আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার, সাড়া জীবন আপনাদের মত মানুষদের হৃদয়ের গহীন কোণ থেকে সম্মান করে এসেছি , ভবিষ্যতেও করতে চাই এবং করবো, তবে ! হ্যাঁ এই তবেতেই যত কথা !
আপনি সব সময় আপনার প্রাঞ্জল ভাষায় হাজারো ছাত্র/ছাত্রীদের এবং সমাজের মানুষদের অনেক চমত্কার কথা ও বাণী দিয়ে আলোর পথ দেখিয়েছেন। তবে কেন এই বয়সে এসে সেই আলোর পথের পাঞ্জেরি অন্ধকার ছড়াবেন ? জনমানুষেরা আপনাকে সম্মান করতে কখনোই কৃপণতা করেনি। তবে কেন সেই সম্মানকে সোনার থালা থেকে মাটিতে ফেলে দেন ?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আপনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেখানে আপনি প্রবাসী , বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক মেহনতি মানুষদের নিয়ে রঙ্গ তামাশা করছেন !!! আপনারা সমাজের উচ্চমার্গের মানুষ , জ্ঞাণ গরিমায় আপনারা সব সময় মানুষ মনে ভিন্ন স্থানে আছেন। আপনারা সমাজের অনেক উঁচু চেয়ারে নিজ জ্ঞাণ গরিমায় আসীন হয়েছেন । তবে সেই চেয়ার বসে আপনাদের মত মানুষ যখন মেহনতি মানুষদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা বা রঙ্গ-তামাশা করেন, তখন আমরা ভাবতে বাধ্য হই , তাহলে কি সাড়া জীবন আপনাদের ভাষ্য সবই রঙ্গ-তামাশা ?
দিনক্ষণ মনে নেই , সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে হবে, ফিলিপাইন থেকে আপনি দেশের হয় প্রথম একজন যিনি ” রেমন ম্যাগসাইসাই ” ( RAMON MAGSAYSAY) পুরস্কার এনে দেশকে সম্মানিত করেছিলেন । আপনার সম্মানে আমরাও গর্ব করেছি দেশের জনগণ হয়ে। আপনি, মাহাবুব উল্লাহ্ তুসার অ্যাওয়ার্ড, খান মোহাম্মদ ফারাবি মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, স্টার লাইভ টাইম অ্যাওয়ার্ড অন এডুকেশন , ন্যাশনাল টেলিভিশন অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পদক কি এমন পদক আপনার ঝোলাতে নাই ? তবে কেন আপনার মত এত বড় জাণের বিত্তশালী মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের মেহনতি/শ্রমিকদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে লোক হাসাতে যান ?
মনে পরে, ম্যাগসাইসাই পুরস্কার ফিলিপাইন থেকে এনে আপনি দেশের সরকারের প্রতি ড্রেসকোড নিয়ে ভীষন ক্ষেপে ছিলেন। মনে পরে সেদিন আপনি সরকারকে বলেছিলেন, আমাদেরকে একটি জাতীয় ড্রেস দিন, অন্তত কিছু না হোক “জাঞ্জিয়া” ( UNDERWEAR ) হলেও চলবে তবুও একটি জাতীয় ড্রেস ঘোষনা দিন । কেননা সেই সময় ফিলিপাইনে যে পাঁচজন এই পুরস্কার নিতে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে কেবলমাত্র আপনিই জাতীয় ড্রেস ছাড়া ছিলেন। আপনার ক্ষোব সেদিন পরিষ্কার ছিলো। সেদিনও সেই তবে নিয়ে কথা হয়েছিলো । আপনি এত বড় পুরস্কার এনেই আপনার ” জাঞ্জিয়া ” নিয়ে সমালোচিত হয়ে ছিলেন। সেদিনকার সেই ঘটনা এখন মনে করিয়ে দেবার কারণ, আপনি সেদিন তাৎক্ষণিক বুঝতে পেরেছিলেন সরকারকে এই ভাষায় বলা আপনার ঠিক হয়নি এবং পরেরদিন পত্রিকায় প্রকাশ্য বলেছিলেন, বিষয়টি আবেগের ছিলো, আপনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং বিষয়টি যেন এখানেই ক্ষান্ত দেওয়া হয়। বিষয়টি সত্যিই ক্ষান্ত দেওয়া হয়েছিলো, আপনার সম্মানেই। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক মেহনতি মানুষদের নিয়ে আপনার হাসি-ঠাট্টা-তামাশা , এগুলো নিয়ে এখন কি বলবেন ? নাকি ওরা ক্ষমতাশালী নয়, এদের জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশের কিছুই নেই ?
