অ্যাডভোকেট আনসার খান:ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাস বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে ওঠেছে, লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্হা, রাজনীতি,অর্থনীতি,সমাজ-সংস্কৃতি
গোটা বিশ্বের শতাধিক রাষ্ট্রের কোটিরও অধিক মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন কয়েক লক্ষ। তবে এ ভাইরাসের প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য এখনঅবধি আবিষ্কার হয়নি কার্যকর কোনো ওষুধ। অন্যদিকে ভাইরাসের সংক্রমণ এবং তাণ্ডবলীলার কমতিও দেখা যাচ্ছে না।কবে,কখন,কীভাবে এ ভাইরাস থেকে বিশ্ববাসী মুক্ত হতে পারবে তারও কোনো হদিস মিলছে না।তবে করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে বিশ্বের জাতিসমুহ যে পরিমাণে ক্ষতির সম্মূখীন হয়েছে তার প্রভাবগুলো করোনা-উত্তর পৃথিবীতে দেখতে পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সচেতন মানুষেরা ও বিশেষজ্ঞজনেরা।
করোনাভাইরাস-উত্তর পৃথিবীতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রসমূহে যে ব্যাপক রুপান্তর ও পরিবর্তন আসবে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রায় একমতই পোষণ করছেন। পরিবর্তনের এই ধাক্কায় বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যবস্হায় বড় ধরণের আঘাত আসতে পারে।ফলে বিশ্বব্যবস্হার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বর্তমান ধারা থেকে বের হয়ে আসতে পারে বিশ্বব্যবস্হা।নতুন নেতৃত্বের উদ্ভবের পাশাপাশি বর্তমানের প্রচলিত এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্হার পরিবর্তে বহূপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্হার ও বিশ্বনেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে পারে বলে অনুমাণ করছেন বিশেষজ্ঞরা,যদিও বিষয়টা এখনও অনুমান নির্ভর। তবে এটা বলা যায় যে,বিশ্ব ক্ষমতার রঙ্গমন্জ্ঞ পশ্চিম থেকে পূর্বে স্হানান্তর হওয়ার বিষয়টা এখন সময়ের ব্যাপ্যার একারণে যে,বিশ্বের বর্তমান মোড়ল আমেরিকা করোনাভাইরাস মহামারীতে বিপর্যস্ত বিশ্বসম্প্রদায়কে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
বিগত শতকে বিশ্বব্যাপী নানান সংকটে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা যেধরণের কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিলেন বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারী সংকটে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেধরণের ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন এবং একইসাথে সারা বিশ্ব থেকে সরিয়ে রেখেছেন তাঁর দেশকে।এটা সম্ভবত এক শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম বিশ্বব্যাপী সংকটে বিশ্ববাসী নেতৃত্ব দেবার জন্য পাশে পায়নি ওয়াশিংটনকে।অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দশকগুলোতে আমেরিকা তার মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক শক্তির সমন্বয়ে বিশ্বব্যবস্হায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছিলো যা ওয়াশিংটনকে বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। কিন্তু ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকালে আমেরিকার সেই নেতৃত্ব এখন অনুপস্থিত। মনে হয় আমেরিকা এখন ক্লান্ত, বিপর্যস্ত এবং দেশটা এখন বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে প্রায় অক্ষম,দেশটার বিশ্ব নেতৃত্ব এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূল ও বিতর্কিত নানা পদক্ষেপ ও সিদ্বান্তের কারণে বিশ্বনেতৃত্বের আসন থেকে আমেরিকার বিদায় হওয়াটা প্রায় অবধারিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আমেরিকা যেসব বহুজাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে জাতিসংঘ, বিশ্ববাণিজ্য সংস্হা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলো ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলো ট্রাম্প সেসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্হাগুলোতে বিপর্যয় ডেকে এনেছেন। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যবস্হার স্হিতিশীলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এসব সংস্হা বিশ্বশক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে অপরিহার্য বলে গণ্য হয়ে থাকে।কিন্তু এগুলোর ওপর ট্রাম্পের কোনো আস্থা নেই,বরং এসব সংস্হাগুলো দুর্বল করে দিতে তিনি বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন।
