গতকাল বিশ্ব ব্যাপী নিরব ঈদ এলো এবং এবারই সর্ব প্রথম নিরবে ঈদ চলে গেলো । এমন নিরব ঈদ ইতিহাসের পাতায় নেই । এমনকি বিশ্বে যুদ্বাবস্থায় কোনো দেশের ইতিহাসেও এমন নিরব ঈদের খবর পাওয়া যাবে না । এমন ঈদের পিছনের শতভাগ যার কল্যাণে হয়েছে , এখন বিশ্বের সেটাই সব চাইতে বড় সমস্যা, করোনা ।
কি কি ক্ষতি এই করোনা ইতিমধ্যেই করেছে বা করছে ? এমন প্রশ্ন করার চেয়ে, কি কি ক্ষতি করে নাই ? সেটাই হবে বাঞ্ছনীয় প্রশ্ন। পৃথিবী ব্যাপী এমন কোনো অংশ বাঁকি নাই, যার ক্ষতি সাধন এই করোনা করেনি ! এক অদৃশ্য ভাইরাসের কতটা ক্ষমতা ! আজ বিশ্বের ধনীকশ্রেনীর দেশগুলো থেকে শুরু করে গরিবদেশগুলোও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে । অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এটাই সবচাইতে বড় ক্ষতির কারণ । সত্যি বলতে সবকিছুকেই উলোটপালট করে দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে । আগামীতে বিশ্বব্যাপী এই অর্থনৈতিক অবস্থানটি কোথায় গিয়ে ঠেকে ? সেটা একটি বিরাট বিষয় প্রশ্ন বটে ।
করোনা আমাদের অনেক শিখালো বলে আমরা প্রায় সবাই বলছি । তবে আমরা কতটা শিখছি বা শিখলাম বা শিক্ষা গ্রহণ করবো ? সেটা নিয়েই কিছু বলার প্রয়াশ মাত্র। সত্যি বলতে ইতিহাস বলে আমরা ( অন্তত বাঙালিরা ) ইতিহাস থেকে তেমন কিছুই শিক্ষা গ্রহণ করে অভ্যস্ত নই। শত প্রমান আছে। রাজনীতিতে তো ভূরি ভূরি প্রমাণ দেওয়া যাবে, আর দেশ চালায় রাজনীতি । তবে সমাজে বা ব্যক্তি জীবনে ইতিহাস থেকে এবার নেবার বা শেখার একটা মহা সুযোগ তৈরি কিন্তু ইতিমধ্যেই হয়ে আছে। সামনে দেখার বিষয় সেটা কতটুকুন ঘটে ।
করোনা বা নিরব ঈদে সবাই এক ধরণের আফসোস করছে। যা স্বাভাবিকও বটে । কেননা ঈদ বলে কথা। হয়ই বছরে মাত্র দুটো । যা আমাদের সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে সত্যি একটা আনন্দ এনে দেয়। সেখানে এমন নিরবচ্ছিন্ন ঈদ ! সুতরাং সে দিক দিয়ে ঠিক আছে। আমরা বলছি, এই ঈদ একটি অভিজ্ঞতা এবং অন্যদিকে এখান থেকে কি শিক্ষা নেব ? সেটাই একটু দেখার চেষ্টা করবো।
লক্ষণীয় যে, এই করোনা মানুষকে মানুষের সাথে দুরুত্বে রাখার প্রভাব ফেলেছে! আমরা কতটা কঠিন হতে পারি তা দেখিয়েছে ! নিষ্ঠুরতার চরমতা দেখিয়েছে ! আমরা যে সত্যি এত নিষ্ঠুর মনের মানুষ, এই করোনা না আসলে হয়তো বা কখনো বুঝতেই পারতাম না। সবই প্রকাশ করেছে এই করোনা। এমনকি আমাদের রাজনীতিতেও জাতিগতভাবে যে মিল হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ, সেটাও চোখের পলকে তুলে এনেছে ! যা সত্যি একটি জাতির জন্য কলঙ্কের । যাকগে , করোনায় রাজনীতি, এই আলোচনা বিশদ হবে বলেই সে দিকে আপাতত হাঁটছি না । সামাজিক দিকটিতেই থাকতে চাই ।
