“নাহ! আজকে ওই সিট দেওয়া যাবে না”, এই বলে লোকটা অদ্ভুত ভাবে তাকালো !
কমলাপুর রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টারের উল্টো পাশে দাঁড়ানো রিয়াদের কাকুতিভরা চোখটাকে লোকটা পাত্তাই দিল না। ঘটনা হচ্ছে সাপ্তাহিক বন্ধে হঠাৎ করেই রিয়াদ ঠিক করেছে সে নীলফামারী যাবে। তেমন কোনো কাজে নয়, এমনি ঘুরতে। সেখানে নীলসাগরটা একটু দেখবে, আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে একদিনেই আবার ফিরতি পথ ধরবে। এভাবে একা একা ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস রিয়াদের বহুদিনের। প্লান ছাড়া এভাবে বের হবার কিছু ঝামেলা আছে; এই যেমন এখন সিট পাচ্ছে না। চাইলে দাঁড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু এতটা লম্বা পথ দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। তাই টিকিট কাউন্টারে বারবার অনুরোধ করছিলো কোন সিট ম্যানেজ করা যায় কিনা। কাউন্টারের লোকটা লিস্টে চোখ বুলিয়ে না বলতে বলতে হঠাৎ বলল, “একটা আছে… কিন্তু… ওহ না… আজকে ওই সিট দেয়া যাবে না।”
রিয়াদ তাড়াতাড়ি বলে বসল, “কেন ভাই? দেয়া যাবে না কেন? দিয়ে দেন না।”
লোকটা বলল, “উহু ওই সিট ভালো না। দেয়া নিষেধ।”
রিয়াদ অনুরোধের সুরে বলল, “আরে ভাই কি সমস্যা? ভাঙ্গা? তবুও দেন, আমি ম্যানেজ করে নেব।”
লোকটা খেঁকিয়ে উঠে বলল, “ধুর মিয়া ! যান তো। বললাম তো দেয়া যাবে না।”
ব্যর্থ মনোরথে রিয়াদ কাউন্টার থেকে সরে এলো। ভাবছে যাওয়ার প্ল্যানটা ক্যান্সেল করে দিবে কিনা। এমন সময় পাশ থেকে শ্লেষ্মা জড়ানো ঘ্যারঘ্যারে একটা কন্ঠ বলে উঠলো, “ভাই, যাইবেন কই?”
রিয়াদ লোকটাকে দেখলো। শুকনো টিংটিঙে একটা লোক। গায়ের কাপড় যথেষ্ট ময়লা। চোখ লাল; নেশা করে এটা কনফার্ম। সেই কোটর থেকে বের হওয়া লাল চোখে কৌতুহল আর লোভ নিয়ে তাকিয়ে আছে। যে কোন স্টেশনেই প্রচুর দালাল ঘোরাফেরা করে। ব্ল্যাকে টিকিট বেচে। অনেক ধান্দাবাজ টাইপের হয় এরা। রিয়াদ কিছু না বলেই চলে যেতে নিয়েছিল তারপর ভাবল, এমনিতেও তো টিকিট পাচ্ছে না; এটাকে দিয়ে যদি কাজ হয় তাহলে মন্দ কি? বললো, “নিলফামারীর একটা সিট লাগতো। ওদের কাছে নাকি একটা খালি আছে কিন্তু দিতে চাচ্ছে না। তুমি ম্যানেজ করে দিতে পারবা?”
