বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী, চারটি গুণের একটিতে ঘৃণা

মুক্তিযোদ্ধা- শব্দটি যত সহজভাবে উচ্চারণ করা যায়, কর্মটি নিশ্চয়ই তত সহজ ছিলো না। মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি এমন একটি মাদলী ( ক্ষুদ্র কবচ বিশেষ, মাদুলি) যা সবার ভাগ্যেও জুটে না। এই কবচটির যে কি মর্ম বা সম্মান সেটার প্রমাণ আমাদের স্বাধীন দেশ। এই মাদুলিই আমাদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের কবচ। ভাবুন তো লক্ষ লক্ষ তরুণ/বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সাথে সেই সময়ে কিন্তু লক্ষ লক্ষ তরুণ/বৃদ্ধ ছিলেন , যারা এই কবচ পড়তে পারেন নি। ইতিহাস তার নির্মম সাক্ষী । বারবার বলি , শতবার বলি, এই রক্ষা কবচ সেদিন যে কৃষক/শ্রমিক/মেহনতি মানুষ সহ আপামর জনসাধারণ  গ্রহণ করেছিলো, তাদের কল্যাণেই আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশ এবং সবকিছুর জন্য তাদের কাছেই কৃতজ্ঞ চিরজীবন থাকতে হবেই । 

মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে  সময় সুযোগ হলেই নত মাথায়  দুকলম কিছু লিখি, আজও সেই প্রয়াশ আছে। তবে আজকে এমন একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা বলছি বা লিখছি, সেটার একটি বিশেষত্ব অবশ্যই আছে। সেখানেই থাকার চেষ্টা থাকবে, আর তিনি সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী ।

কে না এক নামে চেনেন, এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী কে ? উনাকে নানান নামে মানুষ ডাকে। সেই বিশেষণে যাচ্ছি না, কারণ উনার মুক্তিযোদ্ধা বিশেষণটি কোনো ভাবেই হাল্কা হোক আমার লেখায় , সেটা আমার কাম্য নয়। আমি উনার চারটি বিশেষণের কথা বলার চেষ্টা করবো, নিজস্ব ক্ষুদ্র জ্ঞাণে ও ক্ষুদ্র করে।

১)  তরুণ বয়সে তিনি এই দেশমাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে হাটে-ঘাটে, মাঠে-ময়দানে, খেয়ে-না খেয়ে, অস্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন এবং এই দেশ স্বাধীন করেছিলেন। এই বিশেষায়িত বিশেষণটির উনি সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী, বিনা প্রশ্নে এবং নিশ্চয়ই এই মাটি উনাকে সেটা দিবে।  নত মাথায় সম্মান জানাই মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারীকে। আবার বলি , মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারীকে।

২) বিশাল কৃতিত্বের অধিকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা একজন  আদর্শবাদী আওয়ামী লীগার। একটি আদর্শে বিশ্বাসী থেকে, সেই রাজনৈতিক দলের আদর্শ বুকে ধারণ করেই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন । আমার জানা মতে ( ভিন্ন কিছু থাকলে কেউ লিখবেন নিশ্চয়ই) আজীবন তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ছিলেন, আছেন এবং নিশ্চয়ই থাকবেন বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এই দলের আদর্শ নিয়েই চারবারের সাংসদ ছিলেন। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হয়েও দল ত্যাগ করেননি এবং ভিন্ন কোনো দলের সাথেও সখ্যতা গড়ে তুলেননি। মত বদলানোর কোনো চিহ্ন উনার মাঝে দেখা যায় নি। ভুল-শুদ্ধ/ভালো-মন্দ সব হিসেব বাদ দিয়েও বলা যায়, একটি আদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে , সেই দলেই আবার ফিরে এসেছেন উপদেষ্টা হয়ে। কি উপদেশ দিবেন? সেই প্রশ্নে যাচ্ছি না, কেননা সেটা বৃহত্তর পরিসরের আলোচনা । এমন একজন একনিষ্ঠ দলের কর্মী/নেতা হওয়া বা থাকা আমাদের দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের বিচারে , বলতেই হয়, অসামান্য মহত্বীর্য্যে। এমন নিষ্ঠাবান চরিত্রের নিকটও নত মাথায় সম্মান জানাই । কর্মী/নেতা যাই হও, এই কঠিন আদর্শের চারিত্রিক দিকটি নিশ্চয়ই পুণ্যের যোগ্য । এই চরিত্র কে টুপি খুলে সম্মান ।

৩)  একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তার এই বিশাল খেতাবের পাশে সন্ত্রাসী খেতাব কতটুকুন মাননসই? সেই প্রশ্নের বিচারে যাচ্ছি না। সেটা সাধারণ জনগণের হাতেই থাকুক কিংবা জয়নাল হাজারী নিজেই দিক। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যারা জীবন বাজি রেখে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে থেকেই  আবার অনেকেই এই স্বাধীন দেশে নানান জটিলতার সৃষ্টি করেছেন। সেটা দলমত নির্বিশেষে অনেক অনেক মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে জড়িত । সদ্য স্বাধীন দেশে তাদের নিজেদের মধ্যে মতভেদ আর নিম্ন স্বার্থপরতার কারণে অথবা বলতেই হয় , মুক্তিযুদ্ধের সঠিক মূল্যায়ন ( যা তাদের অবদান) উনারা নিজেরাই সঠিকায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলাফল সেই মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝ থেকে অনেকেই দূর্ণীতি, সন্ত্রাস আর খুন-খারাপির  সাথে একনিষ্ঠভাবে জড়িয়েছেন। যা সত্যি এই স্বাধীন দেশের সবচাইতে মর্মান্তিক লজ্জার বিষয় । সেই মর্মান্তিক কাহিনীর একজন বা একটি চরিত্র অপ্রত্যাশিতভাবে হলেও সত যে , তিনি জয়নাল হাজারী! উনার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিষয় আমার আজকের লেখার বিষয় মোটেও নয়। উনার নিজ হাতে গড়া স্টিয়ারিং কমিটি/ ক্লাশ কমিটি এগুলো নোয়াখালী জেলার, বিশেষ করে ফেনির জনপথের  জনগণকে নিশ্চয়ই আজও স্বপ্ন থেকে জাগিয়ে তুলে। তাই সে বিষয়ে যাচ্ছি না। আমার বলার বিষয়, দুঃখিত বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী আপনার এই বিষয়ে নত মাথায় কিছু বলতে পারলাম না বলে। আপনার যেমন দৃঢ় উঁচু মাথা আছে বা থাকে অনেক গুণে, আমরা সাধারণ বা অতি সাধারণ জনগণও কিছু বিষয়ে উঁচু মাথা রাখার চেষ্টা করে থাকি।  তাই সর্বদাই উঁচু মাথায় বরাবরের মতই প্রতিবাদের কলম চালিয়ে যাবো।

