আমার জীবনের সেই ভয়াল মার্চ। এই মার্চ মাসের শেষের দিকে চারিদিক থেকে কভিড ১৯ এর আক্রমণের খবর আসছে। মানুষকে যেন এক অদৃশ্য শত্রু পিছন থেকে তাড়াচ্ছে আর সবাই এক অজানা লক্ষ্যে দৌডাচ্ছে। আমিও মনের অজান্তেই পিছনে শামিল হয়ে যাই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে প্রধান করে প্রতিদিন হোয়াইট হাউসে ট্রাস্কফোর্স গঠন করেন। প্রতিদিন সকাল ১১ টায় ট্রাস্কফোর্সের বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছেন। এসময় তাঁর অনেক কথায় বিতর্কের জন্ম দেয়। যেসব বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞরা কথা বলবেন তা না করে সব ব্যাপারে অনধিকার চর্চা করতে থাকেন তিনি। যেমন প্রথমেই বললেন ‘লকডাউন’ দুই সপ্তাহ পর তুলে নেয়া হবে, গরম পড়লে এই ভাইরাস থাকবে না, এটা সর্দি- কাশির মতো রোগ, এটা চায়নিজ ভাইরাস’। ঔষধের ব্যাপারে বলেন হাইড্রোক্লোঅক্সিকুইন খাওয়ার জন্য এবং তিনি নিজেও খাচ্ছেন বলে দাবী করেন। কয়েকদিন পর বলেন, তিনি এটি নিচ্ছেন না এবং পরে WHO কর্তৃক এটাকে নিষিদ্ধ করা হয়। ( তবে গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটির অনুমোদন দিয়েছে)। আরেক বার তিনি বলেন, Colorax জাতীয় জিনিস যেহেতু জীবানু ধ্বংস করে, সেহেতু এগুলো মানুষের শরীরে ইনজেক্ট করে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায় কি না? এটা শুনে কিছু আমেরিকান এগুলো প্রয়োগ করে হাসপাতালে ভর্তি হন। এটা নিয়ে মিডিয়ায় বেশ রসাত্মক আলাপ এবং কৌতুকের জন্ম দেয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের আগে ও পরের বাস্তবতার মধ্যে নিউইয়র্ক অতি দ্রুত গতিতে মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়। আমার মনেও কিছুটা ভয় কাজ করতে শুরু করে। আতঙ্কে আমি মার্চের প্রথম সপ্তাহের পর কাজ বন্ধ করি। কারণ এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলারও কিছুটা অবনতি হয়। কারণ আমি Barkley Center, Brooklyn যাচ্ছিলাম, রেড লাইটে দাঁড়ানো অবস্থায় টান দিয়ে আমার গাড়ির দরজা খুলে সেকেন্ডের মধ্যে ছিনতাইকারী ফোনটা নিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। অবশ্য আমি দরজা লক করতে ভুলে গিয়েছিলাম। শুরু হলো বিড়ম্বনা। ১৮ মার্চ সার্টডাউন এবং ২৩ মার্চ থেকে নিউইয়র্কে লকডাউন শুরু। ফলে ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না বিধায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস অন্তত এক মাসের খাবার মজুদের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে আমার ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা মনে হয়ে যায়। আমিও সে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। Jackson Heights , Costco সহ বিভিন্ন সুপার মার্কেটে দৌড়াদৌড়ি করি। এর মধ্যে আমি আরেক গাড়িকে পিছনে ধাক্কা দিলে একটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ি। কিন্তু এ সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাতো দূরের কথা হাতে গ্ল্যাভস বা মুখে মাস্ক কিছুই পরিনি। কারণ প্রথম দিকে আমাদের মধ্যে উদাসীনতা ও অজ্ঞতা কাজ করছিল। এরই মধ্যে দেখি আমার প্রথম ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া Sam বাহির থেকে এসে জ্যাকেট দরজার বাহিরে রেখেছে, আমি মনে করি মনে হয় তা এমনিতেই হবে। পরে জানলাম সে করোনা আক্রান্ত। আমেরিকা এবং নিউইয়র্কে কভিড-১৯ এর আগ্রাসী কালো থাবা পৃথিবী প্রত্যক্ষ করা শুরু করেছে। মার্চ ১৫ খেতে বসছি তখন দেশ থেকে বন্ধু মুমিতের ফোন, সে কোন দিন সচরাচর ফোন করে না। হ্যালো বলতেই সে বললো ‘তোমাদের কি খবর?’
