মোমিন মেহেদী:সারাবিশ্ব যখন করোনা পরিস্থিতির কারণে পরিকল্পিতভাবে জনগনের বাড়ি ভাড়া সসমস্যা সমাধান করেছে, খাদ্য সামগ্রী সহ সকল প্রয়োজনীয় নিশ্চিত করেছে, আমরা তখন মুজিব বর্ষের কর্মসূচী নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বিনিময়ে আমলারা হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছে, দেশে হাজার হাজার প্রবাসী করোনা পজিটিভ হয়ে এসেছে আর মধ্যবিত্ত-নিন্মবিত্তরা পড়েছে বাড়ি ভাড়া দিতে না পারার সমস্যায়; অভূক্ততায় কেটেছে মাসের পর মাস। এরই মধ্যে আবার বেজেছে বাজেটঘন্টা। যদিও আগামী (২০২০-২১) অর্থ বছরের বাজেটে করোনাকালিন আর্থিক সংকট কাটিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনতে দ্রব্যমূল্যের দাম কমানো ও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবী জানিয়েছেন অনেকে। সর্বনিম্ন কর হারে ছাড়, শিক্ষাখাতে ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্ধ বাড়ানোরও দাবী করা হয়েছে। আবাসনখাতে নিবন্ধন ফি কমিয়ে সাধারণ মানুষকে কম দামে মাথা গোঁজার ঠাই যোগাড়ের সুযোগ দেয়া এখন সময়ের দাবী বলে মত দিয়েছেন অনেকে। ব্যবসা বাণিজ্যের লোকসান কাটাতে করপোরেট করহার কমানো, কাঁচামালের আমদানিতে ছাড়, ভ্যাট বা মূসক কমানোসহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
আজ যখন সারা বিশ্ব স্বচ্ছতায় এগিয়ে চলছে উন্নয়নের পথে তখন ‘বাংলাদেশে স্বাধীনতা এসেছে ঠিকই; কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে কারা যেন প্রতিনিয়ত ধ্বংস করার জন্য নির্মম কৌশলে মেতে থাকে সবসময়।’ কথাটা বলেই চুপ করে ছিলেন এক বরেণ্য রাজনীতিক-গবেষক। তাকে প্রশ্ন করলাম- আপনিও জানেন না তা?
উত্তরে তিনি সরল একটা হাসি দিলেন, বললেন- জানলেও বলা যাবে না।
– কেন?
কারণ একটাই- বললে জীবনটাই হয়তো থাকবে না!
এখন আমার প্রশ্ন হলো- সবাই যদি বেঁচে থাকার বিনিময়ে অন্যায়কারীকে চিহ্নিতই না করেন, তাহলে আর এই স্বাধীনতা দিয়ে কি হবে? যে স্বাধীনতা অর্জনের পর ৪৯ বছরেও লুটপাট থামেনি, উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা কামাই করে পাচারের রাস্তা তৈরি হয়েছে, আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ যেমন রাস্তার মাস্তান আলু-ফালু-পটলরা হয়েছে; তেমন টাবুইরা নৌকা থেকে কোটি টাকার গাড়িতে পৌছেছে চরমোনাইর পীরের মত ধর্মব্যবসায়ীরা! মধ্যিখানে বছর বছর বাজেট হয়েছে আর চুরি-বাটপারি বেড়েছে!
উত্তর দেননি তিনি। নিরবে সময় পার করে একটা সময় অযুহাত দেখিয়ে চলে গেছেন। আর ইতিহাসের পাতায় ঝুলে দেখেছি- স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম বাজেট ঘোষণা করেছিলেন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। ওই বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। গতবারের বাজেটের আকার হয়েছিলো ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা স্বাধীনতার ৪৮ বছরে ৬৬৬ গুণ বেড়েছে। ঐ পর্যন্তই শেষ; দেশ সেই পিছিয়েই গেছে বরাবরের মত।
আর এখন! করোনার কারণে বিপর্যস্ত দেশের অর্থনীতি। প্রায় সবখাতেই চলছে মন্দা। রপ্তানি আয়ে ধ্বস নেমেছে। এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। করোনায় স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিও। প্রবাসীদের অনেকে কাজ হারিয়েছে। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে লোকসানে পড়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। নিম্ন আয়ের মানুষ আছে বেশি বিপাকে। নিয়মিত আয় করতে পারছে না। করোনা থেকে কবে মুক্তি মিলবে তা অজানা। করোনা ব্যাধিতে কে কখন আক্রান্ত হয়, কে কখন মারা যায়, এমন আতংকে আছে অধিকাংশ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে নিয়মিত আয় করতে পারছেন না। এর মধ্যেই বেঁচে থাকতে খাওয়া, পরাসহ জীবনযাত্রার সব খরচ চালিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমাদের প্রত্যেককে প্রতিদিন পণ্য ও সেবা কিনতে দামের সঙ্গে পরোক্ষ কর হিসাবে বাধ্যতামূলকভাবে মোটা অংকের অর্থ সরকারকে দিতে হয়। এর মধ্যে করমুক্ত আয়সীমা কমিয়ে রেখে অল্প আয়ের মানুষদের প্যাঁচে ফেলে তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা অমানবিক। আমি মনে করি- করোনার কারণে পণ্য সংকট হতে পারে। আগামী বাজেটে দ্রব্যমূল্য কমাতে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। অন্যদিকে করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ালে এবং ১০ শতাংশ কমিয়ে ৫ বা ৪ শতাংশ করা হলে কম আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমবে। এতে রাজস্ব আদায় খুব একটা কমবে না। বরং করদাতারা সক্ষমতা অর্জন করে অল্প সময়ে করসীমায় চলে আসবে। তা না হলে ক্রমশ সমস্যা বাড়তেই থাকবে বলে আমি মনে করি।
