকার থেকে বলা হচ্ছে, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়া রোধে আইএমএফ থেকে সাময়িক ঋণ নিতে হচ্ছে। তার জন্য বেশ কিছু শর্ত মানতে হবে। ভাবুন, সরকারের কতটা সরল উক্তি। আমরা সাধারণ জনগণ তার সমালোচনা করছি। অথচ চুক্তির শর্তগুলো কি ? সেটা কিন্ত সরকারের সরল মনে গড়লতা বেশ লক্ষ্যণীয়।

কেন জ্বালানী তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয় ? সরকার সেটারও একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে। ব্যাখ্যাটি কি? বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উর্ধ্বগতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ সহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত তেলের মূল্য সমন্বয় করে থাকে এবং এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। হ্যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতো বটেই। তবে বিশ্বের কোন দেশে আমাদের মতন বিনা প্রণোদনায় ৫০-৬০ % মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ? ইউরোপের দেশ জার্মানির উদহারণ দেই। সেখানেই তেলের প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিলো বটে। তবে সরকার মাত্র ৯ ইউরোতে সমগ্র জার্মানিতে সকল প্রকার ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের কার্যকারী ভূমিকা গ্রহণ করেছে এবং তা এখন অব্দি চলছে। অর্থাৎ সরকার ভিন্নভাবে জনগণকে রক্ষা করেই চলছে।

জ্বালানি তেলে বিপুল অঙ্কের অর্থ ভর্তুকি দেওয়া হয় বলে সরকার বলেই যাচ্ছে। এর একটি উল্টো রথও কিন্ত আছে। বাংলাদেশ পেট্টোলিয়াম কর্পোরেশন বিগত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি ২২ থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত) জ্বালানি তেল বিক্রয়ে ৮০১৪.৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। জ্বালানি তেল থেকে সরকার ৩৭ শতাংশ শুল্ক-কর পায়। শুল্ক-কর বাদ দিলে বা কমালে বিপিসির লোকসান বা ভর্তুকির প্রসঙ্গ আসত কি ?

ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এক টুইট বার্তায় জানান (গত মে মাসে) , প্রতি লিটার ডিজেলে ৬ রুপি ও পেট্রলে ৮ রুপি শুল্ক কমানো হচ্ছে। এতে প্রতিবছর সরকারের ১ লাখ কোটি রুপি বাড়তি খরচ হবে।

রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রতি লিটার পেট্রল ১০৫ রুপি ৪১ পয়সা ও ডিজেল ৯৬ রুপি ৬৭ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। শুল্ক কমানোর ফলে পেট্রল ৯৫ রুপি ৯১ পয়সা ও ডিজেল ৮৯ রুপি ৬৭ পয়সায় পাওয়া যাচ্ছে। লক্ষ্যণীয় যে, ভারতে এই মুহূর্তে মুদ্রাস্ফীতির পারদ বেশ উর্ধমুখি, বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। এমন পরিস্থিতিতে ডিজেল ও পেট্রলের ওপর থেকে শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার।

ভারতে  ২২ মে ২০২২ তারিখ থেকে কলকাতায় ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ৯২.৭৬ রুপি এবং পেট্রোল লিটার প্রতি ১০৬.০৩ রুপি নির্ধারণ করেছে বলে সরকার থেকে একটি সূত্র উল্লেখ করে নানানভাবে প্রচার চালাচ্ছে। তবে এখানে একটু মারপ্যাচ রয়েই যায়। বাংলাদেশ সরকার থেকে কলকাতার দোহাই দিচ্ছে অথচ কেন্দ্রের মূল্যের সাথে গড়মিল রয়েছে। কেনো কলকাতার দোহাই ?

বাংলাদেশ সরকার ১ রুপি = গড় ১.২৩ টাকা হিসেবে বাংলাদেশে কলকাতার তুলনায় ডিজেলের মূল্য লিটার প্রতি ৩৪.০৯ এবং পেট্টোল লিটার প্রতি ৪৪.৪২ টাকা কমে বিক্রয় হচ্ছিলো বলে প্রচার চালিয়ে একটি সহজ পথে হাঁটতে থাকে । কি চমৎকার বাণী ! কলকাতায় মূল্য কম থাকায় তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা শতভাগ। ঠিক সে কারণে কলকাতার কাহিনী হাইলাইট করা।

