চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক সুমন মাহমুদ বাবুল । পুরো নাম সুমন মামুদ বাবুল। করোনা উপসর্গ নিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে খবরটা পেলাম। গত ১৫ মে তাঁর বোন একটি পোস্ট দেন। তিনি লিখেন যে, সুমন মাহমুদ আসগর আলি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর করোনা উপসর্গ রয়েছে। তাঁর পোস্টটি দেখে চিন্তিত হয়েছি, কিন্তু বিচলিত হইনি। বিশ্বাস ছিলো তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। অনেকেই তো ফিরে আসছেন। একজন সংগ্রামী মানুষ, মনের শক্তি ও চিকিৎসকদের সহায়তায় নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন। কিন্তু না, তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ফেসবুকে মৃত্যু সংবাদের স্ট্যাটাস দেখে আমি শোকে ম্যুজ্জ্বমান! হতবিহ্বল!! সুমন মাহমুদের মৃত্যু সংবাদটি কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বার বার পড়ছিলাম। যখন দেখলাম ফেষবুকের ওয়ালে পোস্টের সংখ্যা বাড়ছে, তখন একরাশ দুঃবোধ জেগে উঠলো মনের মাঝে। সুমন মাহমুদকে আমি চাচা বলে সম্বোধন করতাম। কারণ তিনি ছিলেন আমার প্রয়াত চাচা কাজী আরেফ আহমেদের সহযোদ্ধা। আমাদের অনেক আগের প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতা। সুমন চাচার সাথে ২০১৩ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে আমার যোগাযোগ হয়। এরপর থেকে নিয়মিত তাঁর পোস্টগুলো অনুসরণ করতাম। অত্যন্ত ইতিহাস নির্ভর ও তথ্যবহুল পোস্ট দিতেন তিনি। ২০১০ সালে আমি কাজী আরেফ আহমেদের ওপর একটি ফেসবুক গ্রুপ তৈরি করি। এই গ্রুপের জন্য ছবির অভাব অনুভব করি। আমার সংগ্রহে যথেষ্ট ছবি ছিলো না। সুমন মাহমুদের লেখা ও ছবি থেকে জানলাম তাঁর কাছে প্রচুর ছবি রয়েছে। যোগাযোগ করে তাঁর বাসায় গেলাম। তাঁর সংগ্রহ থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত চাচার (কাজী আরেফ আহমেদ) সাক্ষাৎকারগুলো ফটোকপি করে দেন। সেদিন সুযোগ হয়েছিল তার সংগ্রহশালা দেখার। সুমন মাহমুদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এবং একজন তথ্য সংগ্রাহক। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনীতি বিষয়ক অসংখ্য তথ্য ও ছবি নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দলিল ও তথ্যাবলীও সংগ্রহে রাখতেন। বলা যায় সুমন মাহমুদ ছিলেন এসব বিষয়ের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। তাঁর সংগ্রহের তথ্য ও ছবিগুলো মূল্যবান প্রামাণ্য দলিল। সুমন মাহমুদ ৬০’র দশকে ছাত্রলীগ নেতা । স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন বিএলএফ সদস্য। স্বাধীনতা পরবর্তীতে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ’র রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৯-১৯৮১ সালে জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। পরবর্তীতে তিনি সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। ভোরের কাগজসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কাজ করেছেন তিনি। রাজনীতি ছেড়ে দিলেও অনেক নেতা-কর্মীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন । এই তালিকার অন্যতম ছিলেন প্রয়াত রাজনীতিবিদ মাজহারুল হক টুলু। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাজহারুল হক টুলু ছিলেন জাসদের প্রথম দপ্তর সম্পাদক। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে টুলু চাচার সাথে দেখা করার ইচ্ছা করি। সুমন চাচাকে জানানোর পর তিনি সাথে নিয়ে যাবেন বলে জানান। কিন্তু আমার পূর্বনির্ধারিত একটা

মিটিং থাকায় যথাসময়ে তার সাথে যেতে পারি নাই। প্রায় তিনঘন্টা পর পৌছলাম। তখনও তিনি অপেক্ষা করছেন। আমি খুব লজ্জাবোধ কলছিলাম বিলম্বের জন্য। কিন্তু তার মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া দেখতে পেলাম না। আমার বিলম্বের বিষয়ে কোন কৈফিয়তও চাইলেন না। একজন পেশাদার আলোকচিত্র গ্রাহকের মত তিনি ভিডিও ক্যামেরা, স্ট্যান্ডসহ সবকিছু সাথে নিয়ে বের হলেন। রাত ১১টা পর্যন্ত টুলু চাচার সাথে কথা হলো। তিনি সেই সব কথা ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করলেন। পরবর্তীতে নিজেই তা এডিট করে ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করেন। একইভাবে আরেকদিন ক্যান্সার আক্রান্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সিরাজের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সাথে ছিলেন রেজাউল হক চৌধুরী মোস্তাক, মহিউদ্দিন আলমগীর, সুমন চাচা এবং আরো একজন। সেদিনও তিনি সাথে নেন তাঁর ভিডিও ক্যামেরা। একইভাবে তিনি শাহজাহান সিরাজের সাক্ষাৎকার ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করেন। কিছু স্থিরচিত্রও ধারণ করেন। এগুলোও তিনি নিজে এডিট করে ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করেন। আমার সুযোগ হয়েছে সেগুলো তার কাছ সিডি আকারে পাওয়ার। বছর দুই হলো আমি একটি পত্রিকায় কাজ করছি। এ কারণে চাচার সাথে যোগাযোগ একটু দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো। বেশ কিছুদিন তিনিও দেশের বাইরেে ছিলেন। ফেরার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে সময় আরো কিছু কাজ করার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন । ঘুরে ঘুরে অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এই সংগঠক, এই বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়ে গেলো অনেকের অজানার মধ্যে; অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের মতই। কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সহযোদ্ধারা, কর্ম ও পেশাজীবনের সহকর্মীরা এই নির্লোভ, নিরহঙ্কার, প্রচারবিমুখ বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য দু’ফোটা অশ্রু বর্ষণ করবে, ভালবাসার অশ্রু- তা নিশ্চয়ই অতিআশা নয়। সুমন মাহমুদ বেঁচে থাকবে তার কাজের মাঝে, তাঁর দেশপ্রেমের মাঝে, স্মরণীয় না হোক বরণীয় হবেন আমাদের মাঝে- এটাই প্রত্যশা করি। ওপারে ভাল থাকবেন সুমন চাচা- এটা আমার কামনা।

কাজী সালমা সুলতানা ,গণমাধ্যম কর্মী এবং লেখক ।

