ভারতের রাজনীতিতে ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেশটির ছাত্র আন্দোলন যে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তা শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। এই পরিস্থিতিতে ভারতের ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও নতুন তাৎপর্য বহন করছে।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরা ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের ছাত্রসংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল, বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলন ভারতসহ অন্যান্য দেশের তরুণদের সম্মিলিতভাবে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি দুই দেশের তরুণদের পারস্পরিক সংহতি ও সহযোগিতার আশাও প্রকাশ করেন। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের একটি ছাত্র আন্দোলনকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করার এই বক্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইতিমধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভারতে ছাত্র আন্দোলনের বর্তমান গতিপথ বুঝতে হলে এর পেছনের অসন্তোষগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, বেকারত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তরুণদের একটি অংশকে রাজপথে এনেছে। এর আগে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন ব্যাপকতা পেয়েছিল। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এখন নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের মতো বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনপ্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্বাচনী অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন শিবিরের বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে অভিযোগগুলোকে ঘিরে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রতিবাদ কর্মসূচি, পুলিশি বাধা এবং আন্দোলনকারীদের আটকের ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এখানেই ভারতের ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়। আন্দোলন কি শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বৃহত্তর সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেবে? এর উত্তর নির্ভর করবে আন্দোলনের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন এবং দাবিগুলোর গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
একটি ছাত্র আন্দোলনের শক্তি কেবল জনসমাবেশের আকারে নয়, বরং তার দাবির স্পষ্টতা ও সামাজিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে। প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা, পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মতো বিষয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আন্দোলন যদি এসব প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি দিতে পারে, তবে শিক্ষাঙ্গনের বাইরেও তার সমর্থন বাড়তে পারে। বিপরীতে, আন্দোলন যদি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের বিতর্কে আটকে যায়, তবে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দাবিগুলো আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
এবার বাংলাদেশের প্রসঙ্গ। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তন এনেছে। সেই অভিজ্ঞতা ভারতীয় তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের মানুষকে সাহস, সংগঠন কিংবা প্রতিবাদের নতুন কৌশল সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। কিন্তু অনুপ্রেরণা আর অনুকরণ এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতা ভারতের থেকে আলাদা। বাংলাদেশের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব, কিন্তু একই পরিণতি ভারতের ক্ষেত্রেও ঘটবে—এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
নেহা বোরার বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির পক্ষ থেকে এই বক্তব্যকে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করে সমালোচনা করা হয়েছে। বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে একটি ছাত্রনেত্রীর আন্তর্জাতিক সংহতির বক্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ করতে হলে তাঁর সম্পূর্ণ বক্তব্য, প্রেক্ষাপট ও নির্দিষ্ট দাবিগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশকে অনুপ্রেরণার উৎস বলার কারণে কাউকে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসংগত নয়। একইভাবে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা কিংবা অসাংবিধানিক পন্থাকে সমর্থন করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিতর্কের প্রভাব কী হতে পারে? দুই দেশের সম্পর্ক এমনিতেই নানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক বক্তব্য—প্রতিটি বিষয়ই দুই দেশের জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রশংসা নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক বিতর্ক দুই দেশের সম্পর্কের অবিশ্বাস আরও বাড়ানোর উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের কোনো রাজনৈতিক পক্ষ যদি বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকে ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে, আর বাংলাদেশের কোনো পক্ষ যদি ভারতের ছাত্র আন্দোলনকে দুই দেশের সম্পর্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে উভয় পক্ষেরই ক্ষতি হবে। একটি দেশের তরুণদের রাজনৈতিক বক্তব্যকে পুরো দেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি একজন ছাত্রনেতার বক্তব্যকে বাংলাদেশের সরকারের নীতি হিসেবে বিবেচনা করাও বিভ্রান্তিকর।
দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, পারস্পরিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতার ওপর। ছাত্রনেত্রীর একটি বক্তব্যের কারণে কূটনৈতিক সম্পর্ক অবধারিতভাবে আরও খারাপ হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। তবে বক্তব্যটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচার, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেওয়া হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই দুই দেশের গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল ও নীতিনির্ধারকদের উচিত বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বৃহত্তর স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা।
ভারতের ছাত্র আন্দোলনের শেষ পরিণতি কী হতে পারে, তারও একাধিক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আন্দোলনের যৌক্তিক দাবির জবাব দেয়, তদন্ত ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তবে আন্দোলনের একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের দিকে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দাবি উপেক্ষিত হলে কিংবা আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত দমন-পীড়নের অভিযোগ বাড়লে বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হতে পারে। তৃতীয়ত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলে তা জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও এতে ছাত্রদের নিজস্ব দাবি রাজনৈতিক স্বার্থের আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ছাত্র আন্দোলনের সাফল্য শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তব অগ্রগতি—এসবও সাফল্যের মাপকাঠি। আবার আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হলেও যদি সুস্পষ্ট নেতৃত্ব, গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি ও গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে না পারে, তবে তার শক্তি ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভারতের ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতে পারে, কিন্তু ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ভারতের জনগণ, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়েই। আর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে কোনো ছাত্রনেতার বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রতিবেশী দুই দেশের তরুণদের গণতন্ত্র, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে সংলাপ শত্রুতার নয়, সহযোগিতার ভিত্তি হতে পারে। ছাত্র আন্দোলনের প্রকৃত বিজয় তখনই, যখন তা ক্ষোভকে দায়িত্বশীল পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তরিত করে—আর প্রতিবেশী সম্পর্কের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পথ খোলা থাকে।
লেখক : হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

