আজ বিশ্ব যখন কোভিড–১৯ মহামারীতে নিপতিত তখন গেল শতকের “স্প্যানিশ ফ্লো”র ভয়াল আতংকের স্মৃতি ভেসে আসে। অনেক বিখ্যাত নেতারাই আক্রান্ত হয়েছিলেন। বৃটেনের রাজা ৫ম জর্জ ও তার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ। স্পেনের রাজা ১৩দশ আলফান্সো ও তার কয়েক মন্ত্রী। জার্মানের কাইজার ২য় উইলহেলম। ইথিওপিয়ার রাজা হাইলে সাইলাসী সহ আরও অনেকই । অনেক কষ্টে তাঁরা সেরে উঠেছিলেন । তখন বিশ্বে প্রায় ২০–৫০মি. মানুষ মারা যায়। ১ম মহাযুদ্ধেও নাকি এত মানুষ মারা যায় নি ।
এ মহামারী ধ্বংসস্তূপের উপর হয়ত আমাদের সমাজে দেশে আরও ভাল, মজবুত, আধুনিক নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। আবার অবস্থা খারাপের দিকেও যেতে পারে। রাজনৈতিক অর্থনীতিক কর্মকাণ্ডের ধরন-চরিত্রের উপর তা নির্ভরশীল। বৈশ্বিক সরবরাহ লাইন, মজুরী (আয়) ও উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল। তার উপরেও নির্ভর করে বিশেষ আর্থিক কারনগুলোর উপর, যা সরাসরি পরিবেশ বিনাশ ও শ্রমজীবী মানুষের মানসিক + শারীরিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী ।
যে ব্যাপ্তি ও গতিতে এখনকার করোনা অতিমারী দেশে দেশে বাড়ছে, তা প্রাতিষ্ঠানিক কায়েমী নেতৃত্বের সামনে এক কঠোর ও জটিল চ্যালেঞ্জ। এটা বুঝতে সমস্যা নয় যে, কেন দেশে দেশে বর্তমান নেতৃত্ব যথাসময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে ও সততার সাথে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশ করতে ব্যর্থ ছিলেন। অন্য দিকে এটাও বোধগম্য যে, এ অভূতপূর্ব ভয়াল পরিস্থিতিতে কেহই ধারনাগত ও বস্তুগত দিক হতে শুরুর আগেই প্রস্তুত ছিলেন না, বা ইঙ্গিত পেয়েও প্রস্তুত হবার তাড়া বোধ করেন নি ।
তবে স্থানীয় নেতৃত্ব বা অন্যান্য কয়েক নেতৃত্ব ব্যতিক্রমীও আছেন। তাদের দর্শন ও ব্যাক্তিত্ব আলাদা।
যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ জনপ্রিয় খেলা NBA-এর কমিশনার এডাম সিলভার গত ১১ মার্চেই সারা দেশের এ সিজনের খেলা বন্ধ করেছিলেন। কাকতালীয় ভাবে পরে ঐ একই দিনই ‘WHO’-ও অফিসিয়ালী করোনার আগ্রাসনকে ‘মহামারী’ হিসাবে ঘোষণা করে। প্রসঙ্গত: NBA-এর অনুসরণে পরপরই আমেরিকার অন্যান্য জাতীয় খেলা ও প্রতিযোগিতাগুলু, যেমন- NHL, MLB, বোস্টন ম্যারাথন, NCAA’s ‘মার্চ ম্যাডন্যাস” ইত্যাদিও আপাতত স্থগিত করা হয়। তবে তখনো ট্রাম্প প্রশাসনের টনক নড়ে নি। ট্রাম্প বলেছেন, এ সব ‘মিডিয়ার আতঙ্ক বেলুন’, ‘ডেমো’দের ষড়যন্ত্র, ‘চায়না ভাইরাস’ ‘ওবামা কেয়ার’(স্বাস্থ্য পূর্ণগঠন করব) ইত্যাদি। উনার কাছে জীবনের চেয়ে ব্যবসাই বড় ছিল বা আছে ।
দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও মানবিকতার অভাব কোন নেতৃত্ব যে সাধারণ নাগরিকদের কতটুকু আতংকগ্রস্থ ও জনস্বাস্থ্য / জনজীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে – এ সবই তার যথেষ্ট নমুনা ।
যখন জীবন-ঘাতী বিপদ যতই প্রচ্ছন্ন হয়, বিভিন্ন দেশের নেতা ও তার প্রশাসনের হাতে তখন আর তেমন কোন সময়ই অবশিষ্ট থাকে নি । আতঙ্ক ও বিপদ সামলাতে মাঠে নামার বিলম্বের কারনে, পরিস্থিতি নাগালের বাহিরেই চলে যায় অনেকটা। হাতে গুনা কয়েকটা দেশের প্রশাসন বাদে, অন্যান্য দেশে এ মহাসঙ্কটে সামগ্রিক পরিস্থিতি এমনই দ্রুত অবনতি হয়ে চলেছে।
