পরিবার-সমাজে নারী-পুরুষের জীবন সম্পুরক (Complementary)। আদিমযুগোত্তর ধর্মগুলো ক্রমান্বয়ে নারী-পুরুষের সম্পুরক জীবণের বিকাশ এনেছে। তবে কিছু ধর্মোদ্রী ও আাদিমমুখী মতবাদের প্রভাব এবং নারী-পুরুষের জীবন স্বকীয় ও সম্পুরকের বিষয়টি কম বিবেচনায় আনায় আধুনিক বিজ্ঞান/দর্শণগুলো ক্রমান্বয়ে নারী-পুরুষের পরষ্পর সম্পুরক জীবণের আরও উৎকর্ষ আনতে পরিনি।
কম-শক্তিসহ শারিরিক সীমাবদ্ধতা ও স্বকীয়তার জন্যে নারীর সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনের কম-বেশী পরনির্ভরশীলতা রয়েছে। ধর্মগুলোর পরিবারিক-সামাজিক বিধানগুলো নারীদের সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সহায়তা দিয়েছে। প্যাগান ধর্মগুলোও নারীদের নিরাপত্তা বাড়িয়ে সভ্যতার বিকাশের ধারা দেয়। তবে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ণসহ নির্ভরশীলতা হ্রাস-মোচন করতে পারেনি।
প্যাগানোত্তর হিন্দু-বৌদ্ধ-ক্যাথলিক-ইহুদী ধর্মগুলো পারিবারিক-সামাজিক বিধানাবলীর মধ্যেম নৈতিক-শৃংখলার আরও বিকাশসহ নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা বাড়ালেও নারীদের পরনির্ভরশীলতা কমাতে পারেনি। এরমূলে এসব ধর্মগুলোর পারিবারিক-সামাজিক বিধানগুলো। এ ধর্মগুলোতে নারীদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ও পুনঃবিবাহ এবং সম্পদের উত্তরাধিকার ছিল না। আরধনা ও হিতোপদেশ উৎকর্ষ বাড়ালেও নারীদের পরনির্ভরশীলতা কমাতে ও স্বাধীনতা বাড়াতে পারেনি।
খৃষ্টধর্মের চার্চগুলোর মধ্যে কনষ্টিনোপলস চার্চের অনু-অন্ত বিধান হিসেবে পুরুষ-নারীর সম্পদের সম-উত্তরাধিকার চালু ছিল। সম্রাট জাষ্টিনিয়ানের আমলে ৫৩৪ খৃষ্টাব্দে পূর্ব-রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টকে রাষ্ট্রধর্মসহ নারী-পুরুষের সম্পদের সম-উত্তরাধিকার চালু করা। অতঃপর বৈবাহিক ক্ষেত্রেও সমাধিকার বিধানও চালু করা হয়। অতঃপর ক্রমে বিবাহ-বিচ্ছেদ ও পুনঃবিবাহ বেড়ে উঠলে সমাধিকারের বৈবাহিক বিধান বিলুপ্ত করা হয়।
-২-
ইসলামে কোরাণিক বিধান হিসেবে বৈবাহিক ক্ষেত্রে নারীদের বেশী অধিকার এবং উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে অর্ধ-অধিকার অর্থ্যাৎ উভয় মিলে নারী-পুরুষের সুষম-অধিকারের বিধান প্রচলিত। এতে পারিবারিক-সামাজিক জীবনের উৎকর্ষসহ নারীদের পরনির্ভরশীলতা কমাতে ও স্বাধীনতা বাড়ানো বিধান নিশ্চিত হয়েছে। বিধান থাকলেই বা্স্তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় না। বাস্তবে পরিবারিক জীবনে উৎকর্ষ বাড়াতে সামঞ্জস পরিস্থিতি ও পরিবেশের পরিবর্তন আনতে হবে।
কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সামাজিক জীবনের চেয়ে কৃষি-শিল্প-সেবা-বাণিজ্য ভিত্তিক রাষ্ট্রিক নাগরিক জীবনে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের কর্ম-সংস্থানের সুযোগ বেড়েছে। তবে পারিবারিক-সামাজিক জীবনের উৎকর্ষ কমেছে। এরমূলে প্রচলিত কর্ম-সংস্থানের নিয়মাবলী। প্রচলিত নিয়মে নারী-পুরুষ উভয়ই পূর্ণকালীণ কর্মজীবি। পূর্ণকালীণ কর্মজীবণ স্বকীয় নারী-পুরুষের পরিবারিক-সামাজিক জীবনের জন্যে সংগতিপূর্ণ নয়।
সন্তান জন্ম-লালন-পালনে পারিবারিক জীবনে নারীদের দায়বদ্ধতা বেশী যা এড়ানো কোন সুযোগ নেই। পারিবারিক জীবনে নারীদের কর্ম পূর্ণকালীণ এবং পুরুষদের কর্ম অর্ধকালীণ। কর্মজীবি নাহলে নারীদের নির্ভরশীলতা কমাতে ও স্বাধীনতা বাড়াতে বিধান নিশ্চিত হয় না। তাই সুষম উত্তরণ হবে, পারিবারিক সামাজিক জীবনে নারীদের কর্ম পূর্ণকালীণ ও পুরুষদের অর্ধকালীণ এবং অর্থনৈতিক জীবনে পুরুষদের কর্ম পূর্ণকালীণ ও নারীদের কর্ম অর্ধকালীণ।