অন্যদিকে বিশ্বের বর্তমানে চলমান ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে বিশ্ববাসী যখন নাকাল অবস্হায় পতিত তখন ট্রাম্পের নিকট থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহযোগিতা পায়নি বিশ্বসম্প্রদায়।এ ভাইরাসকে কোনোরূপ পাত্তাই দেননি তিনি।ট্রাম্প বরং করোনাভাইরাস নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে চলেছেন এবং এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের জন্য এককভাবে চীনকে দায়ি ও দোষারোপ করে বলেছেন যেহেতু চীনের উহানে প্রথম এ ভাইরাসের উদ্ভব হয়েছিলো সেহেতু এটাকে তিনি”উহানভাইরাস”বলে অভিহিত করে চীনকে খাটো করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এভাবে ট্রাম্প চীনের সাথে করোনাভাইরাস প্রশ্নে শীতল কূটনৈতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন যা এদূর্যোগের সময় কাম্য ছিলো না,বরং এ মহামারীকালে ট্রাম্প ও আমেরিকার নিকট বিশ্ববাসী দূরদর্শী ভূমিকা ও নেতৃত্ব আশা করেছিলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো ট্রাম্প কাংখিত ভূমিকা পালনে চরম ব্যর্থ হয়েছেন।
করোনাভাইরাস নিয়ে ট্রাম্পের অবজ্ঞা, অবহেলা ও গোয়ার্তুমির কারণে বিশ্বব্যবস্হা সমন্বিতভাবে এ ভাইরাস মোকাবিলায় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।অথচ বিশ্বের জাতিসমুহ এ সংকটকালে আমেরিকার দিকেই তাকিয়েছিলো এবং প্রত্যাশা করেছিলো আমেরিকার বিশ্বনেতৃত্বসূলভ ভূমিকা।কিন্তু এ ভাইরাস মোকাবিলায় ট্রাম্প সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারননি।ফলে সারা বিশ্বে কোটি মানুষ করোনাক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন কয়েক লাখ মানুষ আর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের দূশতাধিক রাষ্ট্রে।এছাড়া তাঁর নিজের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত ও নিহত হয়েছেন। এজন্য বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের ভূল নেতৃত্বকেই দায়ি করছেন।ভাইরাস নিয়ে তাঁর মনগড়া বাজে ভূমিকার কারণে আমেরিকা সহ বিশ্বের মানবসমাজ চরম বিপর্য়য়কর অবস্হায় পতিত হয়েছেন। মানুষের জীবন-জীবিকা,অর্থনীতি,রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি তথা সর্বক্ষেত্রে ধ্বস নেমেছে। ট্রাম্পের এসব কর্মকান্ড দেখে মানুষ প্রাচীন রোমের শাসক নিরোর কথাই মনে করছেন।”রোম যখন পুড়ছিলো,নিরো তখন বাঁশী বাজাচ্ছিলেন”ঠিক তেমনি করোনাভাইরাসে বিশ্ববাসী যখন চরম বিপদ সংকুল অবস্হায় পড়েছেন তখন ট্রাম্প গোয়ার্তুমি করে চলেছেন।”
ট্রাম্পের এসব গোয়ার্তুমির পেছনে একটা নীতি-কৌশলই কাজ করছে, তাহলো তাঁর”আমেরিকা ফার্স্ট “নীতি।২০১৬ সালে এই শ্লোগান দিয়ে তিনি আমেরিকান জনগণকে বিভ্রান্ত করে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদ ভাগিয়ে নিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি আমেরিকাকে ফার্ষ্ট বানাতে গিয়ে আমেরিকাকে সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার অভাবনীয় কাজগুলো করতে শূরু করলেন এবং তাঁর গৃহীত আমেরিকা ফার্ষ্ট নীতি হিতে বিপরীত হয়ে দেখা দেয়।ফলশ্রুতিতে আমেরিকাই এখন “একা ও বিচ্ছিন্ন”হয়ে পড়েছে সারা বিশ্ব থেকে।বিশ্বের দেশগুলো এখন আর ওয়াশিংটনকে খুঁজছে না নেতৃত্ব দেওয়ায় জন্য।গ্যালাপ জরিপকারী সংস্হা সম্প্রতি জানিয়েছে যে,ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্ন অবস্হানের কারণে আমেরিকার বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের অনুমোদন ২০১৬ সালের ৪৮ শতাংশ থেকে নেমে এসে রেকর্ড নিম্নতম ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে,যা চীনের ৩১ শতাংশের নীচে ও জার্মানীর ৪১ শতাংশের নীচে রয়েছে। এই জরিপের ফলাফলই প্রমাণ করছে আমেরিকার বিশ্বনেতার আসনটা ঝুঁকির মধ্যেই আছে।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে গত সাড়ে তিন বছরে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা, দেশের শক্তি, এমনভাবে ব্যবহার ও প্রয়োগ করেছেন,যা আমেরিকার কৌশলগত আধিপত্যের কর্তৃত্ব ও বৈধতাকে মারাত্মক ভাবে হ্রাস করেছে।উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ আলফ্রেড ম্যাককয় দ্য ইন্টারসেপ্টের কাছে প্রদত্ত বক্তব্যে এই বলে মন্তব্য করেছিলেন যে,ট্রাম্প, “আমেরিকান বৈশ্বিক শক্তির স্তম্ভগুলো ধ্বংস করেছেন,ন্যাটো জোটকে দূর্বল করেছেন”।তাই ক্রমেই দেশটা বিশ্বে মিত্রহারা হয়ে পড়ছে।ফলে আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে ট্রাম্প ও আমেরিকার কর্তৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে।
সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ড আমেরিকার এমন দুর্দশায় ভবিষ্যতে আমেরিকার বিকল্প বিশ্বনেতৃত্ব দেখতে পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের গৃহীত বৈদেশিক ও আন্তর্জাতিক বানিজ্য নীতি,আমেরিকান জোটের নেটওয়ার্ক প্রাসঙ্গিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দূর্বল করেছে, এতে করে আমেরিকা ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তার মিত্রদের থেকে ও বিশ্বব্যবস্হা থেকে।ফলে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ক্রমটা প্রকাশ করে এমন চুক্তি, ব্যবস্হা, প্রতিষ্ঠানগুলো, গোষ্ঠীকরণ এবং সংস্হাগুলোর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলো ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে।আমেরিকার মিত্ররা তাই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে চলতে বাধ্য হচ্ছে।আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নে ইউরোপ এখন চিরদিনের মিত্র আমেরিকার মতোই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে চীনকে।
নানা আন্তর্জাতিক ইস্যু, যেমন-করোনাভাইরাসে আমেরিকার অনাকাঙ্ক্ষিত একঘরসূলভ ভূমিকা, ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারিত্ব চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়ায় এশিয়া-প্রশান্তসাগরীয় অন্জ্ঞলে আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান,কানাডা,মেক্সিকো সহ দীর্ঘদিনের মিত্রদের সাথে বানিজ্য উত্তেজনা,প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা, ইরানের পারমানবিক চুক্তি থেকে সরে আসা,জাতিসংঘের প্রতি অবজ্ঞা দেখানো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হা থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা, বিশ্ববাণিজ্য সংস্হা ও ন্যাটোর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন,দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় ও এশিয়ান মিত্রদের থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি আমেরিকার জন্য মারাত্বক বিচ্ছিন্নতার অবস্হা সৃষ্টি করেছে,দেশটা একা হয়ে পড়ছে। ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্ষ্ট কৌশল নীতিটা দেশের আপেক্ষিক পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং অন্যদিকে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসে তার মিত্রদেরও উৎসাহিত করতে পারে এবং অন্য মিত্র খোঁজে নিতে সহায়ক হতে পারে।
আসলে চীনের অবিশ্বাস্য উত্থান, ট্রাম্পের সুস্পষ্ট ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ণয়ে ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে আমেরিকা ভবিষ্যতে বিশ্বনেতৃত্ব হারাতে পারে।ট্রাম্পের বেপরোয়া মনোভাব বিশ্বে দেশটার গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমুর্তি দ্রুতই বিপন্ন করে তুলতে পারে।কোভিড-১৯ মহামারী আমেরিকান জীবন ও অর্থনীতিতে মারাত্বক ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এটাও বিশ্বে আমেরিকান নেতৃত্ব হ্রাসের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে বলে বিশষজ্ঞরা মনে করছেন।
আমেরিকার নেতৃত্বের পতন বলতে বিশ্লেষকরা-দেশটার ভূরাজনৈতিক,সামরিক, আর্থিক ও অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও শক্তি হ্রাসের বিষয়কেই বুঝিয়েছেন।ওয়াশিংটনের এককালীন শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তি ও ক্ষমতা আসলেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।অন্তহীন ষুদ্বে ক্লান্ত হয়ে ওঠেছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ট্রাম্পের উদ্ভট পররাষ্ট্রনীতি দ্বারা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যেসব বহুজাতিক সংস্হা প্রতিষ্ঠা করেছিলো, নেতৃত্ব দিয়েছিলো,ট্রাম্প সেগুলোতে বিপর্য়য় ডেকে এনেছেন যা আমেরিকার পতনের তীব্রতাকে অনিবার্য করে তুলেছে।
এখন প্রশ্ন এসেছে, যদি আমেরিকার বিশ্বশক্তির পতন ঘটে সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যবস্হার ভারসাম্য রক্ষার বিকল্প কী হতে পারে।বিশ্বব্যবস্হা কী আবারও এককেন্দ্রিকতায় ফিরে যাবে,নাকি,বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্হার উদ্ভব হবে যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ঘটেছিলো।
