টোল ! কেন নয় ?

পত্রিকায় দেখলাম পদ্মা সেতুর টোল নির্ধারণ হচ্ছে। পদ্মা সেতু শেষ হয়নি, চালু হয় নি, কিন্তু টোল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ পত্রিকায় বেশ আলোচনা শুরু হয়ে গেছে! অবশ্য সরকারের ভাষ্য পত্রিকায় প্রকাশের পরেই এমনটি হচ্ছে। এটা অবশ্য ভালো দিক যে, পূর্ব থেকেই এই টোল নিয়ে আলোচনা হওয়ায়, সরকার ভবিষ্যতে টোলের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ  করতে পারবে এবং জনমানুষও সঠিক অধিকার পাবে আধা করা যায় ।

একটু দেখে নেই টোল ইউরোপে কিভাবে হয়? আগেই বলে নিচ্ছি, ইউরোপের সাথে কোনো তুলনা করছি না, শুধু একটু দেখার চেষ্টা ইউরোপে কিভাবে টোল আদায় হয়? আমাদের মত দেশকে বাহিরের থেকেই শিখতে হয়, তাই উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা মাত্র । আমার দেখায় সমগ্র ইউরোপের দেশগুলোতে রাস্তাগুলো কয়েকটি ভাগে ভাগ করা থাকে। যেমন, শহরের রাস্তা, শহর লগ্ন পাশের রাস্তা এবং হাইওয়ে । অর্থাত্ শহরের ভিতরের রাস্তাগুলো কম গতিতে গাড়ি চলাচল জন্য , শহরের পাশের রাস্তাগুলো দ্রুত গতিতে চলাচলের জন্য এবং হাইওয়ে অতিদ্রুত গতিতে চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয় । এখানকার সরকারগুলো এই সকল রাস্তায় চলাচলের জন্য যে পদ্ধতিতে টোল আদায় করে, সেটা বেশ প্রশংসনীয় বলতেই হবে। এই টোলের বিষয়ে বলার পূর্বে একটি কথা বলা অতি জরুরী, আর তা হলো, এখানকার জনমানুষ টোল অতি আগ্রহের সাথেই দিয়ে থাকে, তার পিছনের কারণটি স্পষ্ট, কেননা সুযোগ সুবিধে সেরকম পায় বলেই। পার্সেন্টটা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি বলা যায় । কেউ কেউ যে এই টোলের কারণে সরকারকে বকাঝকা করে না, এমনটি নয়। তবে সেই মানুষদের কথায় তেমন কোনো যুক্তি থাকে না। তবে গণতান্ত্রিক অধিকার বলে সরকারকে বকাঝকা করে যায় । এমনকি তাদের অত্যুক্তির কথাগুলোও রাজনীতিবিদদের টেবিলটকে আলোচনায় শুনেছি।

মূলত পায়ে হেঁটে বা গাড়িতে চড়ে, যেভাবেই আমরা চলাচল করি অথবা বসবাস করি , সেটার জন্য পৃথিবীর সব দেশের সরকারই জনগণের নিকট হতে ট্যাক্স নিয়ে থাকে। আমাদের দেশেও ভিন্ন কিছু নয়। শুধু পার্থক্য হলো আমাদের সরকার আমাদেরকে তার বিপরীতে কি উপহার দিচ্ছে? সরকার ট্যাক্স না নিলে এতসব তৈরি করবে কিভাবে? কিংবা দেশের জনগণের জন্য ভালো জীবনমান ও বসবাসের জন্য উপযুক্ত করবে কি করে ? সরকারের তো নিজের কোনো টাকা থাকে না। একটি সরকার মূলত সকল জনগণের সম্পদকে অর্থাত দেশের সম্পদকে  সমষ্টিগতভাবে পরিচালনা করে থাকে। সুতরাং সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সরকারকে তো ট্যাক্স বা ভিন্ন অর্থে টাকার যোগান জনগণকে দিতেই হবে। আর এটা দেওয়ায় উদ্দেশ্যে হলো, সরকার সকলের নিকট হতে সম্পদ বা ট্যাক্স/ভেট আদায় করে , সেই জমা সম্পদকে সকলের জন্য সুবন্টনের ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই সরকারের প্রধান কাজ। সরকার তো আর সেই সম্পদকে জনগণের মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয় না এবং এটা হয়ও না। তবে সরকার যা করে, সেটা হলো, এই সম্পদের মাধ্যমে জনগণকে জীবনে চলার পথে নানান সুযোগ  সুবিধা  তৈরি করে দিবে এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশকে ভালো রাখার চেষ্টা করবে। এই জন্যেই তো গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আমারা আমাদের মতের ভিত্তিতে সরকার নির্ধারণ করি। যেন সরকারটি আমাদেরর সকলের হয়।

