সিদ্ধার্থ সিংহ :২৩ এপ্রিল, বিশ্ব বই দিবস। রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্যোগে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিনটিকে পালন করা হয়। বই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হল— বই পড়া, বই ছাপানো, বইয়ের কপিরাইট সংরক্ষণ করা ইত্যাদি বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো।
আর বই মানেই তো কলেজ স্ট্রিট। মধ্য কলকাতার বউবাজারের মোড় থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধী রোড ছাড়িয়ে যে দেড় কিলোমিটার রাস্তাটা সোজা চলে গেছে বাটার মোড় অবধি, সেই কলেজ স্ট্রিট এবং তার লাগোয়া আশপাশের জায়গা নিয়েই গড়ে উঠেছে বাংলা বইয়ের সব চেয়ে বড় বাজার।
শুধু বাংলা নয়, যদি এ দেশের সব রাজ্যের সব ভাষাও ধরা হয়, তা হলেও দেখা যাবে, বিক্রির দিক থেকে এটাই ভারতের বৃহত্তম বইয়ের বাজার। তাই আজও গোটা উপমহাদেশে বইপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে কলেজ স্ট্রিটের নাম।
কিন্তু কবে থেকে বই-বাজারের এই খ্যাতি লাভ করল কলেজ স্ট্রিট? তার সঠিক ইতিহাস এখনও জানা যায়নি। তবে কলকাতার বাংলা বইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রকাশক, দে’জ পাবলিশিংয়ের কর্ণধার সুধাংশু শেখর দে বললেন, আগে কলকাতার বইয়ের বাজার এই কলেজ স্ট্রিটে ছিল না। ছিল চিৎপুর এলাকায়।
কলেজ স্ট্রিট জুড়ে যখন একের পর এক প্রেসিডেন্সি কলেজ, যা এখন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় (১৮১৭), হিন্দু স্কুল (১৮১৭), হেয়ার স্কুল (১৮১৮), সংস্কৃত কলেজ (১৮২৪), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৭), কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (১৮৫৭) গড়ে উঠছিল, ঠিক তখনই চিৎপুর থেকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দু’-একজন বই-ব্যবসায়ী এই কলেজ স্ট্রিটে এসে বইয়ের কারবার খুলে বসেন। তার পর একটু একটু করে কলেজ স্ট্রিটই হয়ে ওঠে বাংলা বইয়ের সেরা বাজার।
এই মুহূর্তে কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে এক হাজার চারশো সাঁইত্রিশটি প্রকাশনা সংস্থা এবং বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে শুধু যে বাংলা বইই প্রকাশিত হয় তা কিন্তু নয়, বাংলার পাশাপাশি নিয়মিত প্রকাশিত হয় ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ওডিশি, অসমিয়া ভাষার বইও। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা পাঠ্য বই তো প্রকাশিত হয়ই।
তাই কলেজ স্ট্রিট জুড়ে সব সময়ই থাকে বইপ্রেমীদের ভিড় এবং আড্ডা। কলেজ স্ট্রিট শুধু বইপাড়াই নয়। এক চলমান সংস্কৃতির নাম। এই সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলেজ স্ট্রিট, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলেজ রো, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট এবং কথায় কথায় যাঁর নাম তুলে আমরা কটাক্ষ করি, ‘তুই কোথাকার কোন হরিদাস পাল রে?’ আছে কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে সেই ‘হরিদাস পাল লেন’ও।
আছে, একদম কলেজ স্ট্রিট মোড়েই, এক সময়ের সব চেয়ে বড় দৈনিক পত্রপত্রিকার একচেটিয়া মূখ্য পরিবেশক, এখন লিটিল ম্যাগাজিনের সব চেয়ে বড় বিক্রয়কেন্দ্র— পাতিরাম বুক স্টল। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শ্যামল বুক স্টল, ধ্যানবিন্দু, অরণ্যমন, সুপ্রকাশ বইঘর-এর মতো শুধুমাত্র লিটিল ম্যাগাজিনের স্টল।
