কারিশমা আমজাদ:বাংলাদেশ এশিয়ার একটি ক্ষুদ্রতম দেশ। ধারনা করা হয়, প্রতিবছর ৩ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নুতুন ভাবে স্থানান্তরিত হয়। বন্যা, ক্ষরা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তন দূর্যোগ হেতু স্থানান্তরিত হত দরিদ্র মানুষ তুলনামূক উন্নত জীবন যাপনের আশায় বস্তিতে বসবাস শুরু করে।
খাল পাড় শাহজাদপুর বস্তির রাহেলা মনের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, বস্তিতে যারা থাকে তাদের অনেকেরই গ্রামে বাড়ী ঘর আছে। তারা বাড়ী চলে গেছে, আমার বাড়ী ঘর কিছুই নেই। আমারা চাইলেই কোথাও যেতে পারি না। তাই বস্তিতেই পড়ে থাকতে হয়। তিন মেয়ে আর এক ছেলে দিয়ে তার সংসার। আনুমানিক ৯০ বর্গফুটের একটা ঘরে থাকেন। স্বামী আনোয়ার দিন মজুর। বর্তমান পরিস্থিতে মিলছে না কাজ। মাস গেলে এই ছোট ঘরটাতেই ভাড়া দিতে হয় ৪০০০ হাজার টাকা। সাথে আলাদা করে বিদ্যুৎ বিল তো আছেই। কিছুদিন আগেও বাসাবাড়িতে কাজ করতে রাহেলা দিন কাটতো ব্যস্ততায়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতে যা আতঙ্ক তৈরী করেছে তাতে এখন প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়ছে নিজেও।
ভাইরাস আতঙ্কের থেকেও তাদের কাছে কবোনা প্রতিরোধের চেয়ে প্রয়োজন খবারের নিশ্চয়তার। করোনা ভাইরাসের ভয় নেই এমন প্রশ্নের উত্তরে তাৎক্ষনিক উত্তর আসে ভয় থাকলেও কোন ত্রান এখনো পাই নাই। প্রায় অর্থাহারেই দিন কাটে। স্বামী বিভিন্ন চেষ্টায় কিছুদিন কারওয়ান বাজার থেকে সবজী সংগ্রহ করে খাল পাড় ব্রিজেই বিক্রি করলেও কিছুদিন বাদে স্থানীয় জোতদারগন তাকে সেই স্থান থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। ফলে সবজী ব্যবসাও চালানো আর সম্ভব হয় নাই।
বস্তির অভিকাংশ মানুষই কর্মহীন। জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত এই সকল দরিদ্র বস্তিবাসি এক দিকে যেমন নিজ ভিটামাটি হীন অন্যদিকে এমন করোনা কালীন পরিস্থিতে অনত্র যাবারও কোন জায়গা নেই। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গর্ভনেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপে আরো দেখা গেছে, শহরে বস্তির বসবাসরত ৮২ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। জরিপে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে দেশে ৭০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এই দরিদ্র্য শ্রেণির মধ্যে রয়েছে অতি দরিদ্র, মাঝারি দরিদ্র এবং দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিল কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে তারাও দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ দরিদ্র শ্রেণির ভোগ কমে গেছে। আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে শহরের ৭১ শতাংশ দরিদ্র মানুষের।
এসব বস্তিতে বসবাসকারীরা নানা পেশার সঙ্গে জড়িত। কেউ রিকশা চালায়, কেউ ভ্যান, কেউ বাসাবাড়িতে বুয়ার কাজ করে। কেউ রান্না করে বিভিন্ন স্থানে দিয়ে আসে। পোশাকশিল্প, নির্মাণশিল্প, সেবা খাতের বড় একটি অংশে বস্তির মানুষ কাজ করে। জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ দিনমজুর বলেছে, এখন তাদের কোনো কাজ নেই। ৬০ শতাংশ বাঙ্গারি শ্রমিক বলেছে করোনার প্রভাবে এখন তাদের কোনো কাজ নেই। ৫৯ শতাংশ রান্না ও রেস্টুরেন্ট শ্রমিক বলেছে, তাদের কাজ বন্ধ। ৫৭ শতাংশ গৃহপরিচারিকা বলেছে, তাদের কাজ নেই। ৫৫ শতাংশ পরিবহন শ্রমিকের কাজ বন্ধ। জরিপে আরো দেখা গেছে, রেস্টুরেন্টের একজন শ্রমিক আগে যে টাকা আয় করতেন, করোনা প্রভাবে সেটি ৯৩ শতাংশ কমে গেছে। রিকসা চালক আগে যে টাকা আয় করতেন, করোনা প্রভাবে তার ৭৩ শতাংশ আয় কমে গেছে।
