সমগ্র ইউরোপের তালিকাভুক্ত ৪৭ টি দেশের প্রায়শই দেশেই এখন চুড়ান্ত গ্রীষ্মকালীন সময় চলছে এবং সাথে খুবই সাধারণ কারণেই সকল বিদ্যাপ্রতিষ্ঠান গুলোর ছুটি । সমগ্র ইউরোপ জুড়েই চলছে গ্রীষ্মকালীন ছুটির আমেজ। বরফের দেশগুলোতে রোদ্দুর একটি বড় বিষয় । যদিও এবার যতটুকু রোদ এবং তাপমাত্রা পাওয়া যাচ্ছে, সেটাও অনেকটা অস্বাভাবিক বটে। জলবায়ুর পরিবর্তনের রাশ সমগ্র বিশ্ব জুড়েই আক্রান্ত ( সেটা ভিন্ন আলোচনা)। ইউরোপের বরফের দেশগুলোর মানুষগুলো সাধারণত এই গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় বিভিন্ন দেশের সাগরজল আর রোদ্দুর জন্য ছুটে বেড়ান। আমার এবারের ছুটির প্ল্যানটি যদিও একটু ওলটপালট হয়ে গেছে, সেই ওলটপালট সূত্রেই গত সপ্তাহে ছিলাম ” ক্রিক ” নামক দ্বীপটিতে। সকলের সাথে ক্রিক দ্বীপটির বিষয়েই কিছুটা অভিজ্ঞতা ভাগ করার উদ্দেশ্যে আজকের লেখা।

ক্রোশিয়া দেশটির সম্বন্ধে বলার পূর্বে একটু পিছনে ফিরে যাই, ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন ছুটির বিষয়ে। সাধারণত ইউরোপীয়রা গ্রীষ্মকালীন ছুটির জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্পেন/ইতালি/গ্রিস/তুরস্ক এই সকল দেশের দ্বীপগুলোতে ছোটাছুটি করে থাকে, তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে এই ক্রোশিয়া দেশের দিকে তাদের নজরটি বেশ ভালোই লক্ষ্য করা যায় । ক্রোশিয়া বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও তেমন কোনো ধনীক শ্রেণীর দেশ ছিলো না, এমনকি বর্তমানেও তেমনটা নয়। তবে এই ক্রোশিয়া দেশটি তাদের রাষ্ট্রের দ্বীপগুলোকে বিংশ শতাব্দীতে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে। এই দ্বীপগুলোকে ব্যবহার করে এরা এখন ধীরে ধীরে বেশ ধনীক শ্রেণী রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এটা একটা অর্থনৈতিক আলোচনা, আমি সেদিকে যাচ্ছি না। তবে একটু পরিষ্কার করে বুঝাবার জন্য একটি তুলনামূলক অর্থনৈতিক পার্থক্যের কথা বলি। আমি ২০০৩ সালে ক্রোশিয়ার ইস্ত্রিয়ান দ্বীপে এক সপ্তাহ ছিলাম। সেই সময়ের সুযোগ সুবিধার চেয়ে এখন প্রায় সকল দ্বীপগুলোতেই অনেক অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় । মনে পরে সেই সময়ে এক কাপ কফির দাম বর্তমানের দামের চেয়ে প্রায় অর্ধেকের কম ছিলো। এই দামের বিষয়টি সকল ক্ষেত্রেই এখন প্রযোজ্য । সেই সময়ে তিনজনের ছুটির খরচ বর্তমানে একজনের সমান (আনুমানিক হিসেব)। তারপরেও এই ক্রোশিয়ায় অন্যান্য দ্বীপরাষ্টের চেয়েও এখনও কম খরচ, সুযোগ সুবিধে ও স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং নিরাপত্তা শতভাগ । যার ফলাফল সমগ্র ইউরোপের দেশগুলো থেকেই ক্রোশিয়াতে গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটানোর একটা রগরগে ভাব আছে। তাছাড়া এটা স্বীকার করতেই হবে, ক্রোশিয়া একটু উচ্চুতে অবস্থানের কারণে এই দেশটির সকল দ্বীপের সাগর জল এতটাই পরিষ্কার যে , সাগরজলের যত গভীরেই চোখ যায়, সব কাঁচের মত সচ্ছ । আর দ্বীপ ভেদাভেদে জলের রং নীল/গাড়নীল/সবুঝ/তুকিজ( হালকা সবুজ) /স্মারাত ( হাল্কানীল) এমনকি গাড় কালো রংয়ের । দু-তিনটি বালুর সৈকত ছাড়া সবগুলো সৈকতই পাথর আর নুড়ি পাথরের। এই পাথর আর নুড়ি পাথরের কারণে সাগরজল সাধারণত যতটা নোনা হয় , সেই তুলনায় অনেকাংশেই কম নোনা হয়।

