অ্যাডভোকেট আনসার খান:সারা বিশ্বব্যবস্হা যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে টালমাটাল, ঠিক এমনি একসময়ে এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন বৃহৎ দু’টি দেশ,চীন ও ভারত,যেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২.৭ বিলিয়ন বা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বসতি এবং অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত, দেশ দু’টির মধ্যে সীমান্ত সংঘাত থেকে উদ্ভুত পরিস্হিতিতে তীব্র সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং যেকোনো সময় উভয় দেশ কনভেনশনাল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
চীন-ভারত সামরিক সংঘাতের আশংকা কতটুকু
দু’টি দেশই সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন করেছে।চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি। প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে।এছাড়া চীনের অবকাঠামোগত অবস্হাও উচ্চতর পর্যায়ে। অন্যদিকে, গত তিন দশকে ভারত অর্থনীতি,সামরিক ও বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে অগ্রগতি অর্জন করলেও চীনের সাথে তার তুলনামূলক শক্তি আসলেই অনেক কম।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,১৯৮৮ সালে বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী চীনের জিডিপি ছিলো ৩১২ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার,পক্ষান্তরে ভারতের জিডিপি ছিলো ২৯৮ বিলিয়ন ডলার।একই সময়কালে চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিলো ১১.৪ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিলো ১০.৬ বিলিয়ন ডলার।অর্থ্যা দেশ দু’টির অবস্হান প্রায় কাছাকাছি ছিলো।কিন্তু একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের দিকে উভয় দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয়ে ব্যাপক ব্যবধানের সৃষ্টি হয়ে যায়।২০১৯ সালের পরিসংখ্যান হতে দেখা যায়,চীনের জিডিপি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার,অথচ ভারতের জিডিপি চীনের চেয়ে প্রায় পাচঁগুণ কমে দাঁড়ায় ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার।একইভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিকে ভারতের চেয়ে চীনের ব্যয় দাঁড়ায় চারগুণের বেশি। অর্থ্যা এসময়কালে চীন প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে ২৬১.১ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতের ব্যয় দাঁড়ায় ৭১.১ বিলিয়ন ডলার।তাই এটি বলা যায় যে,বিগত তিন দশকে ভারত যখন অর্থনীতি,সামরিক এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে বেড়েছে, তবুও চীনের সাথে তার তুলনামূলক শক্তি প্রকৃতপক্ষেই হ্রাস পেয়েছে।
চীন বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে নিজেকে যেমন দেখতে চায়,তেমনি এশিয়ায়ও আন্জ্ঞলিক শক্তি হিসেবে এককভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।অপরদিকে অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষমতা প্রসারিত ও বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতও এশিয় অন্জ্ঞলে, এমনকি বিশ্ব পর্যায়ে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হয়েছে।
চীন তাই ক্রমবর্ধমান ভারতের অবস্হানকে দেখবে এক অনাগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে, বেইজিং দক্ষিণ এশিয়ায় ও ভারত মহাসাগরে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত না হওয়া পর্যন্ত চীন পুর্ব এশিয়ায় আন্জ্ঞলিক শক্তি হিসেবে থাকতে পারে।অথচ চীন পুরো এশিয়ায় একক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে ভারতকেই দেখছে। অন্যদিকে ভারতও তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনকেই ভাবছে। দু’টি দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক এবং অবস্হানকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই মুল্যায়ন করতে হবে।