ভারতের দক্ষিণে( তামিল নাড়ু) বঙ্গোপসাগরের তীরে ছোট্ট শহর পন্ডিচেরি।পন্ডিচেরি জগৎ বিখ্যাত
হয়েছে অরবিন্দ আশ্রম আর মাতৃ মন্দিরকে কেন্দ্র করে।মাতৃমন্দির গ্রীনিচ বই এ জায়গা করে নিয়েছে।পন্ডিচেরি ছিলো ফ্রান্সের কলোনী।১৬৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে প্রথম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।১৯৫৪ সাল এর আগ পর্যন্ত এই শহরটি ফ্রান্সের অধিনে ছিলো। বর্তমান শহরটি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে অধিনে। ইউরোপীয় এবং ভারতের সংস্কৃতির এক অদ্ভুদ মেল বন্ধন এই শহরটিতে।
অরবিন্দ আশ্রম থেকে ২.১ কিলোমিটার সমুদ্রের গা ঘেঁষে রাস্তা চলে গেছে ফ্রেঞ্চ কলোনী পর্যন্ত। রাস্তার এক পাশে উওাল সমুদ্র সৈকত, অন্যপাশে নীল,হলুদ,সাদা রং এর ফ্রান্সের তৈরি বাড়ী ঘর।যা এখন হোটেল, রেস্তোরা, দোকান, এ রুপ নিয়েছে।হোটেল,রেস্তোরাঁরায় এখনো ফ্রান্সের দেয়া নাম এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
ফ্রান্সের স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রেন্চ মেমোরিয়াল। আর গান্ধীজীর পুরো অবয়বে গান্ধী স্ট্যাচু। অরবিন্দ আশ্রমে শ্রী অরবিন্দের সমাধি স্থল।সমাধি স্থলে প্রবেশ করতে হয়, নগ্ন পায়ে, সারি বদ্ধ ভাবে,নিশ্চুপ হয়ে। দ্বার দিয়ে প্রবেশ করে দেখি, সমাধি ঘিরে ভক্তকুল বসে ধ্যান মগ্ন।আমরা আমাদের স্বভাব সুলভ আচরণে, পরস্পর কথা বলতেই, একজন বাঙলাী ভদ্রলোক , আমাদের বললেন এখানে কথা বলা নিষেধ।আমরা ক্ষীন লজ্জিত হয়ে, পরিদর্শন শেষে, সুভ্যেনীর বিক্রয় কেন্দ্রে ঢুকে, টুক টাক কেনা কাটা করে বের হয়ে এলাম।

শ্রী অরবিন্দ
নামের প্রভাব নাকি পড়ে ব্যক্তি জীবনে।অন্য কারো জীবনে প্রভাব পড়েছিলো কিনা জানিনা,তবে শ্রী অরবিন্দের জীবনে পড়েছিলো। সংস্কৃত অরবিন্দ অর্থ —পদ্ম বা কমল।যার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য দিব্য চেতনার প্রতীক।১৮৭২ সালে ১৫ আগস্ট কোলকাতায় বাবা কৃষ্ণ ধনের প্রাণ প্রিয় বন্ধু কোলকাতার বিখ্যাত ব্যারিস্টার মন মোহন ঘোষের বাড়ীতে মা কৃষ্ণ লতার গর্ভে জন্ম গ্রহন করে, অরবিন্দ।কৃষ্ণ লতা ব্যারিস্টার পত্নী পরস্পর বন্ধু ছিলেন।
বাবা কৃষ্ণ ধন তখন পূর্ব বাংলার খুলনা জেলার সিভিল সার্জন। তিনি ডাক্তার কে ডি ঘোষ নামে পরিচিত।কেডি ঘোষ বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারি ও তেজস্বী পুরুষ ছিলেন।কোলকাতা মেডিকেল থেকে ডাক্তারী পাশ করে ১৮৭৯ সালে স্কটল্যান্ড এবারডিন শহর থেকে উচ্চ ডিগ্রি গ্রহন করে দেশে ফিরে সরকারি চিকিৎসক হিসাবে কর্ম জীবন শুরু করেন।তিনি ভগলপুর,রংপুর খুলনায় সিভিল সার্জন হিসাবে কর্মরত ছিলেন।ভারতীয় রীতি নীতি,অভ্যাস সংস্কার পরিত্যাগ করে আদর্শ ইংরেজ হিসাবে নিজ কে প্রতিষ্ঠিত করেন।
বাল্যকাল থেকে শ্রী অরবিন্দ ইংরেজি আদব কায়দা ও পরিবেশে বড় হন।বাড়ীতে বাংলায় কথা বলা নিষেধ ছিল।ইংরেজী, হিন্দী ভাষায় কথা বার্তা চলত।খাদ্য পোষাক আদব কায়দা, ছিলো সাহেবী।
কৃষ্ণ ধর পাঁচ বছর বয়সে তিন ছেলেকে দার্জিলিং লরেট কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করে দেন।স্কুল টির অধিকাংশ ছাএ ছিলো ইংরেজ। কিশোর অরোর এখানে উল্লেখ যোগ্য শিক্ষা লাভ ঘটেনি।কিন্তু দার্জিলিং এর অপূর্ব নৈসর্গিক, সৌন্দর্য, তুষার গিরি শিখর, বন রাজি তার শিশু মনে গভীর অনুভূতি সৃষ্ট করেছিলো।একদিন শুয়ে,আছে হটাৎ দেখেন– এক গভীর অন্ধকার তাঁর দিকে ধেয়ে এসে তাঁকে ঢেকে দিচ্ছে। ঢেকে দিচ্ছে বিশ্ব চরাচর।পরবর্তীতে ইংল্যান্ড অবস্থা কালে এই তমাস অন্ধকার তাঁকে ঘিরে রেখেছিলো।ভারতে প্রত্যাবর্তনে তাঁর এই তমাস কালো অন্ধকার দূরীভূত হয়েছিলো।

অরোর জীবন বহু মূখি বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক, ভারতীয় সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা, ব্যাখ্যা দাতা,দেশ প্রেমিক বিপ্লবী এক মহান দ্রষ্টা যোগী পুরুষ।
ছেলেদের নিয়ে কৃষধর এর অনেক উচ্চ আকাঙ্ক্ষা ছিলো।এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে তিনি দ্বিতীয় বার ১৮৭৯ সালে স্ব পরিবার লন্ডন পারি দেন।অরো (অরো,অরবিন্দের সংক্ষিপ্ত নাম) তখন সাত বছরের,বড় ছেলে বিনয় ভূষণ বারো,আর মেঝ, মনমোহন নয় বছরের।ইংল্যান্ড যাওয়ার পর অরোর ছোট ভাই বীরেন্দর জন্ম হয়।ইংল্যান্ডে তিন ছেলেকে পড়ানো,সে সময় কালে দুঃসাহসিক ব্যাপার ছিলো। রংপুরে চাকরী থাকাকালীন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রে মিঃ গ্রেজিয়ার এর সাথে তাঁর বাবার বন্ধুত্ব হয়।সেই সুবাদে, ম্যাজিস্ট্রেট এর ভাই ম্যানচেস্টারের যাজক ডুইট সাহেবের কাছে তিন ছেলেকে রেখে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

ফেরদৌসি কাজী লিনু হক