করোনা পরিস্থিতিতে একটা বিষয় কঠিন হলেও এটাই বাস্তবতা যে, মাসে এক ব্যক্তিকে ২০ হাজার ৮৩৪ টাকা নীট আয় করলেই তাকে কর দিতে হবে। বর্তমানে প্রথম ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর শূন্য, পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ২০ শতাংশ, পরবর্তী ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ, অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের বিধান আছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়, যা এখনো বহাল আছে। অবশ্য গত কয়েক অর্থ বছর থেকে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ করমুক্ত আয় সীমা বাড়িয়ে হার পূণঃবিন্যাসের দাবী করে আসছে। এরই মধ্যে বেসরকারী গবেষণা সংস্থা সিপিডি থেকে আগামী অর্থ বছরে সাধারণ করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা প্রতিদিনি করোনার কারণে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে যে দেশ, সে দেশে করোনার কারণে ধ্বস নেমেছে দেশের আবাসনখাতেও। পুঁজির সবটা বিনিয়োগ করে ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত থাকলেও তা অবিক্রিত রয়েছে। করোনার কারণে আর্র্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ অধিকাংশ মানুষ। নিবন্ধন বেশি থাকায় তাদের পক্ষে বেশি দামে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্টরা দাবী করেছেন, দাম কমলে সাধারণ মানুষ নিজের বসবাসের জন্য একটি ঠিকানা যোগাড় করতে আগ্রহী হবে। আবাসন ব্যবসায়েও গতি আসত। আবাসনখাতের সঙ্গে রড, বালি, সিমেন্ট থেকে প্রায় দু’শর বেশি পশ্চাদসংযোগ শিল্প জড়িত। তাই আবাসনখাত স্থবির হয়ে পড়লে সমগ্র অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবাসনখাতে গতি আনতে আগামী বাজেটে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পাল্টে দিয়েছে চলতি বাজেটের হিসাব-নিকাশ। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে স্থবিরতায় শতভাগ বাজেট বাস্তবায়নে সৃষ্টি হয়েছে নানা শঙ্কা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কাটছাঁট করে সংশোধিত বাজেট চূড়ান্ত করা হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। অর্থবছরের শুরুতে ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২১ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা কমানো হল। আগামী জুনে এই সংশোধনী বাজেট প্রকৃত বাস্তবায়ন আশঙ্কাজনকভাবে কম হতে পারে বলে ধারণা করছি।
তবে বাস্তবতার আলোকে বলা যায়- চলতি বাজেটে ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি কাটছাঁট হলেও জুন শেষে প্রকৃত বাস্তবায়ন সংশোধিত বাজেটের চেয়ে আরও কম হবে। কারণ- করোনায় ব্যয় বাড়ছে। রাজস্ব আহরণও কমছে। ফলে বাজেটের ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। ঘাটতি বাজেট পূরণে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়া আর সমীচীন হবে না। কারণ ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। এর কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমছে। এখন ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বৈদেশিক ঋণ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। সবমিলিয়ে চলতি বাজেট বাস্তবায়ন এক রকম চাপের মুখে আছে।
একই সাথে বলতে চাই- এ বছর বাজেটের ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ করোনার প্রভাবে বাজেটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। ফলে ঘাটতি বাজেট ঠিক রাখতে সরকার ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাড়িয়েছে, আর হ্রাস করা হয়েছে বৈদেশিক সহায়তা। অর্থ মন্ত্রণালয় ঘাটতি বাজেট সংশোধন করে ১ লাখ ৪০ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। বছরের শুরুতে এটি ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ২১১ কোটি টাকা। সাধারণ সরকারের ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে ঘাটতি। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার তিনটি খাত থেকে ঋণ গ্রহণ করে। প্রথম হচ্ছে ব্যাংক ঋণ, দ্বিতীয় হচ্ছে বৈদেশিক সহায়তা ও অন্যান্য উৎস। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঘাটতি বাজেট পূরণ করতে বছরের শুরুতে সরকার ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়।
টানলে যখন ছিড়ে যায় অর্থনীতির পাল; তখন আর বড় বড় বুলি না আউড়িয়ে এবার কৃষক-শ্রমিক-শিক্ষা-নারী ও শিশুবান্ধব বাজেট বাস্তবায়নে এগিয়ে আসুন। তা না হলে এবার করোনা যেমন খেলা দেখিয়েছে, স্থবির করে দিয়েছে অর্থনীতিকে, তেমন নির্মম আরো বড় কোন মহামারি এসে শেষ করে দিতে পারে রাজনীতিকের ক্ষমতা-সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাস আর লুটেরাদের লুটতরাজ। যদি দেশকে ভালোবেসেই থাকেন, তাহলে ডাকেন সবাইকে দেশ গড়তে এক সাথে…
মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি

