বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব আবেদ খানের অনুসন্ধানী ধারাবাহিক ‘ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি (নয়), জাসদের জন্মরহস্য’ শিরোনামে লেখাটি কয়েকবার পড়লাম। পড়ে কষ্ট লাগলো এ কারণে যে, জনাব আবেদ খানের মত সাংবাদিক অন্যের কাছ থেকে ধার করা তথ্যকে অনুসন্ধানী লেখা হিসেবে চালিয়ে দেবেন- ভাবতেও পারছি না। অবশ্য এ জন্য তাঁকে কোন কৈফিয়তও দিতে হবে না। সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে?
পুরো প্রতিবেদনে তিনি যা লিখেছেন সে সব কথা প্রায়শই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও জাসদ সমালোচকদের মুখে শুনতে পাওয়া যায়। জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ রচিত জাসদের উত্থান পতন অস্থির সময়ের রাজনীতি বই থেকে ধার করা তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জাসদ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনামুলক বহু গ্রন্থ পাওয়া যায়। সেসব বইয়েরও কোন রেফারেন্স নেই। বিভিন্ন সময়ে নেতা ও সমালোচকদের কথা এবং জনাব মহিউদ্দিন আহমেদের বইয়ের কয়েকটি পাতা তুলে ধরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলায় খুবই কষ্ট পেলাম। আশা করেছিলাম অপ্রকাশিত কোন বিষয় তিনি তুলে ধরবেন। জনাব মহিউদ্দিন আহমেদের বইটি নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক সমালোচনা হয়েছে। তাই সে বিষয়ে খুব কিছু বলার ইচ্ছে নেই।
আর জাসদ রাজনীতির আত্মপ্রকাশ, উত্থান, পতন এবং সাংগঠনিকভাবে বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে মানুষ যতটা পড়ার সুযোগ পেয়েছে, আর কোন রাজনৈতিক দল নিয়ে তা হয়নি। তাই জনাব আবেদ খানের লেখায় নতুন কোন কিছু না পেয়ে হতাশ হয়েছি এবং এটাকে অনুসন্ধানী লেখা হিসেবে মেনে নিতে পারছি না।
যতটুকু জানি, জনাব আবেদ খান সাহেব বছর তিন/চার বছর আগেও গণজাগরনের সহযোদ্ধা সাথী স্নেহভাজন F M Shahin য়ের Daily Jagoran.com এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সে সময় শাহিনের আহবানে ‘গৌরব ৭১‘ এর শাহবাগের সভায় আমি নিজেও উপস্থিত হয়েছি। সে সভা গুলোতে তিনি বক্তৃতা করতেন। পরবর্তীতে শুনলাম F M Shahin কে ক্ষতিগ্রস্থ করে (আর্থিক ও সামাজিক ) করে তিনি নিজেই দৈনিক জাগরণ’ নামের পত্রিকাটির মালিক সম্পাদক হয়েছেন। সে সময় F M Shahin উনার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থের বিষয় নিয়ে বেশ কিছুদিন ধারাবাহিক ভাবে ফেসবুকে লিখেছিলো ।
এরপর তিনি নিজেই DAILY JAGARAN.COM নামে নতুন করে আরেক পত্রিকা শুরু করেন। পত্রিকাটি যখন ডিক্লিয়ারেশন পায় তখন সরকারের তথ্যমন্ত্রী ছিলেন, জাসদ নেতা জনাব হাসাানুল হক ইনু। যদিও পত্রিকার ডিক্লিয়ারেশন দেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, কিন্তু নামের ছাড়পত্র এবং পরবর্তী সকল কাজই সম্পাদন করা হয় চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি)। এ অধিদপ্তরটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাই জনাব আবেদ খানের পত্রিকা ডিক্লিয়ারেশন পাওয়া, ডিএফপি-তে মিডিয়া তালিকাভুক্ত হওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে জনাব হাসানুল হক ইনুর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিলো।
এ সময়ে কর্ণেল তাহের সংসদের উদ্যোগে ‘তাহের দিবস’ উপলক্ষে টিএসসি-তে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় জনাব আবেদ খান আলোচক হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন। সেদিন কর্নেল আবু তাহের, বীর উত্তম সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। যদিও কথিক এ অনুসন্ধানী লেখায় একটি বাক্যের মাধ্যমে কর্নেল তাহের সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়েছে। এদিকে সরকারের মেয়াদ শেষে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ‘জাগরণ’ পত্রিকা নিয়ে বাণিজ্য তো করতে হবে?
আবার জানা যায় যে, জনাব আবেদ খান ৮০’র দশকে প্রয়াত সাংবাদিক জনাব মাহফুজ উল্লাহকে সাথে নিয়ে বিএনপি সমর্থক প্যানেলে সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনও করেছিলেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির ব্যানারে গড়ে ওঠা প্রবল আন্দোলন। এ আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্য়ায়ে অর্থাৎ গণআদালতের আগের দিন হঠাৎ করেই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সাথে নেতৃবৃন্দের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কোন নেতাই জাহানার ইমামের সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। তখন প্রয়াত জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহমেদ খুজা-খুজি করে জনাব আবেদ খান সাহেবের বাসা থেকে জাহানারা ইমামকে উদ্ধার করেন। জানা যায় যে, জনাব আবেদ খান সাহেব পরিকল্পনা করেছিলেন যে, শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে সরিয়ে রাখলে গণআদালত নিয়ে নেতৃবৃন্দ সমস্যায় পড়বেন। আন্দোলনকারীরাও বিভ্রান্ত হবেন। এ সুবাদে গণআদালত বন্ধ হয়ে যাবে, বন্ধ হয়ে যাবে যুদ্ধাপরাধী বিরোধী তীব্র আন্দোলন।
এদিকে কোন কোন আওয়ামী লীগ নেতার মতো তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জাসদ রাজনীতি ওপর খুব খুশি নন। তাই নতুন তথ্যমন্ত্রীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হলে জাসদের বিরুদ্ধে একটা কড়া সমালোচনামুলক লেখা প্রয়োজন। এজন্য হয়তো জনাব আবেদ খান জাসদ নিয়ে এমন একটি মনগড়া গদ্য লিখেছেন। এ বিষয়ে জাসদ রাজনীতির সমর্থক বা কর্মীদের মন খারাপ করার কিছু আছে বলে মনে হয় না। এ কারণে জনাব আবেদ খান সাহেবেকে গালিগালাজ করারও কোন যুক্তি নেই। তাই জনাব আবেদ খান সাহেবের লেখায় জাসদের বেশি ক্ষতি হবারও সম্ভাবনা নেই। এ লেখার মাধ্যমে জনাব আবেদ খান সাহেব যদি সরকারের সুনজরে আসতে পারেন এবং সরকারের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পারেন তাতে জাসদ কর্মীদের ক্ষতি কোথায়?
তবে বলা যায় জনাব আবেদ খানও তো খন্দাকার মোস্তাকের মত অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিলো।
বিষয়টি একটু ইতিবাচকভাবে চিন্তা করলে, জাসদকে সমালোচনা করে বা মন ভরে দুটো গালি দিয়ে বা অপবাদ দিয়ে একটা লোক তো উপকৃত হলো?
তবে এ লেখা পড়ে একটি ঘটনা আমার মনে পড়লো। শুনেছিলাম যে, কেউ তদবিরের জন্য শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে গেলে তিনি তদবির শেষে আগত ব্যক্তিকে আরো পাঁচটি টাকা ধরিয়ে দিতেন। ঐ ব্যক্তি টাকা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে শেরেবাংলা বলতেন, টাকা দিলাম একটা বাঁশ কেনার জন্য। তোমার উপকার করলাম, পরে আমাকে বাঁশ দেবে না? সে বাঁশটা কিনবে কিভাবে? তাই যাতে সময় মত বাঁশ দিতে পারো সে জন্য টাকা দিয়ে দিলাম। জনাব হাসানুল হক ইনুকে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করছে যে, পত্রিকা ডিক্লিয়ারেশনে সহযোগিতা করে জনাব আবেদ খান সাহেবকে কত টাকা দিয়েছিলেন? আপনাকে দেওয়ার জন্য সে টাকায় বাঁশটা কিনতে পেরেছেন কি-না?
দ্বিতীয় আরেকটি কারণ থাকতে পারে। জাসদকে গালি দিয়ে অনেকেরই কিছু ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ আছে। আবার সেই জাসদকেই গালি দিয়ে বড় বড় কথিত অনুসন্ধানী লেখা মাঝে মাঝেই পাওয়া যায়। জাসদ নেতৃবৃন্দ এবং কর্মী-সমর্থকরা বুঝতে পারে যখন কোন নেতা রাজনৈতিক বা সাংগঠনিকভাবে সমস্যায় থাকেন তখন জাসদকে গালিগালাজ বা সমালোচনা করে বক্তৃতা দেন।
লক্ষ করবেন, আওয়ামী লীগের কিছু নেতা কোন কারণ ছাড়াই সংসদে বা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তীব্রভাষায় জাসদকে গালাগাল দিয়ে থাকে। এ দেখে বুঝতে হবে যে, ঐ নেতা দলের মধ্যে সংকটে আছেন। সেই সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন। কিছু সাংবাদিক ভাইয়েরাও এ পথটা চিনে ফেলেছেন। তারাও কিছু পাওয়ার আশায় বা কিছু আদায় করার লোভে বড় আওয়ামী লীগার সাজতে এবং নেত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে জাসদের বিরুদ্ধে লেখাকে কৌশল হিসেবে বেছে নেয়। হয়তো জনাব আবেদ খান সাহেবের তেমন কোন পরিকল্পনা রয়েছে। তাই এ লেখা নিয়ে জাসদ নেতা-কর্মীদের মন খারাপের কোন কারণ নেই।
কোন কারণ নেই হঠাৎ করে বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব জাফর ওয়াজেদ একটি অনলাইনে জাসদের বিরুদ্ধে কয়েক দিন লিখলেন। এখন তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)’র চুক্তিভিত্তিক মহাপরিচালক। জনাব পীর হাবিবুর রহমান ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময় চ্যানেলগুলোতে অস্বাভাবিক সরকারের সমর্থনে কি সুন্দর গুণকীর্তন ও স্তুতি গাইতেন!!! জেনারেল মঈন উ আহমেদকে মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের সাথে তুলনা করেছিলেন। সেই ক্ষতি তো দূর করা প্রয়োজন। আর এ জন্যই কিছুদিন আগে জাসদকে তুলোধুনো করে লিখে সরকারের কাছে নিজকে আওয়ামী লীগ ভক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন।
জনাব আবেদ খান লিখেছেন, জাসদের জন্ম রহস্যজনক। এখানে রহস্যের কি দেখলেন তিনি বুঝতে পারলাম না। জনাব আবেদ খান সাহেবদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, একটি দেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম অনেক রাজনৈতিক উপাদানের জন্ম দেয়। সমাজ বিজ্ঞান তাই বলে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ যুবসমাজের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটায়। সে সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী সমাজাতন্ত্রিক আন্দোলন চলছিলো। এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামে হোচিমিনের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিলো। ভিয়েতনামের সশস্ত্র সংগ্রাম বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদেরও অনুপ্রাণিত করে। এ ছাড়াও স্বাধীনতাপূর্ব সময় থেকেই ছাত্রলীগের একটি বড় ধারা সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে আসছিলো।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ছাত্রলীগের বর্ধিত সভায় প্রচার সম্পাদক বাবু স্বপন কুমার স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ ঘোষণার প্রস্তাব তুলেছিলেন। এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়ে বর্ধিত সভায় প্রচণ্ড বিতর্ক শুরু হয়। অবশেষে বিষয়টি সুরাহা করতে বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতাতেও সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। হঠাৎ করে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা সমাজতন্ত্রের স্লোগান তোলেনি। একটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির বিষয়টি এসেছে। এ ভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়া ভেতের দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এদেশের যুবসমাজসহ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা গড়ে ওঠে। এ সব বিষয় জনাব আবেদ খান সাহেব না বুঝলেও এটাই ছিল বাস্তবতা।