ক্রোশিয়া রাষ্ট্রটিতে সর্বমোট ১২৪৭ টি দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে এবং মাত্র ৪৭ টি দ্বীপপুঞ্জে মানুষের বসবাস । অনেক বড় বড় দ্বীপগুলোর মাঝে ক্ষুদ্রতম দ্বীপটি মাত্র ১০ বর্গ কিলোমিটার। ক্রিক দ্বীপটি ৪০৬ বর্গ কিলোমিটার মাত্র । এই দ্বীপে জনসংখ্যা ১৭,৮৬০ জন। গড় হিসেবে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৪৪ জনের বসবাস । ক্রিক মূলত দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। ক্রিক, (ল্যাটিন Curicta, ইতালির Vegila, ভালমাটিয়ান বিকলা, জার্মান প্রাচীনকালের Vegl) Adriatic আদ্রীয়া সাগরের একটি ক্রোশিয়া দ্বীপ। এই ক্রিক দ্বীপটি রিয়েক্কার দক্ষিণ/পূর্ব কাভারেয়ার উপকূলে অবস্থিত । ১৯৮০ সাল থেকে ক্রিক ব্রিজের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে সংযুক্ত হয়েছে। দ্বীপের প্রশাসনিক কেন্দ্রও ক্রিক দ্বীপ শহরেই। এই দ্বীপে প্রায় ১৩০০ টির মত বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতির গাছ রয়েছে এবং প্রায় ২২০ টির বেশি পাখির প্রজাতি রয়েছে। বর্তমানে ক্রিক দ্বীপটি পর্যটনের জন্য সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়েছে। ইউরোপে এই দ্বীপটির ভৌগলিক অবস্থান দক্ষিণ জার্মানি, অষ্ট্রিয়া এবং উত্তর ইতালির নিকটবর্তী ।

ক্রিক দ্বীপের কিছু নিজস্ব অভিজ্ঞতা বলি। দ্বীপটিতে অনেক ধরনের থাকার বন্দবস্ত আছে। এখানে হোটেল/মোটেল যেমন আছে , তেমনিভাবে ভিন্ন ব্যবস্থাও আছে। এই দ্বীপ অঞ্চলের মানুষেরা তাদের নিজেদের বাড়ি/ঘর ভাড়া দেয়। কিছু হোস্টেলের মত হোটেল আছে, যেখানে থাকার মত নানান ব্যবস্থা আছে। মূলত এই সব কিছুই অন লাইনে পূর্ব হতেই বুকিং দেবার ব্যবস্থা থাকে। বরাবরের মত যত তাড়াতাড়ি বুকিং দেওয়া যায়, মূল্য বা দাম তত কম হয়। জুন/জুলাই/আগস্ট এই তিন মাস খুব সাধারণ কারণেই অন্যান্য মাসের তুলনায় একটু দাম বেশি। তবে বছরের প্রথম দিকেই যদি বুকিং দেওয়া থাকে তাহলে তুলনামূলক দাম কম পাওয়া যায় । সেটা হোটেল বা অ্যাপার্টম্যান্ট যাই হোক। অন লাইলে বুকিং দেবার যেমন সুবিধে আছে , ঠিক মুদ্রার উল্টো পিঠের মত কিছুটা অসুবিধেও থাকে। ধরুন, কেউ একজন বছরের প্রথম দিকেই জুলাই মাসের জন্য হোটেল বুকিং দিল এবং টাকা পেমেন্ট করে দিলো, সব কিছুই একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে করেছে, সাথে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে একটি “হলিডে ইন্সুরেন্স” করে রেখেছে ( ইন্সুরেন্সের টাকার পরিমাণ মূল টাকার উপর নির্ভর করে এবং খুবই কম ) । যদি কোনো কারণে সেইজন জুলাই মাসে ( অসুস্থতা বা ভিন্ন কারণে) যেতে না পারে, তাহলেও তেমন ক্ষতি নেই, কেননা ইন্সুরেন্স কম্পানি আপনাকে সামান্য কিছু ভেমারেজের বিপরীতে আপনার সকল টাকা ফিরত দিয়ে দিবে। কিন্তু কেবলমাত্র অন লাইন বুকিং এ আপনার টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নাই। বিস্তারিত বুকিং সিস্টেম বলতে হলে অনেক বলতে হবে। তবে সমগ্র ইউরোপ মোটামুটি একই সিস্টেমের মধ্যে বুকিং হয়।