ব্যতিক্রম ছিল, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিসেস জেসিন্দা তার দেশে করোনা প্রাদুর্ভাব প্রাথমিক শুরুর প্রারম্ভেই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, এর বিস্তার রোধে। স্বাস্থ্য, জন-নিরাপত্তা সহ সকল বিভাগগুলো একসাথে সমন্বয় করে চার স্তরের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ব্যুহ্য গড়েন। মারীর বিস্তার রোধে অনেকটাই সফল হন। এক পর্যায়ে তার প্রশাসনের কার্যক্রম সফল হয় বলেই দেশটির প্রায় ৮০% নাগরিক এক জাতীয় জরীপে তার প্রতি নিঃসঙ্কোচ সমর্থন জ্ঞাপন করে।
NBA-এর কমিশনার সিলভার ও নিউজিল্যান্ডের জেসিন্দা প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের সফলতার পেছনে কি ছিল গুপ্ত শক্তি? উভয়ই মহাবিপদকে অনেক দূর থাকেই আগেভাগেই মানবিক চেতনা ও প্রজ্ঞার সাহায্যে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। সাহসী, স্পষ্ট,সুনির্দিষ্ট ও বহুধার মাঝেও সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যার যার দায়িত্বের চৌহদ্দিতে। সময়ের আগেই সততার সাথে, পূর্ণ ও অবিকৃত যাবতীয় তথ্যাদি সর্বস্তরের নাগরিকদের প্রকাশ করেছিলেন। সাধারণ জনগণ তাদের সাথে একাত্ম হয়ে উনাদের নেতৃত্ব অনুসরণ করেছিল। এ শ্রেনীর নেতৃত্বের প্যাটার্ন ও প্যাশন আজ বিশ্বে নন্দিত ।
তা হলে কি বলা যায়, এই করোনা দুর্যোগ দেশে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কায়েমী নেতৃত্বের এক প্রখর পরীক্ষার কাল ?
নেতৃত্ব কি শুধুই ‘প্রধানমন্ত্রী’ বা ‘ প্রেসিডেন্ট’ পদবীর হাতে? হয়ত সব সময় তা নয় । আমারা দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মেডিকেল অফিসার ডাঃ এন্থনী ফউচী, নিউইয়র্ক গভর্নর এন্দ্রু কউমু, বা ধরেন সেই সাহসী ক্ষুদ্র নার্সটি ( মাউন্ট সাইনাই ওয়েস্ট) যিনি ক্যামেরায় চিৎকার করে দাবী করেছিলেন- আরও বেশী বেশী চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়াবার জন্য। তাঁরা সকলেই তাদের নিজ নিজ প্রাতিষ্ঠানিক পদবীর বলয়ের অনেক বাহিরে এসে তৃণমূল নাগরিকদের সাহস ও নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন/ দিয়ে যাচ্ছেন। জনগণ এদের নেতৃত্বে ভরসা আস্থা নির্ভর সাহস পাচ্ছে। তাদের সাহসী ও সৎ নেতৃত্বের দ্যুতি স্থানীয় পর্যায় হতে বরং জাতীয় পর্যায়েও মনোযোগ লাভ করেছে।
তাই, প্রাতিষ্ঠানিক ‘পদবী’ আর আস্থাভাজন গন-সমর্থন প্রসূত “নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা (নেতৃত্ব) “ – দুটা ভিন্ন জিনিষ ।
অনেকের কাছেই এটা দৃশ্যমান যে, সনাতনী প্রাতিষ্ঠানিক / প্রশাসনিক নেতৃত্ব কাঠামো – যা উপর হতে অধোগামী আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এককেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত ‘আদেশ’ রূপে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া – ইদানীং তা প্রায়শই ভোঁতা বা অকেজো বলেই যেন অনেকটা উপলব্ধ ।
