নুসরাত মামলার রায় হয়ে গেছে, সামনে এখন কার্যকারিতা দেখার অপেক্ষায় থাকবে জনগণ । এই রায় নিয়ে নানান দিক থেকেই হাজারো কথা চলছে এবং চলবে এটাই স্বাভাবিক বটে।
প্রথমেই রাজনৈতিক দলগুলো কথা বলি। ক্ষমতায় থাকা দলের সাথে বিরোধী দলগুলো কথার ফারাক থাকবে সেটাও স্বাভাবিক । কেননা সব রাজনৈতিক দলই, সব সময় সব কিছু থেকেই জনগণের আবেগগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মত করে ফায়দা লুটতে চেষ্টায় থাকেন। বিশেষ করে যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের চোখে নিজেদের কর্ম সবই ভালো। কালেভদ্রে কিছু কিছু বিষয়ে অস্বাভাবিকতার কথা স্বীকার করলেও, অতীতের নানান উদাহরণ টেনে এনে সেটাকে যায়েজ করার একটা চর্চাতো থাকেই !
এই রাজনৈতিক চর্চা কতটা ভালো বা খারাপ? সে আলোচনা করাও মুশকিল, কেননা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পক্ষে কোনো না কোনো যুক্তি খুঁজে পাবেনই! উনারাই মহান , উনারাই সত্য, বিরোধী দল কি ভাবলো বা জনগণ কতটুকু আমলে নিলো, সেটা কেন জানি উনাদের হিসেবে নেওয়ার তাগিদ থাকে না। বর্তমানের বিরোধী দলকে না হয় বাদই দিলাম, আশ্চর্যের বিষয় হলো জনগণকেও তোয়াক্কা করেন না বা প্রয়োজন ভাবেন না। অবশ্য কেন এমন ভাবনা, সেটা মনে হয় বেশ পরিষ্কার । কেননা , রাষ্ট্রের পুলিশ যখন খোলাখুলি বলার সাহস পায়, আমরাই রাজা বা আমরাই সরকারকে ক্ষমতায় এনেছি ! তাহলে আর জনগণকে গোনার কি বা প্রয়োজন থাকে। তবে একথাও মহাভারতের মত সত্য, ( কবিতার ভাষায় বলি)
” দিনে দিনে দিন ফুরিয়ে যায়
ওলির দেখা মিলে না বেলায়!
ফিরে আসে বারেবারে,
মরমী বাণী!
জনগণই রাজা, জনগণই রানী “।
বর্তমান সরকার কিছুটা হলেও দূর্ণীতির বিরুদ্ধে এগোনোর চেষ্টা করছে। যদিও স্পষ্ট যে, দূর্ণীতির মধ্যেস্তকারী যারা , তাদের থেকেই শুরু করেছে। আবার এটাও স্পষ্ট যে, দূর্ণীতির বর্তমান যে অবস্থা তাতে সরকার বেশ বিপদেই আছে। পত্রিকায় দেখা যায় ব্যাংক রির্পোট, ব্যাংকগুলো খালি, টাকার প্রবাহ নেই! এই একটা বিষয় দিয়েই অন্যান্য সব অনুমান করা যায় । সরকারকে এর বিপরীতে ব্যবস্থা নিতেই হতো, নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলেও। কেননা, ক্ষমতার অপচর্চা সর্বত্র আর দূর্ণীতির মাত্রা এই দুটো বিষয় জনগণ হারে হারেই টের পাচ্ছে বলে মনে হয়। সুতরাং বলাই যায়, সরকার উপায়ান্তর না পেয়েই বাধ্য হচ্ছে অন্তত কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার । এখন জনমানুষ নিশ্চয়ই আশা রাখতে চায়, সেটা যেন কেবলমাত্র লোক দেখানো না হয়। এমনটি হলে , জনগণ হয়তো বা ধোঁয়াশায় থাকবে, তবে সরকার নিজেই নিজেকে বড় ধোঁকা দিবে।
নুসরাত হত্যায় ১৬ জনের ফাঁসি। শুনতে বেশ ভালো লাগে। সরকার কঠিন হচ্ছে। এখানে একটু বলে নেওয়া ভালো, ” যারা সরকারকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন, সেটা ভুল এবং মারাত্মক ভুল” । এতে করে একটি ভুল মেসেজ যায় জনগণের নিকট। প্রশাসনিক কাজ দ্রুত করেছে সরকার, সেটা স্পষ্ট করে ধন্যবাদ দিন, বিচার করেছে সরকার এটা মোটেও ঠিক নয়। এই ভুলটি কিন্তু ছোটোখাটো কোনো বিষয় নয়। আমাদেরকে ছোটো ছোটো ভুল দিয়েই গিলে খাচ্ছে, পরবর্তীতে বড় অন্যায়কেউ হজম করে ফেলে।