আর লিটিল ম্যাগাজিনের কথা উঠলেই খুব স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসতে বাধ্য সন্দীপ দত্তের কথা। তিনি তাঁর এই কলেজ স্ট্রিটের বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন— কলকাতা লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র।
আছে, ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউট, মহাবোধি সোসাইটি, বইচিত্র সভাঘর, থিওলজিকাল সোসাইটি, দ্বারভাঙা হল, ওয়াই এম সি এ, ত্রিপুরা হিতসাধনী সভা। আছে অরবিন্দ পাঠমন্দির। আছে খানিক দূরে প্রায় শিয়ালদার কাছে কৃষ্ণপদ মেমোরিয়াল হল-সহ আরও ছোট-বড় বেশ কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ।
কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ার আর একটি আকর্ষণ প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিং ঘেরা সার সার কিয়স্ক। এই পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো শুরু হয়েছে ভবানী দত্ত লেন থেকে প্রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। স্বীকার করতেই হবে, কলেজ স্ট্রিটের রেলিং বরাবর এই সব কিয়স্কগুলো দুঃষ্প্রাপ্য বইপ্রেমীদের কাছে স্বর্গরাজ্য। তাই এটাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পুরোনো বইয়ের বাজারও বলে।
এক সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় এই পুরোনো বই বিক্রেতাদের উৎখাত করবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। কিন্তু এই পুরোনো বই বিক্রেতাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে শুধু রাজনীতির বিরোধী পক্ষই নয়, অধ্যাপক নির্মলকুমার বসুও এটা রোধ করার জন্য চিঠি দেন সেই সময়ের পুলিশের আই জি রঞ্জিত গুপ্তকে। তাতে সায় দেন জাতীয় অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও।
এখন অবশ্য সেই ঝরঝরে ম্রিয়মাণ কিয়স্কগুলোর জায়গায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে পাকাপাকি স্টল তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
এখন অবশ্য পুরোনো বইয়ের দোকান শুধু ওইটুকু জায়গাতেই আর সীমাবদ্ধ নেই। সেটা মহাত্মা গান্ধী রোড থেকে মির্জাপুর স্ট্রিট হয়ে আরও দূর দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আজও অগণিত মানুষ সেই সব দোকানে, বহু বছর আগেই আউট অব প্রিন্ট হয়ে যাওয়া, পুরোনো, দুষ্প্রাপ্য, প্রায় বিলুপ্ত বইয়ের খোঁজ করতে ভিড় করেন। তাই অনেকেই এই অঞ্চলটাকে দুষ্প্রাপ্য বইয়ের আঁতুড়ঘরও বলেন।
আজকে এই কলেজ স্ট্রিটকে প্রধানত বইপাড়া বোঝালেও, এই ইতিহাস কিন্তু খুব প্রাচীন নয়। বইপাড়া হিসাবে এই অঞ্চল গড়ে উঠেছে খুব বেশি হলে আশি-নব্বই বছর আগে। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তিকালে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ সময়ে।
কলেজ স্ট্রিটে প্রথম বইয়ের দোকানের মালিক ছিলেন গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়। তিনি প্রথম দিকে হিন্দু হস্টেলের সিঁড়ির কোণে দুর্গাদাস করের ‘মেটেরিয়া মেডিকা’ বইটি বিক্রি করতেন। তার পর তিনি কলেজ স্ট্রিটে ‘বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরি’ নামে একটি দোকান খুলে ডাক্তারি বই বিক্রি করা শুরু করেন। ১৮৮৫ সালে এই দোকানটি তিনি তুলে নিয়ে যান তখনকার বই বিক্রির পীঠস্থান কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে।
