এই অর্থ বছরের বাজেট প্রেরিত হলো। স্বাধীন দেশের সবচাইতে বড় বাজেট বা উচ্চাভিলাষ বাজেট, এগুলো যারা বলেন , সেই কথার কোনো মূল্য আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। কেননা , উচ্চাভিলাষী না হলে উচ্চাতায় পৌঁছানোটাও কঠিন। অর্থাৎ বলা যায়, আপনার স্বপ্ন যত বড় হবে ততই আপনার উন্নতি বেশি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই জাতি হিসেবে, বড় স্বপ্ন দেখার পক্ষেই আমি। তাছাড়া এই স্বপ্নতো আর ঘুমের স্বপ্ন না, সরাসরি জেগে থেকে স্বপ্ন দেখা, পরিকল্পিত স্বপ্ন দেখা, বাস্তবতার স্বপ্ন দেখা। ঘুমের স্বপ্নতেও বিনি পয়সায় যারা পোলাও কোরমা রেখে পান্তাভাত আর মরিচডলা খায় , তাদের নজর ছোটোই বলতে হবে। সুতরাং প্রথমেই স্বীকার করছি উচ্চাভিলাষের বাজেটের পক্ষে আমি এবং নিশ্চয়ই আমরা সবাই বলেই বিশ্বাস করি।
মনে পরে,প্রথম বার মুহিত সাহেব যখন উচ্চাভিলাষী বাজেট( সম্ভবত প্রায় চার লক্ষকোটি টাকা ) প্রেরণ করলেন, ( বেশি দিন আগের কথা নয়) তখন সবাই খুব হই রই শুরু করে দিলো ! কতজনকে কত কথা বলতে শুনেছি, তাদের প্রায় সবাই বাজেট বিশেষজ্ঞ ছিলেন ( নাম নাই বললাম) , সেই সময়ে তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছিলো ” গরিবের ফুঁটানি বেশি” কথাটাই সত্যি বলে প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু ফলাফল কি দাঁড়ালো ? সেই উচ্চাভিলাষী বাজেটই জনমানুষ বেশ সানন্দে গ্রহণ করলো। তার আরো বড় প্রমাণ হলো, সেই সকল বাজেট বিশেষজ্ঞগণ এখন একই সুরে বলে বেড়াচ্ছেন উচ্চাভিলাষী বাজেট ভালো, উচ্চাভিলাষী হওয়া ভালো ইত্যাদি ইত্যাদি । মজার ব্যাপার উনারা হয়তো উনাদের সেই সময়কার কথা ভুলে গেছেন, কিন্তু আমরা সাধারণত জনতা যতই বোকা হই না কেন, সেই সকল বাজেট বিশেষজ্ঞদের এখন টিভির পর্দায় ভিন্ন সুরে কথা বলতে দেখি, মুচকি হাসি হাসতেই পারি। অবশ্য মুচকি হাসিতে যদি ভ্যাট বা ট্যাক্স দিতে হতো , নিশ্চয়ই হাসতাম না।
সরকার বাজেটে একটি ভালো সুযোগ নস্ট করলো । সেটা হলো, “কথার উপরে ভ্যাট বসানো”। অবশ্য সেটাতে আমি/আপনি যত ক্ষতির সম্মুখীন হতাম তার চেয়েও নিশ্চয়ই আমাদের রাজনীতিবিদদেরই বেশি এলার্জি বা চুলকানি হত ( যাক সেটা ভিন্ন আলোচনা ) । বলছিলাম কিছু বিষয়ের ভ্যাট নিয়ে । তবে লেখার আগেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা ভালো যে, আমার মত অনেক সাধারণ জনগণ, ” না ঘরকা না ঘাটকা ” ! কেননা যেহেতু আমরা বাজেট বা অর্থনীতি ভালো বুঝি না সুতরাং অনেকেই নাক সিঁটকিয়ে হয়তো বলে বসবেন, আঁতেলগীরি করতে এসেছি “। না আসলে আঁতেলগীরি নয়, তবে সাধারণ জনগণ হিসেবে বাজেটে আপাতত যা চোখে ধরা পড়ছে তাই নিজের ভাবনায় বলার চেষ্টা মাত্র । তাছাড়া আজকে বাজেট আসার পরেই দুএকজন তরুণ কিছু পত্রিকা সূত্রের লিংক পাঠিয়ে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়েছে। সেরকম একটি সূত্রের লিংক নিচে ছাপালাম ( লিংকটি পাঠিয়েছে কাজী আজহার ” KAZI AJAHAR ” নামের একজন তরুণ )
” মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে বাড়তি ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের বোঝা বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) দিনগত রাত থেকে যুক্ত হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার পরপরই মোবাইল ফোন অপারেটরদেরকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
ইতিমধ্যে মোবাইল অপারেটররাও বাড়তি শুল্ক কার্যকর করার জন্যে কাজ শুরু করেছে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন রবি’র প্রধান চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার। বর্তমানে গ্রাহকরা সম্পূরক শুল্কের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আরও এক শতাংশ সারচার্জ দিয়ে আসছে সরকারকে।
দেশে বর্তমানে ১০ কোটি গ্রাহক মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। নতুন সম্পূরক শুল্ক কার্যকর হওয়ার ফলে প্রত্যেকের কথা বলা, ইন্টারনেট ব্যবহার বা এসএমএস আদান-প্রদানসহ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অন্য যেকোনো সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে। সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন ”
উপরের সূত্র থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, আমাদের ডিজিটাল দেশের ডিজিটাল সুবিধে কমে যাচ্ছে। এখানে ইউরোপের উদহারণ টানা কেমন যুত্সই হবে জানিনা, তবে ইউরোপে দিনকে দিন এগুলোর দাম কমে গেছে। নানান ধরনের সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান খোলাবাজার নীতিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ( প্রাইভেট কম্পানি) গ্রাহকদের সঠিক সেবা প্রদানের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক উদহারণ দেওয়া থেকে বিরত থাকলাম। তাই বলছিলাম, এত ডমফাইয়ের ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের জাতি সেই ডিজিটালের ছুরিতেই সামনে পকেট কাঁটা পড়বে। সুতরাং যত দ্রুতর সম্ভব আবার সেই চোঙার যুগেই ফিরে যাওয়া জনসাধারণের জন্য ভালো। কেননা এখনই প্রশ্ন উঠেছে বাজারে , তাহলে অর্থমন্ত্রী বাজেট পূর্বে যে বলেছিলেন ব্যবসায়ীক বান্ধব বাজেট হবে, সেদিকেই হাটলেন ?
