গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় সর্ব প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ সাফল্যের সংগে নির্মিত ও প্রদর্শীত হয় ।তারপর একের পর এক নির্মিত হয়, আসিয়া, মাটির পাহাড়, এদেশ তোমার আমার,সূর্য্য স্নান , নদী ও নারী, গোধূলির প্রেম , কখনও আসেনি, কাঁচের দেয়াল, মেঘ ভাঙ্গা রোদ , জোয়ার এলো প্রকৃত ছায়া ছবি । উল্লেখ্য যে , সে সময় ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি ছবি এদেশে অবাধ প্রদর্শনী চলতো । তদুপরি পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ছায়া ছবিও ব্যাপক ভাবে প্রদর্শনী চলতো । এদেশের প্রথম যুগের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে জনাব আব্দুল জব্বার, ফতেহ্ লোহানী , সালাউদ্দিন, জহির রায়হান, কাজী খালেক প্রমুখ ব্যক্তিগন ঢাকার চলচ্চিত্র শিল্পকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে ছিলেন । অতঃপর ষাটের দশকে নির্মিত হয় বেশ কিছু ব্যবসা-সফল ছায়াছবি । তন্মধ্যে রাজধানীর বুকে, হারানো দিন, সুতরাং ইত্যাদি সামাজিক ছায়া ছবি । ষাটের দশক ঢাকায় নির্মিত ছায়া ছবির স্বর্ণ যুগ বলা যায় । ভারতীয় বাংলা ছবির নায়ক-নায়িকা উত্তম-সুচিত্রার পাশাপাশি অমর জুটি রহমান-শবনম এদেশের বাংলা ছায়া ছবির এক অমূল্য সম্পদ রূপে বিবেচিত হয় । এযুগেই ঢাকায় চলচ্চিত্র শিল্পে প্রথম উর্দু ছায়া ছবিও নির্মিত হতে থাকে । উল্লেখযোগ্য উর্দু ছায়া ছবি হলো, রহমান-শবনম অভিনীত তালাশ একটি সাড়া জাগানো ছবি ছিল । কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ প্রীত না জানে রীত নামের উর্দু ছায়া ছবির শুটিং চলাকালীন এক দুর্ঘটনায় নায়ক রহমান তাঁর একটি পা হারান । এই দুর্ঘটনায় ঢাকার চলচ্চিত্র শিল্পকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয় । এই সময় রহমান নকল পা নিয়েই নিজেই একটি উর্দু ছবি নির্মাণ করেন, যার নাম মিলন । পশ্চিম পাকিস্তানের নায়িকা দীবা মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে মিলন ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন । এর পরও রহমান, জাঁহা বাজে শেহনাই নামে আরও একটি ছবি নির্মাণ করেন । এর পর পরই এহতেশাম পরিচালিত ও নাদিম-শাবানা অভিনীত চকরী , ছোটে সাহাব ছবি নির্মিত হয় । মুস্তাফিজ পরিচালিত মালা , জহির রায়হান পরিচালিত সংগম ও বাহানা ছবি নির্মিত হয় । ষাটের দশকে অন্য আর একটি ধারা ঢাকার চলচ্চিত্র জগতে চালু হয় । সেটা লোক কাহিনী ভিত্তিক Folk নির্মাণের হিড়িক পড়ে যায়। রূপবান, সাত ভাই চম্পা, বেহুলা, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান ইত্যাদি ছবি নির্মিত হয় । 1965 সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এদেশে ভারতীয় ছবি প্রদর্শন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন আবার বেশ কিছু ভালো সামাজিক ছবি নির্মিত হতে থাকে । তন্মধ্যে, আগুন নিয়ে খেলা, কার বউ , নীল আকাশের নিচে, আবির্ভাব, ডাক বাবু, জোয়ার ভাটা,মনের মত বউ , ময়না মতি, এত টুকু আশা , আনোয়ারা , অবান্ঞিত , মোমের আলো , কখগঘঙ ইত্যাদি ছবি খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল । ষাটের দশকের শেষার্ধে দর্শক-নন্দিত বিশেষ দুইটি ছবি নির্মিত হয় । একটি হলো খান আতাউর রহমানের নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও অপরটি জহির রায়হান পরিচালিত জীবন থেকে নেয়া । উল্লেখ্য যে তৎকালিন পাকিস্তান সরকার ছবি প্রেক্ষা গৃহে চলাকালীন হঠাৎ ছবিটির প্রদর্শন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । পরে অবশ্য গণচাপের মুখে পূনরায় প্রদর্শনের অনুমতি পায় । তৎকালিন চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা চিত্রালীতে বিশিষ্ট চিত্র সমালোচক আহমদ জামান চৌধুরী ( আজাচৌ ) নবাব সিরাজুদ্দৌলা ছবিটির ভূয়সী প্রকাশ করে বলেন, এ যাবৎ নির্মিত বাংলা ছায়া ছবির মধ্যে এই ছবিটি সর্বশ্রেষ্ঠ । পরিচালক খান আতি , চিত্র গ্রাহক বেবী ইসলাম সহ কলা কুশলীগণ বাচশাস পুরস্কার লাভ করেন । এক কথায় ষাটের দশক ছিল ঢাকায় নির্মিত চলচ্চিত্রের স্বর্ণ যুগ। এই যুগেই আমরা দর্শক নন্দীত জুটি রাজ্জাক-কবরী , রাজ্জাক-ববিতা , রাজ্জাক-সুচন্দা , আজিম-সুজাতাকে পাই । আর পরিচালকগণের মধ্যে সুভাষ দত্তের মত একজন পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল ব্যক্তিকে । এই পোস্টটি লিখিত হলো সম্পূর্ণ স্মৃতি-নির্ভর করে । সুতরাং তথ্যগত কোন ভুল থাকলে দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন ।

লেখক – বজলার রহমান খান

