কর্ণেল তাহেরের জবানবন্দি- (৪র্থ পর্ব)

চতুর্থ, বাংলাদেশের মাটিতে স্বতঃস্ফুর্তভাবে কাদের সিদ্দিকী, মেজর আফসার, খলিল, বাতেন, ও মারফতের মতো আরো অনেক খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর এক বিশাল দল গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধরত শক্তিগুলোর এটাই ছিল স্বাভাবিক বিকাশ। দুর্ভাগ্যবশত কর্নেল ওসমানী নিয়মিত সামারিক কমান্ড ও প্রবাসী সরকার এই স্বাভাবিক শক্তির বিকাশকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তার ফলে নিয়মিত বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয়নি। পঞ্চমত, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অশুভ প্রভাব মুক্তিবহিনীর কিছু সংখ্যক ছেলের মাথায় ব্যক্তিগত লোভ লালসার চিন্তা ঢুকে যায়। এদের আদর্শগত ভিত্তি ছিল নিতান্তই দুর্বল। এরাই অনেক লুট পাটের ঘটনার নায়ক।
এসব সমস্যা সমাধানের পথ ছিল একটাই। তা হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে মুক্তঞ্চলে প্রবাসী সরকারকে নিয়ে আসা। আমি সামরিক নেতৃত্বকে বোঝাতে চেষ্টা করি যেন ভারতীয় এলাকা থেকে সরে এসে বাংলাদেশের ভেতরে কোথাও সদর দপ্তর স্থানান্তর করা হয়। মেজর জিয়া আমার সাথে একমত হলেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সব কমান্ড সীমান্তের এপারেই স্থানান্তর করা উচিত। আমাদের ইচ্ছা ছিল সব সেক্টরে সমন্বিতভাবে একটা নির্ধারিত সময়ে এই কাজ হোক। তাই সেক্টর কামান্ডারদের একটা সভা ডাকা হল। কর্নেল ওসমানীসহ মেজর খালদ মোশাররফ আর মেজর শফিউল্লাহ আমার প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন। বাংলাদেশের মাটিতে সেক্টর সদর দপ্তর স্থানান্তর করা থেকে আমদের বিরত করা হল। শুধু তাই না, মেজর জিয়ার ব্রিগেডকে আমার সেক্টর থেকে সারিয়ে নেয়া হল। আমার সঙ্গে থেকে যান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হামিদুল্লাহ নামে একজন বিমান বাহিনীর অফিসার ও যুদ্ধাহত অফিসার সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মানড়বান। যাতায়াতের জন্য আমাকে শুধু একটা জীপ দেয়া হয়েছিল। আমাদের অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্রিগেডিয়ার সিং সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে তুরা নামে এক জায়গায় আমার সেক্টরের সদর দপ্তর স্থাপন করার পরামর্শ দিলেন।
উল্লেখযোগ্য, আমাদের প্রায় সব সেক্টর সদরই ছিল ভারতের অনেক ভেতরে। আমদের প্রায় সব সেক্টর অধিনায়কই তাদের তাবুতে কার্পেট ব্যবহার করতেন। আমি ব্রিগেডিয়ার সিং-এর প্রস্তাব প্রত্যাখান করলাম। কামালপুর শত্রুঘাটির ৮০০ গজ দূরে অবস্থিত হল ১১ নং সেক্টরের সদর দপ্তর। আমি ভালোভাবেই জানতাম আমাকে সেই পথের ওপর জোর দিতে হবে যা আমাদেরকে এনে দেবে চূড়ান্ত বিজয়। আর এই পথ হবে কামালপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল, হয়ে শেষের ঢাকা। কামালপুরই ছিল ঢাকার প্রবেশদ্বার।
আমি এখন ‘সুবেদার আফতাব’ নামে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি স্মরণে কিছু বলতে চাই। সে ছিল দুঃসাহসী এক নিবেদিতপ্রাণ যোদ্ধা। সে কখনো মাটি ত্যাগ করেনি। কিছু সংখ্যাক যুবককে নিয়ে সে বীরত্বের সাথে পাক দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল; মওকা পেলেই সে তদেরকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়তো। ১১ নং সেক্টরে আসার পর আমি শুনতে পেলাম সুবেদার আফতার এক বিদ্রোহী। সে কারো আদেশের তেয়াক্কা করে না। রৌমারি থানার কোদালকাঠি নামে এক জায়গায় সে অবস্থান করছিল। বারবার নির্দেশ পাওয়া সত্ত্বেও সে কখনোই মেজর জিয়া বা ব্রিগেডিয়ার সিং এর সাথে দেখা করেনি। আমি সুবেদার আফতাব সম্বন্ধে যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে পড়লাম। আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আঠারো মাইল হেঁটে আমি কোদালকাঠি পৌঁছাই। সে দারুণ অবাক হয়ে গিয়েছিল। দেশের ভূখণ্ডে খোদ একজন অফিসারকে দেখবে তা সে কখনো আশাই করেনি। যুদ্ধকৌশল নিয়ে তাঁর সাথে আলাপ করতে গিয়ে দেখি আমাদের চিন্তাভাবনা অভিন্ন। তারপর থেকেই আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে যাই।
-ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান আবারো বাঁধা দিলেন। তাহের তখন বলেন, “এই কথাগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক। (চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে) আপনিতো যুদ্ধে ছিলেন না, মুক্তিযোদ্ধদের সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা থাকবে।” এই বলে তিনি আবার শুরু করেন।
