অবাক বাংলাদেশ !
তুমি শুধু অবাকই কর না !
তোমার ধাত্রীবিদ্যায় শিখিয়েছো, মেরুকরণ!
তুমিই আমার মাতৃভূমি
তুমিই আমার জীবন
তোমাতে না পারি সহিতে আমি
তোমার আপন জন ।
আমার নিজের কবিতার দুটো লাইন দিয়েই বলছি, সত্যি সেলুকাস বাংলাদেশ।
জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গত একদিন আগে পরলোকগত হয়েছেন। উনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। নিজেও জাতীর বিবেকের চির বিদায়ে দু কলম লিখে চির বিদায়ের প্রার্থনায় সামিল হবার চেষ্টা করেছি । আবার প্রার্থনা করছি, পরকাল ওনার সুন্দর হোক ।
এই জাতীয় অধ্যাপকের বিদায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ লেখালেখি চলছে। ঘেঁটে দেখার একটা প্রচেষ্টা ছিলো, কে, কিভাবে, ওনাকে নিয়ে লিখছেন। বড় বড় জনের লেখাও দেখলাম, পড়লাম এবং অবাক হলাম । অবাক হবার মতন পক্ষপাতদুষ্ট লেখাতেও ভরে আছে । তবে যতই একপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় লেখাই থাকুক না কেন, সবার লেখার মাঝে একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয় যে, বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা আছে । ভাববেন না তাহলে তো সব ঠিক আছে ।
না ঠিক নাই ! কেননা, কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে ক্ষীণ দলিয় স্বার্থে কটূক্তি করা, চরম কটূক্তি, ঈর্ষণীয় কটূক্তি, অপমান জনক কটূক্তি, ভারতীয় দালাল বলা, মানে কি দাঁড়ালো? যখন কেউ বলবে ভারতীয় দালাল, তার পিছনে থাকে দেশদ্রোহী, দেশ শত্রুর মনোভাব। দলীয়ভাবে বা একজন ব্যক্তিকে ভারতীয় দালাল বলার মাঝে পার্থক্য নিশ্চয়ই আছে । আমি বা আমারা সাত খুন মাপ করে দিচ্ছি! বেশ ভালো কথা। তবে সেটা কি নিজে মানুষ বলে মাপ করছি ? বা করতে পারচ্ছি ? নাকি কেবলমাত্র মুসলমান বলেই মাপ করতে বাধ্য হচ্ছি ? আমার কাছে এমন মানসিকতা কে বেশ আজব মানসিকতার মনে হয় ( একান্তই ব্যক্তিগত মত )। বিষয়টি কেমন জানি দ্বিচারিতার পর্যায়ে পরে।
আচ্ছা এক পক্ষ কি গোলাম আজমের পরলোকগতেও ক্ষমা করতে পেরেছে ? ( আমি ব্যক্তিগতভাবে পারিনি ) ভাবছেন এটা আবার কেমন তুলনা ? এইতো । গোলাম আজমও তো দেশেদ্রাহী ছিলো। এমন কি দেশ জনমের বিরোধী ছিলো । তাহলে কি মৃত্যুর পরে সব মাপ ? না, তুলোনা করছি না। শুধু ক্ষমা করা , না করাকে বুঝাতেই বলছি মাত্র।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রে আধা আধা মনোভাব ? গত এক যুগ দেশদ্রোহী, কেননা মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন, একপক্ষের ছিলেন, ভিন্ন পক্ষের ছিলেন না, কেউ কেউ বলবেন ( ঘুরিয়ে/ প্যাঁচিয়ে ) সত্যের পক্ষে ছিলেন না, পূর্বে ছিলো দেশপ্রেমিক ? কথাগুলো বেশ কস্টের, কেননা মানুষের মনোভাব বুঝতে বেশ বেগ পেতে হয় যে । আমাদের দেশে যেমন আবহাওয়া, তার সাথে তাল মিলিয়ে তেমন মানসিকতা !
