কমরেড আবুল খায়ের ভূইয়া- লাল সালাম!

মানুষটার সাথে পরিচয় সম্ভবত ১৯৮৪ সালের শেষের দিকে। এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তখন সারাদেশে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলছিলো। ঢাকায় এক সকালে হরতালের পিকেটিং করার সময় গ্রেফতার হয় সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক নাঈম উদ্দিন। ছাত্র-আন্দোলনের গায়ে কালিমা লেপনের জন্যে পরদিন বন্দী নাঈম উদ্দিনের দু’হাতে দুটো বোমাসহ বিরাট এক ছবি ছাপে ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকা। বর্বরোচিত পুলিশি নির্যাতনের পর কারাগারে পাঠানো হয় ছাত্রনেতা নাঈম উদ্দিনকে।

নাঈমের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে ও তার মুক্তির দাবিতে চট্টগ্রামে আয়োজিত সমাবেশ-মিছিলে সপরিবারে অংশগ্রহণ করেছিলেন নাঈমের বাবা- আবুল খায়ের ভূইয়া। ছেলের বিপদে তিনি বিচলিত হননি। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আহাজারি করেননি। বরং, নিজেও যুক্ত হয়ে যান ছেলের রাজনীতির সাথে। ছেলের দেখানো বিপ্লবের স্বপ্ন তাঁর চোখেও ধরা দেয়।

ভীষণ উদার, প্রাণবন্ত ও লড়াকু মানুষ ছিলেন খালুজান। দলের সভা-সমাবেশে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। উচ্চকণ্ঠে শ্লোগান ধরতেন। সাধ্যানুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা করতেন। মতামত-পরামর্শ দিতেন। দলের রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের মতামত জানতে একবার জরিপ শুরু করেছিলেন। কাগজ-কলম নিয়ে একা একা মানুষের সাথে কথা বলতেন। মানুষের মতামত ও নিজের অভিজ্ঞতা সুপারিশ আকারে লিখে পার্টি অফিসে জমা দিতেন।

১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলে এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে আসে নাঈম উদ্দিন।চট্টগ্রামে শ্রমিক রাজনীতি করতে গিয়েও মালিকের লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডাদের আক্রমণে জীবন-সংশয় দেখা দিয়েছিলো নাঈমের। ছেলের জীবনাশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হলেও, দল ও রাজনীতিকে কখনও দোষারোপ করেননি বাবা আবুল খায়ের ভূইয়া। বরং, ছেলের সাহসী ভূমিকায় বাবা হিসেবে গর্ববোধ করতেন। উৎসাহ ও সমর্থন যোগাতেন।

খালাম্মাকে নিয়ে ঢাকায় দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতেও তিনি অংশগ্রহণ করতেন। সমর্থক ফোরামের বার্ষিক সভায় এসে সোৎসাহে নিজের বক্তব্য রাখতেন। সবার খোঁজখবর নিতেন, গল্প করতেন। কখনও তাঁর মধ্যে আশাবাদের কমতি ছিলো না।

বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতা ও খালাম্মার মৃত্যুতে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন কমরেড আবুল খায়ের ভূইয়া। অনেকদিন দেখিনি তাঁকে। চট্টগ্রাম গেলেও তাঁকে দেখতে যাওয়া হয়নি। নাঈমের মাধ্যমে তাঁর খবরাখবর পেতাম।

পরিণত বয়সে বিদায় নিলেন কমরেড আবুল খায়ের ভূইয়া। একজন বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী লড়াকু মানুষ। একজন অসাধারণ বাবা। আমাদের কমরেড নাঈম উদ্দিনের বাবা। গভীর শ্রদ্ধা ও মমতায় স্মরণ করছি এ প্রিয় মানুষটাকে।

কমরেড আবুল খায়ের ভূইয়া- লাল সালাম!

বেলাল চৌধুরীর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.