লোকটা চোখ বুজে একটু চিন্তা করার ভাব নিয়ে চোখটা খুলে বলল, “হ পারমু। তয় ৫০০ টাকা বেশি দেয়া লাগবো।”
রিয়াদ মেজাজ খারাপ করে বললো, “হাইয়েস্ট ১০০ টাকা পাবা। এর বেশি না।”
বলেই হাঁটা ধরলো। লোকটা পিছু পিছু এসে বললো, “ভাইজান ২০০টা টাকা বেশি দিয়েন। একশতো কাউন্টারেই দিতে হইবো।”
রিয়াদ টিকিটের টাকার সাথে এক্সট্রা ২০০ টাকা লোকটার হাতে ধরিয়ে দিলো। লোকটা টাকাটা নিয়ে কাউন্টারে চলে গেল। কিছুক্ষণ কথা বলে টিকেট নিয়ে রিয়াদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দেঁতো হাসি দিয়ে বলল,”ভাই আপনার কাজ ফিনিশ।”
রিয়াদ টিকিট চেক করে আসল কিনা সেটা কনফার্ম হয়ে হাঁটা ধরলো। যেতে যেতে একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল ওর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লোকটা।
ট্রেন ছাড়তে ঘন্টাখানেক দেরি আছে। এই ফাঁকে হালকা কিছু খেয়ে নিয়ে সাথে কিছু শুকনো খাবার কিনে ট্রেনে উঠে পড়ল। নিজের সিট খুঁজে বের করলো। একেবারে ভেতরের দরজার সাথে সিঙ্গেল একটা সিট। রিয়াদ সেটা একবার ঝাঁকি দিয়ে দেখলো। নাহ, ভাঙ্গা না ! সব ঠিকঠাক, তবুও কেন যে কাউন্টার থেকে সিটটা দিতে চাইল না, কে জানে ! অবশ্য সিটটাতে একটু ধুলা জমে রয়েছে। মনে হচ্ছে দুই-একদিন এই সিটে কেউ বসে নাই। পকেটে থাকা টিস্যু দিয়ে যতটুকু সম্ভব পরিষ্কার করে নিলো রিয়াদ। তারপর ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আরাম করে বসে পড়ল। আশেপাশে মানুষজন উঠছে। বাক্সপেটরা উঠানোর শব্দ, সিট দখল নিয়ে হৈচৈ, ছোট বাচ্চার কান্না ইত্যাদি শব্দের মধ্যে ২০ মিনিটের মাঝেই ট্রেনটা ছেড়ে দিল। রিয়াদ সিটের সাথের জানালাটা খোলার চেষ্টা করলো। কিন্তু খুলছে না। মোবাইলের আলো জ্বেলে দেখল জানালার কপাটে কালচে কি যেন জমে শক্ত হয়ে আছে। এইজন্যই খুলছে না। রিয়াদ বিরক্ত হলো। বাংলাদেশের রেল পরিবহন বলে কথা, কোন কিছুর প্রতি দায়িত্ববোধ নেই। পাশ দিয়ে রেলের এক ক্যান্টিনবয় যাচ্ছিলো। তাকে ডাক দিয়ে থামিয়ে বললো, “এই জানালাটা খুলে না কেন? এগুলো খেয়াল রাখতে পারো না?”
ক্যান্টিনবয়টা একবার রিয়াদের দিকে, তারপর একবার জানালার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হতবাক গলায় বললো, “হ মামা, এই জানালা খুলে না।”
– আরে ব্যাটা, খোলে না যে সেটাতো আমিও দেখেছি। কথা হচ্ছে এটা খোলার ব্যবস্থা করছোনা কেন?
– কিন্তু মামা আজকের দিনে এই সিটেওতো কেউ বসে না !
– বসে না কেন? সমস্যাটা কি? সেই কাউন্টার থেকে এই এক কথা শুনেই আসছি, কি হয়েছে এই সিটের?
ক্যান্টিনবয়টা আশেপাশে তাকিয়ে মাথাটা নামিয়ে নিচুস্বরে বলল, “প্রতিবছর আজকের দিনের নাইট কোচে এই সিটে যারাই বসে তাগো আর খুঁইজা পাওয়া যায় না।”
– খুঁজে পাওয়া যায় না মানে? কি হয় তাদের?
