শীতার্ত বস্রহীন দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের বস্রদান ও সহযোগিতা প্রদানও ইবাদত

আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ।গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। হেমন্ত পেরিয়ে সবেমাত্র শীতকাল শুরু হয়েছে। হেমন্তের অগ্রহায়ণ মাসের শুরু থেকেই শীতের চাদর যেভাবে প্রকৃতিকে ডেকে চলেছে তাতে মনে হয় পৌষ ও মাঘ মাসে অর্থাৎ পুরো শীতকালটাই এবার হয়তোবা শৈতত্যপ্রবাহ সহ প্রচন্ড ঠান্ডার অত্যাধিক প্রকোপ অনেকটাই প্রায় নিশ্চিত।
তবে এবারের শীতকাল সঙ্গে করে নিয়ে আসছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে প্রচন্ড ঠান্ডা, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতা এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ দ্রব্যমূল্যের অস্থিরতা। করোনা জনিত কারনে গত মার্চ মাস হতে মানুষ বিশেষ করে সমাজের শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষগুলো কর্মহীনতার কারণেন আর্থিক অসচ্ছলতাসহ নানাবিধ দুরাবস্থার শিকার।  সমাজে বসবাস নিম্ন আয়ের মানুষগুলো ভুগছে কর্মহীনতা, অর্থহীনতায়। এ কারণে কেবলই দরিদ্র শ্রেণীর মানুষই নয়, সব শ্রেণী পেশার মানুষের আয় বা ক্রয়ক্ষমতার স্বাভাবিকতায় মারাত্মকভাবে ছন্দপতন ঘটেছে। আবার শীতের প্রারম্ভেই করোনা সংক্রমণ হার এবং করোনা আক্রান্তে মৃত্যুর হারও পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে — যা জনমনে স্বাভাবিভাবেই আতঙ্ক বাড়াচ্ছে, মানুষ ও শঙ্কিত হচ্ছে।
পৌষ ও মাঘ মাস শীতকাল হলেও এবারের শীত আগমন মনে হচ্ছে একটু আগাম, অগ্রাহায়নের প্রারম্ভেই শীতের চাদরে মানুষ আচ্ছাদিত হচ্ছে এবং দিনদিনই শীতের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মাত্রাও বাড়ছে, করোনা আক্রান্তে মৃত্যুর মিছিল ও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এতদ্বসত্বেও মানুষ বিশেষ করে সমাজের হত দরিদ্র, দরিদ্র, শ্রমজীবী,  নিন্মবিত্ত এবং নিন্মমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষগুলো তাদের  সাংসারিক নিত্যপ্রয়োজন মিটাতে জীবিকার সন্ধানে শীত উপেক্ষা করে গ্রাম-গঞ্জে, শহর-বন্দরে দিন-রাত ছুটে চলেছে।
শীতকালে শীতের প্রকোপে অসহায় দূর্দশাগ্রস্থ দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং ছিন্নমূল মানুষের অবর্ণনীয় ভূগান্তি বড়ই দূর্ভোগের এবং কষ্টের। প্রচন্ড শীতের প্রকোপে মানুষ কাবু হয়ে যায়।
শীতকালে মানুষ খাবারের চেয়েও তাদের  কাছে শীতনিবারণের তাগিদ জরুরী হয়ে উঠে। শীতার্ত মানুষগুলো মধ্যে নিন্ম আয়ের মানুুষগুলো বিশেষ করে শ্রমজীবি ও দারিদ্র্য পিড়ীত মানুষগুলো শীত নিবারণে গরম কাপড় সংগ্রহে হন্যে হয়ে ছুটাছুটি করে বাজারে, হুমরী খেয়ে পড়ে পুরাতন কাপড়ের দোকানগুলোতে, চেষ্টা করে পরিবারের  চাহিদা অনুযায়ী  সাধ্যমত গরম কাপড় সংগ্রহ করে শীত নিবারণ করে।
শৈত্য প্রবাহের তীব্রতা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা করার আর্থিক সামর্থ্য বা সক্ষমতা সমাজের এই শ্রেণীর মানুষগুলোর থাকে না বলেই তাদের দূর্দশার সীমা থাকে না।
সমাজের এই শ্রেণীর মানুষের বিশেষ করে বৃ্দ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু, শহরগুলোর অলি-গলি বা ফুটপাতে আশ্রয় নেয়া মানুষ গুলো আর্থিক অসচ্ছলতা বা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হাড়কাঁপানো শীত বা প্রচন্ড শৈত্যপ্রবাহে তীব্রতা থেকে নিজেদেরকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় গরম কাপড় কেনা বা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। ফলে হাড়কাঁপানো শীত বা শৈত্য প্রবাহের অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট  এবং চরম ভোগান্তির ফলে গরম কাপড়ের  অভাবে আজকাল সমাজে অনেকেই মারা যেতেও শুনা যায়।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।মানুষ মানুষের জন্য। মানব সেবা বড় সেবা, যদি তা আন্তরিকতার সহিত পালন করতে পারেন। মহান রাব্বুল আল-আমীন আমীন ইরশাদ করেছেন, আমি যা দেই তা থেকে ব্যয় করো, অসহায় এতিম প্রতিবেশীদের দান করো।
শীতকালে প্রচন্ড শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা এবং  হাড়কাঁপানো শীত সমাজের দরিদ্র, অসহায় এবং শহর এলাকায় ফুটপাতে আশ্রয় নেয়া মানুষ গুলোকে শীতের ভোগান্তি থেকে রক্ষায় গরম কাপড় প্রদানের মাধ্যমে সাহায্য বা সহযোগিতার হাত প্রসারিত  করা প্রত্যেক ধনাঢ্য এবং সামর্থ্যবান মানুষের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। শীতার্তদের মাঝে শীত বস্র প্রদান করা ইবাদতের সামীল ও বটে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন শরীফের ৫১নং সুরা জারিয়াত এর ১৯ নং আয়াতে মহান রাব্বুল আল-আমীন বলেছেন, “ওয়া ফি আমওয়ালিহিমহাক্কুল লিসসা-ইলি ওয়াল মাহরুম “–অর্থাৎ তাদের (বিত্তশালীদের) ধন সম্পদে অভাবগ্রস্থ এবং বঞ্চিতদের অধিকার বা হক রয়েছে।