আমি বললাম ভালো। তখন সে বললো ‘তোমাকে একটু সাবধান করতে ফোন দিলাম, তোমার ডায়াবেটিসসহ কয়েকটি রোগ আছে খাওয়া- দাওয়াসহ এই বিপদজনক ভাইরাস থেকে সাবধান। বেপরোয়া চলাচল থেকে বিরত থাকিও।’ আমি আচ্ছা আচ্ছা বলে তার উপদেশ শুনে রেখে দেই। আমার কথা শুনে স্ত্রী মিটমিট হাসে কারণ তখন ৬/৭ পদের তরকারি নিয়ে খাচ্ছি। এই রাত্রিতে প্রথমে গলা কুশ কুশ করে শুকনো কাশি এবং সর্দির মতো দেখা দেয়। পরের দিনে গোসল করে খেতে বসি দেখি রুচি নাই। একটু জ্বরের ভাব, তখনি আমার PCP – ছোট ভাইয়ের মতো ডা. মতিউর রহমানকে কল দেই। সে সাথে ৭ দিনের এন্টিবায়োটিক দেয়, ইতিমধ্যে সমস্ত শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করি। ঔষধের সাথে সাথে দেশীয় ব্যবস্থাগুলো যেমন আদা, গরম মসলাসহ গ্রীণ টি, গরম জলে গাল গাল করাসহ সবকিছু চলছে।
মনে করলাম টিক হয়ে যাবে। কিন্তু না রাতে জ্বর ১০২, ১০৩ ডিগ্রীর উপরে চলে যায়। কিন্তু দিনে একটু কমে। তখনও মনে করতেছি আমার মাঝে-মধ্যে এ রকম হয়, ঠিক হয়ে যাবে। ১০মার্চ আমার বড় ছেলের মেডিকেল কলেজে করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ায় সাথে সাথে ক্লাস সাসপেন্ড করে কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ক্লাস করার সিদ্ধান্ত দেন। আমি বললাম বাবা তুমি বাসায় চলে আসো। সেই ১০ মার্চ থেকে ছেলেটা বার বার বলে আসছিলো মাস্ক পরো, নাক মুখে হাত দিও না, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নাও। কিন্তু আমাদের পুরনো অভ্যাস কি সহজে পরিবর্তন হয়। ইতিমধ্যে আমার অসুখের খবর নিয়ে কানাঘোঁষা শুরু হয়েছে সতীর্থদের মাঝে। স্বজনরা প্রতিদিন ঘন ঘন কল দেওয়া শুরু করেন। বিশেষ করে প্রবাসে আমাদের মুরব্বি ফখরুল ইসলাম খান ভাই, তোফাজ্জল করিম ভাই, সুব্রত দা, লোফা ভাই, এমাদ ভাই, লাহিন ভাই, লুৎফুর ভাই, এম সি কামাল ভাই, অধ্যাপক আবদুল মালিক, দেওয়ান শাহেদ চৌধুরী, আব্দুর রব, কবির চৌধুরী, ইয়ামিন ভাই, লায়েক ভাই, এডভোকেট মুজিবুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার আতিক ভাই, জগলু ভাই, গোলাম কিবরিয়া, তাজুল ইসলাম, গাজী শামসুদ্দিন, অরুণ, কমরেড মোশাররফ, আব্দুর রহিম, মামুন আহমদ, বন্ধু এমদাদুল হক, সালেহ আহমদ, তাজনুর চৌধুরী, রুনু, রাজনৈতিক সহকর্মী সেনেস্পদ সাংবাদিক শাহাব উদ্দিন সাগরের কাছ থেকে প্রচুর কল আসতে থাকে। এদিকে কথা বলতে কষ্ট এবং কন্ঠেরও পরিবর্তন দেখে দেশের বাহির ব্রাজিল থেকে সিরাজুল হক, কানাডার আনোয়ার মুকুল, নুরুল মান্নান দারা, অপু ধর, প্রয়াত কমরেড আ ফ ম মাহবুবুল হকের স্ত্রী কামরুন্নাহার বেবি আপাসহ অনেকে অসুখের খবর জানতে ফোন করেন। ২৫ মার্চ, ঔষধ শেষ হলেও জ্বর কমে নাই। আমার ডাক্তারের সাথে কথা বললে তিনি আরেক বার একটু কড়া এন্টিবায়টিক নেওয়ার পরামর্শ দিলেন, তার কথা মতো তা খেতে শুরু করি। কিন্তু আমার ছেলে এবং আতিক ভাই বারবার হাসপাতালে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। আমি দেখতেছি, ২০ মার্চ থেকে সাপ্তাহিক নবযুগের ব্যানারে পত্রিকার সম্পাদক শাহাব উদ্দিন সাগর এবং তার স্ত্রী জনপ্রিয় সংবাদ উপস্থাপিকা শামসুন নাহার