মোনায়েম খান : বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত । একদিকে রাষ্ট্রপতি সংলাপ নিয়ে ব্যস্ত । অপরদিকে প্রধান বিরোধীদলসহ বেশ ক’টি ছোটদল রাষ্ট্রপতির আহব্বান তাচ্ছিল্যভরে ও সম্পুর্ণরূপে প্রত্যাখান করেছে । ফলে একটি রাজনৈতিক সংকট দেশকে অনিশ্চয়তার পথে যে ধাবিত করছে , এ সত্য একজন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি মাত্রই অকপটে স্বীকার করবেন ।প্রধান বিরোধীদল বিএনপি’র হুংকারে রাজপথ আবার সরগরম ।তাঁদের নেতা নেত্রী ও কর্মীদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা , যে কোন মুল্যে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত না করা পর্যন্ত তাঁরা ঘরে ফিরবেন না । দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্হা সতর্কতার সাথে বিবেচনা করলে ইহা প্রতিয়মান হয় যে, দেশের এক বৃহৎ অংশের লোক রাজ্যশাসনে একটি আমুল পরিবর্তনের পক্ষপাতী । আর সে পরিবর্তন হবে দেশকে সম্পুর্ণরূপে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরচতন্ত্রের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে পশ্চিম ইউরোপীয় গনতান্ত্রিক দেশে পরিবর্তিত করা । যেহেতু আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অন্যতম প্রতিশ্রুতি বা পিলার হিসেবে গনতন্ত্রকেই চিহ্নিত করা হয়ে থাকে ।কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর হতে অধ্যাবধি কোন সরকার সুষ্ঠ গনতন্ত্র বিকাশের জন্য কাজ করেনি । অধিকিন্তু বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনীর নামে মুলত প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছে । যারজন্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েও একজন প্রধানমন্ত্রী অতি সহজে চরম স্বৈরাচারী শাসক হয়ে উঠে । তৎসঙ্গে বিনা বাঁধায় ইচ্ছামাফিক বিভিন্ন কালো আইন প্রনয়ন করে বিরোধীমতালম্বীদের কঠোর হস্তে দমন করার সকল আইনী বৈধতাও পেয়ে যায়। যা পশ্চিমী গনতন্ত্র বা পার্লামেন্টারীয়ান গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে শক্ত দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় , বর্তমান সরকারের প্রতি প্রচন্ডভাবে জনরোষ ফুঁসে উঠেছে । ইহা প্রতিয়মান হচ্ছে , বিরোধীদল গুলো হিসেবী পদক্ষেপ ফেললে সহজে এই গনঅসন্তোষ যেকোন সময় বিস্ফোরণ্মুখ পরিস্হিতির দিকে ধাবিত করতে পারবে।পরিনামে সরকারের ভয়াবহ পরিনতি ঘটার সম্ভাব্যতা আরও বেশী বিশ্বাসযাগ্য হয়ে উঠবে বা ত্বরান্বিত হবে ।কিন্তু প্রশ্ন হলে ,বর্তমান সরকারের পরিনতিই কি দেশে কাঙ্খিত গনতন্ত্র ফিরে আসবে ? সামাজিক ন্যায বিচার প্রতিষ্ঠা হবে ? মত প্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে আসবে ? একজন এমপি সংসদে স্বদলের যেকোন উত্থাপিত মোশন ( Motin) পছন্দ না হলে তার বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করতে পারবে ?সর্বোপরি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে ? অথবা সরকারের গঠনপ্রনালীই বা কিভাবে হবে ? বিজ্ঞজনদের এমন উদ্বিগ্নতার পিছনে যৌক্তিক কারন নিহিত রয়েছে বলে অনেকের মত আমারও বিশ্বাস । কারন , বর্তমান সরকারের পতন হলে , আন্দোলনরত বিরোধীদল কিভাবে পরবর্তি সরকার গঠন করবে , তার কোন সুস্পষ্ট বা পুর্ণাঙ্গ রুপরেখা প্রকাশ করতে এখনও ব্যর্থ । তাছাড়া বর্তমান সরকার কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন কালা কানুন বা প্রতিক্রিয়াশীল আইন তাঁরা বাতিল করবেন কিনা সে ব্যাপারেও কোন স্বচ্ছ ব্যাখ্যা আসছে না ।আন্দোলনরত শীর্ষ নেতা-নেত্রীরা ভালভাবে অবগত আছেন তারা যতই বলছেন , গনতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম করছেন । তা’যে শুধু মাঠগরম করা বক্তব্য ছাড়া অন্যকিছু নয় , সে উপলব্দি তাঁদের সকলেরই আছে । কিন্তু কেউ খোলাসাভাবে স্বীকার করছেন না । এ ভয়ের নেপথ্যে কি কারন লুকিয়ে আছে পরিষ্কার নয় । তাঁদের এই নান্দনিক দুর্বলতা সাধারন মানুষ যে বুঝে না তা নয় । তারপরও সাধারন মানুষ পুর্ন আস্হার সাথে একটি পরিবর্তনের আশায় বুক বেঁধে আছে । বহু কাঙ্ক্ষিত সে পরিবর্তন আদৌ কি সম্ভব ?যেকোন আন্দোলনের একটি অভিষ্ঠ লক্ষ্য থাকা জরুরী । তবেই গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব । বিরোধীদলের আন্দোলনের লক্ষ্য কুয়াশাচ্ছন্ন । অথবা বলা যায় শুধু ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা , বৈ অন্য কিছু নয় । আর এখানেই আমার উদ্বিগ্নতার কারন । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হঠিয়ে আরেকজন হাসিনাকে ক্ষমতার মসনদে পাঠানোর মধ্যে দেশ বা জাতির কোন কল্যান হবে , এমন আশা করা একমাত্র Useful Idiots দের জন্যই শুভা পায় । মনে রাখা ভাল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবর্তনই যতেষ্ট নয় , বরং সকল স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্হার পরিবর্তন জরুরী । নতুবা সকল অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে , যা কারও কাম্য নয় ।
লেখক : বৃটেন প্রবাসী লেখক, কলামিস্ট।

