সিরাজুল আলম খানের আরেক নাম ‘স্বাধীন বাংলার রুপকারঃ ব্যারিস্টার ফারাহ খান

বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও বর্তমান সংসদ সদস্য জনাব তোফায়েল আহমেদ তাঁর রাজনৈতিক ‘গুরু’ জনাব সিরাজুর আলম খান কে ইতিহাস বিকৃতি ও কল্পকাহিনীর জন্য ক্ষমা চাইতে হবে বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেই লেখাটি পড়েছি। পুরো লেখাটি নিয়ে পরে লিখবো আজ শুধু দুই/একটি জায়গা তুলে ধরছি। প্রথমত লেখাটির একদম শেষের চারটি লাইন আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেখানে জনাব তোফায়েল আহমেদ বলেছেন “…….ঊনসত্তর সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর-স্নেহে তাঁর কাছাকাছি ছিলাম। সক্রিয় কর্মী ছিলাম। কোনো দিন সিরাজুল আলম খান কে মঞ্চে বক্তৃতা বা স্লোগান দিতে দেখিনি”।

লেখাটি পরে আমার বার বার একটা জিনিসই মনে হচ্ছে ইতিহাস তাহলে আসলে বিকৃতি ও কল্পকাহিনী কে করছেন? জনাব সিরাজুল আলম খান নাকি জনাব তোফায়েল আহমেদ? তার উপর আমার আজকের এই লেখাটি। আমি আমার লেখার সাথে একটি ভিডিও সংযুক্ত করেছি। নিচে দেওয়া ভিডিওটির ৩মিনিট ৫৬সেকেন্ড থেকে ৪মিনিট ৩০সেকেন্ডে (মাত্র এই ৩৬সেকেন্ডেই) স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে জনাব সিরাজুল আলম খান লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে মঞ্চে বক্তৃতা ও স্লোগান দিচ্ছেন এবং সেখানে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু, শেখ মনি সহ আরো কয়েকজন দাড়িয়ে আছেন। এই কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখলেই তো জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়ে যাবে জনাব তোফায়েল আহমেদের বলা কথাটি রাষ্ট্রের সাথে, জনগণের সাথে এবং বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্মের সাথে কত বড় মিথ্যাচার এবং প্রতারণা। উনার মত এত বিশাল একজন নেতার কাছ থেকে দেশ এবং জাতি এমন আচরণ নিশ্চয় কোনভাবেই প্রত্যাশা করে না।

তোফায়েল আহমেদ যে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করছেন এবং বাংলাদেশের জনগণের সাথে মিথ্যা কথা বলছেন তার আরো উদাহরণ তুলে ধরবো আমি এখানে। জনাব সিরাজুল আলম খান এমন একজন ব্যক্তি যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় কে কি করেছে এবং কার কি ভূমিকা ছিল তার সবই তাঁর নখদর্পনে। তাই ইতিহাসের বিন্দু থেকে সিন্দু জানা, আনাচে-কানাচে সব জানা এমন একজন ব্যক্তিকে আমাদের ‘স্বার্থ লোভী’ বর্তমান অধিকাংশ নেতাদের সহ্য না হবারই কথা। উনি এদের সবার জন্য কাল হয়ে আছেন এবং এদের সবার জন্য একটি অভিশাপ। এখন বরং জনাব তোফায়েল আহমেদের নিজের কথায় এইটা আরো পরিস্কার যে যেই তোফায়েল আহমেদ কে জনাব সিরাজুল আলম খান হাতে ধরে রাজনীতি শিখিয়ে ছিলেন, তোফায়েল আহমেদের ভাষায় বললে বলতে হয় “…আমি তোতা পাখির মত তাই বলতাম যা সিরাজ ভাই আমাকে শিখিয়ে দিতেন”। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো জনাব সিরাজুল আলম খানের থেকে শেখা সুষ্ঠু ও দেশের মঙ্গলের জন্য এবং জনগণের কল্যাণের রাজনীতি সময়ের সাথে ভুলে গিয়েছেন তারই শিষ্য। ক্ষমতার মোহে দাপটের লোভে জনাব তোফায়েল আহমেদ ‘গুরুর’ সব দীক্ষা বিসর্জন দিয়েছেন। এখন উনি আর জনগণের স্বার্থে লড়ে যাওয়া একজন রাজনীতিবিদ নন বরং এখন উনি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পূজারী! জনাব তোফায়েল আহমেদ “আমি সিরাজুল আলম খান” বইটি পড়েছেন বলে তো মনে হয়না। উনি উনার গত দুটি/তিনটি লেখায় যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যে ভাষায় কথা বলেছেন, আমি মনে করি সেই সময়ের যারা এখনো বেঁচে আছেন, সশস্ত্র সংগ্রাম দেখেছেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের সাথে জড়িত ছিলেন তাদের কাছে জনাব তোফায়েল আহমেদের লেখাগুলো নিতান্তই হাস্যকর ও খুব নিচু মানের বলেই মনে হবে। তখনকার অনেকেই তো এখনো বেঁচে আছেন নিশ্চই উনারাও জনাব তোফায়েল আহমেদ কে উনার মিথ্যাচারের জন্য প্রাপ্ত জবাবটা দেবেন। আমি মনে করি জনাব সিরাজুল আলম খানের মত একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও আদর্শবান মানুষকে হেয় করার চেষ্টা করার জন্যে জনাব তোফায়েল আহমেদের প্রতিটি শব্দের প্রতিবাদ হবে। আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি এবং আমি নিশ্চিত জনাব তোফায়েল আহমেদের একদিন না একদিন ইতিহাস বিকৃতি করার জন্য এবং নতুন প্রজন্মের সামনে ভুল ভাবে উপস্থাপন করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এবং দেশের সর্ব সাধারণের কাছে আন্তরিক ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।

