জলের শ্যাওলা

Accuracy ( সঠিকতা)  Precision ( নির্ভুলতা ) and Significant ( উল্লেখযোগ্য)। ইংরেজির এই তিনটি শব্দ যাই অর্থ বহন করুক না কেনো, প্রত্যেকটি শব্দের একক নিজস্বতা এবং ওজন আছে। ভীষণ ভারী শব্দ বলেই আমার কাছে অন্তত মনে হয়। ভাষার বিষয়টি এমন যে এক ভাষার অর্থ ভিন্ন ভাষায় সমান গুরুত্ব পায় না, বা বলা যায় সমান অর্থবহ নয়। এমন কি  ভৌগলিক অবস্থান থেকে এবং সংস্কৃতির দিক দিয়েও ভাষার ক্রিয়াকলাপে তারতম্য বেশ লক্ষ্যণীয় বটে। সেখান থেকেই, এক ভাষার বুলি ভিন্ন ভাষার গালিতে রুপান্তরিত হয়। তাছাড়া মুখের ভাষার একটি ভিন্ন বিষয়তো থেকেই যায়। শালা শব্দটি আমাদের অঞ্চলে যেমন মধুর গালি আবার সেই একি শব্দ শালাতে খুনোখুনিও হয়। ভিন্ন ভাষায় বা অঞ্চলে শালা শব্দটি গালিতো নয়ই, এমনকি রসিকতা বা মূল্য দুটোর কিছুই নাই।

 

ভাষা নিয়ে বলার উদ্দেশ্য ওপরে তিনটি শব্দ নিয়ে বলার জন্যই বলা মাত্র। লক্ষ্য করুন, গত সপ্তাহে সাম্প্রদায়িকতার একপ্রকার নোংরা খেলা হয়ে গেলো। যা নিয়ে কথা হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে এবং হওয়া প্রয়োজন।  বিশেষ করে আমাদের দেশটি এমন সাম্প্রদায়িকতার খেলায় মেতে উঠবে, সেটা ভাবতেই বারবার হোঁচট খেতে হয়। কেননা এই দেশটি ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে কাঁধে কাঁধ রেখে রক্তের বিনিময়ে গড়েছিলো। সেই মূল চেতনা থেকে দিনে দিনে দেশটি দূর থেকে বহুদূর চলে এসেছে। স্বাধীনতার পরে কখনোই শোনা যেতো না সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ঠ।  সবাই ছিলো একক অর্থে বাঙালি। আজ আমরা সেই বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘুতে রুপান্তরিত হয়েছি। প্রশ্নটি হলো কারা করলো এবং কিভাবে এখানে পৌঁছালো ?

 

সহজ উত্তরটি হলো রাজনীতি। রাজনীতিই এর জন্য শতভাগ দায়ী। আরও সঠিকভাবে বললে বলতেই হয় রাজনীতির নামে অপরাজনীতি। ইতিহাস সবার জানা তারপরেও উল্লেখ করতেই হয়, এই দেশটির জন্মের পরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আইনগত বন্ধ ছিলো। এমনকি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ছিলো লজ্জার। অথচ রাজনীতির নামে অপরাজনীতি এবং ক্ষমতার লোভ- লালসা চক্ষুলজ্জাকে দূরে ঠেলে দিয়ে, রাজনীতিতে ভয়ানকভাবে ধর্মের আগমন ঘটায়। কে বা কারা এবং কিভাবে এবং কখন থেকে রাজনীতিতে ধর্মের আগ্রাসন ঘটিয়ে আজকে দেশকে বাঙালি স্বত্বা থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে হিন্দু- মুসলিম বা বৌদ্ধতে ভাগ করলো, সে ইতিহাস কারও নিশ্চয়ই অজানা নয়। তাই সে বিষয়ে লেখার খুব বেশি প্রয়োজনীয়তা নাই। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাঙালিরা তাদের মূল চেতনাকে পায়ে দলিয়ে ধর্মের বড়িটাই অনায়াসে গিললো। ফলাফল যে বাঙালি তত্ত্বে আমাদের এই দেশ গড়লো, আজ অমরা সবাই বাঙালির চেয়েও বড় মুসলমান, বড় হিন্দু এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু।

 

