শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে হচ্ছেটা কি? -শাহাব উদ্দীন

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় বাংলাদেশের একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম দেশের বাইরেও বিদ্যমান। এ সুনাম জাতির জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু আজ প্রায় ১৫ দিন হলো সে বিশ^বিদ্যালয় উত্তপ্ত, মনে হয় যেন এটা দেখভাল করার কোন লোক নেই। গভীর রাতে এম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ এলাকাবাসীর ঘুম হারাম হয়ে গেছে। পুলিশের লাঠিচার্জ, গ্রেনেড, টিয়ার সেলের আওয়াজে সিলেটবাসী আতঙ্কিত। কিন্তু এই বিশ^বিদ্যালয় সিলেটবাসীর অনেক দিনের আন্দোলনের ফসল, গর্বের ধন। এর বিস্তারিত লেখার জন্য যতটুকু তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ করেছি, তাতে জানা যায় এই বিক্ষোভ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বর্তমান ভিসি ৬ বৎসর আগে নিয়োগ পাওয়ার পর বিশ^বিদ্যালয়ের কিছু নীতিমালার পরিবর্তন আনেন। যেমন ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির বইয়ের সমস্যা এবং লাইব্রেরি রাত ৮ টার পর বন্ধ, ক্যাফেটোরিয়ার খাবারের মান উন্নত না করে দাম বৃদ্ধি, বিনা নোটিশে বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় কিছু টং চা-নাস্তার দোকান ছিল যেটা ছাত্রদের সবসময় খাবারের সহায়তা হতো, সেগুলো হঠাৎ উচ্ছেদ করেছেন। ক্যাম্পাসে কমবেশি ৬২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে তাদের রাজনীতি চর্চার জন্য বরাদ্ধকৃত রুমগুলো বাতিল করে দেন। বিশ^বিদ্যালয়ে পরিবহনের মারাত্মক সমস্যা, বাদুড়জোলা করে চলতে গিয়ে পড়ে ছাত্র আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে যখন শাহবাগসহ সারা দেশে আন্দোলন চলছিল, তখন শিক্ষার্থীরা বিশে^র সবচেয়ে বড় আলপনা ক্যাম্পাসে অঙ্কন করে সংহতি প্রকাশ করে। তারপরেই ভিসি সাহেব আদেশ দেন ক্যাম্পাসের রাস্তায় কোন কিছু অঙ্কন বা লেখা যাবে না। বিশ^বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী মেধায় মননে সক্ষম নয়। সেক্ষেত্রে যদি একটু খারাপ ছাত্র-ছাত্রী তাঁর কাছে গেলে কথা বলতেন না। সরাসরি বলে দিতেন তোমারতো রেজাল্ট খারাপ, তোমার সাথে আমি কথা বলবো না। এছাড়া বিভিন্ন দাবী-দাওয়া উপেক্ষা করে এবং আচরণের মাধ্যমে তিনি বিশ^বিদ্যালয়ে একটি তালেবানী শাসন চালু করেছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের আবেগ, ভালোবাসা, শাসন ¯েœহের জায়গা। এই ছাত্র সমাজই ৫২, ৬২, ৬৯, ৭০, ৭১ জন্ম দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল চালিকা হিসাবে লড়াই করেছে। এই যুবকদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ বিশিষ্টজনেরা বহু গান, কবিতা রচনা করেছেন। ছাত্র যুব সমাজই পারে নিঃস্বার্থভাবে যেকোন সময় জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে। এ জন্যই আমরা স্লোগান দিতাম “এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার”। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময় নিহত ছাত্রের লাশের সামনে আমরা ব্যানারে প্রতিবাদী শ্লোগান লিখতাম। পাশাপাশি দালালদের বিপক্ষে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলতাম “আমাদের কফিনে দেয়া ফুলগুলি তোমরা ফিরিয়ে দিও যদি রক্তের সাথে কেউ বিশ^াস ঘাতকতা করে”,। যুগে যুগে ছাত্র-যুবকরাই সমাজ ও প্রগতির ধারাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের চাওয়া-পাওয়া বেশি কিছু নয়। খুব অল্পে তারা সন্তুষ্ট। কিন্তু তারা যদি বিদ্রোহ করে তাহলে যত বড় স্বৈরাচার হোক না কেনা উৎখাত হয়ে যান। ছাত্রীদের হলের কিছু সমস্যা নিয়ে তারা প্রভোস্টের সাথে কথা বলতে গেলে প্রভোস্ট দাবী না মেনে তাদের সাথে অসদাচরণ করেন। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা মিলে ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দীন আহমদের সাথে কথা বলতে গেলে তিনিও প্রভোস্টের সুরে কথা বলে অসৌজন্য আচরণ করেন। এ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত এবং ভিসির পদত্যাগের এক দফার আন্দোলন শুরু করে হলে ভিসিকে শিক্ষার্থীরা তালা বন্ধ করে রাখে। তিনি সিলেট পুলিশ প্রশাসনের আশ্রয় কামনা করলে পুলিশ এসে লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, জল কামান, গ্রেনেডসহ যা যা করার নিরীহ ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের উপর ব্যবহার করে শতাধিক আহত করে। এ খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ১৪ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু করে। প্রথম দিকে তারা ক্যাম্পাসে মিছিল, মিটিং কবিতা আবৃত্তি, সংগীত, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, শিক্ষামন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বরাবরে দাবীনামা সম্বলিত খোলা চিঠি দেন। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করলে কেউ কর্ণপাত করে নাই। এরপর বাধ্য হয়ে ২৬ জন শিক্ষার্থী আমরণ অনশন ধর্মঘটে যান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে কাফনের সাদা কাপড় পড়ে এবং একজন ছাত্রকে কাফনের কাপড় পরিয়ে প্রতীকি লাশ বানিয়ে খাটিয়ার উপর রেখে সারা ক্যাম্পাস মৌন মিছিলসহ প্রদক্ষিণ করেন। এদিকে অনশনকারিরা একে একে কাহিল হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন। সেখানে গিয়েও শিক্ষার্থীরা ডাক্তারদের অনুরোধেও মুখে খাবার নিচ্ছেন না। তারা ভিসির পদত্যাগের দাবীতে অটল। বেশ ক’দিন হয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা অনশন প্রত্যাহার করছেন না, নূতন আরও ছয়জন শিক্ষার্থী অনশনে যোগ দিচ্ছেন। কেউ কথা বলতে গেলে অনশনরত শিক্ষার্থীরা এতই দুর্বল, হাউমাউ করে কাঁদছে। তারা কথা বলতে পারছেন। না পেরে এই শীতের রাতে ভিসির বাসার সামনে রাস্তায় শুয়ে থাকা দেখে যে কোন হৃদয়বান মানুষের কান্না আসে। ভিসি সমর্থক একজন শিক্ষক বলেন, আমরাও এভাবে কাঁদতে জানি। ভিসি বহিরাগত এবং শিক্ষকদের মধ্যে দালাল সৃষ্টি করে আন্দোলন নস্যাৎ করার চেষ্টা করেন। ভিসি সাহেবের পদটা এতই জরুরি যে, সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীরা মারা যাক, তিনি নির্বিকার। শেষ পর্যন্ত যদি এই আবেগী শিক্ষার্থীরা নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করে তারপরও ভিসি অথবা সরকারের টনক নড়বে না। শিক্ষামন্ত্রী জেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, উপজেলা চেয়ারম্যান দিয়ে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দেশের মেধাবী ছাত্রদের সামনে তারা যে কি করবেন যেন বুঝতে পারছিলেন না। মন্ত্রীরা তাদের ব্যক্তিগত অসুবিধায় সিলেট না গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঢাকায় আসতে বলেন। জানি তার ২ টা সন্তান আছে, তিনিও মা। তার সন্তানরা যদি এরকম করতো তিনি কি বাসায় বসে থাকতে পারতেন? আন্দোলনের ১২দিন পর জাতীয় সংসদে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ের ছাত্রনেতা সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর সামনে বলেন-“আজ ১২দিন ধরে সিলেট শা.বি. প্রবিতে আন্দোলন চলছে, ছাত্ররা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে অনশন করে আজ মৃত্যু শয্যায়, শিক্ষামন্ত্রী কোন পদক্ষেপ না নিয়ে বা সেখানে না গিয়ে আপনি তাদেরকে আসতে বললেন? এটা কেমন কথা? ছাত্ররা অনশনে করে মারা যাচ্ছে। একজন ভিসি কি আপনার জন্য এত জরুরি? এই মুহুর্তে তাকে এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক।

 

শাহাব উদ্দীন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.