ব্যর্থ রাষ্ট্র কথাটা ক’দিন আগেও আমরা ব্যবহার করেছি বিভিন্ন রাজনৈতিক উপলক্ষে। বিশ্ব ব্যঙ্ক (World Bank), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (IMF), অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) নব্বই দশকে যাকে বলতো ভঙ্গুর রাষ্ট্র। ১৯৯০- এর সময় পর্যন্ত ভঙ্গুর রাষ্ট্র বলে বিবেচিত রাষ্ট্রগুলিকে নতুন ফর্মুলায় ব্যাখ্যায়িত করা হোল ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবে। ভঙ্গুর রাষ্ট্র বা ব্যর্থ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘উত্তর-ঔপনিবেশিককালে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী কর্তৃক অর্থনৈতিক সাহায্য, ত্রাণ ইত্যাদি পাওয়াসত্ত্বেয় নিজস্ব অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থা, জি.ডি.পি., জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক মর্যাদা পাল্টাতে পারেনি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে যেখানে উল্লেখযোগ্য হারে উন্নয়ন সাধিত হয় না এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি বিলুপ্তপ্রায়।’ ২০০৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ইন্সটিটিউট অব পিস ( USIP ) এক রিপোর্টে ব্যর্থ রাষ্ট্রের সংজ্ঞায়, মারাত্মক মহামারী ছড়ানোর উদ্দেশ্যে গবেষণাগারে জীবাণু নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করাকে সম্পৃক্ত করে। আন্তর্জাতিক বিষয়ে ডাচ উপদেষ্টা পরিষদ ( AIV ) জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের ইস্যুতে ব্যর্থ রাষ্ট্রকে কেন্দ্রীয় সরকারের অক্ষমতা বলে চিহ্নিত করে। দেখা গেল, এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়নশীল দেশের বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ নিজ নিজ দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলতে শুরু করলেন। ফান্ড ফর পিস ২০০৫এ ব্যর্থ রাষ্ট্রের সূচী প্রকাশে উদ্যোগী হয়। সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস অতিমারি এই ধারনার মুলে কুঠরাঘাত হেনেছে। যা এতদিন উন্নত রাষ্ট্রগুলি আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার দরিদ্র, ত্রাণ নির্ভর দেশের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে এসেছে – অতিমারি নিয়ন্ত্রণে সার্বিক ব্যর্থতা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলিকে সে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। ধনী রাষ্ট্র তথা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র সমূহ সর্বদাই উপনিবেশিক শাসন মুক্তির পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিকে জন সাধারণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করতে সচেষ্ট থেকেছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ডামাডোল, আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়নের তথাকথিত বোলবাল শুনিয়েছে ইউরোপীয় আদর্শের আলোকে, ঐতিহাসিক শর্তাবলী ও সাম্প্রতিককালের সীমাবদ্ধতার ফলে বৈষম্যসমূহকে আড়াল করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, উপনিবেশ-উত্তর স্বাধীন দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনে- সাম্রাজ্যবাদীদের উপনিবেশ শাসনামলের অব্যবস্থার কারণগুলিকে বুঝতে না দেওয়া। এমনকি, নব্য ঔপনিবেশিক বাণিজ্য নীতিতে আন্তর্জাতিক ব্যবসা- বাণিজ্যে সদ্য উপনিবেশ মুক্ত দেশের যোগ্যতা অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই। যার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বায়নে বাণিজ্য শর্তাবলী আরোপিত হয়েছে অসম বা অযৌতিক শুধু নয়, দরিদ্র দেশগুলিকে পুনঃ শোষণের লক্ষ্যে। জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে করা এই সব বাণিজ্য চুক্তি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজ দেশের নাগরিকদের নিম্নতম স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যাবস্থা ইত্যাদি নিশ্চিত করার পথে। কভিড-১৯ অতিমারির প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপের ধনী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির মুখোস উন্মোচিত হয়েছে। বাধ্যতামূলক মাস্ক পড়েও যা আর ঢাকা যাচ্ছে না। নাগরিকদের সুরক্ষার শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে এই সকল পুঁজিবাদ শাসিত দেশগুলো।
।। ২ ।। ইউরোপীয় ইতিহাসে রাজতান্ত্রিক জার্মানিতে বিসমার্ক সরকার ১৮৮৯ তে সামাজিক নিরাপত্তা প্রবর্তন করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে নাগরিকদের পরিচয় ঘটায় এবং ১৯৪৮ সালে ন্যাশনাল ইন্সিউরেন্স অ্যাক্ট-এর সাথে সমাজ কল্যাণ রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। ক্ষমতায় তখন অ্যাটলি সরকার। সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেট বলতে যা বোঝায়, তার সূচনা হোল ব্রিটেনে এই সময় থেকে। নিন্দুকেরা বলে, ১৯২০র রুশ দেশে সমাজতন্ত্রের বিপ্লব ভোলগা অতিক্রম করে টেমসে যাতে না আছড়ে পড়ে, তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা- সমাজ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র। সমাজের কল্যাণের চিন্তায় চির ধরতে শুরু হয় বার্লিন প্রাচীরে হাতুড়ির আঘাত পরার সাথে সাথে। বার্লিন প্রাচীর ধ্বসে পরতে সোবিয়েত ইউনিয়নের ভিত নড়বড়ে হয়ে উঠতে বেশী সময় লাগে নাই। টুইন টাওয়ারের চেয়ে দ্রুত গতিতে ধুলিস্মাত হয়ে গেল রুশ ভালুকের লাল প্রাসাদ। পুঁজিবাদের চিল শকুনের উচ্চতা কমে আসতে দেরী হোল না। শিকাগো স্কুল অফ ইকনমিক্স- এর অর্থনীতিবিদ পণ্ডিতেরা উপদেশ আর সহযোগিতার তল্পি তল্পা নিয়ে ঢুকে পরলেন দেশে দেশে। বিশ্বায়নের ঢক্কা নিনাদে ঘুম হারাম হয়ে গেল দুনিয়ার লুম্পেনদের। দুনিয়ার লুম্পেন এক হও- ধ্বনিতে লুটের প্রতিযোগিতা, পারস্প্রিক কামড়াকামড়ি প্রত্যক্ষ না করে থাকলে এর তীব্রতা বুঝতে পারবে না কেউ। অতঃকিম, প্রয়োজনীয়তা ফুরালো সমাজ কল্যাণ মূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। জনসাধারণের মঙ্গল ও কল্যাণে জাতীয়করণ করা সংস্থা- প্রতিষ্ঠান একটা একটা করে আবার ব্যক্তিমালিকানাধীন হতে লাগলো। অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো, ধন সম্পদ বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান লক্ষণে। কল্যাণ মূলক রাষ্ট্রের সোনালী দিনের অবসানের সুর শুনতে পেল নাগরিকরা ১৯৭০ এর শেষ ভাগ থেকে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, বিশ্বায়ন আর ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করার ফলে কল্যাণ রাষ্ট্রের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অর্থনৈতিক চাপ কমাতে রাষ্ট্র বাধ্য হয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঙ্কোচন নীতির আশ্রয় নেয় প্রায় সব কটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি। অপরদিকে, কাঠামোগত পরিবর্তন মাঝারি ধরনের দক্ষতা ( mid skill ) সম্পন্ন শ্রম বাজারকে সংকটাপন্ন করে তোলে। শ্রম বাজার উচ্চ দক্ষতা এবং নিম্ন দক্ষতা কেন্দ্রিক হওয়ায়, উচ্চ ও নিম্ন দক্ষতার পেশাজীবীদের কাছে কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা আর রইলো না অর্থনৈতিক কারণে। তেমনই রাজনীতির ময়দানে ভোটার তোষণ হ্রাস পায় ভোটার ব্যাংকে চাহিদা না থাকায়। সংক্ষেপে বললে, “structural pressures were making the welfare state more expensive and governments faced little electoral incentive to be generous.” এক সময় মারক্সিয় রাজনীতির হাতেখড়িতে বিশ্বযুদ্ধকে বিশ্লেষণ করা হোত উৎপাদিত পণ্যের বাজার দখলের প্রতিযোগিতার পুঁজিবাদী দেশগুলির দ্বন্ধ বলে। বিশ্বায়নের এই পর্যায়ে বাজার প্রতিযোগিতা এখনো আছে, তবে সমঝোতাও আছে পরস্পরের সাথে। এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত প্রক্সি যুদ্ধ তেমন কথাই বলে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি একে অপরের প্রতি যে সৌহার্দ দেখায়, শ্রমিক শ্রেণীর লুম্পেনিয় অনৈক্যকে ব্যঙ্গ করার জন্য যথেষ্ট।
