ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া’র নিবন্ধঃমানুষের সাহিত্য ও সাহিত্যের মানুষ দ্বিতীয় পর্ব।
সত্য–যে সর্বোৎকৃষ্ট তা স্বতঃসিদ্ধ। তবে শুধু আলোর গতি ছাড়া নিরেট, পুরাদস্তুর, নিপাতনীয় সত্য বলে কিছু নেই । আর সবই আপেক্ষিক। টেস্ট টিউব আর কলকব্জা যাদের মগজ মননে, তাদের সে সব বৈজ্ঞানিক সূত্রে অবশ্য সাহিত্যের তেমন ক্ষতি–বৃদ্ধি নেই। সাহিত্য তাদের সেই সত্যের নিকুচি করে। কারণ সাহিত্যের অভিজ্ঞতা বড়ই মর্মন্তুদঃ ‘ আমরা যখন ঘড়ির দুটি কাঁটার মতন মিলি রাতের গভীর যামে/ তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে।‘ সাহিত্যের সত্য কল্পনার সত্য। সাহিত্যের সম্ভোগ আত্মমুগ্ধ সৌন্দর্যরস। জীবনের নিখাদ ও নিখুঁত সত্যের নাম বাস্তব সত্য নয় ; ভাবসত্য।
শিল্পই সাহিত্যের প্রসূতি। এক কথায়, যার শিল্পমূল্য নেই, তা সাহিত্য নয়। তাহলে শিল্প কী? মানুষের সৃষ্টিশীলতা বা কল্পনার প্রকৃষ্ট প্রকাশ ও নান্দনিক প্রয়োগই শিল্প। আর তা নিষ্ঠ হয় সৌন্দর্য সৃষ্টি এবং ভাবাবেগের পরাক্রমে। স্থিতির মধ্যে চলিষ্ণুতা, বিন্দুতে সিন্ধু, খণ্ডাংশে অখণ্ডতা, ক্ষণকালের মধ্যে চিরকাল, সসীমে অসীম, রূপের মধ্যে অরূপকে রূপায়িত করবার মাঝেই কলার কালোত্তীর্ণ কেরামতি। আর্ট চলিষ্ণু জীবনের স্থিতিমান মুহূর্তের প্রকাশ। ‘দৃশ্য বা অদৃশ্যকে শিল্পীর চিত্তরসে রূপায়িত করিয়া যে স্থিথিশীল রূপ–মহিমা দান করা হয়, উহাই আর্ট বা ললিত কলা কিংবা কারুশিল্প এবং যিনি এই সৌন্দর্যসৃষ্টি করেন, তিনিই আর্টিস্ট বা শিল্পী। ‘
সাহিত্যিক রূপ বিলাসী রূপকার। আর সে অর্থেই সাহিত্যিক উচ্চমার্গের আর্টিস্ট। প্রসঙ্গতঃ পাবলো পিকাসো’র শরণ নিয়ে বলি, ‘ Art is a lie that makes us realize truth’. শিল্পীর সত্য তথ্যসত্য
(Truth of fact) নয়। সে সত্যের নাম কাব্য সত্য (Poetic truth) সাহিত্যের সত্য ও প্রকৃত সত্য–যে এক নয়, সে প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এ উক্তিটি স্মরণীয় ‘সাহিত্যের মা যেমন করিয়া কাঁদে, প্রকৃতির মা তেমন করিয়া কাঁদে না। তাই বলিয়া সাহিত্যের মার কান্না মিথ্যা নহে।’ সাহিত্যিক কল্পনার আশ্রয়ে বাস্তব সত্য (Fact) কে কাব্য সত্য (Truth) এ রূপ দান করেন। আর তখনি— “Beauty is truth, truth beauty,—that is all / Ye know on earth, and all ye need to know.” ‘সত্যম শিবম সুন্দরম।‘ এখানেই সৌন্দর্য নান্দনিক সত্য, সর্বজনীন, পারমার্থিক। সেই সৌন্দর্য তখন অনশ্বর, অবিনাশী, অনন্ত কালের আনন্দ সঞ্চারক ও সঞ্চালক। বিবর্ণতা একে গ্রাস করতে পারেনা। বরং সময়ের প্রবহমানতা একে আরো লাবণ্যময় করে তোলে। সে কখনো নিঃশেষ হয় না। রিক্তে বিলীন হয় না। — ‘A thing of beauty is a joy for ever:/ Its loveliness increases; it will never/ Pass into nothingness…’ নবজাগরণযুগপ্রভাতের রবি রবীন্দনাথ যথার্থই বলেছেন, ‘ মানুষকে যদি পুরা করিয়া তুলিতে হয় তবে সৌন্দর্যচর্চাকে ফাঁকি দেওয়া চলে না।’ আর সৌন্দর্যচর্চার পুরোভাগে যাদের অবস্থান তারা শিল্পী। কারণ তাদের উপরই বিধাতা অলৌকিক আনন্দের ভার অর্পণ করছেন অকৃপণ আশিসে। ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে / কবি তব মনোভূমি, রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’ সেই পরিক্রমায় সত্য সুন্দর; সুন্দরই সত্য; সত্যই অমৃত, সুন্দরই অনশ্বর। সৌন্দর্যের উৎকর্ষ সাধনের মধ্যেই মানুষের নান্দনিক সৌকর্যের উৎসারণ। আর এই সৌন্দর্য উৎসারণের কাজটা যার দায় এর নাম সাহিত্য।
‘মানুষের সাহিত্য’বলতে মানুষের জন্য রচিত সাহিত্যকে বোঝালেও এর অর্থবাচকতার গণ্ডি আরো খানিকটা বিস্তৃত। কারণ এ মানুষ সকল মানুষ; ণঅসাধার–সাধারণ , গণ্য–নগণ্য, উচ্চ–তুচ্ছ, ধনি–নির্ধন সকল শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, ভৌগোলিক সীমারেখা নির্বিশেষে গণমানুষ। মুক্ত–চিন্তকরা গণমানুষ আর জনসাধারণ— এ দুয়ের মধ্যে বিস্তর কোন ফারাক দেখে না । তবে যারা কেবলমাত্র বুদ্ধিকেই
জীবিকাবৃত্তির শেষ অবলম্বন হিশেবে বেছে নিয়েছেন, সেই বোদ্ধাদের কেউ–কেউ এ দুয়ের সাযুজ্যে নারাজ।
‘গণ’ –এর মধ্যে তারা কেমন একটা বাম–বাম ব্যেমো খুঁজে পান। কেমন কেমন উদ্ধত উপদ্রবের ভাব। আর জন? কী গোবেচারা শব্দ, কী নিরুপদ্রব! প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ধরুন, জনপ্রিয় জননেতা, জনস্রোতে জনসভা জনসমুদ্র, জনমত জরিপ, জনহিতকর জনপদ, জনমনের জনরায়, জনগণমন অধিনায়ক ।বাহ, কী মাধুর্য!
আরেক শ্রেণির কাছে ‘গণ’ শব্দাংশটাই ভীতিকর। কারণ তা তন্ত্রের উপসর্গ হয়ে ‘গণতন্ত্র’ বানায়।
হয়ত সে কারণেও বোদ্ধারা গনপক্ষ নেন না। কারণ যা–ই হোক গণমানুষ আর জনসাধারণ— এরা যে সকলেই সাহিত্যের মানুষ , তা নিশ্চিত। সাধারণভাবে একটা জনপদের ইতরভদ্র সকল শ্রেণির লোকই এককথায় সাহিত্যের মানুষ, সাহিত্যের চরিত্র। তাদের সঙ্গেই সাহিত্যের সুনিবিড় সংযোগ।
ইংরেজি ‘লিটারেচার‘ (Literature)-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সাহিত্য‘ শব্দটির ব্যবহার বহুল প্রচলিত। কিন্তু ‘Literature’ বলতে ব্যাপক অর্থে যাবতীয় লিখিত ও মুদ্রিত গ্রন্থ বা রচনাকে বুঝায়। কিন্তু ‘সাহিত্য‘ প্রকৃত অর্থে
ভিন্ন প্রকৃতির। ‘সাহিত্য‘ বলতে আমরা সেসব রচনাকেই স্বীকৃতি দেই, যেগুলো জীবন প্রবাহের বিচিত্র ও জটিল অভিজ্ঞতাকে মন্থনের মাধ্যমে ‘বিশেষ সৃজন‘ রূপে সৃষ্ট। ‘সাহিত্য‘ শব্দটি বাংলা ‘সহিত‘ শব্দ থেকে সৃষ্ট। ‘সহিত‘ শব্দমূলের সঙ্গে ‘য‘ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘সাহিত্য‘ শব্দটি গঠিত হয়েছে। ‘সহিত‘-এর অর্থ সংযুক্ত, সমন্বিত, সঙ্গে, মিলন, যোগ, সংযোগ, সাথে বা সম্মিলন। ‘সাহিত্য‘ শব্দের আভিধানিক অর্থ সহিতের ভাব, মিলন বা যোগ; এক হৃদয়ের সঙ্গে অপর হৃদয়ের মিলন। এ সবের মুলেই রয়েছে মানুষ।