১৯১৮তে ‘স্প্যানিশ ফ্লো’ সময় প্রেসিডেন্ট এদ্রু উইলসন হোয়াট হাউসে। তখন বলা হয়েছিল, তা পাখী হতে মানুষে সংক্রমণ করেছিল। তখন প্রেসিডেন্টের মেয়ে (মারগারেত), প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারি, নিরাপত্তা করতাগণ বেশ কয়েক জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৯১৯ এপ্রিলে উইলসন গিয়েছিলেন প্যারিস ১ম মহাযুদ্ধ ফরমালি সমাপ্তির জন্য, শান্তি আলোচনার জন্য। সেখানেই তিনি সর্দি জ্বর ব্যাথায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে সুস্থও হয়েছিলেন। যখন ঐ ফ্লো শেষ হয় আমেরিকায় মোট ৬৭৫,০০০ নাগরিক মারা যায়। তখনো আমেরিকার স্বাস্থ্য বিভাগ শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। তখন হয়ত দৃশ্যমান শত্রুর বিরুদ্ধে কনভেনশনাল ওয়ারের প্রস্তুতি ছিল, ‘অদৃশ্য শত্রুর’ বিরুধে ততটা নয়।
তবে, এর পর বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানে, বায়োটেক ও ফার্মা শিল্পে নীরব বিপ্লব হয়েছে। তারপরও , আজ করোনা দুর্যোগে দেশে দেশে কে অপ্রস্তুত, তার কোন সদুত্তর নেই।
সচেতন মহলে উত্তর হল, সরকারগুলু সমর্থনে বিশ্বে সুস্থ মানুষদের অসুস্থ করার কাজ, এবং ঐসব অসুস্থদের ‘স্বাস্থ্য’কে জিম্মি করে ঔষধ গবেষণা ও বাণিজ্য প্রবনতাই – দুর্যোগ সৃষ্টি ও তা হতে উত্তরনের ব্যর্থতাই সর্ব প্রধান বাধা। এ জন্য নিতিহীন ব্যবসায়ী ও লোভী রাজনীতিকরা মিলিত ভাবে দায়ী / অপরাধী।
ট্রাম্প কিছুদিন আগে হালকা ভাবেই ক্যামেরায় বলেন, ‘এ করোনায় হয়ত এবার তার এক লাখ নাগরিকও মারা যেতে পারে। এরপর আমেরিকা আবার জেগে উঠবে।’ বিষয়টা গভীর চিন্তা করা অবশ্যই দরকার। তার প্রশাসনের কি করছে, তা বিচার বিবেচনার বিষয়। সে কি বিশ্ব মানবতাকে তার মধ্যমা আঙুল দেখাচ্ছে ? যাক, তাকে বলা হচ্ছে এখন “একগুঁয়ে স্বৈরাচার”।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ছিল / আছে । তিন দশক যাবতই বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ মহা-সমস্যায়। ট্রাম্প-বছরগুলোয় বিশেষত করোনা-কালে সে দেশটির এই নেতৃত্বের আসন নির্ঘাত কমবেশি ম্লান। প্রভাব প্রতিপত্তি কমতির দিকেই বৈ কি ! শতাব্দীর অভূতপূর্ব মহা-দুর্যোগে বিশ্বের কোন দেশই – এমন কি ক্ষুদ্রতম / দুর্বলতম দেশটিও – সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকে একবারও তাকায় নি। আটলান্টিকের ওপারের ইউরোপ তার ২য় মহাযুদ্ধ-উত্তর দীর্ঘকালের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে তেমনটা বিশ্বাস করে না। সোজা ভাষায়। ইদানীং, প্রায় শত বছরের ইতিহাসে ট্রাম্প প্রশাসনকে মনে করা হচ্ছে নিকৃষ্টতম। ট্রাম্প চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কথা শুনে না। সর্বত্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পরে। জন-নিরাপত্তা ব্যবস্থা অবহেলিত। আরেকটা ৯/১১র জন্য প্রস্তুতি নিলেও; করোনার মত ‘অদৃশ্য শত্রু’ বিরুদ্ধে কিছুই করা হয় নি। একমাত্র ব্যবসার/মুনাফার দিকেই মনোযোগী আছে। সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা খামখেয়ালীতে রেখে, এ সময় ট্রাম্প চীন ও জার্মানের সাথে পরোক্ষ বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত।

এ সব নিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক নেতৃত্বের বলয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী মৌলিক ও স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দৃশ্যমান। তার মানে কি?
