আমেরিকা-তালেবান চুক্তি : আফগানিস্তানে শান্তির অন্বেষা

অ্যাডভোকেট আনসার খান:শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আঠারো বছরেরও অধিক সময় ধরে চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আমেরিকা ও আফগানিস্তানের তালেবান জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রতি কাতারের রাজধানী দোহায় এক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি সম্পাদনের ফলে আফগানিস্তানের চলমান দীর্ঘ মেয়াদের যুদ্ধের অবসান এবং দেশটায় শান্তি স্থাপিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, যদিও শান্তির পথ অনেক দূরে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এখনোও অনেক কারণ ও বিপত্তি রয়েছে-যা শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন ও তালেবান নেতৃত্বের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ নয়; বরং স্থায়ী শান্তি অর্জনের প্রথম এবং একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ। এ উদ্যোগের ফলে আফগানিস্তানের সরকারের সাথেই ইসলামী জঙ্গি মৌলবাদী তালেবান গোষ্ঠীর আলোচনা শুরুর পথ খোলাসা হলো মাত্র। একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, আফগানিস্তানের তালেবান গোষ্ঠীর সাথে আমেরিকান প্রশাসনের চুক্তি স্বাক্ষর হলেও আফগান সরকারের সাথে তালেবান গোষ্ঠীর কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় তালেবান ও আফগানদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হতে পারে-সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এই দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে আলোচনা শুরুর একটা পথ উন্মুক্ত হলো বলে সবাই আশাবাদী।
অবশ্য অনেক বিশ্লেষক ধারণা পোষণ করছেন, আমেরিকা ও তালেবানদের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকাল ও ন্যাটো বাহিনীর সেনা প্রত্যাহারের ফলে আফগানিস্তানে সামরিক ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে এবং এর ফলে আফগান সরকার ও তালেবান জঙ্গী গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে এবং এমনকি, দেশটায় তালেবানদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কারণ, আফগান সরকারের সামরিক বাহিনী এখনো তালেবানদের তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল।
উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আমেরিকা ও তার মিত্র শক্তি আফগানিস্তানের তখনকার তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ অভিযান শুরু করেছিলো এবং মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন সরকার উৎখাত করেছিলো; দেশটায় আমেরিকান নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। তবে এটা সত্য যে, তালেবান সরকার উৎখাত করা সম্ভব হলেও তালেবান জঙ্গিদের সমূলে উৎখাত ও ধ্বংস করা যায়নি। সেই সময় থেকে তালেবান জঙ্গিরা আমেরিকান সমর্থিত সেনা বাহিনী ও আফগানের আমেরিকান সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধ ও যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছিলো। গড়ে আঠারো বছরেরও অধিক সময় ধরে, দীর্ঘ এই সংঘাতের-যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটানো সম্ভব নয় মনে করেই আমেরিকান সরকার তালেবানদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধাবসানের উদ্যোগ নিয়ে কমপক্ষে নয় দফা আলোচনার পরে এই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে একটা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয়।
শান্তি চুক্তিতে অনেকগুলো বিষয় থাকলেও মূল ইস্যু হিসেবে চারটা বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চারটি ইস্যু হলোÑ
১। যুদ্ধ বিরতি : এই চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হবে এবং স্থায়ী যুদ্ধ বিরতি কার্যকরের উদ্দেশ্যে আফগান সরকার ও তালেবানদের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে।
২। সেনা প্রত্যাহার : আফগানিস্তানে থাকা আমেরিকান ১২,০০০ সৈন্যের মধ্যে ১৩৫ দিনের মধ্যে ৮,৬০০ সৈন্য কমিয়ে আনতে আমেরিকা ও তালেবান-উভয়পক্ষ সম্মত হয়। আর তালেবান যদি চুক্তির শর্ত পালনের অঙ্গীকার মেনে চলে, তবে পরবর্তী ১৪ মাসের মধ্যে আমেরিকা ও তার মিত্র বাহিনীর সকল সৈন্য আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নিবে আমেরিকা।
