প্রথম কোন যুদ্ধে যে দিন ব্যবহৃত হয়েছিল ভয়াবহ পরমানু বোমা

৬ অগাস্ট মানব ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। আজ থেকে ৭৬ বছর আগে, মানে ১৯৪৫ সালের ৬ অগাস্ট এই পৃথিবীতে প্রথম কোন যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল ভয়াবহ পরমানু বোমা। যেই বিস্ফোরণে এক সাথে প্রাণ হারিয়ে ছিলো কয়েক লক্ষ মানুষ, যাদের বেশির ভাগই ছিল সাধারণ জনগণ।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯ সালে এবং তা চলে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। এই দীর্ঘ ছয় বছর যুদ্ধ চলাকালিন এই পৃথিবী অনেকটাই অচল হয়ে পরে। একদিকে, বড় দেশ গুলোর মধ্যে একত্রিত হয়ে ‘মিত্র বাহিনী’ (the Allies force) নামে যুদ্ধ করে আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন। অপরদিকে, ‘নাৎসি বাহিনী’ (the Axis powers) নামে একত্রিত হয় জার্মানি, ইটালি এবং জাপান। পরিসংখ্যান বলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই দীর্ঘ ছয় বছরে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। যাদের মধ্যে প্রায় ৪০ মিলিয়ন বেসামরিক মানে সাধারন জনগণ ছিল, এরা সকলেই কেউ গণহত্যা, কেউ বোমা হামলা, কেউ রোগ অথবা অনাহারের কারণে মারা গিয়েছিল।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রায় শেষের পথে, তখন অগাস্টের ৬ এবং ৯ তারিখে জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহরে পরমাণু বোমা ফেলে হামলা করেছিলো আমেরিকা। বিশ্বে সেই প্রথম কোন যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল পরমানু বোমা, যার ফলে লক্ষাধিক মানুষ এক সাথে প্রাণ হারিয়ে ছিল। জাপানের হিরোশিমা শহরের সময় অনুযায়ি, ঠিক সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বি-২৯ বোমারু বিমান, যেটির নাম ছিল ইনোলা বে, শহরটিতে ‘লিটল বয়’ নামের পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। লিটল বয়ের ওজন ছিল ৬০ কেজি। নিজস্ব গন্তব্যে পৌঁছতে এটি সময় নেয় মাত্র ৫৭ সেকেন্ড। এই সময়ে এটি অতিক্রম করে ৬০০ মিটার দূরত্ব। এ বিস্ফোরণটি ঘটে ১৩ কিলোটন (টিএনটি)-এর সমান। সে সময় তাপমাত্রা হয়েছিল ৩৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ বিস্ফোরণের পর হিরোশিমার প্রায় ৯০ ভাগ বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
অপরদিকে, ৬ অগাস্ট জাপানের হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর ককুরা শহরকে লক্ষ্যস্থল করা হয়। কিন্তু আকাশজুড়ে মেঘ জমে থাকায় বিকল্প লক্ষ্যস্থল হিসেবে নাগাসাকিকে নির্ধারণ করা হয়েছিল। বোমায় ধংস হিরোশিমার ভয়াবহতা বোঝার আগেই তিন দিন পর, অর্থাৎ ৯ আগস্ট জাপানের অন্য একটি শহর, নাগাসাকি তে জাপানি সময় সকাল ১১টা ২ মিনিটে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের আরেকটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় আমেরিকা। ৩৯৩ডি বোম্ব স্কোয়াড্রনের মেজর চার্লস সুইনে বিমানটির পাইলট ছিলেন। ১ হাজার ৬৫০ ফুট উঁচু থেকে বোমাটি নিক্ষেপ করেন। এর ক্ষমতা ছিল ৮৮ টেরাজুল বা ২১ কিলোটন টিএনটি। আকাশ মেঘে ঢাকা থাকার ফলে সঠিকভাবে লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করা যায়নি। ফলে বোমাটি কেন্দ্রস্থল বিচ্যুত হয় এবং হিরোশিমার তুলনায় কম ক্ষতি করে।
অনুমান করা হয়, হিরোশিমাতে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ১লক্ষ ৪০হাজার মানুষ আর নাগাসাকিতে প্রাণ হারায় প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ। পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২লক্ষ ১৪ হাজার মানুষ। এই দুই শহরেই মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ বেসামরিক জনগণ। উপরন্তু, ঐ দুই দিন মৃত্যুর নাগালের বাইরে যারা থাকতে পেরেছিলো, তারাও তেজস্ক্রিয়তার ফলে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই বোমার শিকার হয়েও যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা “হিবাকুশা” বলে পরিচিত। তাদের ভয়ংকর শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে বাকি জীবন বাঁচতে হয়েছে।
