শান্তিনিকেতন—- মলি আহমেদ

 

সাথে করে নিয়ে এসেছি মৃত্যুহীন প্রাণ। আর সেই প্রাণের কলধ্বনিতে,বসন্তের পঞ্চম রাগে প্রাণের প্লাবনে উচ্ছলিত হয়ে উঠে ক’জন নবীন কিশলয়।
লিনু, রোজী, রিনা আপা, জিয়া,আমি । আমরা বন্ধু চিরকাল।আমরা সবাই অর্ধ শতাব্দী পার করেছি একসাথে।
ঠিক করা হল সবাই মিলে কলকাতা,শান্তিনিকেতন যাব।আর কলকাতা থেকে শুধু রোজী ফিরে যাবে ঢাকা। আমরা বাকি ক’জন চেন্নাই হয়ে পন্ডিচেরী যাব।শান্তিনিকেতনে জিয়া আর আমি আগেও গিয়েছি ।যদিও সেটা বেশ কয়েক বছর আগে। কিন্তু এ এমন এক জায়গা বারবার প্রাণের টানে ফিরে যেতে প্রাণ চায়।শাল বনের মাঝ দিয়ে লাল মাটির রাস্তা খোয়াইয়ের সোনাঝুরি গ্রাম পেরিয়ে চলে গিয়েছে কোন অজানা উদ্দেশ্যে। তাল তমাল ,শাল আর ঘন আকাশমণির বুনো জঙ্গলের দীর্ঘ ছায়া খেলা করে কোপাইয়ের গভীর জলে। প্রকৃতি আর জীবন এইখানেই প্রাণ পেয়েছে।

samoli
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভুবনডাঙার ছাতিম তলায় বসে বিশ্রাম নেবার সময় এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এবং এই জায়গার অসাধারণ নীরবতার মাঝে তাঁর আত্মা প্রশান্তিতে ভরে উঠে এবং পরে এর নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করেন শান্তিনিকেতন । শান্তিনিকেতনে মহর্ষি প্রথম বাড়ীটি তৈরি করে নাম দিয়েছিলেন শান্তিনিকেতন গৃহ। যার দেয়ালে খোদাই করা আছে …..
‘সত্যাত্ম প্রাণারামং মন আনন্দং’(সর্বদা নিজ প্রাণে মনে আনন্দ)
প্রাচীন কালের মুনি ঋষিদের তপোবনের আদলে রবীন্দ্র নাথ তৈরি করেছিলেন বিশ্বভারতী।সারা বিশ্ব থেকে মানুষজন আসে এই রবি তীর্থ পরিদর্শনে।

samoli2 শ্যামলী ।

 

 

লাল মাটি, নীল আকাশ, সবুজে মোড়া আম্রকুঞ্জ,শালবীথি, গোয়ালপাড়া সেই সাঁওতাল পল্লী,খোয়াই ও কোপাইয়ের মাঝে এসে দাঁড়ালে মনে হয় এ যেন বিশ্ব প্রকৃতির অপরূপ একখানি রুপকথার রাজ্য।
সেই বাগান,সেই রামকিঙ্কর বেইজের তৈরী ভাস্কর্য ,নন্দলাল বসুর সুচারু শিল্প।কালো বাড়ি,সেই কাঁচের তৈরি উপাসনা গৃহ। গাছ তলায় পড়াশুনা, সেই দেয়ালে বিনোদ বিহারী মুখোপাধযায়ের নিজের গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে করা অপূর্ব মূর্র্যাল, সোমনাথ হোরের আঁকা ছবি। অসাধারণ চারুকলা গৃহ।পাশেই টেক্সটাইল বিভাগ।কলা ভবন। ভবনের দেয়াল শিল্পীদের করা মনোহরণ বিচিত্র সব অপূর্ব চিত্রে চিত্রিত।।ছাতিম তলায় বসে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপলব্ধি……. “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি”
এই সব কিছুর মাঝে মনে হয় সমগ্র বিশ্ব এই খানে ছুটে এসেছে , লুটিয়ে পরেছে এই মাটির ধরাতলে।মনের কোনে আলোড়িত হয় ‘দিকে দিগন্তে যত আনন্দ লভিয়াছে এক গভীর গন্ধ…’
শান্তিনিকেতনে উত্তারায়ন চত্বরে উদায়ন বাড়ী সহ পাঁচটা বাড়ী। কাছাকাছি,পাশাপাশি। এই পাঁচটা বাড়ীতেই রবীন্দ্রনাথ কম বেশি সময় বসবাস করেছেন।উদায়ন, কোনার্ক ,শ্যামলী ,পুনশ্চ , উদীচী। রবিঠাকুরের মন এক পরিবেশে, এক ঘরের দেওয়ালের মধ্যে বেশি দিন আবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় না। নতুন লেখার জন্য সব সময় খুঁজেছেন নতুন পরিবেশ ।বিভিন্ন সময়ে এই সব গৃহে রবীন্দ্রনাথ বাস করেছেন এবং এইখানে বসে তিনি করে গিয়েছেন অসাধারন সব রচনা।পাঁচটা বাড়ীর মাঝে আমাকে শ্যামলী বাড়ীটা খুব টানে। কি যেন এক আশ্চর্য বিস্ময় আছে বাড়ীটিকে ঘিরে।

