২০২০ এর মধ্য দিয়ে যাওয়া, আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং অকল্পনীয় একটি বছর ছিল। বিশ্বজুড়ে মানব জাতির এমন উদ্বেগজনক ও চরম দুঃসময় আমরা আমাদের জীবদ্দশায় দেখিনি।
২০২০ সালের বিশ্বে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল চীনের উহান শহরে কওভিড -১৯-এর প্রাদুর্ভাব যা দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বব্যাপী মহামারীতে পরিণত হয়। চাকরি হারানো থেকে শুরু করে পরীক্ষা বাতিল, হোম স্কুলিং, বাড়ি থেকে চাকরী করা, অনলাইনে কেনাকাটা, ফেইস মাস্ক পরা থেকে শুরু করে সামাজিক দূরত্ব, ঘনঘন সাবান ও পানি দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধোয়া ও হাত ধোয়া সম্পর্কে অবসন্ন হয়ে উঠা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা ভাইরাসের দাপট বাড়ার সাথে সাথে একাধিক জিনিসের ও সংকট তৈরি হয়েছিল, যেমন; হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টয়লেট পেপারস এবং মাস্কের। ডাল, চাল, টয়লেট পেপার, হ্যান্ড-ওয়াশ সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে সমাবেশে সীমাবদ্ধতা, আমাদের আশেপাশের পরিবেশে মহামারীটির তাৎক্ষণিক প্রভাব মার্চ মাসের প্রথম দিকে স্পষ্ট হয়ে যায়।
লকডাউনের ফলে পজেটিভ কিছু রেজাল্ট ও এসেছিল। এই নতুন চ্যালেঞ্জগুলির পাশা পাশি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্বজন হারানোর ব্যাথা বেদনায়, ভয়-ভীতিতে জর্জরিত থাকা সত্বেও ইতিবাচক যে বিষয়টি ঘঠেছে তা হ’ল মানবতাবোধ ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। মানুষের মধ্যে বেড়েছে দয়া-মায়া ও উদারতা, গরীব অসহায় মানুষের সহযোগিতায় তাদের পাশে দাঁড়ানো, এই মহামারীতে যারা রোজ আনে রোজ খায়, যাদের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে তাদেরকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করা, যারা শারীরিকভাবে অক্ষম তাদেরকে বাজার করে দেওয়া, খাবার রান্না করে দেওয়া কিংবা ফোন করে খবরা-খবর নেওয়া ইত্যাদি।
– প্রথম লকডাউনের ফলে পৃষ্ঠ-স্তরের নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড (NO2) দূষণে 42% হ্রাস ঘটে।
কেবল করোনা মহামারীই নয়, ব্রেক্সিট থেকে শুরু করে, ইউএস ইলেকশন এবং ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার‘ মুভমেন্ট পর্যন্ত, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উত্থান দেখা গেছে। এর মধ্যে একটি হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের প্রস্থান।
২০২০ সালের শুরুতে সবচেয়ে বড় বিশ্ব সংবাদ ছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যা। সোলায়মানির হত্যাকাণ্ড ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে বিরাট উত্তেজনা ও বৃদ্ধি করে।
২০২০ সালের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ান বুশফায়ারের কথা নিশ্চয় মনে আছে,
অগ্নিকাণ্ডগুলি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। বুশফায়ারগুলির দ্বারা ক্ষয়ক্ষতির স্কেল মূল্যায়ন করে দেখা গেছে যে ১০০ কোটিরও বেশি হেক্টর পুড়ে গেছে, যা সমগ্র যুক্তরাজ্যের ৪০ শতাংসের সমতুল্য।
মার্চ মাসে লকডাউনের ফলে, বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্পও নাটকীয় ক্ষতির মুখোমুখি হয়, অসংখ্য ক্রুজ জাহাজ ডক এবং যাত্রীবাহী বিমানগুলি অর্ধ-ক্ষমতায় ভ্রমণ করেছে।
২০২০ সালের এপ্রিল মাসে, আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে, তেলের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নেতিবাচক আকার ধারণ করে ৩৭.৬৩ এ নেমে যায়।
-‘ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার‘ প্রতিবাদ “আমি শ্বাস নিতে পারছি না।” এই কয়েকটি শব্দ একটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলনের চলমান শিখার জন্ম দেয় ২০২০ সালের মে মাসে। পুলিশ জর্জি ফ্লয়েডকে হত্যার পরে, সশস্ত্র সংঘাতের অবস্থান ও ইভেন্ট ডেটা প্রকল্প (এসিএলইডি) তিন মাসের ব্যবধানে ৭৫০ বিএলএম-সংযুক্ত বিক্ষোভ রেকর্ড করে।