এবার ফিরে আসি আসল কথায়, টোল। ইউরোপের দেশগুলোতে শহরের রাস্তা বা শহর লগ্ন পাশের রাস্তার জন্য কোনো আলাদা টোল দিতে হয় না, এটা নিয়মিত ট্যাক্স/ভেটের মধ্যেই আদায় হয়। আমাদের দেশেও একই পদ্ধতি চলে। তবে  ইউরোপের হাইওয়ে ব্যবহারের জন্য প্রতিটি গাড়িকেই বাৎসরিক একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা প্রদান করতে হয়, অর্থাত নির্দিষ্ট পরিমান টাকার মাধ্যমে বছরের শুরুতেই একটি স্টিকার কিনে তা গাড়িতে লাগিয়ে রাখতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো, এই স্টিকার কি সবাই কিনতে বাধ্য? উত্তর হলো না। যদি কেউ হাইওয়ে ব্যবহার করতে চায়, তার জন্য কিনতে হবে। আর যেহেতু হাইওয়ে ব্যবহার না করেও দেশের ( এখানে বলে রাখা ভালো কেবলমাত্র দেশের ভিতরে ) সকল প্রান্তেই শহর লগ্ন পাশের রাস্তা ব্যবহার করে যাতায়াত করা যায়, সেই হেতু হাইওয়ের স্টিকার কেনাটা বাধ্যতামূলক নয়। এখানে বলা ভালো যে,শহর লগ্ন পাশের রাস্তা ব্যবহারেও কোনো আলাদা স্টিকার কিনতে হয় না এবং এই রাস্তাগুলোর গতি সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার হয়ে থাকে। সুবিধা/অসুবিধা বলতে পার্থক্য হলো, হাইওয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে চলাচল করে দেশের অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে সময়ের ক্ষেপন কম হয়। আবার ভিন্ন একটি সুবিধে আছে, তা হলো, কেউ যদি বছরে মাত্র একদিনের প্রয়োজনে হাইওয়ে ব্যবহার করতে চায়, সেটাও সম্ভব । কেবলমাত্র একদিনের হাইওয়ে স্টিকার কেনার সুযোগ আছে, তবে তুলনামূলক দাম বছরের হিসেবে একটু বেশি হবে। আবার ইচ্ছামত সাপ্তাহিক, মাসিক কিংবা ত্রৈমাসিক অথবা অর্ধবছরের স্টিকার কেনার সুবিধে আছে, তবে মাত্রাভিত্তিক দাম একটু বেশি হবে। এই বাৎসরিক স্টিকার থাকলেই কি সর্বত্র আর কোনো টাকা পয়সা খরচ না করেই চলাচল করতে পারবে ? উত্তর হচ্ছে না। কেননা , ইউরোপের দেশগুলোর প্রায়শই বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন নিয়ম কানুন আছে। অঙ্গ রাজ্যে বিভেদে ভিন্ন অঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন টানেল বা ব্রিজ ব্যবহারে দৈনিক বা সময় ভিত্তিতে আলাদা টিকেট বা স্টিকার কিনতে হয়। সাধারণত সেই অঙ্গ রাজ্যেগুলোর টানেল বা ব্রিজগুলো মূলত পাশর্বর্তী দেশে যাতায়াতে বেশি ব্যবহার হয়। সেই কারণেই এইগুলোর জন্য আলাদা টাকা প্রদান করা লাগে। তবে এই রাস্তার টানেল বা ব্রিজ ব্যবহারে করে অল্প সময়ে দ্রুত গতিতে ইউরোপের যে কোনো দেশে ভ্রমণ বা যাতায়াত বেশ সুবিধাজনক বটে।