সুবেদার আফতার আমাকে জানালো, সে রৌমারী থানার এক বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত এই এলকাগুলো মুক্তাঞ্চল ছিল। যুদ্ধ চালাকালীন পুরো সময়টা সে ভারতের অভ্যন্তরে ঘাঁটি স্থাপন করতে অস্বীকার করে আসছিল। সে রাত আমি তাঁর সাথে কথা বলে কাটিয়ে দিলাম। দেখলাম সে খুব সহজেই মানুষের নেতৃত্বের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে পেরেছে। তার সামনে নিজেকে বড়ো ছোট লাগলো। সুবেদার বলল, সে যেকোনো কিছু করার জন্য প্রস্তুত আছে। ওদের অবস্থানের কিছু দূরে চরে পাকিস্তানিদের এক ঘাঁটি ছিল। আমি তখন তাদের তাড়িয়ে দেয়ার জন্য একটা আক্রমণের প্রস্তাব দিলাম। দুই শিবিরের মধ্যে একটা নদী। পাকিস্তানিরা যে চরে অবস্থান নিয়েছিল তা একটা খালের মাধ্যমে দুই ভাগে ভাগ
হয়ে আছে। আমি আর সুবেদার একটা নৌকায় করে পৌঁছলাম। দেখি পাকিস্তানিরা চরের অন্য প্রান্তে। এই চর ছিল ঘন কাশবনে ঢাকা। আমি পরিকল্পনা করলাম একদল যোদ্ধা রাতে নদী পার হয়ে খালের পাশের কাশবনে অবস্থন নেবে। পরদিন ভোরে একটা ছোট দল বের হবে পাকিস্তানিদের হাতে তাড়া খাবার জন্যে। ৪ দিনের মধ্যেই সুবেদার আফতার পরিকল্পনা মাফিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। যা আশা করেছিলাম তাই হল, পাকিস্তানিরা ভোরবেলার দলটাকে পিছু ধাওয়া করলো। এভাবে ওদের মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যু ফাঁদের আওতার ভেতরে নিয়ে আসা হল। প্রথম দফা আক্রমণেই পাকিস্তানিদের বেশ বড়োসড়ো ক্ষতি হল। ওরা দুবার আক্রমণ করলো দুবারই আক্রমণ প্রতিহত হওয়ায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তারা পালিয়ে গেল। এভাবেই রৌমারী থানা সহ বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা আমাদের দখলে আসে।
এরপর আমরা চিলমারীর ওপর নজর দেই। চিরমারী যুদ্ধ এক বহু পরিচিত সংঘর্ষ। আমি এই যুদ্ধের নেতৃত্বে দিয়েছিলাম। তখন মাঝ-সেপ্টেম্বর।একরাতে ১২০০ মুক্তিযোদ্ধা ব্রহ্মপুত্র নদী পাড়ি দিল। আমাদের লক্ষ্যস্থল পাহারায় ছিল ২ কোম্পানি পাকিস্তানি নিয়মিত সৈন্য। ছাড়া অজস্র রাজাকার তো ছিলই। আমরা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত চিলমারী বন্দরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম। এটা ছিল এক সাহসিক আক্রমণ। এমন নজীর যুদ্ধের ইতিহাসে কমই আছে। সেপ্টেম্বর মাস থেকেই রেডিওতে প্রচারিত স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত সংবাদের বেশি ভাগেই থাকত আমাদের সেক্টরের খবর। এমনকি বিখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক জ্যাক অ্যান্ডারসনও আমাদের এলাকার অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এই বলে, ‘কমলপুরের ঘাঁটির পতনের মানেই হচ্ছে পাকিস্তানিরা এই যুদ্ধে হেরে গেছে।’ কমলপুরের যুদ্ধ পরিচালনার সময় আমার একটা পা হারাই। আমার সেক্টরের ছেলেরাই সবার আগে ঢাকা পৌঁছেছিল।
স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলতে যেয়ে অবশ্যই আমাদের মুক্তি সেনাদের দেশপ্রেম, বীরত্ব ও আনুগত্যের উল্লেখ করতে হয়। এরাই জাতির সেরা সন্তান। এছাড়াও গ্রামের সব গরিব গ্রামবাসীদের কথাও বলতে হয়। এরা আমাদের দিয়েছে খাদ্য ও আশ্রয়। শত্রুসেনার অবস্থান সম্পর্কে তারা আমাদের সব সময় খবর দিয়েছে। এরা ছিল আমাদের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণার উৎস। আমার হাতে তো তাও একটা অস্ত্র ছিল। এদের কাছে কিছুই ছিল না। আমাদের সাহায্য করেতে যেয়ে এরা পাকিস্তানী বুলেটের শিকার হয়েছে। তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের স্ত্রী-মা-বোনদের সম্মান-হানি করা হয়েছে। এরা ছিল আসলে সবচেয়ে বেশি সাহসী এদের কথা আমি সব সময় মনে রাখবো।
১৬ই ডিসেম্বরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে চলে যায়। এতে আশ্চর্যের কিছুই ছিল না। আমাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের অসাবধানী, অযোগ্য ও দেউলিয়া আচরণের জন্যই প্রবাসী সরকার সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে পড়েছিল। এর ফলে ভারতীয় হস্তক্ষেপের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঘাঁটিগুলো ভারতে থাকায় ও ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের নিয়মিত সৈন্যরা ছিল মানসিকভাবে দুর্বল ও হীনমন্য। বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে পা দেয়া মাত্রই ভারতীয় সৈন্যরা বিজিত সম্পদের ওপর বিজয়ী বাহিনীর মতোই হাত বসালো।( ৫ম পর্বে লিপিবদ্ধ)

 

রণি চৌধুরীর ওয়াল থেকে নেয়া

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.