নিঃশন্দেহে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জনাব তোফায়েল আহমেদ একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, কিন্তু উনাকে ‘গুরুত্বের’ সাথে নানা কিছু নিজ হাতে শিখিয়ে ‘পূর্ণতা’ দেওয়া ব্যক্তিটির নাম জনাব সিরাজুল আলম খান। এই ব্যক্তিটির হাত ধরেই জনাব তোফায়েল আহমেদ নিজেকে ইতিহাসের পাতায় একজন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি হিসেবে স্থান করিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ইতিহাসে জনাব তোফায়েল আহমেদ যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘অধ্যায়’ হয়ে থাকে তবে জনাব সিরাজুল আলম খান সেই অধ্যায়ের লেখক কিংবা স্রষ্টা। তাই বলি একটি ‘অধ্যায়’ না জানতেই পারে কিংবা তার অস্পষ্ট ধারনা থাকতেই পারে লেখকের বাকি অধ্যায়/চ্যাপ্টারগুলো সমপর্কে। তবু বলে রাখি জনাব তোফায়েল আহমেদের কথা যদি সত্য ধরেই নেই তবে উনি নিউক্লিয়াস সম্পর্কে না জানলে “মুজিব বাহিনীর (BLF)” এর কমান্ডার হয়ে ছিলেন কিভাবে? নিউক্লিয়াস-ই তো পরবর্তীতে মুজিব বাহিনী হয়ে ছিল এবং জনাব তোফায়েল আহমেদ তখন বহাল তবিয়তে মুজিব বাহিনীর একটি সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন, তাই নয় কি।

আসল কথা হলো, জনাব তোফায়েল আহমেদ উনার “গুরু, সিরাজ ভাই” কে খুব ভাল করেই চেনেন এবং জানেন জনাব সিরাজুল আলম খান কখনো তার শিষ্য তোফায়েলের লেখার প্রতিবাদ করবেন না। তাই ইচ্ছেমত একটু দলীয় আনুকূল্যের আশায় যা ইচ্ছে লিখে যাচ্ছেন। আমার তো মনে হয় আগামী ২/৩মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগের সম্মেলন। আর সেই সম্মেলন কে সামনে রেখেই জনাব তোফায়েল আহমেদ এমন উদ্ভট এলোমেলো এবং অগোছালো বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। শত হলেও এবার মন্ত্রীত্ব পাননি, শুধুমাত্র উপদেষ্টা কমিটির সদস্য পদ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে, তাই উনি মনে হয় আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন ‘গুরু’ কে কথায় অপমাণ করে, তাঁর সমালোচনা করে হলেও দলীয় হাইকমান্ডের সু-নজরে আসতে এবং আশ্বাস অর্জন করতে। বলা তো যায় না গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে হলেও যদি বাংলাদেশের “রাষ্ট্রপতি” হয়ে যাওয়া যায় আর কি…!!! কারণ অন্যরা ভুলে গেলেও জনাব তোফায়েল আহমেদ তো আর ভুলে যান নাই নিজের কর্মকান্ডের কথা। উনার নিশ্চয় খুব ভাল করেই মনে আছে উনি কি করেছেন এবং উনার কি অবস্থান ছিল সেই ২০০৭-২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। উনি তো ‘সংস্কার পন্থী’ ছিলেন এবং ‘মাইনাস টু (Minus 2) ফর্মুলার একজন অগ্রপন্থী নায়ক ছিলেন এই উনার নিজের দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই!

