একেকটা দেশের খাদ্যাভ্যাস একেক রকম। পৃথিবীর বিরাট একটা অঞ্চল জুড়ে মানুষের প্রধান খাবার গম, কিছু দেশ আছে তাদের খাবার আলু, আর আমাদের ভাত। যে ভাত না হলে চলে না, হাত পড়তে যাচ্ছে এখন সেই ভাতের ওপর। আঘাত এসেছিল অনেক আগে থেকেই। ধান উৎপাদন করে কৃষক ন্যায্য দাম তো দূরের কথা, সরকার নির্ধারিত দামও পায় না; আর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বাজারে চাল বিক্রি হয়। বর্তমানে মোটা চাল ৪৮-৫২ টাকা, মাঝারি চিকন চাল ৬০ টাকা এবং চিকন চাল ৭০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষিবিদ দিবস উপলক্ষে ২০২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বর্তমানে বিশ্বে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ
তৃতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে সপ্তম, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, বর্তমানে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৪ হাজার টন।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি এবং খাদ্য উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। ফলে অভাব ছিল। এখন জনসংখ্যা ১৭ কোটি আর খাদ্যশস্য উৎপাদন সাড়ে চার কোটি টনের বেশি। অর্থাৎ জনসংখ্যা বেড়েছে দুই গুণের একটু বেশি কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে চার গুণের বেশি। তাহলে খাদ্যঘাটতি কিংবা খাদ্য আমদানি করার কথা কি যুক্তিসংগত? বাস্তবে তা কিন্তু ঘটছে। এই তো সেদিন ১৭ লাখ টন চাল আমদানির জন্য ৪২৮ জন ব্যবসায়ীকে অনুমতি দেওয়া হলো। শুধু তা-ই নয় ১২ আগস্ট ২০২১ চাল আমদানির শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে তার প্রভাব নেই।
কিছু মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলে যাচ্ছে। এখন যাদের সামর্থ্য বেশি তারা ভাত খান কম। তারা তিনবেলা তো দূরের কথা একবেলাও ভাত খান না। কারণ তাদের খাওয়ার জিনিসের অভাব নেই। তারা দিনে কমপক্ষে সাতবার খান। সকালে বেড-টি সঙ্গে একটু খেজুর, বিস্কুট, ৮টায় নাশতা, ১১টায় হালকা স্ন্যাক্স, ১টায় লাঞ্চ, ৫টায় নাশতা, ৮টায় ডিনার, রাত ১০টায় হালকা কিছু। এ ছাড়া তাদের সামনে ফুলটাইম মৌসুমি ফল, আখরোট, কাজু বাদাম, স্যান্ডউইচ, বার্গার, পিৎজাসহ নানা ধরনের দেশি-বিদেশি খাবার এবং ওজন কমানোর জন্য গ্রিন-টি ও ব্ল্যাক-কফি তো থাকেই। তারা ভাত খান তবে তা স্ন্যাক্স আর ড্রিংকসের পাশাপাশি এক বা দুবেলা এবং তা কয়েক চামচ মাত্র। কিন্তু দেশে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা কত? যারা মাঝারি থেকে উচ্চ আয় করেন এবং কায়িক পরিশ্রম কম করেন তাদের এই খাদ্য গ্রহণের সামর্থ্য এবং প্রয়োজন আছে। শহুরে মধ্যবিত্ত বলে যারা একটু আত্মসুখ অনুভব করেন তারাও কি এভাবে খাবার সংগ্রহের খরচ করে সংসার চালাতে পারবেন?
১৭ কোটি মানুষের দেশে এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস মেনে জীবনযাপন করার মতো মানুষের সংখ্যা ধরুন মেরে কেটে ২০ লাখ। শতাংশের হিসেবে ১ শতাংশের কাছাকাছি। তারাই অবশ্য দেশের নীতিনির্ধারণ করেন। সে কারণে ৯০ ভাগের বেশি গরিব বা মধ্যবিত্তরা দুপুরে বা রাতে কী খায় তা ঠিক ধারণা করতে পারেন না। কৃষক, রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকচালক, নির্মাণ, পরিবহন শ্রমিক, গার্মেন্টস, লেদার, চা, রি-রোলিং, জাহাজভাঙা, জাহাজ নির্মাণ, দোকান কর্মচারী, হকারসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ৬ কোটি ৮২ লাখ শ্রমিক কত টাকা আয় করে আর কী খায় তারা? তাদের হাতের নাগালে স্যান্ডউইচ-বার্গার থাকলেও পকেটের সামর্থ্য থাকে না। তারা তিনবেলা ভাতই খান। পরিশ্রমের কাজ করলে দিনে ২৫০০ থেকে ৩০০০ কিলো ক্যালরি তাপ উৎপাদন করতে ভাতের বিকল্প কী? কমপক্ষে ৫০০ গ্রাম চাল বা গম খেলে তারা ২০০০ কিলো ক্যালরি তাপ পাবেন, বাকিটা ডাল, তরকারি, মাছ, মাংস, ডিম কিংবা অন্যকিছু দিয়ে পূরণ করেন। ৫০ টাকা কেজির চাল কম খেয়ে ৮০০ টাকা কেজির বাদাম বা ৮০ টাকা কেজির পেয়ারা, ১৯০ টাকা কেজির ব্রয়লার মুরগি, ৮০ টাকা লিটারের দুধ খেয়ে কি তারা ভাতের অভাব পূরণ করতে পারবেন? আর যা ব্যয় হবে সেই খাদ্যব্যয় কতজন মেটাতে পারবেন? তাদের মোটা হয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ভাত খাওয়া বন্ধ করা কি সম্ভব?