নারীদের অর্ধকালীণ কর্মজীবনের পরিস্থিতি, পরিবেশ ও ধারা সৃষ্টিকরা সরকারের দায়িত্ব। প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে নারীর অভিভাবকত্বে উপযোগীতা ও প্রভাব বেশী। জনসংখ্যার অর্ধেক হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে ছাড়া অন্যস্থানে নারীর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র ৫০%-এর কম সংরক্ষিত হলে প্রতযোগীতা ও বিকাশের ধারাবাহিতা থাকবে। অন্যদিকে দেশব্যাপী নারী-পুরুষ বিভাজিত এবং পারিবারিক-সামাজিক জীবনে বিকাশের ধারা অবনতিশীল হবে না।
৩- বিশ্বের সকল দেশেই নারী-পুরুষ জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় সমান। পারিবারিক জীবণের দায়বদ্ধতার জন্যে বাস্তবে ১৮-৬৫ বছরের নারী-পুরুষের নাগরিক অর্থনৈতিক জীবনে শ্রমসম্পদ হিসেবে অনুপাত প্রায় ১০০ঃ৬৭। নারীরা অর্ধকালীণ (৪ ঘন্টা) কর্মজীবি হলে নারী-পুরুষ শ্রমসম্পদের অংশীদারীত্ব প্রায় ১০০ঃ৩৪ হবে। বাকী ৬৬%-এর মধ্য পুরুষদের পূর্ণকালীণ কর্মের অংশীদারীত্ব ৫০%-এর ১৬% থাকবে যেখানে যেকোন নারী চাইলে পূর্ণকালীণ কর্ম করতে পারবে। বাংলাদেশে সরকারী সংস্থায় সপ্তাহে ৫দিন ৪০ ঘন্টা কর্মসময়। বাস্তবে দুপুরে খাবার-নামাজের সময় বাদ দেওয়া হলে ৩৫ ঘন্টা। বেসরকারী সংস্থায় সপ্তাহে ৬দিন ৪০ ঘন্টা কর্মসময় এবং বাস্তবে দুপুরে খাবার-নামাজের সময় বাদ দেওয়া হলে ৩৫ ঘন্টা দাঁড়ায়। প্রান্তিক হ্রাসমান কর্ম ও আধা-ঘন্টা বিরতি বিবেচনায় নারী-পুরুষের উভষের অর্ধকালীণ কর্মের জন্যে পূর্ণকালীণ কর্মের ৬০% বেতন-ভাতা নির্ধারণতব্য। দেশের সরকারী-বেসরকারী সংস্থায় ২৫% পুর্ণকালীণ পদ নারীর জন্যে সংরক্ষণসহ নারী-পুরুষের উভষের অর্ধকালীণ কর্মের জন্যে পূর্ণকালীণ কর্মের ৬০% বেতন-ভাতা প্রদানের নিয়োগনীতি প্রচলন করা যায়। সরকারী-বেসরকারী সংস্থায় প্রতি ৪টি পদের ১টি পুর্ণকালীণ পদে অর্ধকালীণ ২জন নারী কর্মকারীকে নিয়োগ করা যাবে। জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় সরকারী ও অনুদান/মঞ্জুরীকৃত বেসরকারী সংস্থায় অর্ধকালীণ কর্ম ও নিয়োগনীতি সহজেই প্রচলন করা যাবে। জাতীয় বেতন স্কেল ও সরকারী অনুদান/মঞ্জুরী বহির্ভুত বেসরকারী সংস্থাসমূহ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীণ নয়। তবে মাত্র ২৫% পুর্ণকালীণ পদ নারীর জন্যে সংরক্ষণ হবে, এ নীতিমালার প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশী ইতিবাচক জন্য এবং শহর অর্থনীতিতে নারী-পুরুষ একত্রে কর্মরত সংস্থা বাড়ন্ত হওয়ায় এনীতি সহজেই গ্রহণযোগ্য হতে থাকবে। বহুনারী স্বেচ্ছায় পুর্ণকালীণের বদলে অর্ধকালীণ বেছে নেবে, তাই নারী-পুরুষের উভয়ের কর্ম-সংস্থানের সুযোগ ও হার বাড়বে।

মোহাম্মদ আহসানুল করিম
(মোহাম্মদ আহসানুল করিম ১৯৮২ সাল থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠণ/সংস্কারের উদ্যোক্তা। তিনি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরখা (১৯৮৫), প্রগতিশীল গণতন্ত্র (১৯৯১), সংবিধান সংশোধনের দিকগুলো (২০১০), সুপ্রিমকোর্টে পেকৃত প্রতিবেদন (২০১১) এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার সম্পর্কিত বই-নিবন্ধের লেখক। তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ); আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর (টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র) এবং পাবলিক এফেয়ার্সে স্নাতকোত্তর (টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)। তিনি ১৯৮২ ব্যাচে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে ছিলেন।)

