বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ অসংখ্য মানুষের দাবি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিহত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় নিপীড়নবিরোধী অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে এ প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আবরার যে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে তা আমরা জানি। এটা আমাদের সৌভাগ্য যে আবরারের শেষ কথাটি জানতে পেরেছি। সে স্ট্যাটাসে কী ছিল?
তার এক নম্বর স্ট্যাটাসের বক্তব্য ছিল- বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর মংলা এখন ভারত দেশি প্রতিষ্ঠানের মতোই ব্যবহার করতে পারবে। আবরার তথ্যযুক্তি দিয়ে কথা বলেছে, কোনো কটূক্তি করেনি, কাউকে গালি দেয়নি, কাউকে অপমান করেনি।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, ‘আবরার তার স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রীর নামও নেয়নি। সে শুধু তথ্যযুক্তি দিয়ে জানতে চেয়েছে এই বন্দর ব্যবহার করার আগের ঘটনাগুলো কী কী? এবং এই বন্দর ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কী কী বিপদে পড়তে পারে।’
তিনি বলেন, ‘দুই নম্বর সে পানি নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে। আবরার বলেছে, আমাদের যেখানে পানির সংকট, সেখানে পানি চলে যাচ্ছে ভারত। ভারতকে পানি দিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ।’
‘বাংলাদেশের মন্ত্রীরা বলছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীও দেখলাম বললেন, পররাষ্ট্র সচিব বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- এটা মানবিক কারণে দেয়া হয়েছে।’
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘মানবিক কারণে এর আগে তিতাস নদীতে বাঁধ দিয়ে, তিতাস নদীকে নষ্ট করেছে। ভারতের বিদ্যুৎ সরঞ্জাম এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়া হয়েছিল। মানবিক কারণে এর আগে বহু কাজ এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে গেছে।’
‘মানবকি কারণে এখন যে পানি আমাদের ভারতের কাছে প্রাপ্য সেই পানির কোনো সুরাহা না করে ফেনী নদী থেকে পানি এখন ভারতকে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে মানবিক কারণে। মানবিক সরকার আপনাদের মানবিকতা বাংলাদেশের জন্য কোথায়? বাংলাদেশের জন্য আপনাদের মানবিকতা কোথায়?’
সাম্প্রতিক কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরে যখন লাখ লাখ মানুষ একাত্তর সালের মতো পরিস্থিতির শিকার। একাত্তর সালে বাংলাদেশের যে অবস্থা ছিল কাশ্মীরে সেই অবস্থা। সেই কাশ্মীরের জন্য আপনাদের মানবতা কোথায়? কাশ্মীর নিয়ে র্যাবের মহাপরিচালক পরিষ্কার বললেন, ‘বাংলাদেশে কাশ্মীর নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না।’ কেন কথা বলা যাবে না কাশ্মীর নিয়ে?’
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘কাশ্মীরসহ পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় যদি নির্যাতন হয়, অন্যায় হয় তার বিরুদ্ধে কথা বলা পৃথিবীর যে কোনো মানুষের একটা সাধারণ দায়িত্ব।’
‘সেই দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশের মানুষ যাতে কথা বলতে না পারে সে জন্য র্যাব-পুলিশ হুমকি দিচ্ছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, আবরারের স্ট্যাটাসের তিন নম্বর বিষয় ছিল গ্যাস নিয়ে। বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের কারণে এলপিজি রফতানি করা হচ্ছে ভারতে। কীভাবে রফতানি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এলপিজি আমদানি করা হচ্ছে বৈদিশিক মুদ্রা দিয়ে। এলপিজির ব্যবসা বসুন্ধরা ও বেক্সিমকোসহ প্রভাবশালী ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর, যারা ব্যাংক খালি করলে তাদের কোনো অপরাধ হয় না। যারা সন্ত্রাস এবং এই যে দাপট, গণতন্ত্রহীনতা, যার প্রধান সুবিধাভোগী হচ্ছে এ সমস্ত ব্যবসায়িকগোষ্ঠী।
‘তারা সেই এলপিজি আমদানি করবে বৈদিশিক মুদ্রা দিয়ে, তারপর সেটা প্রসেসিং হবে সুন্দরবন নষ্ট করে। সুন্দরবনের পাশে এলপিজির প্ল্যান্টে সেই এলপিজি প্রোডাকশন হবে।’ আনু মুহাম্মদ বলেন, সুন্দরবন নষ্ট করে সেটা ভরা হবে। ভরে তারপর সেটা ভারতে রফতানি করা হবে। এটার কী যুক্তি থাকতে পারে? কীভাবে একজন বাংলাদেশের নাগরিক এর বিরুদ্ধে কথা না বলে থাকতে পারে। আবরার সেই কাজটাই করেছে।
‘আবরার অসংখ্য মানুষের দাবি নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে, বক্তব্য রেখেছে এবং অসংখ্য মানুষের পক্ষে যে কথা বলে নিহত হয়েছে। যে পরিস্থিতি আবরারের মতো ছেলেদের নিহত করে, ঘরে ঘরে খুন-ধর্ষণের মতো পরিস্থিতিকে জায়েজ করতে থাকে, দেশকে পুরো নিরাপত্তাহীন করে তোলে সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনে অসংখ্য মানুষকে আবরারের নাম নিয়ে দাঁড়ানো অবশ্য কর্তব্য।’
তিনি বলেন, আজ বাংলাদেশের তিনদিকে ভারতের কাঁটাতার। আরেকদিক খোলা ছিল, সেখানে ভারতের জাহাজ। আর সেই জাহাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের রাডার। সেই রাডার দিয়ে আমাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি হবে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে র্যাব-পুলিশের নজরদারিতে ভারত সন্তুষ্ট নয়। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার যে নজরদারি এখনও চলছে তাতেও তারা সন্তুষ্ট নয়। তারা প্রকাশ্যে রাডার বসিয়ে বাংলাদেশের ওপর নজরদারি করবে নিরাপত্তার নামে।
‘ভারতের এই তিনদিকে কাঁটাতার, একদিকে জাহাজ আর রাডার, এটাইতো আমাদের নিরাপত্তাহীনতার বড় কারণ।’
তিনি আরও বলেন, এসবের বিরুদ্ধে যে তরুণরা কথা বলবে, সেই তরুণরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অধিকার লড়াইয়ে শামিল হতে পারে। কারণ প্রশ্ন যারা তুলতে পারে, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে, যারা ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের দায় থেকে কথা বলতে পারে, তারাই পরিবর্তন আনতে পারে।
শুদ্ধস্বর/এস এ কে

