কর্নেল তাহেরের জবানবন্দি- (৬ষ্ঠ পর্ব)

১৯৭৪ সালে আমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ড্রেজার সংস্থার পরিচালকের পদে একটা চাকরী নেই। আমি সে সময় দায়িত্ব নেই তখন এই সংস্থা ইতিমধ্যেই দুর্নীতি ও অব্যবস্থার কবলে পড়ে ধ্বংস-প্রায় অবস্থায় পৌঁছেছিল। অল্পদিনের মধ্যেই আমার একে কর্মক্ষম করে তুলি। ১৯৫২ সালে সংস্থার জন্ম লগ্নের সময় থেকে আর কখনোই এর আয় অত বেশি ছিল না। সংস্থার একজন পাহারাদার থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পর্যন্ত সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন আমি কিভাবে এই সংস্থা চালিয়েছি। (তাহের তাঁর বক্তব্যের এই পর্যায়ে আবার বাধা পেলে বলেন- ‘জনাব চেয়ারম্যান ও মামলার সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, আমাকে সবকিছু বলতেই হবে। তাহলে আপনারা আমাকে আরো কাছ থেকে বুঝতে পারবেন।’)
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার কি ভূমিকা পালন করেছে তা দেশবাসী সবারই জানা। কিভাবে একের পর এক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছিল ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছিল তা এখন দলিলের বিষয়। এক কথায় বলা যায়, আমাদের লালিত সব স্বপ্ন, আদর্শ ও মূল্যবোধগুলো এক এক করে ধ্বংস করা হচ্ছিল। গণতন্ত্রের অসম্মানজনক কবরশয্যা রচিত হয়েছিল। মানুষের অধিকার মাটি চাপা পড়েছিল আর সারা জাতির ওপর চেপে বসেছিল এক ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র। ফ্যাসিবাদী নির্যাতনের গর্ভে ধীরে ধীরে জন্ম নিল ফ্যাসিবাদবিরোধী গণপ্রতিরোধ আন্দোলন।
এটা খুবই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক যে এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের অন্যতম প্রধান পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান শেষ পর্যন্ত একনায়কে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ মুজিব তাঁর সংঘাতময় রাজনৈতিক জীবনে কখনো স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের সাথে আপোষ করেননি। তিনি ছিলেন এককালে আমাদের গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। অনেক ক্রটি-বিচ্যূতি থাকলেও তিনিই ছিলেন একমাত্র নেতা যিনি জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন, জনগণের মধ্যে তাঁর ব্যাপক ভিত্তি ছিল। প্রতিদানে জনগণ তাঁকে তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। জনগণই মুজিবকে সম্মান এনে দিয়েছিল, বহুগুণ করে তাঁকে নায়কের প্রতিমূর্তি দিয়েছিল। আসলে জনগণ তাদের নেতা হিসেবে মুজিবকে তাদের মন মতো করে গড়ে নিয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘মুজিব’ নামটি ছিল যেন রণহুংকার। শেখ মুজিব ছিলেন জনগণের নেতা। এ কথা অস্বীকার করার অর্থ সত্যকে অস্বীকার করা। তাই চূড়ান্ত বিশেষণে তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার শুধু জনগণেরই ছিল। যে মুজিব জনগণকে প্রতারিত করে একনায়ক হয়ে উঠেছিলেন, সে মুজিবকে জনগণের শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করাটাই হত সব থেকে ভালো।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে জনতা মুজিবকে নেতার আসনে বসিয়েছিল সেই জনতাই একদিন একনায়ক মুজিবকে উৎখাত করত। ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত করার অধিকার জনতা কাউকে দেয় নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট, একদল সামরিক অফিসার আর সেনাবাহিনীর একটা অংশবিশেষ শেখ মুজিবকে হত্যা করে। সেদিন সকালে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারীর এক অফিসার আমাকে টেলিফোন করেন। তিনি বললেন, ‘মেজর রশীদের পক্ষ থেকে তিনি আমাকে একটা খবর জানাচ্ছেন। তিনি আমাকে ‘বাংলাদেশ বেতার’ ভবনে যেতে বললেন। তিনি আমাকে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের খবরও দিয়েছিলেন। আমাকে জানানো হয় সে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী খোন্দকার মোশতাক আহমেদ এই অফিসারদের নেতৃত্বে রয়েছেন। আমি তখন রেডিও চালিয়ে দেই । জানতে পেলাম শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে আর খোন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করেছেন।