কেন জানি সব আজব মানসিকতার মনে হয় ? লক্ষণীয় যে, যে ভাষায় এই জাতীয় অধ্যাপককে সরাসরি সরকারের দালাল, কাপুরুষ, স্বার্থপর এবং সর্বোপরি ভারতীয় দালাল বলে উল্লেখ করে এক পক্ষ লিখেছেন, ভাবতেই অবাক হই । অনেক বড় বড় জনেরা এই একই ভাষ্য পরিমার্জিত ভাবেই বলেছেন, তবে ঘুরেফিরে একই অভিযোগ ছিলো । কেন এমন বলা ? পিছনে সেই দলীয় রাজনীতি নয় কি ?
এই জাতীয় অধ্যাপক দেশের সকল সম্মানিত পদেই ভূষিত হয়েছেন , একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার , পাশাপাশি আছে ভারত থেকে আনন্দ পুরস্কার, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি লিট এবং ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সম্মামনা পদ্মভূষণ । কি ছিলো না উনার ঝুলিতে ? এগুলো কি এমনি এমনিই পাওয়া যায়? কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না ? উনার কি কোনো অবদান ছিলো না এই দেশের জন্য ? তাহলে কেন এমন মানুষদের এমন নোংরাভাবে অপমানিত করে বলা ? এই মানুষগুলোতো দেশ রত্না, দেশ গর্বা, দেশে আসল সম্পদ । দলীয় স্বার্থটাই কি সব চাইতে বড় ?
হ্যাঁ সমস্যাটি সার্বিকভাবে আমাদের দেশের মেরুকরণের রাজনীতিতে । আমরা সব কিছু নিয়েই এতটাই দলীয়ভাবে চিন্তাভাবনা করি যে, আমরা সাধারণ মানসিকতার কেউ আছি কিনা , আমার বেশ সন্দেহ হয় । আমরাই বড় বড় কথা বলি, লিখি, দেশ সবার আগে, দল পরে , অথচ আমরা কেউই দলের বাইরে ভাবতেই শিখিনি ! হোক সেটা অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বা নোবেল জয়ী অধ্যাপক ইউনুস সাহেব। বাস্তবতার নিরিখে স্পষ্ট যে, তুমি যত বড় জ্ঞাণীজন হও না কেন , তুমি যে বাওয়েই কথা বলো, যদি আমার পক্ষে থাকে, সব ঠিক। আর না থাকলেই তুমি অপর পক্ষের দালাল । এমন কি প্রয়োজনে তুমি দেশদ্রোহী।
এমন উদাহরণ তো বর্তমানে কেবলমাত্র অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রেই দেখছি না । এমন জ্বলন্ত উদাহরণ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকেও কত অশ্লীল ভাষায় অধ্যাপক ইউনুস সাহেবের ক্ষেত্রেও শুনেছি । এই দলীয় করণের কারণে আমরা নোবেল জয়ী ইউনুস সাহেব কে দেশের জন্য কোনো কাজেই লাগাতে পারিনি । অনেকেই হয়তো বলবেন, উনার ইচ্ছা শক্তি থাকলেই পারতেন । উত্তরটি হচ্ছে সরাসরি না ।
কেননা আমাদের মতন স্বৈরাচারী গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের হাত অনেক লম্বা হয়, সেই হাতের বিপরীতে দেশের হয়ে কাজ করা অত সহজ নয় ( কেউ কেউ হয়তো পারেন, তবে সবাই না ) । কেননা সরকার তার ঘাত প্রতিঘাতে এতটাই কাহিল করবে, জীবন নিয়েই টানাটানি শুরূ হবে। আপনারা যারা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রে যে প্রশ্ন তুলছেন, উনি গত এক যুগ দেশের নানাবিধ সমস্যার সময়ও নিরব ছিলেন । জ্বি, সম্মানীত জনেরা এক বয়সে নিরবতাকেই শ্রেয় ভাবতে বাধ্য হয় ( অন্তত আমাদের মতন দেশে, অবশ্যই) । কেননা কে চায় এমন বয়সে অপমানিত হতে ? অনেক উদাহরণ দিতে পারবো, দেশের কত সম্মানিতদের শেষ বয়সে কি অবস্থা করা হয়েছিলো।
তবে মনে রাখা ভালো, এমন মনীষীদের নিকট দেশ যা পেয়েছে তার ছিটেফোঁটাও আমি / আপনি দিতে পারছি কি ? সমস্যা তৈরি করবে আমাদের পরিচালনাকারি রাজনীতিকরা , আর সমাধান চাইবো সকল মনীষীদের নিকট, যাদের মূলত রাজনীতির সাথে তেমন কোনো সম্পর্কই থাকে না ! অথচ সেই সকল মনীষীদের আবার পক্ষে/ বিপক্ষে ভাগ করবো ! বিবেকের প্রশ্ন তুলবো ! নিরব থাকলেও দোষ! আবার সরব হলেও দোষ !