– এইডা আমি কেমনে কমু… রাতের বেলায় ট্রেনে উঠে তারপর আর সকালে খুঁইজ্যা পাওয়া যায় না। ফ্যামিলির মানুষ আইয়া খুঁজে; পায় না।
– কি সব আজে-বাজে কথা বলছো, চলন্ত ট্রেন থেকে যাবে কই? নিশ্চয়ই অন্য কোন স্টেশনে নেমে যায়।
– না মামা, নামে না। সত্যি সত্যি হারাইয়া যায়। এই রকম কয়েক বছর হইছে। তয় এইসব জিনিস শুরু হইছে ওই ঘটনাডার পর থেইকাই।
– আবার কি ঘটনা ?
– আট-দশ বছর আগের কথা, ২০-২১ বছরের একটা মাইয়া আজকের দিনে এই নাইটকোচে উঠছিল। জানালা খুইলা বাতাস খাইতে খাইতে ঘুমায়া পড়ছিলো। লগের ব্যাগটা রাখছিল শরীরের লগে পেচাইয়া কুলের উপর। তো ,মাঝখানে একটা স্টেশনে ট্রেনডা থামছে। সেই প্ল্যাটফর্মের কোনায় এক চোর ওঁত পাইতা ছিল, ট্রেনডা ছাড়ার পরে ভালোমতো স্পিড উঠার আগেই সেই চোর জানালা দিয়ে হাত ঢুকাইয়া মাইয়ার ব্যাগ ধইরা দিছে টান। কিন্তু ব্যাগতো শরীলের সাথে প্যাঁচাইন্যা। ব্যাগের লগে লগে মাইয়া নিজেও জানালা দিয়ে অর্ধেক বাইর হইয়া গেছে। আর এই জানালাটা ধাক্কা খাইয়া মাইয়ার কোমরের উপর পইড়া মাইয়ারে দিছে লক কইরা। ভিতরেও ঢুকতে পারে না, বাইরে যেতে পারে না। বেড়াছ্যারা অবস্থা।
– সর্বনাশ ! তারপর কি হলো ?
– তারপরেই তো সবচাইতে খারাপ জিনিসটা হইলো। স্টেশনের একটু সামনেই লোহার শিকওলা একটা খাম্বা ছিলো। মাইয়ার বডিটা ওই খাম্বায় বাইজ্যা গিয়া এমন টান খাইলো যে পুরা বডি দুইভাগ ! কোমরের উপরের অংশ খাম্বায়, আর নিচের অংশ এই সিটে। বডির উপরের অংশডা পরে আর মাইনষে খুঁইজা পায় নাই। সবাই ভাবছে ওই চোর ব্যাটাই মনে হয় বডিটা গায়েব কইরা দিছে। যাইহোক এই ঘটনার এক বছর পর থেইকাই শুরু হইলো কাহিনী। যে মানুষডা এই সিটে বইছিল পরদিন সকালে তারে আর খুঁইজা পাওয়া গেল না। কেউ তখনও কিছু বোঝে নাই, কিন্তু পরের বছর যখন সেইম জিনিসটাই হইল তখনই সবাই বুঝলো যে ঘটনা খারাপ। ওই মরা মাইয়াডার আসর লাগছে এই সিটে। ঐদিন অয় নিজে যেমন ওর বাড়ি যাইতে পারে নাই, তেমনি অন্য কাউরে যাইতেও দিবো না। মামা আপনারে একটা ভালো কথা কই; আপনি এই সিট ছাইড়া অন্য কোথাও গিয়ে বহেন।
রিয়াদ অবাক ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ ক্যান্টিন বয়টার দিকে তাকিয়ে থেকে ফিক করে হেসে বলল, “ভালো একটা গল্প বললে তো। এরকম গল্প বলেই কি সবাইকে এই সিট থেকে দূরে রাখা হয় নাকি? ঘটনাটা কি বলতো? সরকারকে না জানিয়ে এই সিট আলাদা ভাড়া দিয়ে বাড়তি ইনকামের জন্যই কি এমন গল্প বানানো হয়?”