।। ৩ ।। অতিমারির ভয়াবহতা সামাজিক বীমার পরিশোধ অর্থ ব্যয় প্রচুর বাড়িয়ে দিয়েছে। জন স্বাস্থ্যের তীব্র ঝুঁকি অসুস্থতার জন্য দেয় অর্থের পরিমাণ (sick pay among workers ) বৃদ্ধি পেয়েছে উন্নত দেশে। এমন কি যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে জাতীয় ভাবে অসুস্থতা জনিত আর্থিক ভর্তুকি দেওয়া হয় না, কভিড-১৯ অতিমারিতে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দ করছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর অতিমারি মোকাবেলায় ব্যর্থতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, তারা এতদিন কি ভাবে নাগরিকদের বঞ্চিত করেছে । পাশাপাশি চিন, ভিয়েতনাম এবং কিউবা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সফলতা দেখিয়েছে, এরাই প্রচার চালিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা শুনিয়েছে নাগরিকদের। এহেন অবস্থায়, স্বাভাবিক ভাবে উত্থান ঘটেছে রক্ষণশীল ডানপন্থী রাজনীতির। ধর্মীয় উন্মাদনা এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার। কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের নামে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি আরেকটি পদক্ষেপ নিয়েছে এ সময়ে, বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিকতার আড়ালে যে স্বৈরাচার, তার বিরুদ্ধে গড়ে উঠা আন্দোলনকে দমিত করা স্বাস্থ্য ঝুঁকির অজুহাতে। মানবাধিকার আন্দোলন, বর্ণবৈষম্য প্রতিরোধ গর্জনকে থামাতে সক্ষম হয়েছে ওই করোনাভাইরাসের দোহাই দিয়ে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যর্থতা এবং তড়িঘড়ি অত্যাধিক অর্থ ব্যয় রাষ্ট্রীয় পুঁজিতে ইতিমধ্যে টান ধরিয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্যে করোনাভাইরাস পূর্ব ক্রেতা সঙ্কট উদ্ভূত পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে অতিমারির জন্য নিষেধাজ্ঞার কারণে। বেকারত্ব বাড়ছে হুহু করে। এরই মধ্যে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলেছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে, চাকুরী ক্ষেত্রে অন-লাইন প্রক্রিয়া চালু করার। অর্থাৎ বিশ্বব্যপি চলমান ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দৃশ্যমান। পুঁজিবাদী দেশ সম্মিলিত ভাবে যখন অতিমারি ঠেকাতে ব্যর্থ, সাধারণ গনমানুষের দুর্ভোগের সাথে সাথে বেড়েছে পারস্পারিক দূরত্ব। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য- যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ ব্যাপী নাগরিক জীবনে লক ডাউন, মাস্ক, এবং সামাজিক দূরত্ব বিধি-নিষেধ আরোপ প্রমাণ করেছে, All forms of alienations are organic to capitalism that the failed states aggravate during this pandemic. তারপরেও বলতে হয়, এক সময় অতিমারির আতঙ্ক মুক্ত হবে মানুষ, মাস্ক বা মুখোস খুলে ফেলবে, তখন একমাত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যই সাধারণ মানুষকে ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি জোগাবে। ।। সমাপ্ত ।। ইংল্যান্ড ১০ জুলাই ২০২০
সুজা মাহমুদ, লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

