অকুস চুক্তির দূরবর্তী প্রভাব

অ্যাডভোকেট আনসার খান :সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র-এই তিনটি দেশএকটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং দেশ তিনটির নামের আদ্যাক্ষর-“এইউকেইউএস”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে বাংলায় এই চুক্তিকে-“অকুস চুক্তি”হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।অকুস চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক চুল্লিবাহী সাবমেরিনে সমৃদ্ধ করা।নামোল্লেখ করা না হলেও দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সমুদ্রে এবং তাইওয়ানে চীনের উত্থান,সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসন ও প্রভাব বৃদ্ধিকে মোকাবেলা করার লক্ষ্য সামনে রেখেই চুক্তিটি করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। তাই এই চুক্তি প্রভাবে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে শীতল যুদ্ধ ও পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু ও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

 

নতুন এই অকুস চুক্তি পূর্বতন শীতল যুদ্ধ যুগের কথা মনে করিয়ে দিতে যথেষ্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রায় সত্তুর বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের মধ্যে শীতল যুদ্ধ(ঠান্ডা যুদ্ধ) অব্যাহত ছিলো- উভয় পক্ষই বিশ্বব্যবস্হায় প্রভাব ও আধিপত্য কায়েম করার জন্য মনস্তাত্ত্বিক ওই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো।বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শিবির-পূঁজিবাদী শিবির তথা যুক্তরাষ্ট্রের নিকট শীতল যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যবস্হায় একধরনের স্বস্তি এসেছিলো এই ভেবে যে -বিশ্ব-সম্প্রদায় হয়তো যুদ্ধের হুমকি থেকে মুক্তি পেয়েছে।বিশ্বব্যবস্হার সর্বত্র শান্তির সুবাতাস বইবে-এমনই আশাবাদী হয়েছিলেন বিশ্ববাসী।

 

বিশ্বব্যাপী শান্তির সুবাতাস প্রত্যাশা করা হলেও এবং শীতল যুদ্ধের আপাতত অবসান ঘটেছে বলে মনে করা গেলেও শান্তি ও স্থিতিশীলতার সুবাতাস কিন্তু দূরওয়াস্তে-তা বছর কয়েকের মধ্যেই বিশ্ববাসীর নিকট প্রতীয়মান হয়ে ওঠলো।

 

বিশ্বব্যবস্হায় নতুন এক উপদ্রব দেখা দিলো-যা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে চিহ্নিত হলো।সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ শুরু করে এবং সন্ত্রাসের আশ্রয়দাতা হিসেবে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ২০০১-সালে।মূলত আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কায়েম হয়েছিলো এবং দুই দশক পরে চলিত সালের আগষ্টে ওই দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে না নেওয়া অবধি আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক শাসন অব্যাহত ছিলো। অন্যদিকে,গণতান্ত্রিক শাসনের দাবিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে “আরব বসন্ত” নামের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মোয়ামার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত এবং হত্যা করা হয়।সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।তবে রাশিয়া-ইরান আসাদ সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি।কিন্তু দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে।অপরদিকে-ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঠেকিয়ে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ঢালাও সহযোগিতা করে চলেছে।অর্থাৎ শীতল যুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্বে শান্তি আসেনি।

 

শীতল যুদ্ধ যুগের অবসানের পরবর্তী পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্টিত হয়েছিলো-যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো শক্তিই ছিলো না বিশ্বব্যবস্হায়।তবে চীন নিরবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করে এবং ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমকক্ষতা অর্জন করে।

ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন একক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় ১.৯-বর্গমাইল অঞ্চলের ওপর চীন তার সার্বভৌমত্ব দাবি করে।অথচ ওই অঞ্চলের ওপর ব্রুনাই,মালয়েশিয়া,ফিলিপাইন্স,তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম তাদের দাবি তোলে ধরেছে।কিন্তু চীন এসবের কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না।চীন বরং ওই অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্হাপন করেছে।পূর্ব চীন সাগরেও চীনের আধিপত্য কায়েম হয়েছে এবং দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সমুদ্রের উভয় সমুদ্রাঞ্জল খনিজ,তেল এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ-যা বৈশ্বিক বানিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

চীন এশিয়া,আফ্রিকা,মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে।চীন-পাকিস্তান করিডোরের মাধ্যমে আফগানিস্তান হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্হাপন করেছে এবং এমনকি ইউরোপ পর্যন্ত থাবা বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বিআরআই প্রকল্প বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছে। অর্থাৎ গোটা বিশ্বে চীন তার আধিপত্য বিস্তারের জন্য নানামুখী প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছে-যা বিশ্বশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দৃশ্যমান হয়েছে।তাই চীনের ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাকে প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং সেই লক্ষ্যেই তাঁর পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে পূর্বমূখী পরিকল্পনা সাজিয়েছেন।নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন চীনকে মোকাবেলা করার পূর্বমূখি কূটনীতির অংশ হিসেবেই বাইডেন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন।বিশেষকরে,দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সমুদ্রে এবং তাইওয়ানের দিকে বেইজিংয়ের আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসনের মোকাবেলা করার জন্য বাইডেন তাঁর নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অকুস চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন এবং ইতোপূর্বে ভারত-জাপান-অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে ‘কোয়াড’ নামক চতুর্ভুজ চুক্তি সম্পাদন করেছেন।যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনকে ঘিরে ফেলে এর বিশ্বশক্তি হিসেবে উত্থানকে থামিয়ে দেওয়া।