১৮৮৩ সালে রামতনু লাহিড়ির ছেলে শরৎকুমার লাহিড়ি ‘এস কে লাহিড়ি অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের ব্যবসা শুরু করেন। ১৮৮৬ সালে এই কলেজ স্ট্রিটে আরও একটি বইয়ের দোকানের সন্ধান পাওয়া যায়, সেটা হল, ‘দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি’। এ ছাড়াও আরও বেশ কিছু ছোটখাটো বই ব্যবসায়ী হয়তো তখন কলেজ স্ট্রিটে ছিলেন, কিন্তু কালের স্রোতে বহু দিন আগেই তাঁরা বিলুপ্ত হয়ে গেছেন।
প্রসঙ্গত বলা দরকার, ১৮৪৭ সালে সংস্কৃত ছাপাখানা স্থাপনের পরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একটি বইয়ের দোকান খুলেছিলেন, দোকানটির নাম— ‘সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি’। তার ছাপাখানা ছিল আমহার্স্ট স্ট্রিটে আর বইয়ের দোকানটি ছিল আরপুলি লেনে।
১৮৮১ সালে কলুটোলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গবাসী কার্যালয়’। এরা কবিকঙ্কণ চণ্ডী, পুরাণসমূহ, মহাভারত ইত্যাদি ছেপে বিক্রি করত। এ ছাড়াও টডের রাজস্থান, স্টুয়ার্টের বাঙ্গলার ইতিহাস, মেডোজ টেলরের ঠগের আত্মকাহিনী— এই সব বইয়েরও পুনর্মুদ্রণ করে বিক্রি করত।
১৮৯১ সালে কলুটোলা থেকে হিতবাদী প্রকাশিত হলে, তারাও পত্রিকার পাশাপাশি একের পর এক— বত্রিশ সিংহাসন, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতী’ প্রকাশ করে। হিতবাদীই প্রথম রবীন্দ্র গ্রন্থাবলি ছাপিয়ে বিনা পয়সায় গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করেছিল। পরবর্তিকালে বসুমতী সাহিত্য মন্দির এবং প্রবাসীও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল।
এখানে জেনে রাখা দরকার, প্রকাশনার জগতে বসুমতী সাহিত্য মন্দির কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যে ধরনের অসামান্য এক-একটি বই তারা প্রকাশ করেছিল এবং এত কম দামে পাঠকদের হাতে তুলে দিত যে, আজকের দিনে তা কল্পনাও করা যাবে না।
কলেজ স্টিটের বিখ্যাত বাঙালি প্রকাশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ছ’পুরুষের সংস্থা দেব সাহিত্য কুটীর, চক্রবর্তী চ্যাটার্জি, এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স, জে এন চক্রবর্তী, পুণ্য প্রকাশনী, সাহিত্যম্, পত্র ভারতী, ইউ এন ধর অ্যান্ড সন্স, কমলা বুক ডিপো, সেন রায় অ্যান্ড কোং, করুণা প্রকাশনী, দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোং, বীণা লাইব্রেরি, বাণী মন্দির, চক্রবর্তী চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং, ভট্টাচার্য সন্স, এইচ চ্যাটার্জি অ্যান্ড কোং। অন্য দিকে মিত্র ঘোষ, আশুতোষ লাইব্রেরি, সরস্বতী লাইব্রেরি, শিশু সাহিত্য সংসদ, এন এম রায়চৌধুরী, বর্মণ পাবলিসিং কোং এবং অবশ্যই বলতে হবে আনন্দ পাবলিশার্স এবং সিগনেট-এর কথা।
ডি এম লাইব্রেরিও কোনও অংশে কম ছিল না। তাঁরা অন্য প্রকাশকদের মতো লেখকের কত বই বিক্রি হল, সেই হিসেব করে বছরের শেষে রয়্যালটি দিতেন না। বই বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত পাওনাগণ্ডা একসঙ্গে আগাম মিটিয়ে দিতেন। শুধু তাইই নয়, বই ভাল কাটতি হলে নিজেরাই খুশি হয়ে লেখকদের বিভিন্ন উপঢৌকন পাঠাতেন। যখন অনেক বর্ধিষ্ণু লোকেরাও গাড়ি কেনার আগে দশ বার ভাবতেন, সেই সময়ে একবার কাজী নজরুল ইসলাম আর কথাসাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীকে দু’-দুটো গাড়ি কিনে তাঁরা উপহার দিয়েছিলেন। তবে এই মুহূর্তে কলকাতার বাংলা বইয়ের বাজারের শীর্ষে রয়েছে দে’জ পাবলিশার্স। তাদের টাইটেল অনেক দিন আগেই পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সিদ্ধার্থ সিংহ
E-MAIL : siduabp@gmail.com

