মহামারি করোনা : এক কল্পকিচ্ছা

মোনায়েম খান:এ প্রজন্মের অনেকে হয়তো জানেন না কলেরা রোগ নিয়ে বাংলাদেশে প্রচুর বর্নাট্য মিথ প্রচলিত ছিল।কলেরাকে বলা হতো আসমানী বালা। এ রোগের প্রাদূর্ভাব দেখা দিলে গ্রামে গ্রামে আল্লাহের ওয়াস্তে শিরণী বিতরণ আর দোয়া দূরুদের মাহফিল বসতো, যাতে করে আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।এক শ্রেণীর মোল্লা মৌলভী কলেরা মহামারিকে পূঁজি করে তাবিজ কবজ বিক্রির মাধ্যমে দূ -চার পয়সা কামিয়ে নিতেন। এমনও অনেক মোল্লা মৌলভী ছিলেন যাঁরা ঐশি শক্তির ক্ষমতা বলে কলেরা নামক বিধ্বংসী বালাকে লোকালয় থেকে কোন বিরান ভূমিতে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হতেন। যেহেতু ,তাঁদের পোষ্য মুরিদান জীন,অপ্সরা ছিল। এ রকম অনেক অকাট-মূর্খ আজগুবী গল্প তখন অন্ধ বিশ্বাসী লোকের মুখে জনশ্রুতি হয়ে ফিরতো।

উপরের কথা গুলো কোন কাহিনী বা লোক মুখে শুনা কথা নয় অথবা ইতিহাসের পাতা থেকে সংগৃহিত নয়। ইহা আমার নিজের দেখা অভিজ্ঞতা বৈ অন্য কিছু নয়। আজ থেকে অনেক বৎসর আগে সেই সত্তর দশকের প্রারম্ভরে আমাদের এলাকায় কলেরা রোগ মহামারি আঁকার ধারণ করলে গ্রামের লোক বাড়ী বাড়ী হেঁটে চাউল সংগ্রহ করে আল্লাহের নামে শিরণী করতেন,যাতে করে আসমানী বালা থেকে সুরক্ষিত থাকা যায়। আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম গুলোও ব্যতিক্রম ছিল না। অনেকে আবার পীর ফকিরের মাজারে মানত মানতেন , মহামারি কলেরা থেকে পরিত্রাণ পেতে।

কলেরা মারাত্মক ভাবে ভীতিপ্রদ রোগ ছিল।সাধারন মানুষ এই রোগটির নাম মুখে নিতে ভয় পেতেন।সর্বাবস্হায সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কলেরার প্রদূরভাব দেখা দিলে গ্রামে কেউ ছাতা টাঙ্গিয়ে চলাফেরা করতেন না।একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, ছাতায বাহন হয়ে কলেরা নামক আসমানী বালা সহজে গ্রামে প্রবেশ করবে ,এ জন্য রোগ থেকে বাচঁতে ছাতার ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হতো। কিছু মোল্লামৌলভী আবার প্রতিরক্ষা মুলক ব্যবস্হা হিসেবে তাবিজ লিখে উঁচু বাঁশের আগায় টাঙ্গিয়ে রাখার পরামর্শ দিতেন।কারন, আল্লাহর কালাম দেখলে কলেরা জনপদে ডুকতে পারবেনা,ইত্যাদি ইত্যাদি বহুবিধ কল্পকাহিনী প্রচলিত ছিল। আশ্চর্য , এ সবই তখনকার এক উল্লেখযোগ্য পরিমান লোক বিশ্বাস করতো । তারপর যখন কলেরা নাশক টিকা আবিষ্কার হলো তখন ঐ লোক গুলোই বুঝতে পারলো তাঁদের ভুল কোথায় । বর্তমানে কলেরা একটি অতি সাধারন রোগ, এ রোগের প্রকোপে কেউ আর বিচলিত হন না বা ভয় পান না।
কারও দ্বিমত থাকার কথা নয় যে, আমরা এখন অনেক অগ্রসর বিশ্বে বসবাস করছি। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্যের ফলে অনেক বিস্ময় গোচরিভূত হচ্ছে বা আমরা বিজয় করতে পেরেছি, যা আমাদের কল্যানের অপরিহার্য অংশ হিসেবেই বিবেচ্য হচ্ছে ।কিন্ত তারপরও অদ্যাবধী অগণিত লোক বিবেক অন্ধ পশ্চাৎপদ রয়ে গেছে। তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বর্তমানের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারি করোনাভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট অদ্ভুত ,বালখিল্য কিচছা কাহিনী।

প্রকাশ ,ইটালীতে অবস্তানরত এক বাংলাদেশী লোক সপ্নযোগে করোনাভাইরাসের ইন্টারভিউ নিয়েছেন বলে এক গাঁজাখুরী সংবাদ ছড়িয়ে পরে। আর যায় কোথায় , বাংলাদেশের এক হুজুর ঘোষনা দিলেন এ রোগটি আল্লাহর গজব হিসেবে বিধর্মীদের উপর প্রতিশোধ নিতে নাজিল হয়েছে কাজেই মুসলমানদের জন্য ভয়ের কারন নেই, দৃঢ নিশ্চয়তা দিলেন তিনি, নতুবা পবিত্র কোরআন মিথ্যে হয়ে যাবে।এক দল অনুসারী হুজুরের কথা আর কেরামতির উপর পূর্ন আস্তাশীল, তাঁরা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন, হুজুরের নসিহতের ফাঁকে ফাঁকে সুবহানাল্লাহ ধ্বনির মাধ্যমে কৃতজ্ঞা প্রকাশ করলেন।