বাংলাদেশে বস্তি ও বস্তিতে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা কত তা নিয়ে একটি জরিপ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটি দেখিয়েছে, বাংলাদেশে বস্তির সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে সেখানে বসবাসরত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সংস্থাটি বলছে, স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর ও অন্যান্য শহরাঞ্চলে ছোট-বড় অসংখ্য বস্তি গড়ে উঠেছে। তবে দেশব্যাপী বস্তির বিকাশ ঘটেছে আশির দশকে। বিবিএসের হিসাবে, দেশে এখন বস্তির সংখ্যা ১৫ হাজার। তার মধ্যে রাজধানী ঢাকায়ই রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি বস্তি। এর আগে ১৯৯৭ সালে বিবিএসের করা জরিপ মতে, তখন বস্তির সংখ্যা ছিল দুই হাজার একশ। সে হিসাবে গত ২০ বছরে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর ও অন্যান্য শহরাঞ্চলে বস্তি বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। বিবিএস বলছে, এসব বস্তিতে এখন প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বাস করছে, যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। পুরুষের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ, বাকিরা নারী।তবে এর মধ্যে ঠিক কতজন জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত হয়ে এসেছে সেই পরিসংখ্যান কোথায় উঠে আসেনি।
রাজধানীসহ দেশের সব বস্তিতেই প্রায় একই চিত্র। বস্তির মানুষের সঙ্গে কথা বলেলে জানা যায়, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার প্রত্যেক স্থানান্তরিত প্রায় প্রত্যেকেই কোন একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েই ঢাকায় চলে আসে না, নিজ এলাকায় টিকে থাকার আপ্রান চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে ঋনের দায় আর মেটাতে পারেনা। জীবন আর জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটতে হয় দেশের এই ছিন্নমূল, ভূমিহীন ও বেকার মানুষগুলোকে। খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষগুলো কাজের আশায় শহরে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছে বস্তিতে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবার আগে আঘাত আসে বস্তিবাসীর ওপর।আর করোনা কালীন সময় কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলো প্রয়োজনে বদলে ফেলেছে তাদের পেশা। বাধ্য হয়েই তারা যখন যে কাজ পাচ্ছে তারা সে কাজের তাগিদেই ঘর থেকে বের হচ্ছে হরহামেশায়। একদিকে ঘিঞ্জি বসবাসের স্থান ঠিক তেমনি অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবস্থা, করোনা স্বাস্থ্যসুরক্ষায় যেখানে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে থাকার কথা। অন্যদিকে যেখানে বারবার হাত ধোয়ার কথা উঠে আসছে, সেখানে বস্তি এলাকা গুলোতে পানির সরবরাহও অপর্যাপ্ত, এমন কি তাদের মধ্য হাত ধোয়ার ব্যপারে তেমন একটা সচেতনতা একেবারেই নেই বলেই চলে। এক সময় নিরুপায় হয়ে গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শহরমুখী হইয়েছিল এসব খেটে খাওয়া মানুষ। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গ্রাম ছেড়ে অসংখ্য মানুষ ঢাকায় আসে কাজ পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তায় অনেকে নাড়ির সম্পর্কে ইতি টেনে চলে আসে রাজধানীতে। কিন্তু আজ করোনা কালীন সময় তাদের আর ফিরে যাবার মত নেই কোন আদি নিবাস। রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষ গুলোও জানতে চায়, সরকার বিভিন্ন ক্ষাতে প্রণোদনা ঘোষণা করলেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি আসলে এখন কোন পর্যায়ে?
লেখক: কারিশমা আমজাদ পি এইচ ডি
ফেলো সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