 

উল্লেখ্য-তিনদেশের তিননেতা,অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন,যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন গত১৫-সেপ্টেম্বর এক যৌথ ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘অকুস’ নামের নতুন এই নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব চুক্তির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন।তিননেতা নতুন এই চুক্তির প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে-এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর মোকাবেলার জন্যই এই নিরাপত্তা চুক্তি।নেতৃবৃন্দ কোনো দেশের নামোল্লেখ না করলেও স্পষ্টতই চীনের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

 

বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন-“চীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক ব্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।দেশটি একটি বিশাল নৌ ও বিমান বাহিনী সুগঠিত করে চলেছে এবং কিছু বিতর্কিত এলাকায় এইগুলো নিযুক্ত করেছে।” চীনের মোকাবেলায়-‘সেই অঞ্চলে আমাদের অংশীদাররা তাদের নিজেদের জায়গায় দাঁড়াতে সক্ষম হতে চায়।’

 

এই চুক্তির অধীনে অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন সাবমেরিনগুলোর একটি বহর তৈরি করবে-যা ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে।অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে চুক্তির আওতায় আটটি পারমাণবিক শক্তি চালিত সাবমেরিন তৈরি করবে।এই ধরনের সাবমেরিনগুলো প্রচলিত সাবমেরিনের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগামী এবং এইগুলো শনাক্ত করা কঠিন।এইগুলো কয়েক মাস পানিতে ডুবে থাকতে পারে এবং এর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দীর্ঘ দূরত্বে আঘাত করতে সক্ষম।অস্ট্রেলিয়া এই প্রযুক্তি লাভ করায় যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য,ফ্রান্স,চীন,ভারত ও রাশিয়ার পরে অস্ট্রেলিয়া পারমাণবিক সাবমেরিন ক্লাবের সপ্তম সদস্য হিসেবে অভিষিক্ত হলো।অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক ক্লাবের সদস্য করার লক্ষ্য হলো-অস্ট্রেলিয়ান নৌবাহিনীকে-চীনের নৌবাহিনীর সাথে প্রযুক্তিগত ভাবে সমতুল্য করা।

 

এই অংশীদারিত্ব চুক্তি তিনটি দেশকে সাইবার নিরাপত্তা,কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আন্ডারওয়াটার সিস্টেমসহ তাদের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতা উন্নত করার জন্য প্রযুক্তি ভাগাভাগি করে নেবার সূযোগ দিয়েছে।

 

এই চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।তবে চীনের প্রতিক্রিয়া মৌলিক।কেননা,এটি স্পষ্ট হয়েছে যে মূলত চীনকে উদ্দেশ্য করেই এই চুক্তি। কাজেই চীন কী মন্তব্য করেছে সেটি দেখার বিষয়।প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় চীন-এই চুক্তিকে-‘অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছে।চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান বলেন-এই চুক্তি-‘আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং অস্ত্র প্রতিযোগীতা তীব্রতর করবে।’বেইজিং ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আইনার টাঙ্গেন আল-জাজিরাকে বলেছেন-নতুন চুক্তিতে-ঔপনিবেশিক যুগের-“গানবোট কূটনীতির” প্রতিধ্বনির ইঙ্গিত রয়েছে।

 

সিডনিভিত্তিক লোই ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক স্যাম রোগভিন বলেন-“চীনের উত্থানের প্রতিক্রিয়া এবং এই চ্যালেঞ্জের প্রতি আমেরিকান উদ্যোগ হলো অকুস চুক্তি।এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র চীনা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে এবং পুরানো নিয়ম ভাঙ্গতে প্রস্তুত।”

 

চীন সরকারের মুখপত্র হিসেবে চিহ্নিত হকিশ গ্লোবাল টাইমসের ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় নোটে বলা হয়েছে-অস্ট্রেলিয়া এখন”চীনের প্রতিপক্ষ”হয়ে ওঠেছে।এতে করে- অস্ট্রেলিয়া চীনের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। “অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরাও সম্ভবত দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের জীবন নষ্ট করার জন্য পশ্চিমা সৈন্যদের প্রথম ব্যাচ হতে পারে।”

 

এই চুক্তির ভবিষ্যত প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সে প্রশ্নটি আসতেই পারে।১.ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেছে ২.চীন বিকল্প জোট গঠনের জন্য উদ্যোগী হবে এবং উভয় জোট মুখোমুখি বৈরিতার জায়গায় এসে দাঁড়াবে এবং ইন্দো-মহাসাগরীয় অঞ্চলে কর্তৃত্ব স্হাপনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে-যা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে উভয় জোটকে ৩.পশ্চিম হতে পূর্বে অর্থাৎ ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শীতল যুদ্ধ তীব্রতর হয়ে ওঠবে এবং অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।সর্বশেষ হলো- ওই অঞ্চল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধস্হল হিসেবে দেখা দিতে পারে।অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র পশ্চিম থেকে পূর্বে স্থানান্তরিত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

 

লেখকঃআন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.