জলের শ্যাওলা – সরকারে সন্তুষ্ট নন ভালো কথা। গণতন্ত্র নেই, ভোট নেই, বিচার নেই, দূর্ণীতিতে সয়লাব, টাকা পাচার হচ্ছে, মানবাধিকার হরন হচ্ছে, শিক্ষার মান নামছে, দিনের পর দিন মানুষ হতাশায় ভুগছে ইত্যাদি সব ঠিক আছে। এইসব সমস্যার সমাধানের জন্য জনমানুষের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন । সেখানে জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
সেই জনগণকে পাশে পাচ্ছেন না। জনগণের কণ্ঠস্বর বা দাবী একত্রিত করতে পারছেন না। সমস্বরে কিছুই হচ্ছে না। তাই বলে এখন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি শ্রীলঙ্কা হোক, এমন প্রার্থনা বা মনে মনে মনকলা খাওয়া বা কামনা করা মোটেও সমীচীন কী ?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশ লক্ষ্য করছি, অনেক বিদ্যান- জ্ঞানী গুণীজন, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইনিয়ে- বিনিয়ে এই রাষ্ট্রটিকে শ্রীলঙ্কার পর্যায়ে দেখতে চাচ্ছেন। লেখা বা বলার ভাবটা এমন যে, এই রাষ্ট্রটি শ্রীলঙ্কা হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। লেখা বা বলা দিয়ে একপ্রকার মগজধোলাইয়ের প্রচেষ্টা বেশ স্পষ্ট এবং প্রবল। কিন্ত কেন ?
এই কিন্ত এবং কেন এর মাঝে লুকিয়ে আছে হতাশা আর বঞ্চনা। সেই হতাশা বা বঞ্চনা রাষ্ট্রের সকল মানুষের মাঝে যদি ছাপ না ফেলে বা প্রক্রিয়াগত না হয়, তাহলে বুঝতে হবে, জনমানুষেরা মুখে যাই বলুক, তাদের নিজস্বতা ভিন্ন মাত্রায় আছে। সেই ভিন্নমাত্রায় কোথাও না কোথাও স্বার্থ ও স্বস্তির বায়ু বহে। অন্তত বর্তমান পরিস্থিতি সেই সাক্ষ্য স্পষ্টতই দেয়।
যে বা যারা কল্পনার জগতে বা জাগ্রত অবস্থায় এই রাষ্ট্রটিকে শ্রীলঙ্কার অবস্থার সাথে তুলোনামূলক অবস্থায় দেখতে পাচ্ছেন অথবা মনে মনে কামনা করছেন, তাদের জন্য বলছি, নিজেদের হতাশার দূর্বলতার হাতিয়ারে শান দিন, সেটা যেভাবেই হোক তবুও এই রাষ্ট্রটিকে শ্রীলঙ্কার হিসেবে না দেখতে চাওয়াটাই উত্তম।
অর্থনৈতিক ভাষায় এবং অর্থনৈতিক অংকের হিসেবে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট যে, যেকোনো রাষ্ট্র তার মূল জিডিপির ৭০% পর্যন্ত বৈশিক ঋণ গ্রহণ করলেও সেই রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংসের মুখ দেখবে না। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন ( জিডিপি) এর বর্তমান ঋণ ৪৪% এর মতন। তবে যেটা মূলত শংকার বিষয়, তা হলো বৈদেশিক ঋণ বড় মাত্রায় বেড়েছে ২১,৮% পাশাপাশি বৈশিক অবনম পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যায় বেড়েছে ৪৪% এবং ইতিমধ্যেই প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৪০ এর ঘরে নেমে এসেও বিশ্বে ৪৪ তম অবস্থানে আছে এবং এশিয়ার মধ্য বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের পরেই এবং নিকটতম অবস্থান পাকিস্তানের তবে ২৮ ধাপ নিচে। আমদানি ব্যায় একটি বড় সমস্যার কারণ হবে রাষ্ট্রের জন্য। এই ব্যায় কমানো তেমন সহজ নয়। এখানে রাষ্ট্রকে কৌশলি হতেই হবে বড় বিপদ থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচাতে। আল্পভাষায় যা উল্লেখ করলাম, মোদ্দা কথা সবদিক থেকে এই রাষ্ট্রটি বেশ ভালো অবস্থানে আছে, এটা বলাই বাহুল্য।
বিশ্বে বর্তমানে ১৭ টি দেশ দেউলিয়া হবার পথে। ইতিমধ্যেই লেবানন/ জাম্বিয়া দেউলিয়া হবার ঘোষণা দিয়েছে। লাউস, কেনিয়া, ইথিওপিয়া দেউলিয়া হবার পথে। মিশরের অর্থনৈতিক অবস্থা বেহাল। ফিটস্ নামক একটি সংস্থার সূত্র এগুলো।
ইউরোপের এক অংশের রাষ্ট্র তুরস্কের রিজার্ভ সাত বিলিয়নে নেমে এসেছে। ল্যাটিন আমেরিকার আর্জেন্টিনার মতন দেশ ইতিপূর্বে নয়বার দেউলিয়া হবার ঘোষণা দিয়েছিলো। ইউরোপের গ্রীস, ইতালির মতন রাষ্ট্রগুলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কল্যানে বেঁচে গেছে। কেনো এই কথাগুলো বলছি ?