অনেক গবেষক বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্হার কথা বলছেন। এক্ষেত্রে চীন,রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানী প্রভৃতির সমন্বয়ে একটা নতুন বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্হার স্বপ্ন দেখছেন। তবে এনিয়ে মতভিন্নতাও আছে।বেশিরভাগ বিশ্লেষক, গবেষক ও বিশেষজ্ঞ মনে করেন বিশ্বনেতৃত্বে যদি কোনো পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে সেক্ষেত্রে ক্ষমতা পশ্চিম থেকে পূর্বে চীনের ওপরই বর্তাবে।নানা কারণে চীনই এখন পর্যন্ত বিশ্বনেতৃত্বের আসনটা দখলের প্রতিযোগিতায় প্রথম সারিতে আছে এবং ট্রাম্পের ভূল ও ব্যর্থ নীতি চীনকে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে প্রতিস্থাপনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তাই আমেরিকান পত্রিকা নিউইয়র্কার হেডলাইন করে লিখেছিলো,”ট্রাম্প ওয়াজ মেকিং চায়না গ্রেট এগেইন”।
বিগত চার দশক ধরে বেইজিংয়ের পূনরুত্থান ইতিহাসের যেকোনোও দেশের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ট্রাজেক্টরী হতে পারে।দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা,বিআরআইয়ের মতো বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা ও পশ্চিমা আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সোচ্চার হওয়া,সামরিক ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন করা ইত্যাদির মধ্যদিয়ে চীন একটা ক্রমবর্ধমান দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগী হয়ে ওঠেছে যা বিশ্বের বর্তমান বৃহৎ প্রধান শক্তিকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম করে তুলেছে।সামরিক দিক দিয়ে চীন যেসব আধুনিকায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে চলেছে তা দেশটাকে আমেরিকার সামরিক শক্তির কাছাকাছি নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ করটেজ কোপার।অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মতে,সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনের ব্যয় মধ্য ২০৩০ সালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে।উল্লখ্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পাওয়ার প্রজেকশনের জন্য সামরিক সক্ষমতা অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।
পাওয়ার প্রজেকশনের ক্ষেত্রে অন্যতম গূরত্বপূর্ণ আরো দুটো উপাদান হলো,অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সাংস্কৃতিক বা সফ্ট পাওয়ার সক্ষমতা। এদুটো ক্ষেত্রেই আমেরিকার সমক্ষতার কাছাকাছি চলে এসেছে চীন।সাম্প্রতিক এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে ২০৩২ সালে চীনা জিডিপি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে।অন্যদিকে, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে স্হান অর্জন করে চলেছে এবং তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। অর্থ্যা সামরিক শক্তি,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তথা সফ্ট পাওয়ার প্রজেকশনে চীন দ্রুতই এগিয়ে আসছে বিশ্বের ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছাকাছি।
অন্যদিকে, বেইজিং তার নিজস্ব সমান্তরাল বিশ্বব্যবস্হা গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। যেমন,ন্যাটোর বিকল্প সাংহাই সহযোগিতা সংস্হা প্রতিষ্ঠা করেছে,আইএমএফের পরিবর্তে এশিয়ান অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারিত্বের বানিজ্য চুক্তির পরিপূরক করতে আন্জ্ঞলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব রোড এন্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ ইত্যাদি বিকল্প বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্হা প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক,সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং এশিয়া,আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্রগুলো জুড়ে ট্রিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার বানিজ্য ও উন্নয়ন চুক্তি করে দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলছে বেইজিং।
আমেরিকার বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং সেই শূন্যস্হান পূরণের পরিপূরক হিসেবে চীনের এগিয়ে আসার প্রেক্ষিতে বলাই যায়, কোভিড-১৯ পরবর্তী ব্যবস্হায় বিশ্বশক্তি ও বিশ্বব্যবস্হার স্হানটা চীনের দেখলেই যেতে পারে।