স্বাধীনতার পর একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রেক্ষাপট ছিল বলেই কয়েকজন তরুন ছাত্রনেতার ডাকে সারা দিয়ে হাজার হাজার যুবক জাসদের পতাকা তলে সমবেত হয়েছিল। ৩১ অক্টোবর ১৯৭২ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মুলত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টরা জাসদে যোগ দেয় বা জাসদ গঠন করে। এরা কেউই জাতীয়ভাবে পরিচিত রাজনীতিক ছিলেন না। তবুও আত্মপ্রকাশের পর জাসদ বিপুলভাবে জনসমর্থন পায়।
এ কথা মানতেই হবে যে, বঙ্গবন্ধুর পাহাড়সম জনপ্রিয়তা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের রেডিক্যাল ফোর্সটিকে ধরে রাখতে পারেনি। এ জন্য কেউ কেউ ভারতের জেনারেল উবানসহ বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দায়ি করে থাকেন। তাই যদি হবে, আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিশ্বের তাবত গোয়েন্দা সংস্থা মিলে উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশে জাসদের মত (প্রতিষ্ঠাকালীন) একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারবে? এ সব বিষয় জনাব আবেদ খান সাহেবদের মনে রাখা প্রয়োজন।
হয়তো প্রশ্ন হতে পারে, কেন ওই তরুন ছাত্রনেতারা এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের প্রথম কাউন্সিলে যে বিভক্তি দেখা দেয় বঙ্গবন্ধু তা কি নিরসন করতে পারতেন না? আমার বিশ্বাস অবশ্যই পারতেন। তিনি কোন অংশের কাউন্সিলে উপস্থিত না হয়ে দু’পক্ষকে ডেকে ধমক দিলেই হয়তো সেদিন ছাত্রলীগ দ্বিধাবিভক্ত হতো না। আর জাসদ গঠনের প্রেক্ষাপটও গতিশীল হতো না। কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধু তা করতে পারেননি। কেন দুপক্ষকে একসাথে রাখলেন না, সে বিষয়টি বিশ্লেষণে থাকা প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু বিশেষ উদ্দেশে বা ফরমায়েসে কোন লেখা লিখলে এসব বিষয় বিবেচনায় আসার কথা নয়। জনাব আবেদ খান সাহেবের বেলায়ও তাই ঘটেছে। সে কারণে বিষয়টির বিশ্লেষণ না করে তিনি বিদেশি গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টার মত সস্তা কথা লিখেছেন তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। জনাব আবেদ খান লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের অর্জন বিধ্বস্ত করার লক্ষ্যেই জাসদের জন্ম ঘটানো হয়।’ কতবড় অর্বাচিন হলে এমন উদ্ভট বিশ্লেষণ আসতে পারে। একজন নেতাকে হত্যা করতে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হয়? আশ্চর্য়!!! একজন নেতাকে হত্যার জন্য একটি রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্ভট তত্ত্ব পৃথিবীতে এটাই প্রথম শুনলাম।
পল্টনে বক্তৃতার মত জনাব আবেদ খান সাহেব খুব সহজভাবে বলে দিলেন যে, মুজিব নগর সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির সাথে জাসদের যোগাযোগ থাকার কথা। সেই শক্তির সাথে জাসদের কবে সখ্যতা ছিল বা হয়েছিল তা তিনি বলেন নি। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারীদের কাছে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব উত্থাপনের অদ্ভুত তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের উচ্ছিষ্ট লাভের প্রত্যাশায় জনাব আবেদ খান সাহেব মোস্তাক মন্ত্রীসভার সদস্যদের নাম বেমালুম চেপে গেছেন।
খন্দকার মোস্তাকের সাথে সখ্য গড়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করলো জাসদ অথচ খন্দকার মোস্তাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিলো না! কি অদ্ভুত কথা!! বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোস্তাক খুব শাস্তিতে ছিলেন না। মোস্তাক সামরিক বাহিনীর পূর্ণ সমর্থনও পায়নি, সমর্থন পায়নি কোন রাজনৈতিক দলের। বঙ্গবন্ধু হত্যার কথিত প্রেক্ষাপট সৃষ্টিকারী জাসদও সমর্থন দিলো না, অথচ জনাব আবেদ খান সাহেবের ভাষ্যমতে হত্যাকাণ্ডের পেক্ষাপট সৃজনকারী জাসদের তো খন্দকার মোস্তাক মন্ত্রিসভায় একাধিক নেতার মন্ত্রীত্ব পাওয়ার কথা। তার পরিবর্তে খন্দকার মোস্তাক মন্ত্রিসভার সকল সদস্যই ছিল আওয়ামী লীগ নেতা।
জনাব আবেদ খান সাহেবের নিশ্চয়ই জানা আছে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশের প্রচলিত আদালতে বিচার হয়েছে। দীর্ঘসময় নিয়ে এ মামলার অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ সম্পাদন করা হয়েছে। সেই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন বা রায়ের কোন পর্য়ায়ে বলা হলো না যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাসদের সম্পৃক্ততা ছিল। অথচ জনাব আবেদ খান সাহেব সিআইএ’র কাছ থেকে টাকা নিয়ে জাসদের আন্দোলন গড়ে তোলার তত্ত্ব দিলেন! টাকা হলেই আন্দোলন গড়ে তোলা যায়—এমন উদ্ভট কথা জনাব আবেদ খান সাহেবরাই বলতে পারেন।