ক্যান্টিনবয়টা আহত গলায় বলল, “মামা আমার কথা বিশ্বাস করলেন না? আপনে নিজে যহন হারাইয়া যাবেন তখন বুঝবেন আমি সত্য কইতেছিলাম কিনা।”
কথাটা বলে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ছেলেটা চলে গেল। রিয়াদ এই অভিনব গল্পটা শুনে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। মানুষ যে কি পরিমাণ গল্প বানাতে পারে ! যদি সবাই গুছিয়ে লেখালেখি করতে পারতো তাহলে ঘরে ঘরে উপন্যাসিক তৈরি হতো। যাইহোক, মোবাইলটা বের করে দেখলো সবে মাত্র ১২টার মতো বাজে। রাত শেষ হতে এখনো অনেক দেরি। মোবাইলের চার্জ বাঁচানোর জন্য মোবাইলটা সুইচ অফ করে রাখল। তারপর সিটে হেলান দিয়ে চোখটা বুজতেই ট্রেনের দুলোনিতে ঘুম এসে গেল।
রাতের কোন একটা সময়ে হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙ্গে গেল রিয়াদের। একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেউ যেনো ট্রেনের সমস্ত লাইট অফ করে রেখেছে। মোবাইল বের করে সময়টা দেখতে যাবে তখন মনে পড়ল মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। এখন অন হতে হতে অনেক সময় লাগবে, তার মধ্যে আবার প্রস্রাব চেপেছে। শেষে মোবাইল বের না করেই উঠে পড়লো। দরজার সাথেই সিট, হাতরে হাতরে টয়লেটের দরজায় চলে গেল। সুইচ খুঁজে বের করে অন করল, কিন্তু না; আলো জ্বললো না। কি মুশকিল ! জানালা দিয়ে আসা আলোতে কোন রকমে ছোট কাজ সমাধা করে নিজের সিটের দিকে চলে এলো। সিটে বসতে যাবে এমন সময় পায়ের সাথে অন্য কারো পায়ের স্পর্শ পেলো। ঘটনা কি? ভুল করে অন্য কারো সাথে সিটে চলে এলো? কিন্তু না, দরজার সাথে প্রথম সিটতো এটাই, ওর সিট। তাহলে মনে হয় অন্য কেউ ভুল করে ওর সিটে চলে এসেছে। যেই হোক, তাকে হালকা করে ডাকলো। কিন্তু শুনেছি বলে মনে হলো না। শেষে হাত বাড়িয়ে মানুষটার কাঁধটা ধরতে চাইলো। জায়গামতো কাধঁটা পেলোনা। বাতাসে হাতটা ভেসে গেলো। হাতটা এদিক ওদিক সরালো, কিন্তু না, সিটের উপরটা একদম ফাঁকা। কেউ নেই । পা-টা আবার বাড়িয়ে দেখলো, আছে ! অন্য কারো পা ঠিকই সিটে বসে আছে। কিন্তু উপরে কিছু খুঁজে পেল না কেন? এবার সরাসরি সিটের বসার জায়গায় হাত দিলো। নরম, উষ্ণ ও থকথকে কিসের মধ্যে যেন হাতটা লাগলো। ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে আনলো রিয়াদ। নাহ ! এবার আলোর ব্যবস্থাটা করতেই হবে। অন্য হাতটা দিয়ে মোবাইলটা বের করে সুইচ অন করলো। ফ্লাশ লাইটটা জ্বালিয়ে হাতে ফেলতেই দেখল আঠালো লাল কি যেন লেগে আছে হাতে। অনেকটা ঘন হয়ে যাওয়া রক্তের মত ! তাড়াতাড়ি আলোটা ঘুরিয়ে সিটের দিকে ফেলতেই রিয়াদের গলা দিয়ে আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো। কি ওটা ? ওর সিটের উপর কোন এক নারীর একজোড়া পা বসে রয়েছে। শুধুই পা, তার উপরে আর কিছু নেই। কোমর যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেখানে দগদগে ঘা এর মত হয়ে আছে আর থেকে থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।
রিয়াদ প্রচন্ড ভয় পেয়ে ছিটকে সামনের দিকে সরে এলো। একটু এগোতেই হঠাৎ পায়ের নিচে কি যেন একটা পড়ে মর্মর করে ভাঙলো। আলোটা নিচে ফেলতে আরেকবার আঁতকে উঠলো। একটা মানুষের কঙ্কাল পড়ে আছে মাটিতে ! পুরোপুরি কঙ্কাল না অবশ্য, এখনো পোশাক আর চামড়ার আভাস লেগে আছে গায়ে। অনেকটা মমির মতো শুকিয়ে গেছে বডিটা। রিয়াদ হঠাৎ করে খেয়াল করলো এতকিছু ঘটে যাচ্ছে, অথচ আশেপাশে মানুষের কোন সাড়া-শব্দই নেই। আলোটা চারপাশে ফেলল এবং খুব অবাক হলো। একটা মানুষও নাই ! গোটা কামরা ফাঁকা। কই গেল সবাই? রিয়াদ আলোটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আরও সামনে এগিয়ে গেল। এত মানুষ, এত বাক্স-পেটরা… কিচ্ছু নেই। সব কেমন যেন ম্যাজিকের মতো হারিয়ে গেছে। কিছু সিটে অমন মমি হয়ে যাওয়া আর কিছু কঙ্কাল খুঁজে পেলো। সব মিলিয়ে চারটা। কারা এরা ? রিয়াদ বগির একেবারে সামনে চলে এলো। দরজা খোলার চেষ্টা করলো, খুললো না। দরজার সাথে লাগানো কাঁচ দিয়ে সামনের অংশ দেখার চেষ্টা করলো। কিছু নেই। এই সিঙ্গেল একটা বগি, ইঞ্জিন ছাড়াই অলৌকিক কোন একটা উপায় কোন এক শূন্যলোকের মধ্য দিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে। রিয়াদ একটা সিটে ধপ করে বসে পড়লো। তারপর হঠাৎ করে বুঝে ফেলল পুরো ঘটনাটা কি। ওর সিটের উপর পড়ে থাকা এই অর্ধেক দেহটা হচ্ছে সেই মেয়েটার দেহ যে তার পুরো দেহটা নিয়ে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। আর মমি হওয়া কঙ্কালগুলো আসলে ওই হতভাগা মানুষগুলো যারা বছরের এই নির্দিষ্ট দিনটাতে এই সিটের যাত্রী ছিলো। রিয়াদের মতো ওরাও রাতের আড়ালে এই অভিশপ্ত সিটের খপ্পরে পড়ে যায়। পালানোর উপায় না পেয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় এখানেই আস্তে আস্তে শুকিয়ে মরে গেছে। এবং খুব সম্ভবত রিয়াদের পরিণতিও হতে যাচ্ছে এমনটাই। মেয়েটা যেমন নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি তেমনি ভাবে রিয়াদকেও নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে দেবে না মেয়েটার আত্মা !
রিয়াদ আত্ম চিন্তায় মগ্ন হয়ে ছিলো, এমনই সময় এক ভয়ানক চিৎকারে ট্রেনের বগিটা কেঁপে গেলো। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। দরজার বাইরে কি যেন একটা আছে। চিৎকার করছে আর ক্রমাগত দরজা থাবা দিচ্ছে। আলোটা ফেলে ভালোমতো দেখার আগেই সেটা সরে গেলো। কিন্তু ছায়ামূর্তিটা যে একটা নারীর, তাতে সন্দেহ নেই। আর সেটার দৈর্ঘ্য কোমর অবধি। কোমরের নিচ দিয়ে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে ঝুলছে। এবার সেটা ট্রেনের একটা জানালায় উদয় হলো। আবারো থাবা দিয়ে চিৎকার করলো। এরপর প্রত্যেকটা জানালায় এভাবে চিৎকার করতে করতে পুরো বগিটা ঘিরে চক্কর মারা শুরু