লক্ষ্যণীয় যে, এই অত্র অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বহুপূর্বে বেশ ছিলো। সেটা দেশভাগের পূর্বে বা পরেও। তবে বর্তমানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলতে কিছু নেই। যা আছে সেটা হলো সাম্প্রদায়িক নির্যাতন।  হউক সেটা ভারতে বা বাংলাদেশে । বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান দ্বারা সংখ্যালঘু হিন্দুধর্মাম্বলীরা নির্যাতিত। আবার অপরদিকে ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দ্বারা সংখ্যালঘু মুসলমানেরা নির্যাতিত। ভারতের জনসংখ্যার বিচারে কোনো কোনো অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব আছে বটে। তবে আমাদের দেশে কিন্ত দাঙ্গার প্রভাব নেই। যা আছে বা হচ্ছে সেটা সরাসরি সাম্প্রদায়িক নির্যাতন।  কেননা সংখ্যার দিক বিবেচনায় দাঙ্গার সুযোগ কম।

 

সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প মানুষ মনকে কতটা  বিকারগ্রস্ত করতে পারে, তার চরম উদহারণ সাম্প্রতিক  বিশ্ব ক্রিকেট তার প্রমাণ। অপ্রত্যাশিত হলেও ঘটনাটি দুই মুল্লুকে সমানহারেই ঘটেছে । এক অঞ্চলে লিটন দাস তো ভিন্ন অঞ্চলে সামি। অথচ দুইজনই তাদের আপন দেশের জন্য খেলছে। খেলার মানদণ্ডে যাবো না। তবে লক্ষ্য করুন, মানুষের মগজে ধর্মের বাতাস কতটা দূষিত হলে খেলার মাঝেও ধর্মকে খুঁজে পায়। দেশপ্রেমের মাঝেও ধর্মের কল নাড়ায় । ব্যাপারটি এমন যে, বিধর্মী বা ধর্মহীন হলে দেশপ্রেম বলে কিছু থাকতে পারে না । কেনো বড় সংখ্যার জনমানুষেরা এমনভাবে ভাবছে ? সহজ উত্তরটি হলো, রাজনীতিকে ধর্ম দ্বারা ধীরে ধীরে  বিকলঙ্গ করা হয়েছে বলেই আজকে সর্বত্রই সাম্প্রদায়িক ভাবনার বিকাশ ঘটছে।

 

লেখার শুরুতেই তিনটি ইংরেজি শব্দ লিখেছিলাম, Accuracy ( সঠিকতা)  Precision ( নির্ভুলতা ) and Significant ( উল্লেখযোগ্য )। লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের দেশ সহ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও রাজনীতি বা ধর্মে Accuracy বালাই নেই। আর Precision ? যেখানে Accuracy থাকে না সেখানে Precision এর প্রশ্ন অবান্তর। তবে বেশ লক্ষ্যণীয় যে, Significant শব্দটি দুই দেশের জন্যেই বেশ প্রযোজ্য বটে। কেননা বেশ মিল আছে। দুই দেশেই উল্লেখযোগ্যভাবে ধর্ম বা রাজনীতি দুটোরই চরম অপব্যবহার হয়। বিগত তিরিশ- পয়ত্রিশ বছরের সময়কালটি একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে ( ভারতে বাজপেয়ি এবং আমাদের দেশে এরশাদ আমল থেকে ) দুই দেশের মানুষের বেশিরভাগই উল্লেখযোগ্যভাবে ধীরে ধীরে এই সময়ের মধ্যেই রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারের কল্যাণে নিজেদের মগজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প অতিমাত্রায় ধারণ করছে। ধর্ম যে হিংসা- বিদ্বেষহীন এবং মানব কল্যাণের মতন মহান বিষয়। রাজনীতিতে ধর্মের আগমনে সেটা বেমালুম উড়ে গিয়ে, ধর্ম নিজেও তীরবিদ্ধ এবং প্রশ্নের সম্মুখীন। মানুষ মন ধর্মভিরুতা থেকে ধর্মান্ধতায় বেশি উপনীত হচ্ছে। হিংসা- বিদ্বেষ কমার বিপরীতে দিনে দিনে বেড়েই চলছে। তাহলে সমাধান আসবে কি করে ? সমাধান একটাই, যার যার পথে তাকে চলতে দেওয়া। ধর্মকে ধর্মের পথে আর রাজনীতিকে রাজনীতির পথে। বিপরীত ধর্মী দুই পথ এক সাথে মিলেমিশে একাকার হলে, দুটোই তার পথ হারা হবে। যা বর্তমানে বেশ প্রতিয়মান হচ্ছে। তবে অবস্থা পরিপ্রেক্ষিতে বলাই বাহুল্য আগামীতেও সমাধানের দেখা মেলা ভার।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.