ক্রিক দ্বীপটিতে দেখা মেলে শত শত ছোটো বড় স্পিডবোড, জাহাজ আর জলে চালানোর মোটরবাইক । বোডগুলো জলের ট্যাক্সি হিসেবে ব্যবহার হয়। এই বোডগুলোকে যে কেউ ভাড়া নিয়ে চালাতে পারে তবে সেই জন্য একটি স্পিডবোড চালনার গৃহীত লাইসেন্স অবশ্যই থাকতে হবে। এই দ্বীপে ইউরোপের দেশগুলো থেকে অনেকেই গাড়িতে করে স্পিডবোড নিয়ে আসে, সেই ক্ষেত্রে কেবলমাত্র জলে পার্কিং করার ভাড়া দিতে হয়। এখানে নানান ধরণের জাহাজ ভ্রমণ করার বন্দবস্ত আছে। প্রতিদিন সকাল বিকাল জাহাজ ভ্রমণের জন্য নানান ধরনের আকর্ষণীয় অফার থাকে। আমি নিজে একদিনের একটি জাহাজ ভ্রমণ করেছি। আমাদের জাহাজ ভ্রমণটি ছিলো সাড়া দিনের এবং অন্যান্য আরো চারটি দ্বীপের ভ্রমণ । এই চারটি দ্বীপের একটি দ্বীপছিলো , বৃহত্তর যুগোস্লাভিয়ার কমিউনিসট যুগের জেলখানা। এই দ্বীপে সেই সময়ে বড় বড় ক্রিমিনালদের রেখা আসা হতো। বিস্তারিত অন্য কোনো সময় লিখবো। এই জাহাজগুলো বিভিন্ন দ্বীপে থেমে থেমে যথেষ্ট সময় দিয়ে ভ্রমণকারীদের সমুদ্রে সাঁতার কাটা বা বিভিন্ন কিছু উপভোগ করার সুযোগ করে দেয় । প্রতিটি জাহাজেই থাকে ভিন্ন ভাষার দোভাষী । এই দোভাষীরা বিভিন্ন ভাষায় সব কিছু বুঝিয়ে বলে দেয়। যেকোনো ভিন্ন দ্বীপে জাহাজ গুলো যখন ভীরে, সব দ্বীপেই অন্তত একটি করে খাবারের বা কফিসোপ আছেই। দাম মোটামুটি সব জায়গায় সমান । ক্রোশিয়ার সাগরের বা বিভিন্ন দ্বীপ অঞ্চলে বিভিন্ন জায়গায় জাহাজ ভ্রমণে সাগর জলে ডলফিনের দেখা মেলে। ডলফিনগুলো দলে দলে জলকেলিতে ব্যস্ত থাকে। জাহাজগুলো ডলফিনের স্থানগুলোতে একটু কম বা ধীর গতিতে চলে, যেন সকল ভ্রমণকারী ডলফিনগুলোর জলকেলি উপভোগ করতে পারে। এমন কিছু দ্বীপে জাহাজগুলো ভীরে, যেখানে হাজারে হাজারে মাছের দেখা মেলে। সামান্য একটু শুকনো রুটি পানিতে ফেললে শত শত মাছ জলের উপরে ভেসে উঠে। প্রতিটি দ্বীপের জলের রং এর ভিন্নতা পাওয়া যায় । যেমন সৈকত “গোল্ডবিচ” । যেমন নাম দেখতেও ঠিক তেমনি স্বর্ণের মত । পাথরগুলো অনেকটা হাল্কা মার্মর রং এর। সাগরজলে সেই মার্মরগুলো রোদের আলোতে দেখতে সত্যি সত্যি হাল্কা সোনালি রং এর মত। সাগরজল এতটাই পরিষ্কার আর সচ্ছ যে চোখ জলের দিকে ফেললে আর ফেরানো মুশকিল । গভীর জল পরিষ্কার দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় । সত্যি বলতে এই সাগরের জল মানুষের হৃদয়কে জলের মত নরম করে দেয় ।

ক্রোশিয়ার সাগরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষেরা নানান ধরনের বোড/জাহাজ ইত্যাদি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় । বিভিন্ন দ্বীপে একেবারেই সাগর ঘেসে অনেক বড় বড় বাড়ির দেখা মেলে। পৃথিবীর অনেক পয়সাওয়ালারা এই ক্রোশিয়ার দ্বীপগুলোতে ইদানিংকালে বেশ বাড়ি/ঘর কেনারদিকে নজর দিচ্ছে। এই দ্বীপগুলোতে সাগরজলে তেমন বেশি ঢেউ থাকে না, যা কিনা ইতালি/স্পেন বা তুরস্কের সাগরে মেলে। যেহেতু সাগরের চারিদিকেই দ্বীপ, মাঝে দ্বীপ, পাশে দ্বীপ সুতরাং বাতাসের বেগ একটু কম বলেই উপলব্ধি হয়। ট্যুরিস্টদের জন্য ক্রোশিয়া রাষ্ট্র শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এমনকি এই দ্বীপরাষ্টের মানুষগুলোর আচার/ব্যবহার সকলকেই আপ্লুত করে। সব ধরনের সহযোগিতা এই রাষ্ট্রের পুলিশ এবং মানুষের নিকট অনায়াসেই পাওয়া যায় । ক্রিক দ্বীপটি সত্যি উপভোগ্য একটি দ্বীপ। ইদানিংকালে আমাদের দেশের মানুষেরাও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায় । কারো এমন কোনো সুযোগ হলে, এই দ্বীপরাষ্ট্রটি হতে পারে ঘুরে বেড়ানোর একটি চমত্কার উদাহরণ ।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ভটকম