“অচিরেই বিশ্ব শৃঙ্খলার মূল খেলোয়াড় হিসেবে আমেরিকান আধিপত্যের পতন ঘটিয়ে চীনের উত্থান ঘটবে।“ – এমন ধারনাও অবশ্য রাতারাতি করা বাতুলতা মাত্র। শতাধিক বছরে গড়ে উঠা বিশ্ব নেতৃত্বের ভারসাম্যে মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ী নয়া কাঠামো দেখতে হয়ত কমপক্ষে আরও এক-দু দশক দেখতে হতে পারে। হয়ত । বিশ্বের আরেক ‘মাফিয়া প্রশাসন’ মস্কোর পুতিনও কি ভূমিকা নেন, তিনি কি অবস্থান নেন, তা-ও দ্রষ্টব্য।
উহান লক-ডাউন কাল হতেই চীনের কঠোর একনায়কবাদী নেতৃত্ব, তথ্য বিকৃত/ গোপন করা, সংকট বিশ বাকিহ্য ও নিজ প্রভাব বিস্তারের স্পৃহা ইত্যাদি নিয়ে তীব্র সমালোচিত ও সন্দেহভাজন। তথাপি, চীনের সহযোগিতার হাত ইউরোপ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাগত হয়েছে। এ বাস্তবতাও অনস্বীকার্য ।
জার্মানির নেতৃত্বের চৌকশ পরিকল্পনা ও সমন্বিত চেষ্টা জনগণের আস্থা অর্জনে সফল হয় । এবং, বাকী ইউরোপীয় মিত্রদেরও শ্রদ্ধা অর্জনে অনেকটাই সফল হয়। জার্মানের সম্মান ও প্রভাব বেশ বাড়ে। ২য় মহাযুদ্ধের পর সম্প্রতি কালে এ সব জার্মানের বিরাট অর্জন ।
করোনা দুর্যোগে বৃটেন লেজেগোবরে অবস্থায় পরেছে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কাজকর্ম , আটলান্টিকের ওপারের ট্রাম্পেরই মনস-প্রতিচ্ছবি। তাকে ২য় মহাযুদ্ধ কালের বিতর্কিত উইনস্টন চার্চিলের অনুরূপ প্রশাসক হিসাবেই মনে করা হয়। জনসন আজ ঘরে বাহিরে তীব্র সমালোচিত ও নিন্দিত । তা ছাড়া চরম দুর্গতিতে নিপতিত ইতালি, ফ্রাঞ্চ ও স্পেনে করোনার দ্রুত বিস্তারের কারনে নিজ নিজ স্বাস্থ্য-সেনাবাহিনী প্রস্তুত করতে পারে নি। অনেক ক্ষতি ও ধ্বংস সহ্য করতে হচ্ছে ।
স্বদেশী জার্মানদের সমালোচনা হল, সুযোগ / পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রশংসিত চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল এখন কেন সারা ইউরোপের নেতৃত্ব হাতে নিতে ইতস্তত করলেন।
জার্মানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পূর্ব হতেই সবল ও সুবিন্যস্ত ছিল, বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল, স্বদেশীদের তথ্য-ভিত্তিক আস্থা সমর্থন ছিল এ. মার্কেলের পেছনে। তার নেতৃত্বের বিশেষত ছিল, এ দুর্যোগে তিনি মাল্টি- ডিসিপ্লিনারী প্যানেল গঠন করেছিলেন, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, স্বাস্থ্যবিদ, রাজনীতিক, একাডেমিক, দার্শনিক, আইনবিদ, মনস্তত্ববিদ প্রমুখ । তাঁরা ফেডারেল প্রশাসনকে সাহায্য করেছিল। পাদ্রীর মেয়ে বিজ্ঞান-মনস্ক সফল চ্যান্সেলর মার্কেলের সমর্থন রেইটিং ৮০% উপর এখন। মার্কেল ২০০৮ অর্থনীতিক মহাসংকট কাল হতে শুরু করে সর্বশেষ ২০১৫এর রিফুজি সংকট কাল হয়ে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন বৈশ্বিক/জাতীয় ক্রান্তিকালে বলিষ্ঠ ও সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে আজকের এ উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বে গড়ে উঠেছেন।