আমি ব্যক্তিগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের উপর দিয়ে কয়েকবার চলাচল করেছি। এয়ারপোর্টে দেখেছি আমাদের শ্রমিক /মেহনতি মানুষদেরকে। অনেকের সাথে কথা বলেছি, জেনেছি কেমন এবং কত কস্টের জীবন। একটি ঘটনা বলি , আপনার হাসি-ঠাট্টার বিপরীতে । দুবাই এয়ারপোর্টে প্লেনে উঠবো দেশের রাস্তায় । একজন শ্রমিক ভাই হাতে একটা ব্যাগ এবং আরো একটি ছোটো ব্যাগ প্রায় ঘাড়ে বা মাথায় নিয়ে, প্লেনে উঠার আগে ” ওই আবুল ওই আবুল তুই কই ?” বলে প্রায় চোখ ভিজিয়ে ফেলেছে, কারণ তিনি সঙ্গী আবুলকে খুঁজে পাচ্ছে না । আমি কাছে গিয়ে ওনাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করি এবং এও বলি আপনি ভয় পাবেন না, নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গী চলে আসবেন এবং বলি যতক্ষণ না আসে আমি আপনার পাশেই আছি কোনো সমস্যা হবে না । শ্রমিক ভাইটির ভয় ছিলো উনি ঠিকমত কাগজপাতি জমা দিয়ে প্লেনে উঠতে পারবেন কিনা ? আমার আশ্বস্ত পেয়ে ব্যাগ দুটো মাটিতে রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে। এদিকে সবাই প্লেনে উঠে যাচ্ছে, হাতে তখনও অনেক সময় আছে, আমিও অপেক্ষায় আছি উনার সঙ্গী আসার জন্য । ইতিমধ্যেই উনার সঙ্গী চলে এসেছেন। আসলে উনার সঙ্গীও উনাকে হারিয়ে ফেলেছিলিন এবং খুঁজছিলেন। শ্রমিক ভাইটি আমাকে উনার সঙ্গীর সাথে পরিচয় করিয়ে কত যে প্রশংসা করলেন, আমি তো রীতিমতো হা । আমিতো কিছুই করিনি, কেবলমাত্র একটু আশ্বস্ত ও অপেক্ষা করেছি মাত্র । পরবর্তীতে আমি ওনাদের দুজনকে নিয়ে এক সাথে প্লেনে উঠি। সেই প্লেনে উঠার সময় ইমিগ্রেশনে একজন অফিসার ছিলেন যিনি সম্ভবত ইন্ডিয়ান । সেখানে ভিন্ন একটি ঘটনা । তবে আমি ওনাদের নিয়েই একসাথে প্লেনে উঠে , ওনাদের জায়গায় বসিয়েই নিজের জায়গায় এসে বসি। প্লেন চলা কালিন বেশ কয়েকবার ওনারা আমার কাছে এসেছেন, কথা বলেছেন।
আবদুল্লা আবু সায়ীদ স্যার আপনাকে বলছি, আমিও সেদিন আপনার হাসি-ঠাট্টার ফর্ম পূরণ গল্পের মত ফর্ম পূরণ করে দিয়েছি। সাথে তাদের চোখের ভাষাও পড়েছি। আমরা খুবই ক্ষুদ্রজন আর আপনারা সমাজের বীজ্ঞজন। শুধু বলবো, এই শ্রমিক ভাইদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করবেন না, ওরা যদি ফর্ম পূরণ করতেই পারতো তাহলে আপনার মত বীজ্ঞজনের নিকট হাত বাড়িয়ে দিত না । কেননা শ্রমিকের হাত অনেক শক্তিশালী হাত।
[ বিঃ দ্রঃ আমার প্রিয় আরেকজন টিভি তারকা , কৃষকের বন্ধু ” সাইখ সীরাজ ” উনি ঈদ অনুষ্ঠান কৃষকদের নিয়ে করে আসলেন ! অথচ ধানের যখন দাম নাই, ধানে যখন কৃষক আগুণ দেয় , তখন ওনার টিক্কিটিও খুঁজে পাইনি কোথাও! যেমনটি টিক্কিটি খুঁজে পাওয়া যায়নি শিশুদের রাজপথের আন্দোলনে স্যার জাফর ইকবালের ! এগুলো সবই ” হাসি-ঠাট্টা-তামাশা ” বলেই মনে হচ্ছে , দুঃখিত ।]

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