 


পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ এই বাড়ীটিতে অনেটা সময়ই থেকেছেন। বাড়ীটি মাটির এমনকী তার ছাদটিও মাটির । এমন অভূতপূর্ব অভিনব পরিকল্পনাটি রূপায়ণের দায়িত্ব পড়েছিল শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ করের ওপর।
দরিদ্র পল্লী এলাকায় শনের তৈরি বাড়ী গুলি প্রায় আগুন লেগে পুড়ে যায়।সেই সব কথা ভেবে নিজে একটা মাটির বাড়ী বানিয়েছিলেন যার ছাদটাও মাটির হবে ।যাতে আগুনের হাত থেকে রক্ষা পায়।আর এই বাড়ীটা যেন অন্য সবাইকে অগ্রহী আর অনুপ্রানিত করে এমন বাড়ী তৈরির জন্য।শ্যামলী বাড়ীর কোন একটা ঘরের দুই পুরু দেয়ালের মাঝে বিশাল বড় বড় খালি কলস ভরে দেয়া হয়েছে যেন ঘরটা ঠান্ডা থাকে। বাড়ী তৈরির পর নন্দলাল বসু ও তাঁর কলাভবনের ছাত্রছাত্রীরা বাড়ীর বাইরে মাটির দেওয়ালে নানা মূর্তি ও শান্তিনিকেতনের জীবনযাত্রার নানা ছবি এঁকে তাকে অপরূপ করে তোলে।বাড়িটির গায়ে শিল্পী রামকিঙ্কর ফুটিয়ে তোলেন কয়েক জন সাঁওতাল রমণীর চেহারা— অপূর্ব সেই শিল্পকর্মটি।মন কেড়ে নেয়া সৌন্দর্য ।পঁচাত্তরতম জন্মদিনের পর শ্যামলীতে বসবাস করতে আরম্ভ করেন রবীন্দ্রনাথ।
আমি আর জিয়া ১৯৯৭ সালে গিয়েছিলাম তখন সব বাড়ী গুলি ভিতর ঢুকে ঘুরে দেখেছিলাম ।এখন ভিতরে যাওয়া নিষেধ।

 

 


এই শ্যামলী বাড়ীতেই রবীন্দ্রনাথ মহাত্মা গান্ধী’কে আপ্যায়ন করেছিলেন।গান্ধীজী এবং কস্তুরী দেবী অতিথি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের।আমার মনে আছে যে ঘরটিতে দুজনে বসে কথা বলেছিলেন সে ঘরটি তেমনি আছে। যে দুটি চেয়ারে তাঁরা বসেছিলেন সে চেয়ার দুটিও তেমন আছে। মুহুর্তে কেমন যেন একটা সমস্ত শরীরে মনে প্রাণে অদ্ভুত একটা শিহরণ বয়ে গিয়েছিল।এই সেই ঘর!!! আমি ওখানে দাঁড়িয়ে কি অনুভব করছি আর আমার কি রকম অনুভুতি হয়েছিল সেটা প্রকাশের ক্ষমতা আমার নেই। শুধু অকারণে মনটা ভারী হয়ে উঠছিল আর চোখে জল আসছিল।সে এক অভূতপূর্ব আর অসম্ভব অভিজ্ঞতা।
মহাত্মা গান্ধী রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও এসে শ্যামলী বাড়ীতেই থেকেছেন ।
রবীন্দ্রনাথ এই বাড়ীতেই বসে লিখেছেন ‘শ্যামলী’ কাব্য সমগ্র। যা এই বাড়ীটাকে দিয়েছে অমরত্ত্ব অতি সহজে।