নোবেল বিজয়ী ফরাসি লেখক প্যাত্রিক মোদিয়ানো তরুণ বয়স থেকেই পুরনো ফরাসী টেলিফোন নির্দেশিকা ঘাঁটতেন। সড়কের নামের আদ্যাক্ষর ও বাড়ির নম্বরের ক্রমানুসারে গ্রাহকদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর যে নির্দেশিকায় ছাপানো হতো বিশেষত: সেগুলো উল্টে পাল্টে দেখতেন, যাতে সেগুলোকে তার লেখালেখির কাজে লাগানো যায়। তাঁর প্রথম বই লেখার স্পৃহা ও প্রেরণা তিনি ঐ পুরনো ফরাসি টেলিফোন নির্দেশিকা থেকেই পান। তিনি কিছু কিছু অপরিচিত লোকের নাম–ঠিকানা এবং ফোন নম্বর পেন্সিলে আন্ডারলাইন করে রাখতেন এবং হাজার হাজার লোকের ভিড়ে তাদের জীবন কেমন ছিলো এ বিষয়ে কল্পনা করে মানুষের চরিত্র চিত্রণ করতেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হারানো মানুষ’ তেমনি একজন স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষের গল্প। স্মৃতি হারিয়ে ফেলার পর খুঁজতে থাকেন তিনি আসলে কে! ইতিহাসের সাহায্য নিয়ে তিনি অনুসন্ধান চালাতে থাকেন। অবশেষে খুঁজে পান তাঁর আসল পরিচয়। এভাবেই নানান শৈল্পিক কৌশলে সাহিত্যিক যুক্ত থাকেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে।
একজন লেখক জীবনের বাস্তবতা থেকে পালিয়ে নিভৃতচারী হয়ে অথবা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মকান্ডে না জড়িয়েও তার জন্ম তারিখ ও তার কাল দ্বারা অমোছনীয়ভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন।
তিনি যে কালের লেখক, তাঁর রচিত সাহিত্য কর্মে ঐ কালেরই প্রতিফলন ঘটান এবং অন্য কোনো যুগে এ ধরনের রচনা হয়তো কোনো দিনই আর রচিত হবে না। আইরিশ কবি ইয়েটস্–এর কবিতা ‘দি ওয়াইল্ড সোয়ান্স অ্যাট কুলি’তে পার্কের একটা লেকে কয়েকটা রাজহাঁস ভেসে বেড়ানোর দৃশ্যকে তিনি যে শৈল্পিক মুন্সিয়ানায় কাব্যরূপ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে তা আর কখনো সেভাবে সম্ভব হবে না। ঊনবিংশ শতাব্দির কবিতায় মরালের প্রতীকী উপস্থিতি ছিলো হরহামেশা। বোঁদলেয়ার বা মালার্মের কবিতায় এর ভুরি ভুরি প্রমাণ মিলবে। কিন্তু ‘ ইয়েট্স–এর এ কবিতাটি ঊনবিংশ শতাব্দিতে লেখা যেতো না। এ কবিতার একটা স্বকীয় ও নির্দিষ্ট যুৎসই ছন্দমাত্রা রয়েছে; রয়েছে একটা বিষন্নতা বা বিষাদগ্রস্ততার ভাব—যে কারণে কবিতাটিকে বিংশ শতাব্দির সঙ্গে , এমনকি যে বছরে তিনি সেটা লিখেছেন সে নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতাকে এঁটে দেয়া যায়। প্রত্যেক লেখক তার যুগের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংলগ্ন থাকেন— যা তিনি এড়াতে পারেন না। তার শ্বাস–প্রশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার যুগভাবনা। তা সত্ত্বেও প্রত্যেক লেখক তার সাহিত্যকর্মে