যে বাড়ীতে আওয়ামীলীগের জন্ম

আজ ২৩ শে জুন উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে (হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি) এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জন্ম হয় দলটির। এরপর জাতি গঠনের প্রতিটি সোপানে-স্বাধিকার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে দলটি। রোজ গার্ডেন পুরান ঢাকার টিকাটুলিস্থ কে এম দাস লেনের একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন। তৎকালীন নব্য জমিদার ঋষিকেশ দাস বিশ শতকের তৃতীয় দশকে (সম্ভবত ১৯৩০ সালে) গড়ে তোলেন এ গার্ডেন। উনিশ শতকের শেষের দিকে বলধার জমিদারের বাগান ও বাড়ি (যা বর্তমানে বলধা গার্ডেন নামে পরিচিত) উচ্চবিত্তদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

 

ইতিহাস বলধার জমিদার নিজে নাট্যকার ছিলেন এবং তাঁর বাড়িতে নিয়মিত গান বাজনার আসর বসতো। ঢাকার একজন ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে হৃষিকেশ দাস একদিন বলধার এক জলসায় গেলে সেখানে নিম্ন বর্ণের হওয়ায় তাঁকে অপমান করা হয়। এরই ফলশ্রুতিতে একই রকম বাগান ও বাড়ি নির্মাণ করে এর প্রতিশোধ নিতে তিনি দৃঢপ্রতিজ্ঞ হন বলে কাহিনী প্রচলিত আছে। এভাবেই নির্মিত হয় রোজ গার্ডেন। সমগ্র ভারতে অদ্বিতীয় গোলাপ বাগান সমৃদ্ধ বাড়ি হওয়ার কারনেই এর নাম হয় ‘রোজ গার্ডেন’। বেশীর ভাগ উপাত্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে ১৯৩০ সালের দিকেই হৃষিকেশ বাবু এ বাগান নির্মাণ শুরু করেন। এই বাগানের জন্য তিনি চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মাটিসহ গোলাপের চারা এনে লাগিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঋণের দায়ে তিনি তাঁর সন্মানের প্রতীক এই জৌলুসপূর্ণ বাগানবাড়িটি ১৯৩৬ সালে খান বাহাদুর মৌলভী কাজী আবদুর রশীদের কাছে বিক্রয় করে দিতে বাধ্য হন। সত্তর সালের দিকে ‘রোজ গার্ডেন’ লীজ দেয়া হয় ‘বেঙ্গল স্টুডিও’কে। ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ‘রোজ গার্ডেন’কে সংরক্ষিত ভবন বলে ঘোষণা করে। এরপর প্রথম হাত বদল হয় ১৯৩৭ সালে।

 

১৯৬৬ সালে আবদুর রশীদের বড় ভাই কাজী হুমায়ুন কবির এই রোজ গার্ডেনের মালিকানা লাভ করেন। এই হুমায়ুন কবির হচ্ছেন সেই বিখ্যাত লেখক ও স্কুল-পাঠ্য ‘মেঘনার ঢল’ কবিতার কবি হুমায়ুন কবির, যিনি একাধারে রাজনীতিক ও এককালে বিভিন্ন মেয়াদে ভারতের একাধিক মন্ত্রীসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর নামেই রোজ গার্ডেন হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক।

 

১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন রোজ গার্ডেনে নতুন দল গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এক সম্মেলন আহ্বান করে। সেই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে, ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নাম রাখা হয়: ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। শেষবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি কাজী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৯ সালে রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত ভবন ঘোষণা করে। ২০৯৮ সালে সেই ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন কিনে নিয়েছে সরকার। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বর্তমান সরকার এই ভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে ।

কাজী সালমা সুলতানা, গণমাধ্যম কর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.