বিশ্বজিত থেকে রিফাত, রাজনীতি এবং সমাধান

লক্ষ্যণীয় যে , ” সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি বর্তমানের রাজনৈতিক বেড়াজালের ফাঁকে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম “ । কেননা এই মাধ্যমটির কারণেই সমাজেয নানান অন্যায়,অবিচার ইত্যাদি বেশ জোরেসরেই প্রকাশ হচ্ছে। এমনকি যে খবর দৈনিক পত্রিকাগুলো দিতে পারছে না , তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো না কোনো ভাবে চলে আসছে। শোনা যায় পত্রিকার উপর সরকারের খরগহস্ত চলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সরকার তেমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। দুচার জনের আইডি হয়তোবা শেষ করে দিতে পারে, তবে সবারটা নিশ্চয়ই নয়। সম্পূর্ণরুপে বন্ধ রাখা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে, তবে প্রশ্ন থেকে যায় কয়দিন বা কয়টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ রাখবে সরকার ? সেই সূত্রে বলা যায় এই মাধ্যমটি বেশ কার্যকর বটে।

এখনতো প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে খবর নিয়েই মূল পত্রিকাগুলো খবর করছে । শত উদহারণ আছে।  তাই সব সময় বলছি, এই মাধ্যমটি যারা ব্যবহার করেন, তারা একটু সতর্ক থাকলেই এই মাধ্যমটি আরো বেশি শক্তিশালী হতে বাধ্য । আমরাই বলে থাকি বর্তমানে সাংবাদিকরা সব হলুদ সাংবাদিকতায় ব্যস্ত, মানে সরাসরি বললে বলতে হয় ” দালালি “ চরিত্র । যদি সেটাই বিশ্বাস করি তাহলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে একটু ভেবে চিন্তে ব্যবহার করাই উচিত। কেননা এখানে দালালি যেমন খোলা মনে করা সম্ভব, সাথে সাথে সত্যেও নিবিরভাবে প্রকাশ করা সম্ভব । সহজ ভাবে বললে , এই মাধ্যমে আপনার সেই স্বাধীনতা কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারছে না। এই ছোট্ট কথা থেকেই মূল্যায়নটি বুঝলেই উপকার বেশি হবে। 

এখন আসি ছোট্ট শহর বরগুনার কথায় । কি নৃশংস ঘটনাই না ঘটে গেলো!! গতকাল আমি নিজেও লিখেছি ” কেউ কোথাও নেই” ” , ” মানুষ মনে মন আছে মানবতা নেই” , তরুণদের বুকে রক্ত প্রবাহ নেই ” শেষে লিখেছি হায়রে আমার বাংলাদেশ!!! আমার লেখায় অনেকেই কমেন্টস করেছেন, ” সেই বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ডের ( রাজপথে দিনেদুপুরে কোপানো) সঠিক বিচার হলে হয়তো আজকে বরগুনায় এই ঘটনা ঘটতো না । দ্বিমত হবার সুযোগ নেই। লক্ষ্য করুন, বিশ্বজিত ঘটনার মামলার শেষ খবর হলো ৯ জন বেকসুর খালাস আর ১৭ জন পালাতক এবং এদেরর প্রায় সবাই নাকি দেশ ত্যাগ করেছে ! বিশ্বজিতের আরো একটু আগের ঘটনা ঘাটলে স্বাধীন দেশের সর্বোচ্চ ঘটনা স্বয়ং রাষ্ট্রপতি  তার ক্ষমতা বলে একসাথে ২১ জনকে  ফাঁসিরমঞ্চ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ২১ জন একসাথে মুক্তি, সেটা এই স্বাধীন দেশে প্রথমবারের মত ঘটে। রাষ্ট্র যখন ২১ জনকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ঘরে যেতে দেয়, সেটার পিছনে কোন রাজনীতি কাজ করে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে কি ? এরকম ঘটনা যে কেবল এই সরকারের আমলে ঘটেছে তা নয়, ২১ জনকে নয় তবে  সরাসরি সুইডেন্ট থেকে ফাঁসির আসামীকে বিমিনে চড়িয়ে এনে বিএনপি সরকারের কৃপায় খালাস করে আবার সুইডেন পাঠানো হয়েছে, সে ঘটনা তো সবারই জানা, নাম না বললেও সবারই ভালোই মনে থাকবার কথা। সুতরাং এক সরকার একজনকে করেছে তো আমি সরকার ২১ জনকেও করতে পারি । এক সরকার হাওয়া ভবন করেছে তো আমি পুরো ব্যাংক গায়েব করে দিতে পারি । এক সরকার পাঁচজনকে মেরেছে তো আমি পাঁচশত জনকে মারতে পারি । এক সরকারের আমলে হার্ট অ্যাটাকে মারা হয়েছে তো আমি শত শত গুম/খুন/ ক্রসবায়ারে দিতে পারি।  ক্ষমতার হাত বলে কথা । কথায় বলে না সর্ষে ভুত! তাহলে রাষ্ট্রের মূলেই ভুতের আছর আছে বললে একেবারে ভুল হবার নয়।

বিশ্বজিত থেকে রিফাত , মাঝে কত লাশ ঝড়েছে? কারো পক্ষে সঠিক করে  হিসেব করে বলা মুশকিল । প্রতিদিন খবরের কাগজে এরকম নৃশংস ঘটনার ছড়াছড়ি! মানুষ মনে একটা ক্ষোব আছে বলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে । তাররপরেও জনমানুষ দিনে দুপুরে কোপাকপি দেখেও এগিয়ে আসার সাহস দেখাতে পারে না। আর পারবেই বা কি করে ? উপকারে বাঘে খায় প্রবাদের মত নিজেই বাঘের মুখে কল্লা তুলে দেওয়ার মত। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যতটা না আসামীকে জ্বালায় তার চেয়েও বেশি সেই রুখে দাঁড়ানো পাবলিককেই বেশি হয়রানি করে ! তাহলে তরুণ/যুবক/ সাধারণ জনমানুষেরা কেন রুখে দাঁড়াবে?  নিজের খেয়ে পরের মোষ চালাতে কেন তাড়াতে যাবে ? যেখানে সমাজ বিপ্লবের কোনো সিঁকি/আধলাও দেখা যায় না, সেখানে কেন নিজেকে, সাথে পরিবারকে বিব্রতর অবস্থায় ফেলবে। সেই সুত্রে বলাই যায় , অন্তত জনমানুষেরা গোপনে একটি ভিডিও করেও হলে সমাজকে কিছুটা বা পুরোপুরি কিছু দিচ্ছে । অন্ততপক্ষে সরকার বা প্রশাসনকে কিছুটা হলেও নাড়া দিতে পারছে। রাগে ক্ষোবে আমরাও  সেই সকল দর্শকের ভূমিকা পালককারীদের বিবেকহীনা বলি বা লিখি, কিন্তু আমরা নিজেরা ভালো করেই জানি কোথায় এর সমস্যা, তারপরেও আশা করি।

আজকাল দেখা যাচ্ছে, খুনের বদলা সরাসরি খুন বা ক্রসফায়ার ইত্যাদিকে জনমানুষেরা স্পষ্টতই সমর্থন করছে । তাহলে বুঝতে অসুবিধে হয় না মানুষ কেন এখন এতটা আগ্রাসী মতামতের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। এখন সমর্থন যোগাচ্ছে , এক সময় নিজেরাই অংশগ্রহণ করবে । ভেবে দেখুন তাহলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে  ? আইন আদালত সমাজকে যদি নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পারে , তাহলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

এর পিছনের কারণ সেই অপরিকল্পিত , স্বার্থের বা ক্ষমতার রাজনীতি । মুখে বড় বুলি আর গণতন্ত্রের চর্চা থেকে পুরোপুরি সড়ে আসা, সাথে বিলাসিতা ও ক্ষমতার অধিক চর্চা কিংবা অপব্যবহার, আরো অনেক উপসর্গ আছে,  এইগুলোই মূলত একটি সমাজ কে ভুলুন্ঠিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। সেই সুমন্তর যাদুই আমাদের মত সাধারন জনমানুষকে এখন দেখতে হচ্ছে। কিসের মুক্তি যুদ্ধ আর কিসের চেতনা ! দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই রাজনীতি হয়ে গেছে ক্ষমতার খেলা। উদহারণ আর টানলাম না, কেন না আমি /আপনি যত সত্য কথাই লিখি না কেন , সেই কথাকে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে যার যার সুবিধে মত বা রাজনৈতিক মতবাদের ছকে ফেলে ব্যাখ্যা বা ইন্টারপ্রেটেশন করাটাও এখন নতুন রাজনীতি  ! কি বলা হচ্ছে বা কি ভাষ্য, কোন আঙিকে সেটা বিবেচনায় না নিয়ে, আমার / আপনার লেখাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলেই চালিয়ে দেবে, সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোক বা অন্য কোথাও । গত দীর্ঘদিন ধরে একটি সরকার ক্ষমতায় আছে, অপরদিকে ভিন্নমতবাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ কর্মকা নেই , এমতা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই সকল কিছুর ফলাফল পরে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ঘাড়ে । সুতরাং লেখালেখি আমি/আপনি যাই করুন না কেন, সেই ক্ষমতাসীনদের দিকেই বেশি আঙুল তোলা হয়, কেননা ক্ষমতায় দীর্ঘদিন যাবত্। বেশ এই স্বাভাবিকতাকেই রাজনৈতিক রং দেওয়াটাই বর্তমানে বেশি লক্ষ্যণীয় হচ্ছে। সহজভাবে বললে বলতেই হয়, রাজনৈতিক চর্চা, গণতন্ত্রের চর্চা, সহনশীলতা এগুলো একেবারেই অনুপস্থিত । মূল কথা হলো রাজনীতিকেই ঘূণে ধরেছে।

যে যত কথাই বলুক, রাজনীতি দ্বারাই যেহেতু দেশ পরিচালিত হয়, যা স্বাভাবিক, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই রাজনীতি তার নিজস্ব পক্ষকেন্দ্রে বিচরণ করতে না পারবে, ততক্ষণ বর্তমানে আমাদের সমাজে যে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য  করা যাচ্ছে, তা বিরাজমান থাকবেই। সুতরাং ধর্ষণ, গুম, খুন, লুটরাজ বা নতুন এই কোপানো সংস্কৃতি এগুলো তখনই শেষ হতে পারে যখন রাজনীতি তার নিজস্বতা ফিরে পাবে। সময় অনেক গড়িয়েছে, আসুন রাজনীতিকে তার নিজস্ব পথে চলতে দেই, সেখানেই সব সমাধান নিহিত আছে।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক,শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.