এখন আসি পদ্মা সেতুর টোলের কথায় । পদ্মাসেতু ঋণ করে নয়, নিজের দেশের টাকায় তৈরি হয়েছে, এটা নিয়ে অনেকেই কম বেশি অনেক আলোচনা করে আসছেন বা করছেন! আলোচনা হোক বা হবে, সেটা নিশ্চয়ই আপত্তির নয়। পদ্মাসেতু তার বিশ্ব ব্যাংক কাহিনী থেকেই মূলত এত আলোচনা। কেউ বলেন বিশ্ব ব্যাংক থেকে অল্প সুদে ঋণ হলে ভালো হতো , আবার কেউ বলেন নিজের টাকায় করে দাম বেশি হলো, ইত্যাদি ইত্যাদি । জনগণ নানান কিছু বলবে, সেটা আজকের বিষয় না মোটেও। আজকে টোল বিষয় নিয়েই আলোচনা । সরকার টোল নিবে। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি অবশ্যই টোল জনগণকে দিতে হবে বা দেওয়া উচিত। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ( প্রশ্নের ভিত্তি কি , জানিনা) আগে ফেরি দিয়ে  কম পয়সায় যাতায়াত করা যেতো, আগামীতে ব্রিজ ব্যবহারে গাটের বেশি টাকা খরচ হবে। তাছাড়া বাইক বা গাড়িতে যে পরিমাণ টাকা প্রদান  করতে হবে ( জানিনা, হিসেবে কোথা থেকে এসেছে!) সেটা অতিমাত্রায়! এখানে দুটো বিষয় বলা ভালো। প্রথমত: বাইক বা গাড়ি ব্যবহার করা , এটা এককভাবে চলাচলের আরামদায়ক বা সুবিধেজনক যানবাহন । সুতরাং এগুলোর জন্য অবশ্যই তুলনামূলক বেশি টোল হওয়া অতি স্বাভাবিক বলেই মনে করি । কেউ সুবিধে বেশি নিলে, সেই তুলনায় খরচ বেশি করবে, এটাতো স্বাভাবিক ধারণায়ও সঠিক হওয়ার কথা। দ্বিতীয়ত : সময় । পদ্মা সেতু নিশ্চয়ই ফেরির চেয়ে অনেক দ্রুত ও নিশ্চয়তার হবে । সুতরাং টোলতো স্বাভাবিক কারণেই বেশি হবে।  তবে হ্যাঁ গণ পরিহবন সকল জনমানুষের কথা বিবেচনায় রেখে অবশ্যই টোল তুলনামূলক মাত্রায় থাকা উচিত। আর একটা বিষয়, যা আমরা ভাবি না! তা হলো, এককভাবে গাড়ি  বা বাইক বেশি চলাচল আর সমষ্টিগতভাবে গণ পরিবহন চলাচলে পরিবেশ ও রাস্তা-ঘাটের ভবিষ্যতের উপর একটি বিষয় জড়িয়ে আছে।

ধারণা থেকে বলছি, আমদের দেশের মানুষ, আমরা এখনও সব কিছুই সরকারের নিকট হতে শতকরা হারে সকল সুযোগ সুবিধে পেতে চাই, কিন্তু বিপরীতে দিতে চাই না। এই অভ্যাসটি আমাদের জনমানুষের পরিবর্তনের চুড়ান্ত সময় বলেই মনে করি।  আর পাশাপাশি সরকারের জন্য বলবো, একটি দেশের সরকার জনগণের কাছ থেকে যে ট্যাক্স/ভেট/টোল নেয় তা জনগণকেই শতভাগ ফিরিয়ে দিতে হয়। তাছাড়া একটি সরকার ট্যাক্স/ভেট/টোল সবকিছুই জনগণের আয়ের উপর সঠিক হিসেব রেখেই আদায় করতে পারে এবং সেটার সর্বোচ্চ  সুযোগ সুবিধা জনগণকে ফিরত দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব ও অঙ্গীকার থাকতে হয়, তাহলেই জনগন স্বতস্ফূর্তভাবেই হাত বাড়িয়ে বিনা সমালোচনায় সরকার কে অবশ্যই ট্যাক্স/ভেট/টোল সব কিছুই দিতে আগ্রহী হবে।  সরকারের মনে থাকা ভালো যে, ” দুই হাত ব্যবহারে, হাত ভালো পরিষ্কার হয়”। 

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.