৩। আন্তঃআফগান আলোচনা : তালেবান জঙ্গিগোষ্ঠী আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের সাথে বিরোধ মীমাংসার জন্য আলোচনায় বসতে সম্মতি জ্ঞাপন করে এই চুক্তির মাধ্যমে। যদিও এতদিন আফগান সরকারকে আমেরিকার পুতুল সরকার বলে অভিহিত করে এই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা করতে অস্বীকার করেছিলো তালেবানরা। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরে তালেবানরা-এ সরকারের সাথে আলোচনার সম্ভাবনার কথা স্বীকার করেছে। এ প্রসঙ্গে তালেবানের সহ নেতা সিরাজ উদ্দিন হাক্কানি নিউইয়র্ক টাইমসের অপ-এতে লিখেছেন-‘আমরা যদি কোনো বিদেশী শত্রুর সাথে চুক্তিতে পৌঁছাতে পারি-তবে আমরা অবশ্যই আন্তঃআফগান মতবিরোধ সমাধান করতে সক্ষম হবো আলোচনার মাধ্যমে।
৪। সন্ত্রাস বিরোধী আশ্বাস : সন্ত্রাস বন্ধের লক্ষ্যে আমেরিকা ও তার মিত্র বাহিনী আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলো; আমেরিকার লক্ষ্য আল-কায়েদা এবং স্ব-ঘোষিত ইসলামিক স্টেটসহ দেশে সকল সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড বন্ধ করা এবং স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী-তালেবানরা এই নিশ্চয়তা প্রদান করেছে যে, তার দলের সদস্য, অন্য ব্যক্তি বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা আফগানিস্তানে আমেরিকান ও এর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করবে না বা অন্য কোনো সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ডের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করবে না।
এই চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে যে, আফগান সরকারের কারাগারে থাকা ৫,০০০ তালেবান জঙ্গিদের মুক্তি দেবে আফগান সরকার; পক্ষান্তরে তালেবানদের জিম্মায় থাকা ১,০০০ আফগান সেনাকে মুক্তি দেবে তালেবান গোষ্ঠী। তবে, আফগান সরকারের কারাগারে থাকা বন্দীদের মুক্তির বিষয়ে আফগান সরকার বলেছে, তারা এ ধরনের পদক্ষেপের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
শুধু বন্দী বিনিময়ের প্রশ্নেই নয়, শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পথে রয়েছে আরো অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ। যেমন-আফগান-তালেবানদের মধ্যে রাষ্ট্র ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্ন রয়েছে, আছে তালেবান জঙ্গীদের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়, তালেবান যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের বিষয়টা কীভাবে সমাধান করা হবে-সেটা বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে, তালেবানরা আফগান সরকার ও আফগান সংবিধান মেনে চলবে কি-না, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমেত মহিলাদের অধিকারের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতি দেবে কিনা তা নিয়ে বেশ সংশয়-সন্দেহ দেখা দিয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। পক্ষান্তরে-দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যত নির্ধারণেও আফগান ও তালেবানদের মধ্যে মতান্তর ও মতানৈক্য তীব্র হওয়ার শংকা রয়েছে।
তালেবানদের ব্যাপক শক্তি-সামর্থতার প্রতি ইঙ্গিত করেই বিশেষজ্ঞরা আফগান-তালেবান জঙ্গিদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন। কেননা, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তালেবানরা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। আনুমানিক ষাট হাজার যোদ্ধাসহ দেশজুড়ে অনেক ভূমি ও জেলা নিয়ন্ত্রণ করছে তালেবান। আফিম পোস্ত চাষ এবং অবৈধ মাদক ব্যবসা করে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার আয় করছে তালেবানরাÑশান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হলে এ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বিধায় শান্তি প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে তালেবানদের পক্ষ থেকে। তাই, কিছু কিছু বিশ্লেষকও আশংকা করছেন যে, র‌্যাক্ট এন্ড ফাইল তালেবান যোদ্ধারা কোনোও শান্তি চুক্তি মেনে চলবে না।
