রহিম মাষ্টার বারান্দা বসে পেপার পড়তেছে, “আমাদের দেশে ধর্ষণে পরিসংখ্যান” শিরোনামের একটি কলাম। শিশু ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখে ভয়ে রহিম মাষ্টার বুকের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে। কীভাবে নরাধমরা শিশুদের ব্যবহার করছে, তাদের লালসা চরিতার্থ করতে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলেছে ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা চারশোরও বেশি। এরমধ্যে ৬৪ জন শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, যাদের বয়স চার থেকে নয় বছর। এরকম ঘটনার কথা বিশ্বাস করাও কঠিন, কিন্তু ঘটছে অবিরত। শুধু বাইরে নয়, শিশু তার গৃহেই যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শিশুর জন্য নিরাপদ জায়গা বলে আর কিছু নেই। রহিম বিচলিত সেইসব অমানুষদের নিয়ে, যারা সমাজে ভদ্র চেহারার মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর দিনরাত চোখমুখ দিয়ে নারী-শিশুদের ধর্ষণ করছে। সুযোগ পেলে এরাই একদিন ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার পরিবারের বা বাইরের কোন নারী-শিশুর উপর। ধর্ষণের ঘটনা শুধু বাড়াই নয়, তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ধর্ষকের হাত থেকে তিন বছরের শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। পরিচিতজনদের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। সবকিছুর মূলে আছে মূল্যবোধের অভাব। অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বল্প পরিচয়ের পর ওই ছেলের সঙ্গে বাছবিচার না করে মেলামেশা, বিভিন্ন চ্যানেল, বিশেষ করে পাশের দেশের বিভিন্ন চ্যানেলে যা দেখানো হয়, তা-ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। বিজ্ঞাপন দেখে একটি ছোট ছেলেও জানতে পারছে, শরীরকে উত্তেজিত করতে হলে কী খেতে হবে। ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটে কোন সাইট দেখছে, তা-ও অভিভাবকেরা কখনো নজরে আনছেন না। রহিম মাষ্টার বউয়ের বাচ্চা হবে। বাইরে চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছেন। মনে মনে দোয়া করতেছে আল্লাহ যেন তাকে একটা ছেলে সন্তান দেয়। ভেতর থেকে ধাত্রী কুলসুম বানু বের হলো। তাকে দেখেই রহিম মাষ্টার ব্যাকুল হয়ে তাকায়। কুলসুম বানু হাসিমুখে বলে, -স্যার, আপনার মাইয়া হয়ছে, ফুটফুটে চাঁদের লাহান একটা মাইয়া। রহিম মাস্টারের মুখটা মলিন হয়ে যায়। মেয়ে সন্তান সে চায়নি। হতাশ কণ্ঠে কৃত্রিম হাসার চেষ্টা করে অস্ফুটে শব্দ করলেন তিনি, -ও.. -স্যার, আপনে খুশি হননাই? প্রশ্ন করে ধাত্রী। কয়েকমুহূর্ত ভেবে রহিম মাস্টার জবাব দেন, -হইছি, আবার হইনি। -ক্যান স্যার, এখন তো পোলা আর মাইয়া হগলের সমান অধিকার। তাইলে এতো চিন্তা করতাছেন ক্যান? অবাক হয় ধাত্রী। রহিম মাস্টারের মতো শিক্ষিত মানুষের কাছে এমন কথা হয়তো আশা করেনি সে। রহিম মাস্টার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জবাব দেয়, -আমি সেজন্য চিন্তিত নই রে কুলসুম বানু। আমি চিন্তিত আমার মেয়েটার ইজ্জত আমি আজীবন বাঁচাতে পারবো কি না? যেভাবে শকুনগুলো ছোটো ছোটো মেয়ে শিশুকে ধর্ষণ করছে, স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে ধর্ষণ করছে, দলবল নিয়ে গৃহবধূকে ধর্ষণ করছে। আমি এখন থেকেই চিন্তিত, আমি আমার মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে পারবো কি না। বাবাকে বেঁধে রেখে মেয়ের ইজ্জত লুট, দৃশ্যটা দেখার জন্য কি আমাকে বেঁচে থাকতে হবে কুলসুম? রহিম মাস্টারের প্রশ্নে একরাশ হতাশা লুকোনো। কী জবাব দেবে ভেবে পায় না কুলসুম বানু। রহিম মেয়ে সন্তানের মুখ দেখতেছে আর মনে মনে ভাবতেছে, বাংলাদেশে গত ৩৬৫ দিনে এমন একটা দিন নেই যে দিনে একটা শিশু, আই রিপিট ‘শিশু’ ধর্ষণ হয়নি! ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষন তো আজকের পৃথিবীতে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এই পৃথিবী বড় অনিরাপদ একটা জায়গা। এখানে নিজের কাজে কর্মে বেরিয়ে মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয়, এমনকি প্রাণও হারায়, গণধর্ষণের শিকার হয় পাঁচ বছরের শিশু, ছোট ছোট বাচ্চারা ধারে-কাছের পুরুষের হাতে নির্যাতিত হয়, কিন্তু কাউকে বলার ভাষা খুঁজে পায় না। মেয়েদের পোশাক, সৌন্দর্য, সাজগোজ, চলাফেরা, বয়স, বন্ধুত্ব, আচরণ যদি ধর্ষণের কারণ হয়ে থাকে, তাহলে কেন শিশু ধর্ষণের হার বছর বছর বাড়ছে?

আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)