নিম্মি প্রতিদিন ফেসবুক লাইভে নিউইয়র্ক এবং আমেরিকার সার্বিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরছিলেন। এদিকে Time TV. TBN24 সহ সকল মিডিয়াতে একই ভয়াবহ চিত্র দেখে অবাক হয়ে চিন্তা করছি কিভাবে এ অবস্থায় হাসপাতালে যাবো। প্রতিদিন ৬০/৭০জন রোগী কুইন্স হাসপাতাল এবং Elmhurst Hospital এ মারা যাচ্ছে। স্থান সংকুলন না হওয়ায় বাহিরে তাবু সাঁটিয়ে রোগীদের সেবা দেয়া হচ্ছে। এদিকে ভ্যান্টিলেশনের জন্য হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে নিউইয়র্কে ৩৪ হাজার করোনা রোগী ভর্তি হয়। ভ্যান্টিলেশন সাত হাজার মাত্র। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই জন রোগীকে ভাগ করে একটি ভ্যান্টিলেশনে ব্যবহার শুরুর কথা বলেন নিউইয়র্ক গভর্নর এন্ড্রু কোমো। তাতেও কুলাতে না পেরে ৫/৬ হাজার কৃত্রিম ভ্যান্টিলেশন তৈরি করে যা হাত দিয়ে পাম্প করে চালানো হয় এবং যারা ৪০/৪৫ বছরের নিচের মানুষ অর্থাৎ যুবকদের অগ্রাধিকার দেয়া হয় ভ্যান্টিলেশন শেয়ার করা হয়। Elmhurst hospital কে এপি সেন্টার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে দিন-রাত স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিশ্রম করছেন, আমাদের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও এবং গভর্নর এন্ড্রু কোমো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে মানুষ বাঁচানোর কার্যকর পদক্ষেপ ও সহায়তার জন্য দেন-দরবার শুরু করেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ধীরগতি। কারণ নিউইয়র্কররা ডেমোক্রেটিক তার বিরুদ্ধে সব সময় এখানে বিক্ষোভ হয় বেশি। এই বিপদের দিনেও তিনি সে কথা ভুলেননি। কিন্তু গভর্নর দেখছেন একে একে হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর উপচে পড়া ভীড়, তাই তিনি নতুন অস্থায়ী হাসপাতাল খোলার উদ্যোগ নেন। এরইমধ্যে ইউএস নেভির হাসপাতাল শয্যাসমেত ইউএস কমফোর্ট ফ্লোরিডা থেকে ম্যানহাটানের ডকে নোঙর করে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া শুরু করে। এছাড়া জ্যাকব জেভিড সেন্টারে দুই হাজার শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রস্তুত করে করোনা রোগীদের চিকিৎসা শুরু করা হয়। ফ্লাশিংয়ের ইউএস ওপেনের ভ্যানুতে স্থাপন করা হয় ৪৫০ শয্যার অস্থায়ী হাসপাতাল। ১১ হাজার হোটেল রোমও প্রস্তুত রাখা হয় কোভিড রোগীদের জন্য। এর আগেই আমার মধ্যেও কিছুটা ভয় আর আতংক কাজ করছে। বিধিবাম ২৭ মার্চ রাতে জ্বর ১০৪ এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। কোন রকম সকাল হলেই আমার ডাক্তারকে বলার সাথে সাথে তিনি হাসপাতাল যেতে বলেন। আমি এম্ব্যুলেন্স কল দিলাম। তারা বলে ৩/৪ ঘন্টা সময় লাগবে। দেখলাম আমার অবস্থা খারাপ হচ্ছে, পরিবারের সাথে আলাপ করে Elmhurst Hospital না গিয়ে ছেলেকে নিয়ে Manhattan, New York Presbyterian Hospital যাই। এই দু’টোই আমার বাসা থেকে পনের মিনিটের ড্রাইভ। ( আগামী সংখ্যায় পড়–ন, হাসাপাতলের দিনগুলো এবং পারিপাস্কিতা)।

শাহাব উদ্দীন
ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতা।