এই খবর শূনে আমি যথেষ্ট আঘাত পাই। আমার মনে হল এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। এমনকি জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এর মধ্যে আমার কাছে অনেকগুলো টেলিফোন আসতে থাকল। সবার অনুরোধ ছিল আমি যেন ‘বাংলাদেশ বেতার’ ভবনে যাই। আমি ভাবলাম, যেয়ে দেখা উচিত পরিস্থিতি কি দাঁড়িয়েছে। সকাল নটায়, বেতার ভবনে গেলাম। মেজর রশীদ আমাকে একটা কক্ষে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি খোন্দকার মোশতাক, তাহেরুদ্দিন ঠাকুর, মেজর ডালিম আর মেজর জেনারেল এম. খলিলুর রহমানকে দেখতে পাই। খোন্দকার মোশতাকের সাথে আমি কিছুক্ষণ আলোচনা করলাম। আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে এই মুহূর্তে জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা করাটাই সবচেয়ে জরুরি। মেজর রশীদ আমাকে আরেকটা কক্ষে নিয়ে গেল ও জানতে চাইল আমি মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে উৎসাহী কি না। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানদের সাথে অবস্থা পর্যালোচনা করে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে। মেজর রশীদ জোর দিয়ে বললো আমি আর লেঃ কর্নেল জিয়াউদ্দিন-ই এই অবস্থা সামাল দিতে সক্ষম। সে বললো অন্য কোন বাহিনী প্রধানদের ওপর কিংবা কোন রাজনীতিবিদের ওপর তার কোন আস্থা নেই। আমি তার প্রস্তাব নাকচ করে দিলাম। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম বাকশালকে বাদ দিয়ে অন্য সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে যেন একটা সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হয়।
খোন্দকার মোশতাকের সামনে বিবেচনার জন্য আমি বেশ কয়েকটা প্রস্তাব রেখেছিলাম:
১) অবিলম্বে সংবিধান স্থগিত-করণ,
২) দেশব্যাপী সামরিক শাসন ঘোষণা ও তার প্রবর্তন, ৩) দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দান,
৪) বাকশালকে বাদ দিয়ে একটা সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করা
৫) জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য জরুরী ভিত্তিতে একটা জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
খোন্দকার মোশতাক আমার সব কথা মন দিয়ে শুনলেন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন। মেজর রশীদ বারবার জোর দিয়ে বলতে থাকল যে আমি যেন বঙ্গভবনে খোন্দকার মোশতাকের শপথ গ্রহণের সময় উপস্থিত থাকি।
সকাল সাড়ে এগারোটায় আমি বেতার ভবন ত্যাগ করি গভীর উদ্বেগ নিয়ে। আমার মনে হচ্ছিল মোশতাক তার কথা রাখবেন না, বরং উল্টো পথে এগুবেন। আমার আরো মনে হচ্ছিল এটা শুধু মোশতাক আর সেই অফিসারদের দলের ব্যাপার নয়। এর পেছনে অন্য কিছু বা অন্য কারো হাত রয়েছে। তারাই আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে। আমার ধারণাই সত্যে পরিণত হল। জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে খোন্দকার মোশতাক আমার সঙ্গে আলোচিত একটা কথাও উল্লেখ করেননি। দুপুর বেলায় আমি যখন বঙ্গভবনে পৌঁছলাম ততক্ষণে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষ। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি হত্যাকাণ্ডে জড়িত অফিসারদের সাথে আলোচনায় বসি। এদের নেতা ছিল মেজর রশীদ। সেদিন সকালে মোশতাকের কাছে আমি যে প্রস্তাবগুলো রেখেছিলাম এদের কাছেও সেগুলো পেশ করি। সুনির্দিষ্ট কোন পদক্ষেপ নেয়ার আগেই যাতে জরুরি ভিত্তিতে সব রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়া হয় সে ব্যাপারে আমি বেশ জোর দিয়েছিলাম। আমাদের আলোচনার শেষের দিকে আলোচনায় যোগ দেয়ার জন্য জেনারেল জিয়াকে ডেকে আনলাম।আমার প্রস্তাবগুলো সবাই সমর্থন করলেন। এ ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছিলেন যে সে মুহূর্তে সেটাই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
(৭ম পর্বে লিপিবদ্ধ)

 

রণি চৌধুরীর ওয়াল থেকে নেয়া

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.