–
ঢাকার অবিভক্ত সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন কর্নেল (অব: মালেক)। এরশাদ আমলের কথা। মালেক সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে মাস্টার্স করে সেনাবাহিনীতে গিয়েছিলেন। ’৭৫এর পর সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। এরশাদ ক্ষমতায় এলে ব্যবসা শুরু করেন এবং বাংলাদেশ থাই এ্যলুমিনিয়াম নামে একটা শিল্প প্রতিষ্ঠন বানিয়ে অল্প দিনে জমিয়ে ফেলেন। এরশাদ তাকে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পদে বসালে তিনি ব্যবসা পরিচালনার ভার ছেলে এবং মেয়ের ওপর ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে নেমে পড়েন।
মালেক সাহেবের বিস্তর পড়ালেখা ছিল। নানা বিষয়েই ভাল জ্ঞান রাখতেন। ভাল ইংলিশ বলতে পারতেন। তো এই মেয়র সাহেবের একটা অভ্যাস ছিল- রোজ রাতে গান শোনা। লাইভ। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রাতের খাবার খেয়ে, কখনও ছোটখাট একটা ঘুম দিয়ে এসে বসতেন ড্রয়িং রুমে। ওয়ার্ড কমিশনাররা নানা ধরনের ফাইল বগলদাবা করে এসে বসে থাকতো। চলতো আড্ডা। নানা বিষয়ে আলোচনা। কমিশনাররা সবাই তাতে তাল মেলাতো আর ফাঁক বুঝে বগল থেকে ফাইল বের করে মেয়র সাহেবের সামনে মেলে ধরতো। কলমও বাড়িয়ে দিতো। মালেক সাহেব কথা বলতে বলতেই কারও কারও ফাইলে বড় করে একটা মা লিখে দিতেন। মা’ অক্ষরটাই ছিল তার স্বাক্ষর। মুগদাপাড়ার কমিশনার এনাম সর্দার একবার বলছিলো, স্যার আপনে একটা মা লেইখা দিলে এলাকার পাবলিকে আমারে বাপ ডাকে!
কমিশনাররা যার যার কাজ সেড়ে চলে গেলে শুরু হতো গানের আসর। চলতো ভোর পর্যন্ত। কোন কোন কমিশনার আবার থেকেও যেতেন। আসরে গাইতে আসতেন সে সময়ের প্রতিষ্ঠিত অনেক শিল্পী। দুইএকবার শাহনাজ রহমতুল্লাহ এসে গেছেন। একক সঙ্গীতানুষ্ঠান। মালেক সাহেব বসতেন পানের বাটা নিয়ে। খুব পান খেতেন ভদ্রলোক। সোফার ওপর লম্বা করে পা তুলে আধশোয়া হয়ে চোখ বুজে গান শুনতেন, মাঝেসাঝে গুনগুনিয়ে নিজেও কণ্ঠসঙ্গত করতেন। তবে, এই গানের আসরে যারা পারফর্ম করতেন সবাইকে যাওয়ার সময় সম্মানী হিসেবে একটা করে মোটা খাম দেওয়া হতো। ফলে অনেক শিল্পীই তার পিএ’র কলের জন্য অপেক্ষায় থাকতো।
এক পর্যায়ে আমিও এই আসরের একজন নিয়মিত অংশীদার হয়ে যাই। রাত ১১/১২টার দিকে আসতাম, একেবারে ভোর রাতে শেষ করে বাসায় ফিরতাম। আসর শুরুর আগে বা শিল্পী আসার বিলম্বকালীন সময়ে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে জিজ্ঞাস করলেন কও তো মিয়া বাংলাদেশের আসল সমস্যা কি! আমি বললাম, জনসংখ্যা। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, না হইলো না। আমি যুক্তি দিয়ে বললাম এই এতটুকু একটা দেশ তাতে এত এত মানুষ, নুন আনতে পান্তা ফুরায়, এইটাই তো এক নম্বর সমস্যা। তিনি বললেন, না, বাংলাদেশের এক নম্বর সমস্যা হইতেছে অশিক্ষা। মানুষ যদি শিক্ষিত হয় সব সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবো।