দেশ দু’টির সীমান্ত সংকটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে উপরোক্ত অবস্হার আলোকেই। চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ, সংঘাত ও সীমান্ত উত্তেজনা নতুন কোনো বিষয় নয়।প্রায় ৪০৫৬ কিলোমিটার বা ২৫২০ বর্গমাইলব্যাপী বিশ্বের দীর্ঘতম অচিহ্নিত সীমান্ত ভাগ করে নেবার পরে দেশ দু’টি ১৯৬২ সালে একটি পুর্ণাঙ্গ লড়াই করেছিলো এবং পরবর্তী সময়কালে অনেকগুলো ছোট ছোট সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিলো। এমন সীমান্ত সংঘর্ষের সর্বশেষ ঘটনা এ বছরের ৫-মে ও ৯-মে সংঘটিত হয় এবং এ সাংঘর্ষিক ঘটনায় উভয় দেশ কনভেনশনাল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।এখানে প্রতিদিন উভয় দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে।
৫-মে লাদাখের হিমালয় অন্জ্ঞলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চৌদ্দ হাজার ফুট উপরে অবস্হিত প্যাংগং তসো হ্রদে চীনা ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে ছোটখাট সংঘাত হয়।দু-দেশের সেনারা ডি-ফ্যাক্টো সীমান্তে একে অন্যের উপর পাথর নিক্ষেপ করে।এর তিনদিন পরে লাইন অব একচ্যুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি)বরাবর পুর্ব দিকে প্রায় এক হাজার দুশ কিলোমিটার দুরে ভারতের সিকিম রাজ্যের নাথু লা পাসে ভারতীয় সেনারা চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি(পিএলএ)এর একটি টহল দলকে থামানোর চেষ্টাকালে আরো একটি সংঘাত বেধে যায়।
এসব ঘটনার জন্য চীন ও ভারত পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকে।বিশ্লেষকরা বলছেন,এলএসি বরাবর ভারত যেসব অবকাঠামো কার্যক্রম পরিচালনা করছে,তার ফলে মুলতঃউত্তেজনা দেখা দিয়েছে। দেশ দু’টির মধ্যে যেকোনোও দ্বন্দ্বের সুচনার দিকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে মনে করা হয়।আর সামরিক পদক্ষেপগুলো কেবল সে লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখে।চীনের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্য হলো লাদাখের ভারতীয় সীমান্ত অবকাঠামোর নির্মাণ ও উন্নয়ন বন্দ্ব করা,যা চীনের আকসাই চীনের জন্য হুমকি স্বরপ।এই আকসাই চীনকে নিজস্ব ভুখন্ডের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে চীন,অথচ ভারত এটিকে তার নিজস্ব ভুখন্ড হিসেবে দাবি করে থাকে।
লাদাখ হলো একমাত্র অন্জ্ঞল -যেখানে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সরাসরি শারীরিক মিলন হতে পারে।ভারতীয় সাব সেক্টর (এসএসএন) সিয়াচেন হিমবাহের ঠিক পূর্ব দিকে অবস্হিত। এটি একমাত্র অন্জ্ঞল, যা ভারত থেকে আকসাই চীনের সরাসরি প্রবেশ লাইন নিশ্চিত করে।
চীনা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমস স্পষ্ট করে বলেছে,লাদাখের গ্যালওয়ান উপত্যকা অন্জ্ঞলটি চীনা অন্জ্ঞল। অথচ ভারত এখানেই শায়োক নদীর তীরে পূর্ব লাদাখের দুরবুক হতে দৌলতবেগ ওল্ডির((ডিবিও) মধ্যে সংযোগকারী সড়ক নির্মাণ করেছে,নতুন বিমান ঘাঁটি তৈরি করছে।লাদাখের এলএসির সবচেয়ে দুর্গম ও ঝুঁকিপুর্ণ এলাকা হলো এটি।ভারত কর্তৃক ওখানটায় অবকাঠামো নির্মাণ করার ভারতের সিদ্বান্তে বেইজিংকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এ অন্জ্ঞলে ভারতের অবকাঠামো নির্মাণকে চীন তার জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বলে মনে করে।বিশেষ করে,পশ্চিম জিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় শহর থেকে তিব্বতের রাজধানী লাসা পর্যন্ত সামরিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে মহাসড়ক চীন তৈরি করেছে তার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে চীন উদ্ভিগ্ন হয়ে পড়েছে অত্রান্জলে ভারতের অবকাঠামো নির্মাণকে কেন্দ্র করে।কারণ কাশগড় -রাসা পর্যন্ত নির্মিত চীনা এ মহাসড়কটি আকসাই চীন নামের যে এলাকার মধ্যদিয়ে গেছে সে এলাকাকে ভারত তার নিজস্ব ভুখন্ড বলে দাবি করে থাকে,ভারত অভিযোগ করে এটি জবরদস্তিমুলক ভাবে চীন দখলে নিয়ে গেছে।এ অন্জ্ঞলটি ভারতীয় মানচিত্রের অংশ হয়ে আছে।