ব্যতিক্রমী বাস্তবতা হল, জার্মান ও দঃ কোরিয়া । এ দু’টা দেশই মহাযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে/ সাহায্যে পুনুরুজ্জিবিত হয়েছিল। চলমান করোনা দুর্যোগে এ দু’টাই ভাল ব্যবস্থাপনা / নেতৃত্ব দিয়ে নিজ নিজ দেশ স্থিতিশীল রেখেছে । যেমন, যুক্তরাষ্ট্র ও দঃ কোরিয়া উভয়ই ২০ জানু. করোনার প্রথম প্রকাশ ধরতে পারে। কোরিয়া প্রশাসন পর সপ্তাহেই বিজ্ঞানী ও ফার্মা শিল্প মালিকদের সাথে যৌথ বৈঠক করে। আগাগোড়া পরিকল্পনা করে গন-হারে টেস্টিং কীট বানানোর জন্য। ২৬ফেব্রুয়ারী, গন-হারে সর্বত্র পরীক্ষা চলে । ৫১ মিলিয়ন লোকের দেশটিতে কয়েক সপ্তাহ আগেই সর্বশেষে মাত্র ৯০০০হাজারের কিছু বেশী করোনা কেইস সনাক্ত হয়। প্রশাসন টোটাল নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। কয়েক দিন পরই স্বাস্থ্য প্রোটোকল মেনে ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্কুল, গাড়ী ঘোড়া ইত্যাদির মত জরুরী ক্ষেত্রগুলো চালু করতে সক্ষম হয়। প্রসঙ্গত, কোরিয়া সাধারণত নামকেয়াস্তে গনতন্ত্রের কার্যত কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র।
মধ্য ইউরোপে – পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি – একটু ব্যতিক্রমী ধারায়। যেমন, হাঙ্গেরীয় প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরব্যান এই করোনা দুর্যোগ মোকাবেলা করার অজুহাতে এক ‘ডিক্রি’ জারির মাধ্যমে একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী ও অনির্দিষ্ট মেয়াদী তার ক্ষমতাকে পোক্ত করেন। তিনি তার দেশে গণতন্ত্রকে ‘অনুদার গণতন্ত্র’ বলেও উল্লেখ করেন। অনুন্নত দুর্নীতি পরায়ন প্রশাসনগুলোর ব্যর্থতা প্রতিবাদী বিরোধী কর্মী ও মিডিয়ার কণ্ঠ স্থব্ধ করতে ব্যস্ত ।
এ সব পর্যালোচনায় কয়েকটি মৌল প্রশ্ন সামনে আসে ।
** পশ্চিম ইউরোপ তথা বিশ্বের শান্তির জন্য ইদানীং মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের প্রশাসনিক মডেল কোনটাই গ্রহণীয় নয়। তা নয় কি?
** কর্তারা / নেতাদের দূরদর্শিতা ও বিপদে অতিদ্রুত কর্ম উদ্যোগ নিতে সক্ষমতা এবং আমলাতান্ত্রিক ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম’ স্থগিত করার সক্ষমতা যে কোন অকস্মাৎ দুর্যোগ মোকাবেলায় একান্ত অপরিহার্য । নয় কি ?
** বিশ্বায়ন কেবলই অল্প ক’টি ধনকুবের নেতার লৌহ-হস্তের নিগড়ে মুনাফা বর্ধন ও গুটি কয়েকের পকেটে তা বণ্টনের ব্যবস্থা নয় কি? মহা-দুর্যোগে সাধারণ নাগরিক / প্রজাদের মানবিক কল্যানে সাম্প্রতিক বিশ্বায়ন আপাতত এক অর্থে ব্যর্থ নয় কি?
** কেহ কেহ ‘গণতন্ত্র’কে মহা-দুর্যোগে অন্যতম নিয়ামক দর্শন / শাসন কাঠামো হিসাবে দেখেছেন। গেল শতকের নব্বুয়ের পর হতেই ‘গনতন্ত্র’ যে বৃহত্তর জাতীয় জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক কল্যাণকর হতে বার বার ব্যর্থ হতে কেন দেখতে হল?

কাদের চৌধুরী , কানাডা প্রবাসী লেখক এবং কবি ।