এই বোমা হামলার আগেই জার্মানি ও ইটালি আত্মসমর্পণ করায় ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৪৫ সালের ৭ই মে থেমে যায়। এরপর মিত্র বাহিনী ২৮শে জুলাই জাপানকে আত্মসমর্পণের সময়সীমা বেঁধে দেয়। তবে এই সময়সীমার মধ্যে জাপান আত্মসমর্পণ করেনি। এরপরই অগাষ্টের ৬ ও ৯ তারিখে জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহরে এই পরমাণু বোমা হামলা চালায় আমেরিকা এবং ১৫ই আগস্ট জাপান নিঃশর্তভাবে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে এশিয়ায় তথা পুরো পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। যদিও জাপান আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫।
যদিও, ভয়াবহ এই পরমানু বোমা তৈরী ও বিস্ফোরণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। এর পক্ষে যেমন যুক্তি আছে, তেমনি এর বিপক্ষে রয়েছে কড়া ক্রোধ ও ধিক্কার। আমেরিকার শরণার্থী হিসেবে বসবাস করা হাঙ্গেরির বিজ্ঞানী ড. লিও জিলার্ড সর্বপ্রথম এই বোমা তৈরির উদ্যোগ নেয়। জার্মানি নিউক্লিয়ার বোমা বানাচ্ছে এমন খবরে ড. জিলার্ড পৃথিবী খ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন কে অবহিত করে এবং অনুরোধ করে আইনস্টাইন যেন তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট কে এই মর্মে একটি চিঠি লিখে এবং জার্মানির আগে আমেরিকা যেন নিউক্লিয়ার বোমা বানাতে পারে সে জন্য কাজ শুরু করে। আইনস্টাইনের চিঠি পেয়েই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নিউক্লিয়ার বোমা বানানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করে। যদিও প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের নির্দেশে এই পরমানু বোমাগুলো নিক্ষেপ করা হয়।
এ পরমানু বোমা বিস্ফারণের পক্ষে যারা রয়েছে তারা মনে করে এই বোমাবর্ষণের কারণেই জাপান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল এবং এ কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনেক মাস আগেই সমাপ্ত হয় আর তা না হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরো বহুদিন হয়তো আরো বহু বছর চলতো। আমেরিকার আরেকটি যুক্তি ছিল, তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ি তারা যদি জাপানের ভূখন্ডে আক্রমণ করে (Japan invasion), তাহলে অন্য সব দেশ বাদ দিয়ে শুধু আমেরিকারই আরো প্রায় ২লক্ষ ৫০হাজার সেনা নিহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এছাড়াও উভয় পক্ষের যে বিপুল প্রাণহানি হতো, এই বোমা বিস্ফারণের কারণে তা আর বাস্তবে ঘটেনি। জাপানের আত্মসমর্পণের পর ব্রিটেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় বিজয় উৎসব করার জন্য দুদিন জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং হাজার হাজার মানুষ উৎসব করে।
অপরদিকে, জাপান সহ পৃথিবীর বহু দেশ ও সাধারণ জনগণ মনে করে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের উপর এই ভয়াবহ বোমাবর্ষণ অপ্রয়োজনীয় ছিল। হিরোশিমা ও নাগাসাকির এই বোমাবর্ষণ ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কের দিন হিসেবে লেখা থাকবে আজীবন। এত ভয়াবহ, বর্বর, নৃশংস ও ঘৃণ্য আক্রমণ মানুষ দ্বারা মানুষের উপর হতে পারেনা। একদিকে যেমন এক মুহূর্তে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পরেছিল, তেমনি অন্যদিকে তেজস্ক্রিয়তার অভিশাপ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজম্মও রেহায় পাইনি। এই বোমা বিস্ফারণের বিপক্ষে যাদের অবস্থান তারা মনে করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যে কত একপেশি, ভয়ঙ্কর এবং মানবঘাতী হতে পারে, তা হারে হারে পুরো পৃথিবী উপলব্ধি করেছে।
প্রসংগত, প্রথম চারটি ছবি হলো-
•বোমার বিস্ফোরণের পর হিরোশিমার ধ্বংসস্তুপের ছবি
•বোমা বিস্ফোরণের পর নাগাসাকির ধ্বংসস্তুপের ছবি
•বোমা হামলার পর হিরোশিমা এবং নাগাসাকির আকাশে ধোঁয়ার কুন্ডলি
•বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলে ক্লাস চলছে ১৯৪৬ সালে ।
ব্যারিস্টার ফারাহ খান , লন্ডন প্রবাসী লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.