আচ্ছা প্রশ্ন করা যাবে কি, আমাদের বিজিবির কাজটি কি ? বর্ডারে ঘুমানো ? নাকি ল্যাফ- রাইট করা মাত্র ? এত শত- হাজার কোটি টাকা দিয়ে তাহলে এই বর্ডার গার্ড, আর্মি, পুলিশ পেলে লাভ কি ? আচ্ছা তেলকি ঠোঙায় ভরে বা ব্যাগে করে পাচার হয় ? তেল কি জঙ্গল দিয়ে হাতে করে পাচার হয় ? মানে কি দাঁড়ালো ? হাতেগোণা দুই- তিনটা রাস্তার পাহারায় রাখা সম্ভব নয়, এতবড় বাহিনীর ? সরকারকে ভাবা উচিত, এমন বচনে বিজিবি সহ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহির উপর কলঙ্ক দিচ্ছেন কিনা ?

ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের কারণে  অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেকটা নিরুপায় হয়েই জ্বালানী তেলের মূল্যের সমন্বয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে বলে সরকার নিয়মিত বচন দিয়েই যাচ্ছে। হ্যা ঠিক আছে কথাটি। তবে প্রশ্ন রয়েই যায় সেই সমন্বয় সঠিক পথে হচ্ছে কি ?

একটু রেমিট্যান্সের কথা বলতেই হয়। প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে প্রবাসীরা জুলাই মাসেই রেমিট্যান্স (বৈধ চ্যানেলে) ২.০৯ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে। সরকার থেকেই বলা হচ্ছে, অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে আনুমানিক আরও ০২ বিলিয়ন ডলার আমাদের অর্থনীতিতে ক্রিয়া করছে। ভালো কথা। সরকার যথাসম্ভব পদক্ষেপ  নিলে ভিন্ন চিত্র অর্থনীতিতে আসবেই।

তবে সরকার কালো টাকার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে পেরেছে কী ? উল্টো দেখলাম ১০% ট্যাক্স পে এর মাধ্যমে স্বাগত জানানো হচ্ছে। উত্তরটি খুব সহজ, না পারে নাই এবং পারবেও না। কেননা সুঁটকির হাটে বেড়াল নিজেই চকিদার যে। প্রশ্ন করবো না, কালো টাকার মালিক কারা ? তবে বাতাসের সূত্রে এতটুকু বলতে পারি, যত কালো টাকা আছে( দেশে ও বাহিরে) সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আইএমএফ এর কাছে দৌড়াতে হত না।

এবার সহজভাবে ভাবুন, আইএমএফ ঋণ দেবে, ঋণের সাথে শর্ত দেবে (সাধারণ ব্যাংক থেকেও যে ঋণ সাধারণ জনগণ নেয়, সেখানেও শর্ত থাকে এবং স্বাভাবিক বটে) সবই ঠিক আছে। তবে আইএমএফ এর শর্তগুলো সরাসরি সরকারের নীতির মধ্য হাত পুশ করছে এবং সরকার মেনেও নিচ্ছে। প্রশ্নটি ঠিক সেখানেই, কেনো ? এই কেনোর উত্তরটি হলো, দেশের সাধারণ জনগণের অর্থে সরকার নিজেই যখন ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন অর্থনীতি আর অর্থনীতির ভূমিকায় থাকে না, হয়ে যায় দূর্ণীতি।

আইএমএফ ঠিক সেই দূর্ণীতে ঈশারা করেই দেশের মূলনীতিতে ইন করছে। মনে রাখবেন, আইএমএফ/ বিশ্ব ব্যাংক/ বা বিশ্বের বড় ঋণদাতারা ( বর্তমানে যেমন চীন) তারা নিজেরাই বিশ্ব বাজার অর্থনীতিতে ঈশ্বরের ভূমিকায় বহাল। এই ঈশ্বরেরা যখন একটি রাষ্ট্রের মূলনীতিতে পরিবর্তন আনে, সেটা কিন্ত তাদের আপন স্বার্থেই ধ্বংস করে। সরকারকে বলছি, একটু আশেপাশে নজর দিন, সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

আইএমএফ- বিশ্ব ব্যাংক- চীন এদের অর্থে ঋণ, সাথে দূর্ণীতি ! আগামীর বাংলাদেশ তুমি কোন পথে ?

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক- শুদ্ধস্বর.কম

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.