ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট পদের জন্যে প্রার্থীর যোগ্যতার ক্রাইটেরিয়াটি এখন বেশ আলোচিত হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট যিনি হবেন তিনি ইউরোপীয় কাউন্সিল দ্বারা মনোনীত এবং ইউরোপীয় সংসদ দ্বারা নির্বাচিত পাঁচ বছরের জন্যে হবেন। এটি কমিশনের কাজের নির্দেশিকা নির্ধারণ করে এবং কমিশন কার্যকরীভাবে এবং যৌক্তিকভাবে কাজ করে তা নিশ্চিত করে। নির্বাহী শাখা প্রধান হিসাবে, তার পোস্ট জাতীয় স্তরে সরকারের প্রধানের তুলনায় তুলনীয়। সেকারনেই ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি হিসাবে তার বিস্ময়কর মনোনয়নের একদিন পর উসুলা ভন ডার লেয়েন প্রথমবারের মত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের সমর্থন চেয়েছেন, কারন তিনি নিজে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য নন, আঙ্গেলা মের্কেলের সমর্থনে তিনি ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়িয়েছেন, তাই স্ট্রাসবার্গ সফরকালে জার্মান রাজনীতিবিদ সংসদকে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেন। “এখানে ইউরোপীয় সংসদে, ইউরোপীয় গণতন্ত্রের হৃদয় হতাশ হয়ে পড়েছে, এবং এ কারণে তা অবিলম্বে সংলাপ শুরু করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ” বলেন তিনি। তিনি একজন খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাট দলের সদস্য, ২০১৩ সাল থেকে জার্মানিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি জার্মানিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে প্রথম মহিলা, এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মহিলা হবেন। ইউরোপের রাজনীতি নিয়ে আমার বিশ্লেষণ করার একটা বিশেষ কারন হলোঃ একটা কন্টিনেন্ট কিভাবে নিজেদের মধ্যে ৩০০ বছরের যুদ্ধবিগ্রহ শেষ করে মাত্র ৫০ বছরে একটা বহুজাতিক বহুভাষার জাতি হয়েও একটা ইউনিয়নে রুপান্তরিত হয়েছে, যা থেকে আমাদের দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলির অনেক কিছু শেখার আছে। বিভিন্ন ভাষা জানা বেশ সৌভাগ্যের ব্যপার আর ব্যক্তির অবস্থান, প্রয়োজনীয়তা ও পরিবেশের উপর নির্ভর করে, এক সময় আমাদেরকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাদের ভাষা শিখে তারপর উচ্চশিক্ষা করতে হতো, এখন প্রতিটি ইউরোপিয়ান কমপক্ষে তিন থেকে চারটি ভাষায় কথা বলেন, এর অর্থ হলো ইউরোপীয় দের এখন একে অপরের ভাষা শিখতে সগ্রহ বেড়েছে, বিভিন্ন দেশে কর্ম সংস্থান হয়েছে এছাড়াও বিভিন্ন ভাষাভাষীর কলিগ থাকায় এবং পার্টনার থাকায় বিলিঙুয়াল সন্তান থাকে। এসব করনেই বিভিন্ন ভাষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। আমার নিজের বাড়িতেই সন্তানেরা ৪/৫ টি ভাষায় কথা বলে। রাষ্ট্র যখন গ্লোবাল সৌহার্দ্য বিনিময় করে তখন রাষ্ট্রের জনগনও সেটাই করে, আর রাষ্ট্র যদি শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাহলে অন্যের প্রতি উদারতা দেখাতে পারেনা। ইউরোপীয় দেশ গুলি সেই বাধা অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের বেলায় এখনো সেই পরিবেশে সৃষ্টি হয়নি। আর ভাষা শেখা শুধু কথা বলা নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতিকে ভেতর থেকে দেখতে হয়। আর একটি পর্যবেক্ষণ হলো গত ৪০ বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে নারী পুরুষের অনুপাত ছিলো ১৭% নারী ৮৩% পুরুষ, আর এবার ২০১৯ সালে সেই অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৪২% নারী ও ৫৮% পুরুষ। একটি পরিসংখ্যান যা বাঙালিরা কল্পনা করতে পারবে না। জনসংখ্যার দিক থেকে চীন ও ভারতের পরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের লোকসংখ্যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন (যদিও একটি রাষ্ট্র নয়) আর যার সদস্য ২৮ টি দেশ। সুইডেন ও আয়ারল্যান্ড থেকে নারী সদস্য যথাক্রমে ৫৫% এবং ৫৪% অর্থাৎ এই দুটি দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নে নারী সদস্যই সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘ তর্কবিতর্কের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ পদগুলির জন্য প্রার্থী তালিকা স্থির করছেন সদস্য দেশগুলির শীর্ষ নেতারা৷ তবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে৷ প্রায় ৩ দিন ধরে দরকষাকষির পর অবশেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৫ শীর্ষ পদের জন্য প্রার্থীতালিকা সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছলেন সদস্য দেশগুলির শীর্ষ নেতারা৷ তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থেকে যাচ্ছে৷ মনোনীত প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন পাবেন কিনা, সে বিষয়ও সংশয় দূর হচ্ছে না৷ অর্থাৎ একদিকে ইইউ দেশগুলির জাতীয় সরকার, অন্যদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে গোটা প্রক্রিয়া আবার জটিল হয়ে পড়বে৷ এদিকে একই সাথে এতোদিনের আইএমএফের (IMF) প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্ড’কে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ECB) প্রধান হিসেবে মনোনীত করে প্রস্তাব দিয়ে ইউরোপে প্রথম দুজন শীর্ষ পদে নারীদেরকে মনোনীত করা হচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ও আইরিশ প্রধানমন্ত্রী লিও ওয়ারদকর বলেন, প্রধান এই জবের জন্য দুই নারীর মনোনয়ন একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠিয়েছে যে ইইউ লিঙ্গ সমতা প্রতিরক্ষা করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
লেখক, মোনাজ হক সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