পবিত্র কুরআন শরীফের ৭৬নং সুরা দাহর’র ৮নং আয়াতে উল্লখ করেছেন,” ওয়া ইয়ুত্বয়িমুনাত ত্বাআমা আলা হুব্বিহি মিসকিনাও ওয়া এতিমাও ওয়া আসীরা “—- অর্থাৎ আহার বা খাদ্যের প্রতি আসক্তি সত্বেও তারা অভাবগ্রস্থ, ইয়াতিম এবং বন্দীদের খাদ্য বা আহার দান করত বা তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি তথা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দরিদ্র, এতিম এবং বন্দীদের খাদ্য দান করে।
দূর্দশাগ্রস্থ শীতার্থ অসহায় বস্রহীনদের বস্রদান প্রসঙ্গে তিরমিজি শরীফের ২৮৩৫ নং হাদিসের উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে যে, হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেছেন কোন মুসলমান আরেক মুসলমানকে বস্রহীনতা ঢাকতে বস্রদান করিলে মহান আল্লাহ পাক জান্নাতের সবুজ কাপড় পড়াবেন।
আমাদের মহানবী হযরত মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,  ” তোমরা ক্ষুধার্থকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যাক্তির অসুস্থতা  সম্পর্কে খোঁজ খবর নাও, বস্রহীন লোকদের বস্র দাও, বন্দীদের মুক্ত করে দাও”– যাহা বুখারী শরীফে ২৪১৭ নং হাদিসে বর্ণিত রয়েছে।
প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ)  আরো বলেছেন, ” হে বনী আদম যদি তোমরা তোমাদের উদ্বৃত্ত অর্থ দান করো তাহলে ভালো হবে আর আটকিয়ে রাখলে ক্ষতি হবে” যাহা হাদিস শরিফ আবু দাউদে ১৯৬৪ নং হাদিসে বর্ণিত রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেছেন,  ” বান্দা যতক্ষণ তার ভাইকে সাহায্য করে মহান আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করে থাকেন”– যাহা মুসলিম শরীফের ২১৪৮নং হাদিসে বর্ণিত রয়েছে।
রাসুলে করিম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন যে, ” যে মুসলমান ব্যক্তি অপর কোন মুসলমানকে বস্রহীন অবস্থায় বস্র দান করবে,  মহান রাব্বুল আল-আমীন তাকে জান্নাতে সবুজ রঙের পোশাক পড়াবেন, খাদ্য দান করলে তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন, পানি পান করালে তাকে জান্নাতের শরবত পান করাবেন” যাহা হাদিসে আবু দাউদ শরীফে হাদিস নং ১৭৫২ এ বর্ণনা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাঃ আরো বলেছেন যে ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তির প্রয়োজন মিটাবেন ,পরকালে আল্লাহ তার ১০০ প্রয়োজন মিটিয়ে দেবেন এবং কোন বান্দা কারো দুঃখ-দুর্দশায় সাহায্য-সহযোগীতা করলে আল্লাহ তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেবেন ” –যাহা মুসলিম শরীফে হাদিস নং ২৪১৯- এ বর্নিত হয়েছে।
সুতরাং পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ্’র আলোকে সমাজের সামর্থবান বিত্তবান মানুষ কতৃক শীতকালে শীতার্ত, দুর্দশাগ্রস্ত, দরিদ্র অসহায় বস্রহীন মানুষদের দুঃখ-কষ্ট, দৈনতায় প্রচন্ড শীতের ভোগান্তি লাঘবে তাদের পাশে থেকে সাহায্য সহযোগিতা করাও ইবাদতের সামীল  এবং ইবাদত।
আমাদের দেশে প্রতি শীতকালেই দেখা যায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, মন্ত্রী এমপিসহ জনপ্রতিনিধিগন,  বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন এনজিও গুলো কতৃক শীতার্তদের মাঝে শীতনিবারণে গরম কাপড় বিশেষ করে কম্বল, চাদর, বিতরণ করা হয়— যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
শীতকালে শীতার্ত বস্রহীন দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মাঝে গরম কাপড় বিতরণে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাও পরিলক্ষিত হয়, যা বিভিন্ন খবরের কাগজে নিউজ সমাজের চোখে ভেসে উঠে, মানুষ কষ্ট পায়।
আমরা সবাই আশা করি সদাশয় সরকার এবারের শীতে শীতার্ত বস্রহীন দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মাঝে গরম কাপড় বিতরণে পর্যাপ্ত বরাদ্দের ব্যবস্থা গ্রহন করতঃ তাদের মাঝে গরম কাপড় বিতরণে স্বচ্ছতা রেখে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থা বন্ধে যথাযথ কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রকৃত শীতার্ত উপকৃত হবে।

মোঃ আব্দুল হান্নান রঞ্জন 

এডভোকেট  জজ কোর্ট,  নেত্রকোণা ও সহ-সভাপতি প্রেসক্লাব, নেত্রকোণা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.