৪) বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারীর শেষ গুণটির কথা বলেই শেষ করবো। উনার নিশ্চয়ই এই চারটি গুণ ছাড়াও হাজারো ভালো/মন্দ গুণ আছে, যা আমরা জানি না। তবে উনার প্রেমের গুণটি সত্যি সত্যি আমাকে মহিমান্বিত করেছে। আমার বয়স যদি এখন তারুণ্যের অনুকূলে থাকতো, তাহলে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহা প্রেমিকের ছবি নিশ্চিত আমার শোবার ঘরের মাথার উপর রাখতাম। উনার প্রেমের বিষয়টি সবার নিশ্চয়ই জানা আছে। শুধুমাত্র উনার এই   মহা প্রেমিকের চরিত্রকে সত্যি সম্মান জানাতেই , উনার প্রেম কাহিনী নিয়ে বিশেষ কিছু লিখবো না।যারা জানেন না , তাদের জন্য ছোট্ট করে বলি। উনি কলেজ জীবনেই ( ফেনি কলেজ)  বিজু নামের একজন মেয়ের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। কলেজ জীবনে বিজু মেয়েটি গানের শিল্পী ছিলেন আর জয়নাল হাজারীর ছিলো গানের কথা, যা কিনা গীতিনকসা বলা হয়। সেই সূত্রেই ওনাদের প্রেম ভালোবাসা ।  জয়নাল হাজারী যুদ্ধে চলে যাবার পরেই সব উলোট পালট হয়ে যায় । যুদ্ধ শেষে এসে দেখেন কোনো এক রাজাকার বিজুকে জোর করেই বিয়ে করেন। যুদ্ধের পূর্বে তাদের ওয়াদা ছিলো একে অপরকে ছাড়া কেউ অন্যকে বিয়ে করবেন না । তারপরে অনেক কাহিনী । মনে পরে , পরবর্তীতে জয়নাল হাজারী ঢাকার আকাশে হাজারে হাজারে বড় বড় বেলুন উড়িয়ে দিয়ে বিজুর বিচার চেয়েছিলেন। বিচারটি চেয়েছিলেন, বিজু ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন , তার বিচার । বলা যায়,  খোলা আকাশের নিকট একজন ব্যথিত প্রেমিকের বিচার চাওয়া । আদালতে বিচার চান নি। প্রেমিক হারানোর বেদনা তিনি চিরজীবন মন থেকে সড়াতে পারেন নি। আবার সেই সময়ে তার এত শক্তিশালী ক্যাডার গ্রুপ থাকা স্বতেও কখনোই বিজুর প্রতি কোনো অমানবিক বা অমানুষিক অত্যাচার/অনাচারের চর্চা করেন নি। সেই ব্যথায় ব্যথিত হয়েও তিনি তার ওয়াদা ভঙ্গ করেন নি। তিনি অন্য কাউকেই বিয়ে করেন নি। তিনি এখন অব্দি চিরকুমার আছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী আপনার মত এমন প্রেমিকের নিকট থেকে আমাদের তরুণ সমাজের নিশ্চয়ই অনেক অনেক শেখার আছে। পত্র পত্রিকায় প্রায়শই দেখতে পাই, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কি কি অঘটন ঘটিয়ে যাচ্ছে। যারা সত্যিকারের প্রেমিক তারা কখনোই প্রেমে ব্যর্থ হলেই প্রেমিককে আঘাত করতে পারে না এবং নিজের সাথেও ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে না। আপনি সত্যি প্রেমিক/প্রেমিকাদের জন্য একজন সর্ব উৎকৃষ্ট ও সর্ব শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ।

লেখার শেষে বলি , ( যদি ভুল না করি) জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, প্রেমিকের সুধা পেলেই সব শেষ, প্রেম আর  প্রেমে থাকে না। তাই প্রেম চিরজীবী হয় বিনি শুধায়। আবার রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, প্রেমিকার সুধা গ্রহণেই হতে পারে প্রেমের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো। তবেই প্রেম স্বার্থক হয়।

তবে জয়নাল হাজারী বলেন, পুরুষেরা ভঙ্গপ্রেমে অবিবাহিত থাকেন ( বেশিরভাগ) , মেয়েরা নাকি অবিবাহিত থাকেন না । কঠিন সত্য বা কঠিন অসত্য সেটার বিবেচনা করার দায়িত্ব প্রেমিক পুরুষদের উপর ছেড়ে দিলাম। বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী , আপনার এমন প্রেমের নিদর্শনের জন্য, আপনাকে, স্যালুট ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.