করলো। অবয়বটার চিৎকারে ট্রেনের ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। কি চায় এটা? ব্যাপারটা বুঝে ফেলতে রিয়াদের খুব বেশি সময় লাগলো না। দৌড়ে চলে গেলো নিজের সিটের কাছে। সেই দ্বিখন্ডিত নিম্নাংশটা এখনো সেখানেই আছে। রিয়াদ ওর সিটের পাশের জানালাটা খোলার চেষ্টা করলো। এখনো শক্ত হয়ে আটকে আছে। কিন্তু ওকে যে এটা খুলতেই হবে। কারণ এই পুরো ঘটনা শুরু হবার মূল কারণ হলো মেয়েটার দেহের দুই খন্ড এক হয়নি কখনো। তাই তার আত্মাটাও শান্তি পায়নি। ট্রেনের বাইরের হারিয়ে যাওয়া দেহের উর্ধ্বাংশটা এখন পুরো দেহটা ফিরে চায়। আর এই জন্যই প্রতিবছর এই সিট থেকে সে একজন মানুষকে উধাও করে দেয়। রিয়াদকে এখন ফিরিয়ে দেবার সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। নতুবা মুক্তি নেই।
জানালাটা অনেক শক্ত হয়ে আটকে ছিলো, সহজে উঠছিল না। প্রাণপণ চেষ্টায় একটু একটু করে উপরে উঠছে। এরইমধ্যে চিৎকারের শব্দে কামরার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। সর্বশক্তি দিয়ে এক হ্যাঁচকা টানে পাল্লাটা উপরে উঠিয়ে ফেললো। ব্যাস, দেরি না করে মেয়েটার দেহের নিম্নাংশটা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। সাথে সাথে চিৎকার-এর পরিমাণ বেড়ে গেলো এবং ট্রেনের গতি বৃদ্ধি হওয়া শুরু হলো। আরো কিছু কাজ বাকি। রিয়াদ দৌড়ে গিয়ে মমি হয়ে যাওয়া কঙ্কালগুলো সব নিয়ে এলো। একে একে সবগুলো জানালা দিয়ে ফেলে দিয়ে কামরাটাকে সকল অশুভ শক্তি ও পিছুটান থেকে মুক্ত করলো। এর মধ্যে চিৎকার থেমে গেছে। কিন্তু ট্রেনের গতি হু হু করে বেড়েই চলছে। গতি এতই বেশি যে রিয়াদের মাথা ঘুরতে লাগলো। সে ধপ করে নিজের সিটে বসে পড়তেই জ্ঞান হারালো।
চোখে সূর্যের আলো পড়তেই রিয়াদ চোখ খুললো। সকাল হয়ে গেছে। ট্রেনটা থেমে আছে, সবাই স্টেশনে নামছে। সামনে তাকাতে ক্যান্টিন বয়টাকে দেখতে পেলো। ছেলেটা অবিশ্বাস ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রিয়াদ সেদিকে তাকিয়ে বলল, “কি, হারিয়ে গেলাম নাতো। ঠিকইতো জায়গামতো পৌঁছে গেলাম। এসব ভুলভাল জিনিস আর কাউকে বলো না। এই সিটে কোন সমস্যা নেই।”
ক্যান্টিন বয়টা কিছু না বলে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেলো। কিন্তু আসলেই কি সব কিছু মিথ্যা ছিলো? একটা দুঃস্বপ্ন ছিলো? রিয়াদ জানালার দিকে তাকালো। কি আশ্চর্য ! জানালাটা খোলা। সব যদি মিথ্যাই হবে তাহলে জানালাটা খুললো কিভাবে?
পরিশিষ্টঃ একদিন পরের কথা। নিউজ পোর্টালে ছোট্ট করে একটা নিউজ বের হয়েছে। সেখানে লেখা দেশের উত্তর সীমানার এক অখ্যাত রেলস্টেশনের পাশের ইলেকট্রিক পোলে এক ব্যক্তির দ্বিখন্ডিত লাশ ঝুলতে দেখা গেছে। এলাকার মানুষজন থেকে জানা গেছে যে উক্ত ব্যক্তি চোর এবং ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিত ছিল ওই এলাকায়।

-অরণ্য আবির, চিত্রকর ও লেখক

