প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সেতুবন্ধন গড়তে ১ নভেম্বর প্যারিসে আন্তর্জাতিক বইমেলা
নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষার চর্চা, সাহিত্যপ্রেম ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ দৃঢ় করার প্রত্যয়ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘প্যারিস টাইমস দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬’। বইয়ের প্রদর্শনী ও বিক্রির পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালিদের সাহিত্যচর্চা, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য আয়োজন হয়ে উঠবে এই বইমেলা—এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজকদের।
ইউরোপের অন্যতম সাংস্কৃতিক রাজধানী প্যারিসে আবারও বসতে যাচ্ছে বাংলা বই ও সাহিত্যের মিলনমেলা। আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬, রোববার, প্যারিসের মার্ক্স ডরমোয়া গির্জার হলে (Marx Dormoy Church Hall) দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে ‘প্যারিস টাইমস দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬’।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরা, প্রবাসী লেখক-পাঠকদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজন করা হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক বইমেলার।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য এ আয়োজন শুধু বই কেনাবেচার উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং হয়ে উঠবে সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তাচর্চা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল।

বই, লেখক ও পাঠকের মিলনমেলা
আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, এবারের বইমেলায় ফ্রান্সের স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং সাহিত্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
মেলায় বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার বই প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি আয়োজনের পরিকল্পনায় রয়েছে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, লেখক-পাঠক মতবিনিময়, কবিতা আবৃত্তি, সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
প্রবাসী লেখকদের জন্য এ ধরনের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের বাইরে বসবাস করেও যাঁরা বাংলা ভাষায় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা গবেষণামূলক সাহিত্য রচনা করছেন, তাঁদের সৃষ্টিকর্ম পাঠকের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে আন্তর্জাতিক বইমেলা।
একই সঙ্গে পাঠকেরাও লেখকদের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার, তাঁদের লেখার পেছনের ভাবনা জানার এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্য নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ পাবেন।

প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের মাতৃভাষার সঙ্গে পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বই
প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা।
ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেড়ে ওঠা বাংলা ভাষাভাষী পরিবারের শিশুরা সাধারণত স্থানীয় ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করে। বিদ্যালয়, বন্ধুবান্ধব ও সামাজিক পরিবেশে ফরাসি কিংবা অন্য ইউরোপীয় ভাষার প্রাধান্য থাকায় অনেক শিশুর দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
ফলে পরিবারের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারলেও অনেক শিশু বাংলা পড়া ও লেখায় সমান দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। সময়ের সঙ্গে মাতৃভাষার সাহিত্য, ইতিহাস, লোককথা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাদের দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই বাস্তবতায় বাংলা বইমেলা নতুন প্রজন্মের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
শিশুদের হাতে বাংলা গল্পের বই, ছড়ার বই, রূপকথা, কিশোর সাহিত্য ও চিত্রসমৃদ্ধ বই তুলে দেওয়া হলে মাতৃভাষার প্রতি তাদের স্বাভাবিক আগ্রহ গড়ে উঠতে পারে। বইয়ের মাধ্যমে তারা শুধু নতুন শব্দ শেখে না, বরং পরিচিত হয় নিজেদের পারিবারিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং পূর্বপুরুষের ভাষার সঙ্গে।
বিশেষ করে প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য বাংলা বই হতে পারে দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক জগতের মধ্যে একটি সুন্দর সেতুবন্ধন। একদিকে তারা স্থানীয় সমাজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে বেড়ে উঠবে, অন্যদিকে বাংলা সাহিত্য তাদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে সহায়তা করবে।
শিশুদের দ্বিভাষিক দক্ষতা বিকাশের ক্ষেত্রেও মাতৃভাষায় নিয়মিত পড়াশোনা ও সাহিত্যচর্চা সহায়ক হতে পারে। বয়সোপযোগী বই পড়া শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করে, ভাষাগত প্রকাশ ক্ষমতা বাড়ায় এবং চিন্তাকে সুসংগঠিত করতে সাহায্য করে।
এ কারণে প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য বইমেলায় সন্তানদের নিয়ে অংশগ্রহণ কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া নয়; এটি তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশে উৎসাহ দেওয়ারও একটি সুযোগ।
সাহিত্যচর্চা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে
বই পড়া কিংবা সাহিত্যচর্চা শুধু অবসর বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের মনন, চিন্তাশক্তি, ব্যক্তিত্ব ও জীবনদৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করার একটি কার্যকর উপায়।