প্রকৃতপক্ষে সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারতের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদে চলমান সংকটের চুড়ান্ত কোনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সন্দেহ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ১৯৫০ সালে চীন তিব্বতের সমস্ত অংশকে নিজেদের ভুখন্ডে সংযুক্ত করার পর থেকেই বিতর্কিত সীমান্তটি এখনও স্পষ্টতা পায়নি।চীন-ভারতীয় অরুণাচল প্রদেশকে(প্রায় ৩৪০০০ হাজার বর্গমাইল) “দক্ষিণ তিব্বত “হিসেবে নিজেদের ভুখন্ড হিসেবে দাবি করে থাকে এবং এজন্য উভয় দেশ সীমান্ত সংঘর্ষেও জড়িয়েছিলো ইতোপূর্বে। অন্যদিকে ভারত আকসাই চীনের প্রায় পনেরো হাজার বর্গমাইল এলাকা যা চীনের নিয়ন্ত্রণে,সেটিকে নিজেদের ভুখন্ড বলে দাবি করে আসছে।
চীন ও ভারতের সন্দেহ-অবিশ্বাস এখানেই। ভারত সন্দেহ করে চীন হয়তো অরুণাচল প্রদেশ জবর দখলে নিতে পারে।আবার চীন সন্দেহ করে, দীর্ঘমেয়াদে ভারতের কৌশলগত লক্ষ্য হলো আকসাই চীন ও চীন কর্তৃক অন্যান্য দখলীকৃত অন্জ্ঞলগুলো পুনরুদ্ধার করে ১৯৫০ সালের পুর্বের অবস্হায় ফিরতে চাইছে ভারত।এরূপ অবস্হায় চীন ও ভারতের কৌশলগত সীমান্ত বিরোধ, আন্জ্ঞলিক ও ভুরাজনৈতিক বিরোধ উভয় দেশকে এক জটিল অবস্হার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত সমস্যার পাশাপাশি ভুরাজনীতি ও আন্জ্ঞলিক শক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা উসকে দিচ্ছে সংকটকে।কারণ জোট বেধে চীনের উত্তান ঠেকিয়ে দেবার জন্য জাপান,অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে নিয়ে যে চেষ্টা আমেরিকা করে যাচ্ছে তার প্রথম সারিতেই ভারত রয়েছে বলে মনে করে চীন।চীনা সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া গ্লোবাল টাইমস সম্প্রতি তাদের বিভিন্ন লেখায় এমন কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে যা থেকে বোঝা যায় যে,ভারতকে চীন এখন আমেরিকার নেতৃত্বে চীন বিরোধী একটি অক্ষের অংশ হিসেবে মনে করছে।
অন্যদিকে, চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক ক্রমবর্ধমান ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যেকার সীমান্ত সংকটে চীনের পাকিস্তানের প্রতি সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেওয়া,নেপালের প্রতি চীনের সমর্থন,এসব কিছু নিয়ে চীনের প্রতি ভারতের উদ্ভেগ রয়েছে। পারমাণবিক সরবরাহকারী গ্রুপে ভারতের প্রবেশকে চীন ও পাকিস্তান একযোগে বাধা দিয়ে চলেছে, এটাও ভারতের জন্য হুমকি বলে মনে করে ভারত।অন্যদিকে চীনের বৈদেশিক নীতি উদ্যোগ, বেল্ট এন্ড রোড প্রকল্পে অংশ নিতে ভারতের অস্বীকৃতির ফলে চীন-ভারতের প্রতি ক্ষুদ্ব ও সন্দিহান।
আসলে পরস্পরের প্রতি নিজেদের বিকাশ ও শক্তি অর্জনের প্রতি বাধাস্বরূপ মনে করায় চীন ও ভারতের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলমান ‘শীতল শান্তি’এখন তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশ দু’টির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামুলক প্রতিহিংসা ও ক্ষোভ বেড়ে চলেছে এবং সীমান্ত সংকটকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, এশিয়ান এই দুই জায়ান্ট এই অন্জ্ঞল ও তার বাইরেও ভয়ংকর প্রভাব ফেলে আবারও সামরিক ূ্দ্বন্দ্বের পথেই আছে।নয়াদিল্লীভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অজাই শুক্লার মন্তব্য দিয়ে আজকের লেখার উপসংহার টানতে চাই।মিঃ শুক্লা সম্প্রতি এমন আশংকা প্রকাশ করেছেন যে,”আরও কোনো বড় ধরণের বর্ধনের অর্থ হলো -অল আউট লড়াই হবে।”
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