সেই থেকে আমি বিষয়টা নিয়ে ভেবে চলছি। কখনও মনে হয়েছে হয়তো মালেক ভাই সেদিন ঠিকই বলেছিলেন। আমি নিজেও অনেককে একই কথা বলেছি। মানুষ শিক্ষিত হয়ে উঠলেই জ্ঞান বাড়বে, তাতে আইন মানবে, আইন মানলে সমাজে শৃংখলা ফিরে আসবে, আর শৃংখলা প্রতিষ্ঠা হলে দেশ এবং সমাজ নিয়মের মধ্য দিয়ে চলবে। মালেক ভাই যখন কথাটা বলেছিলেন তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১০ কি ১২ কোটী, ঢাকা শহরে বড়জোর এক কোটী মানুষ বাস করতো। ২০২৬ সালে আজ এই শহরেরই জনসংখ্যা ৪ কোটীর মত, দেশে ২০ কোটীর ওপর। গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে দেড় হাজারের মত মানুষের বাস। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় সোয়া লক্ষ! পৃথিবীর ১০টা ঘনবসতিপূর্ণ দেশের মধ্যে অন্যতম একটা।
ঘনবসতিপূর্ণ অন্য দেশগুলোর অধিকাংশই ধনী। শিক্ষার হার কোথাও কোথাও শতভাগ। ফলে হয়তো তারা সভ্যতা এবং আধুনিক নিয়মকানুনগুলো রপ্ত করতে পেরেছে। নিজেরা কর্মসংস্থান করতে পেরেছে। কিন্তু আমাদের দেশে জনসংখ্যাই শুধু বাড়ে শিক্ষিতের হার কমে। কৃতিত্ব জাহিরের জন্য সরকারগুলো আমলাদের তৈরী ক্যালকুলেটরের হিসাব দিয়ে বাহবা নেয় যে শিক্ষার শনৈ শনৈ উন্নতি হয়ে চলেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ন উল্টো। হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে ঠিকই কিন্তু তা থেকে প্রতি বছর কিছু করে সার্টিফিকেটধারী বের হচ্ছেমাত্র, যাদের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষিত হয়তো হাতেগোনা। আবার যারা একটু শিক্ষিত বা লেখাপড়াজানা, সুযোগ পেলেই বিদেশে চলে যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে থিতু হচ্ছে করেকেটে খাচ্ছে। রয়ে যাচ্ছে আকাইম্যা আর ভাদাইম্যারা। তারাও চেষ্টায় থাকে ফাঁক পেলে বিদেশে পাড়ি জমাতে।
পাকিস্তান আমল থেকেই দেশে পরিবার পরিকল্পনার কর্মসূচী ছিল। কারন তখনকার শাষকরা বুঝেছিলেন এই এত ছোট একটা ভুখন্ড খুব বেশী মানুষের চাপ নিতে পারবে না। আইউব খানের আমলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যপক উদ্যোগ দেখা যেতো। তখন বলা হতো সন্তানসংখ্যা তিনের মধ্যে রাখলেই ভাল। সচেতনামূলক মিটিং প্রচার প্রচারণা গ্রামে গ্রামে ঘুড়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ উপকরন বিনামূল্যে বিতরন এমনকি ভ্যাসেকটমি লাইগেশনের মত কর্মসূচীর মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধিও হার নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করা হতো। স্বাধীনতার পরও এই কর্মসূচী চালু ছিলো। পত্র পত্রিকা রেডিও টিভিতে রাজা-মায়ার বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো। এরশাদ সরকারের আমলে বলা হতো ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক- দু’টি সন্তানই যথেষ্ঠ।’