দেশে চালের দাম বাড়ছে কেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর এবং সমাধান কিছুদিন পরপরই মন্ত্রী সাহেবদের কাছ থেকে আসছে। অন্যান্য দেশের চেয়ে আমরা দ্বিগুণ ভাত খাই বলেই নাকি চালের দাম বেড়ে গেছে। ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর : কৃষির রূপান্তর ও অর্জন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা অনেক বেশি ভাত খাই। যদি ভাতের এই কনজাম্পশন (খাওয়া) কমাতে পারি, তাহলে চালের চাহিদা অনেকটাই কমে যাবে। আমরা একেকজন দিনে প্রায় ৪০০ গ্রাম চাল খাই, পৃথিবীর অনেক দেশে ২০০ গ্রামও খায় না।’
কথা সত্য। পৃথিবীর অনেক দেশের যে মানুষরা দিনে ২০০ গ্রামও চাল খায় না, কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় তাপশক্তি তো বাতাস থেকে আসে না। তারা ভাত, রুটি, পাউরুটির বাইরেও প্রচুর ফল, ভেজিটেবল সালাদ, মাছ-মাংস, দুধ, মাখন ও দুগ্ধজাত খাবার খান। ফাস্টফুড হিসেবে পিৎজা, স্যান্ডউইচ, বার্গার, হটডগ খান। কোক, পেপসি, বিয়ার, ওয়াইনসহ নানা খাবারের পাশাপাশি তারা যে ২০০ গ্রাম চালের ভাত খান, এটাই তো অবাক হওয়ার কথা। সে কারণেই স্থূলতা এখন তাদের জন্য বড় সমস্যা। ওদের সমস্যা মোটা হয়ে যাওয়া আর আমাদের শ্রমজীবীদের সমস্যা মোটা চালের ভাত খাওয়া।
ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১১৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৭৬ নম্বরে। ২০২০ সালে ছিল ৭৫ নম্বরে। তার মানে, দেশে ক্ষুধা এবং ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং বাংলাদেশ সরকারের করা যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখনো ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রতি আটজনের মধ্যে একজনের পুষ্টিকর খাবার জোগাড়ের ক্ষমতা নেই। পুষ্টি জোগাড়ের ক্ষমতা না থাকলেও পেট ভরানোর প্রয়োজন তো আছে। সে ক্ষেত্রে সহজে পাওয়া ভাতের বিকল্প কী?
কোনো ঘটনার ফলাফল বোঝাতে প্রবাদবাক্য ছিল, ‘কত ধানে কত চাল’। এখন বলতে এবং বুঝতে হবে, ‘কত চালে কত ভাত’। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান তো মিথ্যা নয়। এই হিসাব মাথা খাটিয়ে যত কষ্ট করে বের করা যায়, তার চেয়ে বেশি কষ্ট করেও শ্রমিকদের পকেট থেকে টাকা বের করা যায় না। অল্প কিছু মানুষের ঘরে আছে মাছ, মাংস, ফল, দুধসহ খাবারের প্রাচুর্য। অন্যদিকে বেশির ভাগ মানুষের থালায় ভাত আর আলুভর্তা, ডাল বা ছোট মাছ কিংবা শাক ছাড়া কিছু নেই। এ কারণে বিকল্প খাবারের সামর্থ্য অর্জন না করে ভাত খাওয়া কমাতে বললে ভাত দেওয়ার মুরোদ না থাকা সেই কিল মারার গোঁসাইয়ের কথা মনে আসার পাশাপাশি এ কথাটাও মনে উঁকি দেয়, একি সাধারণ মানুষ সম্পর্কে অজ্ঞতা নাকি সাধারণ মানুষকে উপহাস?
লেখক : রাজেকুজ্জামান রতন, রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট ।