এখানে আরেকটু বলা প্রয়োজন, ১৬ জনের ফাঁসি! আইনের মানুষ আমি না। তারপরেও সাধারণ জ্ঞাণে স্পষ্ট যে, এই ১৬ জনের সবাই সরাসরি হত্যার সাথে জড়িত না। কেউ হয়তো ইনস্ট্রোম্যান্ট জোগান দিয়েছেন, কেউ হয়তো পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন, কেউ হয়তো ঘটনা ঘটতে সাহায্য করেছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি । সবার ফাঁসির হুকুম হয়েছে। ভবিষ্যতে আবার উচ্চ আদালতের বিচারে কেউ মৃত্যুদন্ড থেকে মুক্তি লাভ করে কম সাজাভুক্ত হলে , আমি আশ্চর্য হবো না। তাই অগ্রিম বলে রাখলাম, তখন আবার সরকারকে দোষারোপ করে গালাগালি করবেন না। তাই বলছিলাম, বিশেষ করে বিচারের জন্য কেবলমাত্র আদালতকেই ধন্যবাদ দিন। কেননা, আগামীতে এই রায়, পুরোপুরি বহাল না থাকলে ঘুরেফিরে সেই সরকারের ঘাড়েই বর্তাবে। সরকারও অবশ্য এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে পারে যদি, সব ক্রেডিট নিজেদের না, সেটা স্পষ্ট করে দেয়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকলে আবার দাম্ভিক হয় বলেই সবকিছুতেই একটা জগাখিচুড়ির অবস্থা হয় কিনা, তাই বললাম।
কেন কথাগুলো বললাম? মনে আছে সবার নিশ্চয়ই, বিশ্বজিত হত্যা কাহিনী । বিচার হলো, সরকার ক্রেডিট নিলো, আবার ফাঁসির আসামি মুক্ত হলো, আজ অব্দি রায়ের কার্যকরীতা দেখা গেলো না ! তখন রাজপথে থাকা বিরোধী দল(!) কথা যাই বলে, সরকারের পছন্দ হয় না। জনগণের কথাতো আবার আজকাল সরকার গণনায় নেয় না। অবশ্য জনগণের নেই তেমন কোনো প্লাটফর্ম, এদিক সেদিক হাটবাজারের কথা সরকারের কান পর্যন্ত যদিও পৌঁছানোর কথা, কিন্তু সেটার মূল্যায়ন সরকার করে না। সেই একই কারণ, ক্ষমতার দাম্ভিকতা। তবে মনে রাখা ভালো যে, হাটবাজারের কথাই এক সময় সত্য হয়ে প্রকাশ পায় ।
আরো একটি কথা না বললেই নয়, নুসরাত হত্যার মামলার তদন্তের ভার ছিলো পিবিআই এর উপর। বলতেই হবে, পিবিআই খুব দ্রুত মামলার চার্জশিট জমা দেওয়ায় রায়টি ঘোষণা হয়েছে। তবে পিবিআই এর তদন্তে পুলিশ অফিসারের বিষয়ে ব্যাখ্যাটি তেমনভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। তাদের ব্যাখ্যাটি ছিলো, পুলিশ অফিসার সরাসরি হত্যায় জড়িত ছিলো না! তবে আইসিটি অ্যাক্টে তার কেস চলছে। প্রশ্ন উঠবেই, পুলিশ অফিসার কি এই মামলায় উৎসাহের যোগান দেন নাই ? বা কোনো কর্ণার থেকে সহযোগিতা করেন নাই ? মানলাম সরাসরি জড়িত ছিলো না। তবে সেই পুলিশ অফিসারই কিন্তু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধু আইসিটিতে কেন মামলা হবে ? কেন ফৌজদারি মামলা নয় ? আবার সরাসরি জড়িত নয়, এই উদাহরণের কারণেই যদি আগামীতে উচ্চ আদালতে কোনো আসামির শাস্তি লঘু হয়ে যায়, তখন কি হবে ? তাই বলছিলাম, বিশ্বজিত হত্যার উদাহরণ সামনে রেখে, আগামীতে শান্তি লঘু হলে কেউ আশ্চর্য হবেন না।
নুসরাত হত্যর মামলা পরিচালনাকরি আইনজীবীকে ( নামটি এই মূহুর্তে মনে আসছে না , দুঃখিত) অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে হবে। তিনি বিনি পয়সায় এই মামলা পরিচালনা করে জয়ী হয়েছেন। ওনার ভাষ্য ছিলো, উনার নিজের তিনটি মেয়ে আছে, সেই উপলব্ধি থেকেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, প্রতিজ্ঞা করেছিলেন,চমত্কার উপলব্ধি । বলতেই হয়, এই ভদ্রলোক আইনজীবীকে অন্য আইনজীবীরা একটি উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন। আমাদের দেশে আইনজীবীদের নিয়ে তেমন কোনো ভালো অভিজ্ঞতা জনমানুষদের নাই। সুতরাং এমন উদাহরণ বিবেচনায় আনলে সকল আইনজীবীদের জন্যেই মঙ্গলের হবে, তাদের নিজেদের পেশাতেই। আইনজীবীরা ভেবে দেখতে পারেন।