 

 


১৯৩৬ সালে শ্যামলী কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর শেষ জীবনে এমন একটা ঘর বানিয়েছেন যার নাম দিয়েছেন শ্যামলী । আজীবন মাটি রবীন্দ্রনাথ কে টেনেছে চির মুক্তির প্রত্যাশায়।রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ বয়সে এই মাটির বাড়ির ভিত গেঁথেছেন যার সাথে সাথে জীবনের যত হতাশা, ক্ষতি আর ক্ষত যত, যতই বিচ্ছেদের ব্যাথা, এর মাঝেই হবে সব বেদনার বিস্মৃতি।
সব কলঙ্কের মার্জনা তার সবই বিলীন হবে।যা কিছু বিকার যত সব বিদ্রূপ তার সব টুকুই ঢেকে যাবে নব দূর্বাদলের স্নিগ্ধ সৌজন্যে ধুলো মাটির সাথে সাথে। মৃত্যুর পর মানুষ বিলীন হয়ে যায় এই ধরণীর ধূলিতে।তাই ধুলোমাটি দিয়েই তৈরি এই একতলা বাড়ী যার নাম ‘শ্যামলী’।

“আমার শেষবেলাকার ঘরখানি
বানিয়ে রেখে যাব মাটিতে,
তার নাম দেব শ্যামলী।
ও যখন পড়বে ভেঙে
সে হবে ঘুমিয়ে পড়ার মতো,
মাটির কোলে মিশবে মাটি………..
……………………………
সেই মাটিতে গাঁথব
আমার শেষ বাড়ির ভিত
যার মধ্যে সব বেদনার বিস্মৃতি,
সব কলঙ্কের মার্জনা,
যাতে সব বিকার সব বিদ্রূপকে
ঢেকে দেয় দূর্বাদলের স্নিগ্ধ সৌজন্যে;”
……………………………………

শান্তিনিকেতনের প্রতিটা জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখেছি আর অনুভব করেছি …এই খানে এমন একজন বাস করে গিয়েছেন যে দিয়ে গেছেন এক মনোরম পরিবেশ, আধ্যাত্মিক মনন আর সমগ্র জীবন যাত্রার এক আশ্চর্য পথ। কি আছে পথের শেষে !!??? পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে! কে জানে কে বলে দেবে !!??
একটা অসম্ভব সুন্দর সময় কাটিয়ে আমরা ফিরে এসেছি। রোজী চলে গেল আমেরিকায়, আমি চলে এসেছি সিডনি। রিনা আপা ব্যাস্ত তার অসংখ্য কাজে কর্মে । লীনু প্রস্তুতি নিচ্ছে ঈশিতার কাছে ইংল্যান্ড যাবার।জিয়া সিডনির টাওন প্ল্যানিং নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
জানি না কার মনে কি হচ্ছে!!! কিন্তু দুরে কোথায় দুরে দুরে , আমার মন বেড়ায় যে ঘুরে ঘুরে…। আমি ফিরে এসেছি সেই কবে শান্তিনিকেতন থেকে কিন্তু আমার মন এখনো হেঁটে বেড়াচ্ছে শ্যামলী বাড়ীর সবুজ চত্বরে ,মাটির দেয়ালের কোল ঘেঁসে ,আনিন্দ্য সুন্দর সেই সব বিমূর্ত ভাস্কর্য ঘিরে। এ জীবনে সেই পরিক্রমা আমার ফুরাবে না।

মলি আহমেদ  ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.