জনাব তোফায়েল আহমেদ নিজ স্বার্থে যেভাবেই বিশ্লেষণ করেন না কেন, জনাব সিরাজুল আলম খান বাংলাদেশে শুধু নয় আমার মনে হয় গোটা পৃথিবীতে একজনই। এবং শত মিথ্যাচারের পরেও আজ হোক আর কাল হোক আমাদের নতুন প্রজন্ম জনাব সিরাজুল আলম খান কে সঠিক মূল্যায়ন অবশ্যই করবে। তাঁর মত এত সাদামাটা জীবন বাংলাদেশের এত বড় প্রভাবশালী আর কোন নেতার আছে বলে আমার জানা নেই। কখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজ কিংবা পারিবারিক কোন স্বার্থে উনি ব্যবহার করেননি। জনাব তোফায়েল আহমেদ হয়তো এখন ভুলে গেছেন জনাব সিরাজুল আলম খান উনাদের মত নামে বেনামে বাড়ি, ফ্লাট, জমি, ব্যবসা করেননি কিংবা কোটি কোটি টাকার মালিকও হয়নি। উনি এমনই এক ‘ভাগ্যবান’ রাজনীতিবিদ যিনি সারা জীবন ভাড়া বাসায় থেকেছেন, না করেছেন অর্থের পাহাড়, না প্রাসাদ সমতুল্য বাড়ি কিংবা চড়েছেন দামি নিজ গাড়িতে! যেখানে কিনা জনাব তোফায়েল আহমেদদের মত বড় নেতাদের কথা বাদই দিলাম, এখন ছোট পাতি নেতা, খুদ্র কর্মীরা তো বটেই ধান্দাবাজ সমর্থকরাও কোটি টাকার মালিক! আজ উনি নিজ স্বার্থে অস্বীকার করতেই পারেন তবে মনে রাখবেন জনাব সিরাজুল আলম খান ছিল বলেই আজকের তোফায়েল আহমেদ কে মানুষ চিনে।

যাইহোক, আমি বুঝে গিয়েছি কে নিজ স্বার্থকে ইতিহাস বিকৃতি ও কল্পকাহিনী করছেন। সে কি জনাব সিরাজুল আলম খান নাকি জনাব তোফায়েল আহমেদ। উনারা দুইজনই অনেক বড় মাপের নেতা। উনাদের আমরা সম্মান করি। উনাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ আমাদের মহান সশস্ত্র যুদ্ধের অন্যতম নায়ক উনারা এবং আজ উনাদের জন্য আমরা একটি স্বাধীন মাতৃভূমি পেয়েছি। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে আমাদেরও যৌক্তিক দাবি আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধের নির্ভূল ইতিহাস জানতে চাওয়া। এটা আমাদের অধিকার। আমরা নতুন প্রজন্ম জানতে চাই আমাদের মহান স্বাধীনতার মূল এবং সঠিক ইতিহাস। আমাদেরকেই বের করতে হবে আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে কে ভূল ইতিহাস তুলে ধরেছে, কে আমাদের কে অন্ধকারে রাখছে এবং আমাদের নিজ দেশের সঠিক ইতিহাস জানার থেকে বঞ্চিত করছে।

এখন আপনাদের হাতে ছেড়ে দিলাম। আবারো অনুরোধ রইল বেশী সময় লাগবে না, সময় না থাকলে পুরো ভিডিওটি দেখার দরকার নেই, শুধুমাত্র ৩:৫৬ সময় থেকে ৪:৩০ সময় (৩মিনিট ৫৬সেকেন্ড থেকে ৪মিনিট ৩০সেকেন্ড) পর্যন্ত দেখার জন্য বিশেষ অনুরোধ রইল। মাত্র এই ৩৬সেকেন্ডই যথেস্ট কোন বুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মানুষের জন্য। এই কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখলেই বুঝে যাবেন এবং নিজেরাই বিচার করতে পারবেন যে জনাব তোফায়েল আহমেদের বলা কথা “…..ঊনসত্তর সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর-স্নেহে তাঁর কাছাকাছি ছিলাম। সক্রিয় কর্মী ছিলাম। কোনো দিন সিরাজুল আলম খান কে মঞ্চে বক্তৃতা বা স্লোগান দিতে দেখিনি” এই উক্তিটি রাষ্ট্রের সাথে, জনগণের সাথে এবং বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্মের সাথে কত বড় মিথ্যাচার এবং প্রতারণা। জনাব তোফায়েল আহমেদ নিজ স্বার্থে ইতিহাস বিকৃতি ও কল্পকাহিনী করছেন যার জন্য আমরা উনাকে কখনো ক্ষমা করতে পারিনা।

সর্বশেষ এইটি কথাই বলি, জনাব সিরাজুল আলম খানের আরেক নাম ‘স্বাধীন বাংলার রুপকার’।

জয় হোক সত্যির, জয় হোক সত্যের।

ব্যারিস্টার ফারাহ খান, লন্ডন প্রবাসী আইনজীবী ।

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.