একটি উদহারণ দেই । এই বঙ্গ ভূমিতে সর্ব প্রথম যে নির্বাচনটি শতভাগ গৃহীত হয়েছিলো, সেটা ছিলো সাবেক বিচারপতি শাহাবুদ্দিন সাহেবের আমলে , স্বৈরাচার এরশাদ পতনের পর । কেউ স্বীকার করুক আর নাই বা করুক, ইহাই সত্য। অনেকের লেখায় পড়েছি, শাহাবুদ্দিন সাহেব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা নেবার সময়েই উল্লেখ করেছিলেন, তিনি আবার উনার পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে যেতে ইচ্ছুক। পরবর্তীতে যা ঘটেছিলো তা সবার জানা । এক ব্যক্তি শাহাবউদ্দিন সাহেবের কারণে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছিলো ( সেটা আবার ভিন্ন আলোচনা ) বেশ সেটাকে পুঁজি করেই রাজনীতিক দলগুলো আজ অব্দি কত রাজনীতি করছে !
লক্ষণীয় যে, সেই শাহাবউদ্দিন সাহেবকে ৯৬ তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে একপ্রকার অনুনয়/ বিনিনয় করেই প্রেসিডেনট করে ( অনেক লেখায় আছে )। অথচ উনি প্রেসিডেনট থাকা কালিন শুধু আফসোসই করে গেছেন । এক সময় বিদায় নিলেন এবং আজ অব্দি দেশের নানান জটিলতায় উনার আর কোনো টিকিটি পাওয়া গেলো না কিন্তু কেন ? উনি কি দেশপ্রেমিক ছিলেন না ? অবশ্যই ছিলেন এবং সেই দেশপ্রেমের সর্তেই এমন একটি নির্বাচন জাতীকে উপহার দিয়েছিলেন নিশ্চয়ই। দেশের নানান সংকট মূহূর্তে নিশ্চয়ই উনারও হৃদয় কাঁপে। কিন্তু রাষ্ট্রের মুরুব্বি হয়েও সামনে এগিয়ে আসেন না বা মন সায় দেয় না নিশ্চয়ই। কেননা উনারা জানেন রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা উনাদের আপন সার্থে মাথায় তুলে নেয় , আবার প্রয়োজনে বুড়িগঙ্গার কালো জলে ডুবায় ।
সুতরাং এই বয়সে সম্মান নিয়ে চুপটি করে থাকাই সম্ভবত শ্রেয় । ধারণা করি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রেও অনেকটাই তেমন ঘটেছে । কোনো কোনো সময় বক্তৃতা/ বিবৃতিতে মানবতা/ বাঙালীয়ানা/ বাক স্বাধীনতা/ গণতন্ত্র এসব বলেছেন , কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে আগ বাড়িয়ে দু কথা বলেল নি, কেননা তিনিও নিশ্চয়ই অভিজ্ঞতা থেকে জানতেন, এ দেশে ক্ষমতার জন্য কত কি হতে পারে । পক্ষে থাকলে সব ঠিক, আর বিপক্ষে থাকলেই সম্মান নিয়ে হবে টানাটানি । সুতরাং ধারণা করি চুপ থাকাটাই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শ্রেয় ভেবেছেন।
হ্যাঁ, দেশের রাজনৈতিক চরম বিপর্যয়ে আমিও জাতীয় অধ্যাপকের নিকট দেশের মুরুব্বি হিসেবে অনেক কিছুই আশা করেছিলাম। মুরুব্বি বলে কথা। তবে সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, অনেক সময় মুরুব্বিদেরও নিরবে চোখে জল আসে, মনে মনে ডুকরে কাঁদে, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, তবুও কিছু বলার থাকে না! ধারণা করি, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু ছিলো না।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

