বই আকারে প্রকাশ এর আগে প্রবাসী মাসিক পত্রিকায় (কার্তিক ১৯৩৮- ফাল্গুন ১৯৩৯) ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। কাত্যায়ণি বুক স্টল থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয়।
আরণ্যক প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য দারুণ একটা উপন্যাস। উপন্যাসটি পড়লে একেবারে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবে পাঠকগণ। মূখ্য চরিত্রে আছেন সত্যাচরণ।যিনি একজন তরুণ যুবক যার অবস্থা এরকম- বি এ পাস করে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে কলকাতা শহরে কিন্তু চাকরি পাচ্ছেন না, মেসের ম্যানেজার বারবার হুশিয়ারি করে দিচ্ছেন টাকা না দিলে খাবার বন্ধ হয়ে যাবে ঠিক এমন সময় পূর্বের এক বড়লোক বন্ধুর সাথে দেখা এবং তিনি যখন জানলেন সত্যাচরণ কোনো কাজ করছে না তখন তিনি তার বাবার বিহারের জঙ্গল মহাল প্রজাদের কাছে বিলিব্যবস্থা ও দেখাশোনার চাকরি দিলেন। চাকরি টা পেয়ে না করার সাধ্য ছিলো না ওরকম কঠিন পরিস্থিতিতে।
কিন্তু সত্যাচরণ যখন কাছারিতে পৌঁছালেন বুঝতে পারলেন এরকম নির্জন, জঙ্গল- মরুভূমিতে তার মন টিকছে না। টিকবেই বা কি করে! কলকাতায় কেটেছে বন্ধু -বান্ধবের সাথে আড্ডা, সিনেমা, থিয়েটার, লাইব্রেরি, গানের আড্ডা। তার ওপর সেখানকার মানুষ জনের খাবার – (কলাইয়ের ছাতু, মকাইয়ের ছাতু, চিনাবাদাম), ভাষা একেবারেই আলাদা। দেহাতী হিন্দি কিছুই বুঝতে পারেন না।
তবে কাছারির বৃদ্ধ মূহুরী গেষ্ঠবাবু বলেছিলেন-দেখবেন এ জঙ্গল আপনাকে পেয়ে বসবে, এর মায়া ছাড়তে পারবেন না। সত্যই তাই হলো। দেহাতী হিন্দি শিখে ফেললেন অল্প কিছু, ঘোড়ায় চড়া ও শিখে ফেললেন। এরপর তিনি লবটুলিয়া বইহার, নাঢ়া বইহার, সরস্বতী কুন্ডী ঘোড়ায় চড়ে নির্জন জঙ্গল পাড়ি দিয়ে জোৎস্নার আলোয় ঘুরে বেড়াতেন। যার ফলে বিচিত্র জীবন চোখে পড়ত তার। যেমন গনু মাহাতো, যে কিনা একেবারে নির্জন জঙ্গলে শুধুমাত্র মহিষ চরানোর জন্যই থাকেন। যার আশেপাশে ২/৩ মাইলে কোন বসতি নাই। পাহাড়ি মানুষ জন ছোট ছোট লেকের মত জলাশয় কে কুন্ডী বলে। আহা কি অপরূপ দেখতে সেসব কু্ন্ডী জোৎস্নার আলোয়। সত্যাচরণ পাহাড়ের সৌন্দর্য্য, জঙ্গলের বিভিন্ন ফুলের সুমধুর সুবাশ, আর জোৎস্নার আলোয় সরস্বতী কুন্ডী( যেখানে একসাথে বুনো হাতি, হায়েনা পানি পান করতো, ২ বুনো হাতির মাঝে ১ বাচ্চা হাতি, মা হাতি একবার বাচ্চা কে দেখে একবার হায়েনা কে) এসবের টানে বারবার ছুটে যেত সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য। বুনো মহিষের ভয়টা সবাই বেশি করতো, বলতো একবার বুনো মহিষের হাতে পড়লে রক্ষা নাই। তারা বিশ্বাস করত বুনো মহিষদের রক্ষা করার জন্য দেবতা টাড়বারো আছেন যিনি শিকারী মানুষের হাত থেকে বুনো মহিষকে রক্ষা করেন।
উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র যুগলপ্রসাদ। যে ছিলো বৃক্ষপ্রেমী, কোন পাহাড়ে, কোন জঙ্গলে কোন গাছ বা লতা নাই সেটা সে দূর থেকে সংগ্রহ করে লাগাইতো।এতেই তার আনন্দ।এমনকি নিজের টাকা খরচ করে বীজ কিনে লাগাতো। সত্যাচরন তার কাজকে শ্রদ্ধা করতো। কিন্তু সে এসেছেই বন জঙ্গল প্রজাদের বিলি করতে আর প্রজারা এসব কেটে চাষবাস করবে।তাই সে অনেক সময় দিতে চাইত না জঙ্গল তবে ওপর থেকে হুকুম আসলে দিতেই হত।