সব শেষে বলবো, ভালো মন্দের মাঝেই আমাদের বসবাস । সরকারের কাজের সঠিক সমালোচনা বা আলোচনা অথবা ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবার উত্তম জায়গা হবার কথা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংসদে। সেই সংসদ নিয়ে বলতে গেলে আবার মহাকাব্য লিখতে হবে বলেই থেমে গেলাম। তাছাড়া জনগণ সব জানে বা অবগত আছেন। তাই বলছিলাম, সরকার হয়ে বেশি উৎত্তেজিত হবেন না। তথাকথিত রাজপথের বিরোধী দল যা বলে, সেটাকে একেবারেই অবহেলা না করাই ভালো। তাদেরকেও বলতে দিন। এই বলা ভালো। তাদের কথাও শুনুন, অনেক ছিদ্র খুঁজে পাবেন, যা কিনা ক্ষমতার চশমা চোখে থাকলে ধরা দেয় না। বিরোধী দল সব কিছু নিয়ে কেবলমাত্র রাজনীতি করে বলেই উড়িয়ে দিবেন না। রাজনীতিতো করবেই, সেই রাজনীতির মধ্যেও ভালো কিছু আছে কিনা বা সত্য আছে কিনা, পর্যবক্ষেণে রাখুন। বিরোধী দলের চোখে সরকারের ভালো কিছুই নজরে আসে না বলে, উত্তেজিত হবার কোনো কারণ নেই, হুমকি ধামকি দেবার কারণ নেই। সহনশীলতা সরকারকেই দেখাতে হয়।
সব কিছুতেই সরকারের নিজস্ব কৌশল নিশ্চয়ই থাকে। সরকারের ভিতরেই অতি ক্ষমতাশালী কিছু মানুষ সব সরকারেই থাকে। আপনাদের সরকারেও আছে বলেই প্রতীয়মান হয়। জানি, তাদের বিরুদ্ধে অতি সহজে অ্যাকশনে যাওয়া কঠিন। পৃথিবীর সব দেশেই এমনটি হয়, শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয়। তবে আমাদের দেশে সেই সকল শক্তিশালীদের বিরুদ্ধে যাওয়াটা সত্যিই কঠিন। নানান কারণ আছে। তবে বলতেই হয়, তাদের বিরুদ্ধে এই সরকারের কৌশলটি আপাতত মোটামুটি ভালোই মনে হচ্ছে। সরকার তাদেরকে ধীরে ধীরে শক্তিহীন করছে বলেই মনে হচ্ছে, ক্ষমতার দিক থেকে। এক সময় ওরা শক্তি হারিয়ে ফেললে হয়তো বা সরকার ভালোভাবেই ওদেরকে ধরতে পারবে। তবে বেশি সময়ক্ষেপন কিন্তু সরকারের ঘাড়েই ভুত হয়ে চেপে বসে থেকে, সরকারকেই না গিলে খায় । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কেলেঙ্কারির ঘটার কথা। একটা রির্পোট ছিলো, ইব্রাহিম খালেদ সাহেবের। সেই রির্পোটটি আলোর ছোঁয়া আজ অব্দি পায়নি। সেটা নিয়ে বিরোধীদের পক্ষ থেকে সমালোচনাও কম নয়। হোক সমালোচনা, এতে করে বিষয়টি অন্তত নিভে যাবে না। তাহলে সরকারের টনকও জিয়েই থাকবে। লক্ষণীয় যে, সরকারের কর্মে বুঝা যাচ্ছে, দলিয় ক্ষমতাশালীদের সরকার তাদের পদ-পদবি থেকে সরিয়ে দিয়ে তাদেরকে কিছুটা হলেও দূর্বল করতে পেরেছে, হয়তো ধীরে ধীরে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে সরকার যাবে। কৌশলটি আপাতত ভালো বলেই মনে হচ্ছে। এইইভাবে ব্যাংক/শেয়ারবাজার বা অন্যান্য দূর্ণীতির বড় বড় রাঘব বোয়ালদেরকেও যত দুরুত সম্ভব ক্ষমতাহীন করে , তাদের বিরুদ্ধে সরকার যত তাড়াতাড়ি অ্যাকশনে যাবে সরকারের ততই লাভ হবে। আমরা সাধারণ জনগণ বলতেই থাকবো, সমালোচনা করতেই থাকবো, একই কাজ বিরোধীদলও করছে। সুতরাং এগুলো নিয়ে সরকার যত কম উত্তেজিত হবে, ততই সরকারের জন্য মঙ্গল । সরকার মানেই দেশের অভিভাবক, তবে মনে রাখা ভালো , সরকারের বাহিরে যারাই আছে সবাই সাধারণ জনমানুষ অথবা হোক সেটা বিরোধী দলের লোক , তারাও সাধারণ জনগণ। আর সাধারণ জনগণ কিন্তু ভিন্ন অর্থে সরকারেরও অভিভাবক । সুতরাং অভিভাবকদের কথার মর্মবাণী সরকারকে বুঝতে হবে ও সম্মানও রাখতে হবে। তবেই সরকার সঠিক পথে নিশ্চিত চলতে পারবে। গণতন্ত্রে সরকারকে পরিচালনা করে কিন্তু সেই সাধারণ জনগণই।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম।