কালোত্তীর্ণ কিছুর প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। আবার অ্যাডগার এলেন পো, মেলভিল বা স্তদল–এর মতো এমন অনেক লেখকও আছেন—যাঁদের লেখার সাহিত্যমূল্য তাদের সমকালীন পাঠকদের চেয়ে তাদের মৃত্যুর দু’শতাব্দির পরের পাঠকরা আরো গভীরভাবে উপলব্দি করেছেন। এমনি করেই সাহিত্য কাল–কালান্তে, যুগ–যুগান্তে সময়কে জয় করে মানুষের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে থাকে।
বাস্তব জগতের যে সব মানুষ লেখককে বিভিন্ন চরিত্র চিত্রণে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে থাকে, তাদের সঙ্গে লেখকের যে– খানিকটা দূরত্ব থাকে সে ব্যবধান লেখকের ক্ষমতাকে সীমার বাঁধনে বাঁধতে পারে না। যেমন, ফরাসি লেখক গুস্তাভ ফ্লবেয়ার তার প্রথম উপন্যাস ‘ মাদাম বোভারি‘ তে একজন প্রাদেশিক নারী চিকিৎসকের জীবনের নানা বর্নিল দিক অসাধারন দক্ষতায় উপস্থাপনের পাশাপাশি উচ্চভিলাসী জীবনযাপনের আড়ালে নিহিত তুচ্ছতা ও অসাড়তাকে তুলে এনেছেন । একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের খোঁজে নতুন করে স্বপ্নবোনা এবং সব প্রতিকূলতাকে উপড়ে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার গল্পকে উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়ে তিনি এর কেন্দ্রীয় চরিত্র সম্পর্কে বলেন, ‘মাদাম বোভারি আমি নিজেই।’ চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে চরিত্র চিত্রণ করে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হবার এ পন্থার চেয়ে বড়ো উপায় আর কী হতে পারে!
রুশ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক লিও তলস্তোয়ের প্রথম প্রকৃত উপন্যাস ‘আন্না কারেনিনা’ তৎকালিন সময়ের বাস্তবিকতা এবং পারিবারিক জীবনের ব্যক্তিগত অবস্থার প্রকাশ করতে গিয়ে তলস্তোয় তাৎক্ষনিক সেই মহিলাকে সনাক্ত করে ফেলেন যাকে রাশিয়ার একটা রেল স্টেশনে এক রাতে তিনি ট্রেনের নীচে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছেন। এমন সনাক্তকরণের সওগাতের বিস্তার এতোটাই প্রসারিত হয়েছে যে, তলস্তোয় আকাশ আর মাটির চিত্রকল্পকে এমনি একাকার করে বর্ণনা করেছেন যে, যেন তিনি এর মধ্যে পুরো নিবিষ্ট হয়ে আছেন। বাইরের জগৎটাকে নিরীক্ষণকালে তা টান টান চিত্তবৈভব ও অতি সহজবোধ্যতার সুযোগ সৃষ্টি করে। এভাবেই তলস্তোয় তার সাহিত্যকর্মের চরিত্রকে যুক্ত করে নিয়েছেন গণমানুষের সঙ্গে। ব্যক্তি যখন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে, তখন জীবন যাপন তার জন্য হয়ে ওঠে নিতান্ত যন্ত্রণাদায়ক ও দুঃসহ। বিচ্ছিন্নতার ওই কারণেই আন্না অবশেষ আত্মহত্যা করে। এ থেকেই উপলব্ধি করা যায়, জীবনকে এর স্বাভাবিক মার্গে যাপন করবার সুযোগ করে দিতে মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা কতোটা জরুরী।
চলবে……