মঞ্চী হলো এক গাঙ্গোতা তরুণী। যার বিয়ে হয় এক বুড়ো- নকছেদি ভকতের সাথে। মঞ্চী সরলা বন্য মেয়ে। ওর আকর্ষণ ছিলো সস্তা সাজগোজের জিনিসের প্রতি। শস্যের মৌসুমে শস্যের বিনিময়ে নিত সেসব।এদের জীবনটা যাযাবরের মত। এক জায়গায় স্থির থাকতো না। যখন যেখানে ফসল কাটতো সেখানে যেয়ে ফসল কেটে দিত।মঞ্চীকে পরে খুঁজে পাওয়া যায় না। লেখক ধারনা করে সাজগোজের জিনিসের লোভ দেখিয়ে কেউ তাকে নিয়ে গেছে। আর সুরতিয়া ছিলো নকছেদি ভকতের ১ম স্ত্রীর মেয়ে।যে খুব সহজেই ডাহুক ও গুড়গুড়ি পাখি কে পোষ মানিয়ে বন্য পাখি ধরত।
রাজু পাড়ে – যে চিনাবাদাম খেয়েই থাকতো, চাষবাস কম করত, উপাসনা বেশি করত, তার অদ্ভুত অদ্ভুত কথা শুনে লেখক মনে মনে হাসত। যেমন- তার ধারনা উইপোকার ঢিবি থেকেই রংধনু হয়, আর সূর্য উঠে পাহাড়ের ওপাশ থেকে ডুবে নদীতে। লোকজন বিশ্বাস ও করত এসব। লেখক সত্যি টা বলতে গেলেই বরং তারা বিশ্বাস করবে না।তাই তিনি চুপ থাকতেন।
কুন্তা – যে ছিলো বাইজি র মেয়ে।রাজপুতের সাথে বিয়ে হলেও কেউ দেখতে পারতো না।অথচ মেয়েটা যথেষ্ট ভালো ছিলো। স্বামী মারা গেলে লোকলজ্জার ভয়ে রাতে শস্য কুড়াতে বের হত।বাচ্চাদের খাইতে দিতে পারতো না।পরে সত্যাচরণ তাকে চাষের জমি দেন।বেচারা অনেক কৃতজ্ঞ প্রকাশ করে।
রাসবিহারী সিং- যিনি ছিলেন অত্যাচারী মহাজন।গাঙ্গোতাদের কাছ থেকে তার লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে অর্থ আদায় করতেন। ঠিক তার বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মহাজন ধাওতাল সাহু। মটুকনাথ পাড়ে যে টোল পড়াতো আর ধাতুরিয়া নামের এক ছেলে ছিলো যে কাছারিতে নাচ দেখিয়েছিলো।
পাহাড়ি এলাকায় একটা মেলা হত সেখানে সত্যাচরণ গিয়েছিল। হঠাৎ কান্নার শোরগোল এ থমকে যান। কেউ মারা গেল কিনা! পরে শুনতে পেলেন এটা এখানকার রীতি। শ্বশুর বাড়ি থেকে অনেকদিন পর মেয়েরা এসে বাপের বাড়ির মেয়েদের দেখে কান্না করে এভাবে। কান্না না করলেই নাকি লজ্জার বিষয়।
রাজা দোবরু পান্না- সাঁওতালদের রাজা ছিলেন যদিও স্বাধীনতার পর রাজকীয় ক্ষমতা হারিয়েছেন তারপরও তার ব্যক্তিত্ব রাজার মতই। তার নাতনী রাজকন্যা ভানুমতি।সহজ, সরল তার স্বভাব।সত্যাচরন দোবরু পান্নার সাথে দেখা করতে গেলে ভানুমতীর আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়ে যান। দোবরু পান্না মারা গেলেও সত্যাচরণ সেখানে যান। সত্যাচরণ ভাবতেন-” এখানেই যদি থাকিতে পারিতাম, ভানুমতীকে বিবাহ করিতাম, এই মাটির ঘরে জোৎস্ন্যা ওঠা দাওয়ায় বসে সরলা বন্যবালার গল্প শুনিতাম”।
সেই নির্জন পাহাড়ি এলাকায় খরা, দাবানল ও হইতো।তারপরেও জোৎস্ন্যা রাতে পাহাড়, কুন্ডী, জঙ্গলের এবং সেই বন্য সরল মানুষদের ভালোবাসায় সত্যি হারিয়ে যাবার মত অবস্থা।
উপন্যাসটি পড়ে আমার মনে হইছে শুধু উপন্যাস পড়িনি আমি নিজেও পাহাড়,নদী ঘুরে আসছি।উপন্যাস টি পাঠকগনকে আকৃষ্ট করবেই। এককথায় অসাধারন উপন্যাস।

মানসুরা জাহান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