অন্যদিকে, আফগান সরকারী কর্মকর্তাদের মতে, বিশটারও অধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছে এবং তাদের দিক থেকেও শান্তিচুক্তি হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। এছাড়া পাকিস্তানসহ আফগান সীমান্তের দেশগুলো-যারা তালেবান নেতৃত্বের হোমবেস হিসেবে আছে-তারা আলোচনা থেকে বঞ্চিত বোধ করতে পারে এবং তাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিগোষ্ঠীকে শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করতে পারে।
তবে শান্তি প্রক্রিয়ার সফলতা নিহিত আছে আন্তঃআফগান আলোচনার মধ্যে, মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আফগান-তালেবান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১০ মার্চ থেকে আন্তঃআফগান আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে-তবে আলোচনার নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা নেই। তালেবানরা যদিও এ আলোচনায় অংশ নেয়-তবে এটা হবে আফগান সরকারের প্রতি তালেবানদের এক ধরনের স্বীকৃতি। কারণ-তালেবানরা হরহামেশাই বলে আসছে আফগান সরকার বিদেশীদের পোষ্য পুতুল সরকার, এ সরকারের কোনো গুরুত্ব তালেবানদের নিকট নেই। তাই এখন আফগান সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে তালেবানদের আন্তঃআফগান আলোচনায় অংশ নেওয়াটা হবে তাৎপর্যপূর্ণ-যার প্রভাব পড়বে শান্তি প্রক্রিয়ায়। তাই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আসল চ্যালেঞ্জ আন্তঃআফগান আলোচনার মধ্যে রয়েছে, এটাই বাস্তবতা বলা যায়।
এদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছে। ‘কোনোও চুক্তি নিখুঁত নয় এবং আমেরিকা ও তালেবান চুক্তিও এর ব্যতিক্রম নয়’-বলেন ক্রাইসিস গ্রুপের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী রবার্ট ম্যালি।’ তবে এ চুক্তি দুই দশক ধরে চলমান একটা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সবচেয়ে আশাবাদী পদক্ষেপের প্রতিনিধিত্ব করে-বলছেন ম্যালি।
‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা এই যে, ২৯ ফেব্রুয়ারির আমেরিকা ও তালেবানদের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তা কোনোও শান্তি চুক্তি নয়,-পরিবর্তে এটা আফগান শান্তি প্রক্রিয়ার পূর্ববর্তী পর্বের ফলাফল-এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য তালেবানদেরকে আফগান সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে এক টেবিলে নিয়ে আসা দরকার ছিলো,’-বলেছেন ক্রাইসিস গ্রুপের আফগানিস্তানের সিনিয়র বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু ওয়াটকিনস।
‘আমেরিকান-তালেবান চুক্তিকে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ অবসানের জন্য একটা সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে সে লক্ষ্যে অনেক কাজ বাকী রয়েছে’-বলেন ওয়াটকিনস।
শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরকে তালেবানরা একটা বিজয় হিসেবে দেখছে, তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন যে, আফগান সরকারসহ সব পক্ষই আপোষ করেছে। ‘শান্তি নিখরচায় আসে না। এ ধরনের কোনোও চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য সকল পক্ষকেই কিছু না কিছু ছাড় দিয়ে আপোষ করতে হয়-এ চুক্তির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে’-বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে-শান্তিকামী মানুষেরা একটা স্থায়ী শান্তি প্রত্যাশা করছে এবং এই শান্তি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে শান্তির পথ অন্বেষার পথ ও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, এটাই আগার বিষয়। আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও তাই বলেছেন,-‘চুক্তিটার অর্থ হবে না-এবং আজকের ভালো অনুভূতি স্থায়ী হবে না-যদি আমরা বিবৃত প্রতিশ্রুতিগুলোর বিষয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ না করি।’ সন্দেহ-সংশয় ও দ্বিধা থাকা সত্বেও সকল পক্ষ চুক্তি মেনে চলবে, এমনটাই আশাবাদী বিশ্ববাসী। চুক্তি মানার মধ্যেই শান্তি নিহিত।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.