তার পরের ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন,পরিবর্তন হয়ে গেল সবকিছু।এ রোগে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেল।ধর্ম-অধর্ম ,সাদা-কালো ,উচু- নিচ, রাজা-প্রজা ,মোল্লামৌলভী কাউকে ছাড়ছে না।ফলে হুজুরদের যেমন শংকিত দেখা যাচ্ছে ঠিক তেমনি তাঁদের নসিহতেও ভাটার সূর পরিলক্ষিত হয় ।

এবার এলো প্রতিরোধের পালা। ইউরোপ আমেরিকা তথা সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা সর্ব সাকুল্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কিভাবে একটি টিকা বা ঔষধ আবিষ্কার করা যায়,ফলশ্রুতিতে , অনাকাঙিখত জনমৃত্যু কিছুটা হলেও সংকুচিত হবে। এখানেও বাধ সাধলেন কিছু মহাজ্ঞানী হুজুর লোক । তাঁদের কথা হলো এ বালা আল্লাহর তরফ থেকে গজব হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে কাজেই ইহা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা গুনাহের কাজ, আল্লাহ যখন চাইবেন একমাত্র তখন তিনিই তা তুলে নিবেন। এ সব আল্লাহর সৈনিক ।

ইদানীং কালে বাংলাদেশের অনেক হুজুর ওয়াজ মাহফিলে একটি কথা বারংবার উচ্চারণ করছেন যে, আমাদের পাপের ফসল স্বরুপ আল্লাহতালা মহামারি দিয়ে শাস্তি দিচ্ছেন। এতে কোন সন্দেহ নেই, মানুষের পাপাচারের জন্য সময় সময় মহান আল্লাহ সতর্কতা মুলক সংকেত প্রদান করে থাকেন, তা হতে পারে বিভিন্ন রোগ ব্যাধি।তার জন্য রোগমুক্তির উপায় বের করা বা ঔষধ আবিষ্কার করার প্রচেষ্ট করা যাবেনা এমন ধারণা পোষন করা নিতান্তই মূর্খতা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার সামিল।যা কারও জন্য সুফল বযে নিয়ে আসবেনা।যেহেতু পবিত্র কোরআনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইঙ্গিত রয়েছ ।

একজন হুজুর বিরাট এক মাহফিলে বিজ্ঞানী আর বিজ্ঞানের অগ্রগতির প্রতি ধিক্কার জানিয়ে কথা বলছেন। উপহাস করছেন বিজ্ঞানীদের ,অথচ বিজ্ঞানের ফসল সবচেয়ে অত্যাধুনিক মোবাইল ফোনটি তাঁর কু্র্তার পকেটে রয়েছে। রোগ শোক হলে তিনি উন্নত হাসপাতাল খুঁজেন আগে।অথবা পাড়ি দেন বিদেশে। ইহা কি বিবেকের চরম বৈপরীত্য নয়?
অস্বীকার করার উপায় নেই বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের জন্য কল্যান বয়ে নিয়ে এসেছে, উপকৃত হচ্ছে গোটা মানব সমাজ।বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্যে ফলে আমরা অনেক মারাত্মক ব্যধি থেকে সূরক্ষিত রয়েছি। কাজেই বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের প্রতি ঘৃণা পোষন করা বা তাঁদেরকে আল্লাহ বিরোধী বলে প্রচার করা সমীচীন নয় ।
একটি কঠিন বাস্তবতা হল সারা দুনিয়া এখন এক ভয়ংকর মহামারিতে আক্রান্ত। তার বিনাশী শক্তি সম্পর্কেও আমরা অবগত আছি।প্রতি দিন মৃত্যুর হাহাকার শুনছি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ।
মসজিদ, মন্দির ,গীর্জা আর প্যাগোডা সহ সকল উপসানালয়ে তালা ঝুলছে, প্রাণঘাতী এই মহামারির জন্য।স্বাভাবিক জীবন যাত্রা একদম ভেঙ্গে পরেছে। ইহা নিশ্চিত,এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে চলেছে সমস্ত পৃথিবীর মানবকূল।
তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই ভয়ংকর মহামারিকে মোকাবিলা করা সময়ে দাবী। নৈতিক দায়ীত্বও বটে।

সবার প্রতি বিনীত নিবেদন,করোনাভাইরাসকে নিয়ে কোন বিভ্রান্তিকর কথায কান দিবেন না।সকল আজগুবী কিচছা কাহিনীর উপর স্বীয় বিবেক জাগ্রত করুন এবং স্বস্ব সরকারের গৃহিত নিয়মাবলি মেনে চলুন, ইনশাআল্লাহ সকলের প্রচেষ্টায় এই ভাইরাসকেও জয় করেত পারবো।যেভাবে আমরা ইতিপুর্ব অনেক মহামারিকে পরাস্হ করেছি।

লেখক:বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক,কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.