সাহিত্য মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতার বাইরের জগৎ সম্পর্কে জানতে শেখায়। একটি উপন্যাস, গল্প কিংবা কবিতার মাধ্যমে পাঠক ভিন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, অনুভূতি, স্বপ্ন, আনন্দ ও বেদনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতা অন্যের অবস্থান বোঝার ক্ষমতা ও সহমর্মিতা বিকাশে সহায়ক হতে পারে।
নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস ভাষাগত দক্ষতা, মনোযোগ, বিশ্লেষণক্ষমতা ও সৃজনশীল চিন্তাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সাহিত্য পাঠ মানুষকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে এবং কোনো বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে উৎসাহিত করে।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও মানসিক চাপের মধ্যেও বই হতে পারে প্রশান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। পছন্দের বই পড়া অনেকের জন্য মানসিক স্বস্তি, আত্মঅনুসন্ধান এবং দৈনন্দিন চাপ থেকে সাময়িক বিরতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
সাহিত্যচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল্যবোধের বিকাশ। মানবিকতা, ন্যায়বোধ, সামাজিক দায়িত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মতো বিষয়গুলো সাহিত্যের নানা চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়ে পাঠকের সামনে উঠে আসে।
তবে সাহিত্য পাঠের এসব সুফল ব্যক্তির বয়স, পাঠাভ্যাস, বইয়ের বিষয়বস্তু ও সামাজিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। তা সত্ত্বেও একটি পাঠবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা ব্যক্তি ও সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
যে সমাজে বই পড়া, মুক্ত আলোচনা এবং সৃজনশীল চিন্তার চর্চা বেশি হয়, সেখানে জ্ঞান বিনিময় ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সুযোগও প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
একই স্থানে লেখক, কবি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ পাঠকের সমাগম নতুন পরিচয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করে। সাহিত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব সম্পর্ক প্রবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে পারে।
পাশাপাশি সাহিত্যসভা, পাঠচক্র, শিশুদের বাংলা ভাষা শিক্ষা এবং নতুন লেখকদের উৎসাহিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ক্ষেত্রেও বইমেলা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশ্বসংস্কৃতির শহর প্যারিসে বাংলা সাহিত্যের উপস্থিতি
প্যারিস বিশ্বজুড়ে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস এই শহরকে দিয়েছে বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়।
এমন একটি আন্তর্জাতিক নগরীতে বাংলা ভাষার বইমেলা আয়োজনের তাৎপর্য তাই বহুমাত্রিক।
বাংলা ভাষা কেবল একটি জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এর রয়েছে সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, বেগম রোকেয়াসহ অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদের সৃষ্টিকর্ম বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
এই সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরে বাংলা ভাষার উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি করতে পারে প্যারিসের এই বইমেলা।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলা ভাষার লেখক ও প্রকাশকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে প্রবাসী সাহিত্যচর্চা আরও সংগঠিত ও সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলিত উৎসবের প্রত্যাশা
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের আন্তর্জাতিক বইমেলাকে সব বয়সের মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক সাহিত্যিক আয়োজন হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বইয়ের প্রদর্শনী ও বিক্রির পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি, লেখক-পাঠক মতবিনিময়, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং প্রবাসী ও স্থানীয় শিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মেলায় ভিন্নমাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্র করে মানুষের একত্র হওয়ার সুযোগ তৈরি করাই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলা সাহিত্যকে ভালোবাসেন এমন মানুষের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণও বইমেলার সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে।
সবার জন্য উন্মুক্ত বইমেলা
আগামী ১ নভেম্বর প্যারিসের মার্ক্স ডরমোয়া গির্জার হলে অনুষ্ঠিতব্য ‘প্যারিস টাইমস দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬’-এ প্রবেশ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
আয়োজক কমিটি ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী পরিবার, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশক, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও বইপ্রেমীদের মেলায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
যেসব লেখক ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রকাশিত বই নিয়ে মেলায় অংশ নিতে আগ্রহী, তাঁদের আয়োজক কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অংশগ্রহণ ও যোগাযোগ
আয়োজন: প্যারিস টাইমস দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬
তারিখ: ১ নভেম্বর ২০২৬, রোববার
স্থান: মার্ক্স ডরমোয়া গির্জার হল (Marx Dormoy Church Hall), প্যারিস, ফ্রান্স
প্রবেশ: সবার জন্য উন্মুক্ত
যোগাযোগ: প্যারিস টাইমস আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬ উদ্যাপন কমিটি
ইমেইল: contact@paristimes.fr
রাকিবুল ইসলাম, শুদ্ধস্বর ডটকমের ফ্রান্স প্রতিনিধি।