শ্রীলঙ্কাকে সামনে রেখেই কথাগুলো বলা। একবার ভাবুনতো, শ্রীলঙ্কার বিপ্লবীরা রাজার বাড়িতে ঘাটে শুয়ে, পায়ের উপর পা রেখে ঘুমাচ্ছে বা সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছে। একটি রাষ্ট্রের সব কিছুর মালিক মূলত জনগণ। সেই তত্বে সব ঠিক আছে। তবে এই রাষ্ট্রের যে করুন হাল বর্তমানে বিরাজমান, সেটার রিপেয়ারিং কে বা কারা করবে ? বৈদেশিক শক্তিমান রাষ্ট্রগুলো যদি হাত বাড়িয়ে দেয় ( কেউ এগিয়ে আসবে কিনা, সেটাও বড় প্রশ্ন), সেখানে থাকবে নানান বেড়াজাল। যে সর্ত থেকে আগামী শত বছরেও শ্রীলঙ্কার বের হয়ে আসার সম্ভাবনা থাকবে না।
ভুল বুঝবেন না কেউ। শ্রীলঙ্কার বিপ্লব সঠিক আছে। এমনটাই হবার কথা ছিলো। কেননা রাষ্ট্রটি একটি ডুবে যাওয়া জাহাজে রূপান্তরিত হয়েছিলো সেই দেশের রাজনীতিবিদদের কল্যাণেই। এখন এই ডুবন্ত জাহাজে ভাসছে রাষ্ট্রটির জনমানুষেরা। শ্রীলঙ্কা নামের জাহাজটি ডুববার আগেই বিপ্লবটি হলে আজকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আসতে হতো না। ঠিক সেখান থেকেই বাংলাদেশকে শিক্ষাটি গ্রহণ করতেই হবে। নতুবা আমরাও অর্থনৈতিক ভালো অবস্থানে থাকা স্বত্বেও শ্রীলঙ্কার মতন ডুবতে পারি। সেখানেই সতর্কতার বিষয়।
রাজবাড়ির ঘাটে ঘুমাক আর সুইমিং পুলে সাঁতার কাটুক, এই ডুবন্ত জাহাজকে কিন্ত ওইসব বিপ্লবীরা টেনে তুলতে পারবে না। কোনো ওপায় নেই। তাই বলছিলাম, সরকারের উপর নাখোস হয়ে বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার মতন ডুবন্ত জাহাজে কামনা করলে এবং সেই পরিস্থিতি হলে, আমরাও আর ভেসে উঠতে পারবো না। তখন আর উপায় থাকবে না। সুতরাং যে বা যারা এই কামনা বা প্রত্যাশাটি হতাশা থেকে করেন, তারা নিতান্তই ভুল ভাবনায় ও হাওয়ায় ভেসে ভাবছেন।
যা করণীয়, সেটা হলো সময় থাকতে সেই বিপ্লবটি করা যে বিপ্লবে সতর্কতা সৃষ্টি করবে। যে বিপ্লব রাজনীতিকে বাধ্য করবে সঠিক পথে আসতে। কেননা মনে রাখা ভালো যে, রাষ্ট্রের মূলত কল্যাণ হয় যখন রাজনীতিকদের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, ভিন্ন কারও দ্বারা নয়। আমরা গোড়ায় ভাবি না। তবে স্বার্থের ভাগটি আগে ভাবি। সেটা জনগণ যেমন আগে ভাবে ঠিক তেমনটাই রাজনীতিকরাও। হ্যা আমাদের রাজনীতিকরা ক্ষমতা ও স্বার্থ দুটোই এক সাথে ভাবে, যা ভয়ানক বটে।
শেষে একটু রিজার্ভের কথা বলেই শেষ করবো। রিজার্ভ ৪০ বিলিয়নের ঘরে ঠেকেছে। রিজার্ভ গেলো – রিজার্ভ গেলো বলে শোরগোল পাকানোর কোনো কারণ মোটেও দেখি না। কেননা কঠিন সত্য হলো, বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন রিজার্ভটি কত ছিলো ? সেই তুলোনায় বর্তমানে দ্বিগুণের বেশি। (আমি সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছি না, এটাই কঠিন সত্য) সুতরাং রিজার্ভ মোটেও সমস্যা হবার কথা নয়। সেই সময়ে রাষ্ট্রের তিনমাসের আমদানি ব্যায় মেটানোর ক্ষমতা ছিলো যা বর্তমান প্রায় সাত মাসের আছে। তবে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকার গত সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সঙ্গে ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানি পেমেন্ট নিষ্পত্তি করেছে। মূলত আমদানির অর্থ পরিশোধের অনুমোদন দেওয়ার পর রিজার্ভ কমে গেছে। আকুর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো তাদের আঞ্চলিক লেনদেনের জন্য আমদানি পেমেন্ট নিষ্পত্তি করে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা হচ্ছে এসিইউ’র সদস্য।
যা সমস্যার কারণ হয়ে রাষ্ট্রের মাথা ব্যথা হবে, সেটা দূর্ণীতি আর টাকা পাচার। শ্রীলঙ্কা ডুবেছে কিন্ত এই দূর্ণীতির কল্যাণেই এবং সেখানে ছিলো চরম পর্যায়ের স্বজনপ্রীতি। রাষ্ট্রকে এই দিকে কঠিন নজর দিতেই হবে। সমস্যা হলো আমরা রাষ্ট্রের উপর মহলে দূর্ণীতির দিকে আঙুল তুলি এবং বড় বড় জ্ঞানের বচন বলি। কিন্ত লক্ষ্য করি না, এই রাষ্ট্রের এমন কোনো কর্ম নেই যা ঘুষ বানিজ্য ছাড়া হয় ? মূলত আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে দূর্ণীতির সাথে বেশ আঠার মতন জড়িয়ে। স্বীকার করুন আর নাই বা করুন, ইহাই সত্য।
এবার ভাবুনতো বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হলে শেষ বেলায় কারা গণভবন বা সচিবালয়ে বা রাষ্ট্রের ভিন্ন কোনো ভবনে জায়গা দখল করে হইহুল্লা করবে ? আমি/ আপনি/ আমাদের মতন জনগণেরাই’তো নিশ্চয়ই। আমরা কিন্ত সুযোগের অভাব থাকার পরেও সবাই দূর্ণীতির সাথে বেশ জড়িয়ে। সুযোগের কথা বলছি কেননা এই আমি/ আপনি/ আমরাই সুযোগ পেলে বড় বড় দূর্ণীতির সাথে অনায়াসেই জড়িয়ে যাই বা যাবো, যাহা প্রমাণীত সত্য। কেননা আমরা সেই চর্চায় কিন্ত আছিই।
তাই বলছিলাম, বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার চেহারায় দেখা মোটেও ভালো ভাবনা নয়। এই রাষ্ট্র এখনও ভালো পথেই হাঁটছে। তবে সেই পথটি আরও পরিষ্কার রাখার জন্য অনেক গোড়ায় ধুপ দেওয়ার ভাবনা ভাবুন। কৃষক, কামার, জাউলা, মজুররা যদি এই রাষ্ট্র স্বাধীন করতে পারে তাহলে সঠিকও করতে পারে। আসুন রাষ্ট্রের কল্যাণে আমলা- কামলা- রাজনীতিবিদ- জনগণ সবাই রাষ্ট্রটিকে সামনে এগিয়ে যাবার পথকে পরিষ্কার করি তবেই সবার মঙ্গল। সে বিপ্লবটি ঘটাতে হবে। স্বার্থ আর ক্ষমতা পরিবর্তনের বিপ্লব অতঃপর আবার বিপ্লব, এই রাষ্ট্রের জন্য কোনো কাজে আসবে না। সুতরাং ভাবনায় পরিবর্তন আসুক দশের কল্যাণে। শ্রীলঙ্কার ভাবনা ঝেড়ে ফেলুন।
বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর.কম