-২০২০ সালের মে মাস থেকে সারা বিশ্বের মানুষ বাড়ি থেকে কাজ করা শুরু করে এবং আমাদের অফিসগুলি ভার্চুয়াল অফিস হিসেবে পরিণীত হয়, যার ফলে আমরা প্রতিদিনের সামাজিক ইন্টারাকশন থেকে দূরে সরে পড়েছি এবং বাড়ি থেকে কাজ করার ফলে আমাদের অনেকেরই প্রযুক্তির উপর অনেক বেশি নির্ভর থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার গুলোর উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল আমরা।
-টেসলা গাড়ির জন্যও একটি হলমার্ক বছর ছিল ২০২০ সাল, জুলাই মাসে টেসলা বিশ্বের সর্বাধিক মূল্যবান অটোমেকার হয়ে ওঠে। কেবল তা নয়, টেসলা পরবর্তী ছয়টি গাড়ি প্রস্তুতকারীর চেয়েও মূল্যবান হয়ে উঠে।
-২০২০ সালের জুলাই মাসে টেকনোলজির আধিপত্যও বেড়েছিল বেশ, ফেসবুক, অ্যাপল, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্স, এবং মাইক্রোসফ্ট-এর শেয়ার বাজারের ক্যাপ ৫০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছিল।
বিশ্ব যখন অনেক জৈবিক এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে ঠিক তখন ২০২০ সালের আগস্ট মাসে মানব-ত্রুটির ফলে বৈরুতে ঘটেছিল মারাত্মক বিস্ফোরণ যা বৈরুত বন্দরকে কাঁপিয়ে তোলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা এই বিস্ফোরণটি রিয়েল টাইমে বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়েছিল।
২০২০ সালে, পশ্চিম আমেরিকা বেশ কয়েকটি বড় বড় ওয়াইল্ডফায়ার ও ভারী ধোঁয়ার ফলে বেশ কয়েকটি ধোঁয়াজনিত ঘটনা ঘটে। পশ্চিম উপকূলের অনেক শহর জুড়ে লাল আকাশ দেখা যায়।
আগস্টে মাসে তীব্র বজ্রপাতে ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন এবং ওয়াশিংটন জুড়ে অসংখ্য দাবানল জ্বলে উঠে, তারপরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে পশ্চিম উপকূল জুড়ে অতিরিক্ত জ্বলন্ত ঘটনা ঘটে, যার ফলে বায়ুর গুণমান “বিপজ্জনক” বিভাগে পৌঁছেছিল।
-২০২০ সালের, নভেম্বরে ইউএস প্রেসিডেন্টসিয়াল ইলেকশন হয়।
-কোভিড -১৯ এর তৃতীয় তরঙ্গ ও বাড়ে নভেম্বরে।
-টিকা দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে।
২০২০ সাল আমাদের সকলের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও অপ্রত্যাশিত একটি বছর ছিল। বছরের বেশীরভাগ সময়ই আমরা করোনা আতঙ্ক নিয়েই কাটিয়েছি। আমরা কীভাবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবো এই ভাবনায় বিশ্বের সকল মানুষ, সকল দেশ সংগ্রাম করছে, মহামারীটি মানব ইতিহাসের গতিপথকে বদলে দিয়েছে। ২০২১ সাল আমাদের জন্য কেমন যাবে তা ধারণা করা কঠিন।
যদিও খবরা-খবরের মাধ্যমে গত ১০-১২ সপ্তাহ ধরে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং ভ্যাকসিনগুলি কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে এমন একটি নতুন আশার আলো আমরা দেখতে পাচ্ছি। তারপরও ট্রান্সমিশন এবং মৃত্যুর পরিমাণ এখনও অনেক, ভ্যাকসিনের আনইকোয়াল অ্যাক্সেস এবং ভাইরাসের ভারিয়ান্টস আমাদেরকে অনেক উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে এবং আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যাই কি না এই ভীতিও আমাদের মধ্যে কাজ করছে।
মহামারীটির শেষ পরিণতি কি হতে পারে তা দেখতে আমাদের এই বছরের শেষ অবধি পর্যন্ত হয়তো অপেক্ষা করতে হতে পারে।
হুসনা খান হাসি
লন্ডন
৩১/০৩/২০২১


করোনা মহামারি শুরুর বছর ২০২০. বছরটির নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনা সুন্দর সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিশ্লেষণাত্বক বর্ণনা করা হয়েছে। লিখাটি তথ্য সমৃদ্ধ। ঐতিহাসিক দলাল হিসাবে লিখাটি সংরক্ষণ যোগ্য। লেখিকাকে আন্তরিক ধন্যবাদ