জনাব আবেদ খান সাহেবের এমন কথার কারণে আমি প্রচণ্ড বিভ্রান্ত। কেউ বলেন, জাসদ মুলত ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর তৈরি। জেনারেল উবান এর পেছনে কাজ করেছিলেন। আবার জনাব আবেদ খান লিখেছেন, প্রচণ্ড আন্দোলন গতে তুলতে জাসদেকে সিআইএ অর্থ দিয়েছিল। আমার জানামতে সে সময়ে বিশ্বরাজনীতিতে ঠাণ্ডা লড়াই চলছিলো। এর নেতৃত্বে ছিল একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, অপরদিকে মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুলভাবে সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশকে সহযোগিতার জন্য ভারত সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে শান্তি চুক্তি করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে। তা হলে সোভিয়েত সমর্থক সেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর সৃষ্ট জাসদের ভেতরে আবার প্রতিদ্বন্দ্বী সিআইএ কিভাবে এলো?
জনাব আবেদ খান সাহেব হয়তো জানেন , জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জাসদ ও আওয়ামী লীগসহ সমমনা রাজনৈতিক দল নিয়ে আট দলীয় জোট গঠন করা হয়েছিল। জাসদ নেতারা সে সময়ে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের জোর করে রাজপথে নামিয়ে আনে। একটি রাজনৈতিক দলের বিরোধীতা করা আর হত্যাকণ্ডের মত জঘন্য রাজনীতি এক কথা নয়। জনাব আবেদ খান সাহেব উচ্ছিষ্ট পাওয়া আশায় অবলীলায় বলে দিলেন যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে জাসদ গঠন করা হয়।
২০০১-২০০৬ সালে বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় ছিলো। এ সময়ে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটে। এ উত্থানে প্রত্যক্ষ মদত দেয় রাষ্ট্রক্ষমতা অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত। মৌলবাদের আস্ফালনে ভীতসন্ত্রস্ত ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষ এবং সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকরী আওয়ামী লীগও মৌলবাদের উত্থান মোকাবিলায় এককভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে নি। এমন এক পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন হয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল রাজনৈতিক দলের একটি মঞ্চ। গঠন হয় মহাজোট। এ মহাজোট গঠন করা হয় নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে জামায়াত-বিএনপিকে মোকাবিলা করতে; মৌলবাদের অবসান ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করা।
জনগণও মহাজোটের পক্ষে রায় দেয়। এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য যে মহাজোট গঠন না হলে ঐ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতকে মোকাবিলা করা আওয়ামী লীগের একার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনও একই সমীকরণে অনুষ্ঠিত হয়। সেই লক্ষ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
এরপরও দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির নিরব উত্থান ঘটছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন কার রাষ্ট্রীয় নীতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির বিষবাষ্পকে প্রতিরোধ করা। জাসদসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য গড়ে তুলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের আশ্রয়দাতাদের প্রতিরোধ করার সংগ্রাম চালানো। এ সময়ে এ সব সুবাধাবাদীদের দৌড়াত্মেই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। আজও তেমনি একটি গোষ্ঠীর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনাব আবেদ খানরা কার স্বার্থ রক্ষা করছেন, তা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসীদের বুঝতে হবে, সজাগ থাকতে হবে।
কাজী সালমা সুলতানা
রাজনীতি বিশ্লেষক এবং গণমাধ্যম কর্মী ।