বিশেষ করে এই করোনা ঈদ কেন পজিটিভ বলছি, লক্ষ্য করুন, আমাদের আফসোস ( সবার নয়, তবে বেশিরভাগের ) আহ্হা ঈদ ঈদের মতন মনেই হচ্ছে না । হ্যাঁ তা সত্যি। তবে একবার ভাবুন তো আমাদের দেশেই কত লক্ষ্য মানুষেরা স্বাভাবিক সময়েও ঈদকে ঈদ ভাবতে পারে না? ওরা যাকাত/ ফিতরা অথবা একটু মাংসের জন্য আমার/ আপনার দারজায় হাত পেতে থাকে । ঘরের কাজের মানুষটি একদিন আগে থেকেই বা সবার ঘুম ভাঙার আগ থেকেই সকলের জন্য কত কাজ করতে থাকে। তার আপন সন্তানের জন্যেও ঈদের একটি দিন নিজের করে নিতে পারে না । ঘরে শত মেহমানের আগমনে রসে ভরা শত প্রকার খাবারের ঢালি টেবিলে সাজিয়ে দেয়, অথচ সবার শেষে তার ভাগ্য পাতিলের নিচের অংশ জুটে । দু- চারটি উদহারণ সমাজে ভিন্ন আছে, সেগুলো সার্বিকভাবে উদহারণ হয় না , বেশিরভাগই এমনটাই ঘটে । ঈদের কেনাকাটা করা, নতুন জামা/ কাপর সেটা তাদের ভাগ্য কতটুকুন জুটে ? জাকাতের একটি শাড়ি ভাগ্যে মিললেও, তা হবে মশারির মতন পাতলা, খাবার মিললেও নিচেরটা, আর শরিরে আরাম দেওয়া, সেটা তো ঈদে প্রশ্নই উঠে না । এরকম শত বিষয় বলা যাবে।
এবার প্রায় সবার ক্ষেত্রেই ভিন্নতা ছিলো। ঘরে নেই কাজের মানুষ, নেই মেহমানের আগমন, কেনাকাটাও সবাই করেনি । ঢাকা ছেড়েও যাওয়া হয়নি । হয়তো মা/ বাবা ছাড়াই ঈদ পালন করতে হয়েছে। ভাবুন তো যেখানে পৃথিবীতে প্রায় এক কোটির উপরে বাংলাদেশী প্রবাসী আছে, তাদের কতভাগ মানুষ জীবনে কয়টা ঈদ মা/ বাবার সাথে করতে পারে । ইচ্ছা থাকলেও সেটা সবার সম্ভব হয় না, এমনকি অনেক সময় ঈদ টের পাওয়াও মুশকিল হয় । প্রায় প্রতি ঈদেই সড়কে,জলে কত শত মানুষের মৃত্যু ঘটৈ, ঈদকেই কেন্দ্র করে। এবার তেমনটা নেই বললেই চলে । আমি বলছি না, করোনার কারণে সড়কে/ জলে মৃত্যু নেই, না তা নয় । তবে একটি প্রভাব পড়েছে নিশ্চয়ই।
এই যে সমাজের ছোটোখাটো বিষয়গুলো চোখে না পড়া, অনুভূতিতে না লাগা, এগুলো এবার সবার নিশ্চয়ই খেয়াল হয়েছে ? একটা বিরাট পার্থক্য আছে। এই বিষয়গুলোকেই আগামীর জন্য পজিটিভ নেওয়া বেশ প্রয়োজন, আমাদের পরিবর্তনশীল অস্বাভাবিক মানসিকতার কারণে। এই বিষয়গুলোকেই পরিবারের সকলের সামনে তুলে আনা প্রয়োজন। ঘরের ছোট্ট শিশুটিকেও এই বিষয়গুলো দেখিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সত্যি বলতে আমাদের সমাজের মানুষগুলো দিনকে দিন বেশ নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছিলো, সেটার থেকে পরিবর্তনের বিশাল সুযোগ এই করোনার নিরব ঈদটি ।
আসুন এবারের এই করোনার নিরব ঈদকে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই, এই ভঙুর সমাজের প্রয়োজনেই, মানবিকতার প্রয়োজনেই, সর্বোপরি আগামীর ভালো বাংলাদেশের প্রয়োজনেই, সম্পূর্ণ পজিটিভ রূপে দেখি। তাহলে হয়তো আগামীতে আমরা ভালো ও সুষ্ঠু সমাজ পেতে পারি । যা , বর্তমানে আমাদের ভীষণ প্রয়োজন।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