কিন্তু যেদিন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ডলার আসার পথ খুললো, জনসংখ্যা হয়ে গেল জনসম্পদ! মূর্খের দল এটা বুঝলো না কর্মসংস্থান না থাকলে এই জনসম্পদ হচ্ছে আসলে জনবোঝা! সরকারগুলো দেখলো আরে এ তো ভাল মওকা, কলকারখানা মিলফ্যাক্টরি এক্সপোর্ট ইমপোর্টের ঝামেলা ছাড়াই মাসে ফোকটে ডলার এসে জমা হচ্ছে এ্যাকাউন্টে! বিদেশে যত কর্মসস্থান সরকারের ঘরে তত ডলার! ব্যস, শিক্ষার বারোটা বাজলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচীও লাটে উঠলো। তখন দর্শন হয়ে গেল পোলাপানের এত শিক্ষিত হয়ে দরকার কি! কোনমতে নাম সই শিখলেই তো কামলা খাটতে বিদেশে চলে যাবে! যত কামলা তত ডলার! বুনিয়াদী শিক্ষা বলতে কিছু থাকলো না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠলো জিপিএ পাইপ আর সার্টিফিকেট বিক্রির দোকান। মানুষ গড়ার কারখানার বদলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কামলা বানানোর ফ্যাক্টরি! জনসংখ্যা সেই যে মানবসম্পদ হলো এখনও সেই বুলি। দেশে জনবিষ্ফোরন নিয়ন্ত্রণের সকল কর্মসূচীই একেএকে পরিত্যক্ত হলো। শেখ হাসিনা ১৭ বছর সরকার চালালেন তার আমলেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশী। একবার ভেবে দেখলেন না কেউ, বিদেশে কর্মসংস্থান সাময়িক ব্যবস্থা। আবহমান কাল ধরে এই সুযোগ থাকবে না। এই বিরাট জনগোষ্ঠী যারা বিদেশে কাজ করছে যখন তাদেরকে দেশে ফিরে আসতে হবে কি অবস্থা দাঁড়াবে!
আজ মনে হচ্ছে, শিক্ষা না আপাতত: জনসংখ্যা বিষ্ফোরণই দেশের বড় সমস্যা। এই টিউমার মানবসম্পদ জাতির জন্য একটা বাড়তি বোঝা। তা ধারন করার ক্ষমতা আমাদের নাই। ভাবতে পারেন কেউ, যদি এই অবস্থা চলতে থাকে আগামি ২৫ বছরের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫ থেকে ৩৮ কোটী! তখনও কি তা মানবসম্পদ থাকবে! এই মানব বিষ্ফোরন দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে! ঢাকা শহরে এখনই কীট পতঙ্গের মত মানুষ গিজগিজ করে, পপুলেশন ডাবল হলে কি অবস্থা দাঁড়াবে কেউ কল্পনা করতে পারেন! পন্ডিতেরা কেউ চায়নার উদাহরন দেবেন, সেখানেও তো জনসংখ্যার আধিক্য। তারা টিকতে পারলে আমরা কেন পারবো না। চায়না একটা বিশাল ভুখন্ড। নানা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। সবচেয়ে বড় কথা তারা একটা রেজিমেন্টেড সোসাইটি। তারপও সেখানে পরিবার ছোট রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আই হ্যাভ এ প্লান। অনুরোধ করবো আপনার প্লানের মধ্যে জরুরী ভিত্তিতে জনবিষ্ফোরন রোধ বা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচী অন্তর্ভূক্ত করুন। আপনার পিতা বা মা’র আমলেও এই উদ্যোগ অব্যাহত ছিল। এখন তা আরও সম্প্রসারিত করুন, এখনকার শ্লোগান হোক- ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক-একটি সন্তানই যথেষ্ঠ।’ মানুষের সংখ্যা কমাতে বা আয়ত্বের মধ্যে না রাখতে পারলে কোন প্লানই কাজ দেবে না, মানুষকে শিক্ষিতও করা যাবে না। আজ মনে হচ্ছে দেশের প্রধানতম সমস্যা, জনসংখ্যা বিষ্ফোরনই।
সাঈদ তারেক ,সাংবাদিক , লেখক এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ।