এবার বলছি বাজেট প্রেরণের পরে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচিত হচ্ছে যে বিষয়টি তা হলো সিগারেটের দাম নিয়ে । জানি এই সিগারেট নিয়ে বলাটা একটু রিক্সি বটে। তবে নিজে যেহেতু সিগারেট খোর, এটা স্বীকার করেই বলছি সিগারেটের দাম নিয়ে একটু বাড়াবাড়িই হয়েছে। কথায় বলে না কিছু জিনিস আছে, “যার টাকা নাকি ভুতে যোগান দেয়”। তো সিগারেটের দাম যে উদ্দেশ্যে বাড়ানো হয়েছে, “ক্ষতিকর বিষয় যেন মানুষের আওতার বাহিরে থাকে” সে উদ্দেশ্য কোনো দিনও সফল হবে না। কেন হবে না তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ফেসবুক থেকে কপি না করে কতগুলো ফেসবুক আলাপ তুদে দিচ্ছি।
যেমন : কেউ কেউ বলছেন,
” শালার খাওয়ার মধ্যে খাই শুধু সিগারেটটাই, সেটাও সরকারের সহ্য হলো না ! ”
” কোনো রাজনৈতিক দলের বুকে পাটা থাকলে, এই দাম নিয়া সরকার পতনের ডাক দিক, আমরা রাজপথ কাঁপিয়াইয়া সরকার ফালাইয়া দিমু ”
” এইবার সিগারেট ছাইড়া পোলাপাই গাঞ্জা ধরবো ”
” ভাতাছি নিজের ছাদে সবজির বদলে তামাকের চাষ করুম, কেমিক্যাল ছাড়া টাটকা সিগারেট খামু ”
এরকম আরো অনেক আছে।
এই সিগারেটের দাম বাড়িয়ে মনে হচ্ছে সরকারের গদিতে টাঁন লাগলেও লাগতে পারে ( এটা অবশ্য আমার কথা নয়, একজন তরুণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা, নামটি দেওয়া থেকে বিরত থাকলাম, কেননা আমি তার শুভাকাঙ্ক্ষী, তাই ) । এখানে আমার একটি মনের আশংকার কথা বলতে হয়, ” দেশে যেমন ভারতীয় গরু সহ অনেক কিছুই চোরাই পথে এসে হুমরি খায়, সিগারেটেও যদি তাই ঘটে আশ্চর্য হবো না “। সুতরাং সবাই সেই হুক্কার যুগে ফিরে গেলেই ভালো হবে, ধুমপানের সাথে বাঙালির আসল কালচারের চর্চাও ফিরে আসবে।
এবারের বাজেটেই প্রথমবারের মত নতুন ভ্যাটের যোগান হতে যাচ্ছে, আর তা হলো , ” ঘটকালি ভ্যাট” ! অনেকের কাছেই বিষটি নতুন বলে খটকা লাগতে পারে। বিষয়টি পরিষ্কার করে বলি। এই প্রথমবার বিয়ে সাদির ঘটকদের উপর ভ্যাট বসানো হয়েছে। একটি বিষয় নিশ্চয়ই সবার কাছেই পরিষ্কার যে , “বাজেটের সকল ভ্যাট আপেক্ষিক অর্থে সাধারণ জনগণকেই পে বা মাশুল গুণতে হয়” । সেই অর্থে তরুণদের জন্য এই বিষয়টি একটু বিড়ম্বনার বিষয় হতে যাচ্ছে নিশ্চয়ই । সহজ বাংলায় বিয়ে সাদিতে সরাসরি খরচ একধাপ বেড়ে গেলো। আবার ভিন্নভাবে বলা যায়, দেশে এখনও যৌতুকের বাহার কম না, এই ভ্যাট ঘুরে ফিরে না যৌতুকের সাথে জড়িয়ে যায় ।
দেশে এত উন্নয়ন, তারপরেও পত্র পত্রিকায় প্রায়শই দেখি এখনও, ” চার কোটির উপরে বেকার শিক্ষিত আছে”! মানে হলো, এই বেকার শিক্ষিতরা একদিকে যেমন জীবনে হাহুতাশে আছে এবার যোগ হলো নতুন হাহুতাশ! এই ঘটকালির ভ্যাট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনও তেমন বেশি আসেনি। অবশ্য বাজেট কেবলই এলো, আমি নিশ্চিত এটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কম কথা হবে না। আমি অপেক্ষায় আছি , সামনে দেখার জন্য । এই ঘটকালি ভ্যাটের কারণে তো আর বলা যাবে না বা পরামর্শ দেওয়া যাবে না যে , বিয়ে সাদি তরুণরা বন্ধ করে দাও! তবে শুধু বলবো, হে তরুণ তোমাদের জন্য শুভ কামনা রইলো। এখানে অগ্রিম বলে রাখি, এই ঘটকালি ভ্যাট নিয়ে সরকারের অর্থমন্ত্রীর বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে।
লেখার শেষে এবারের বাজেটের একটি কঠিন সত্য বলেই শেষ করবো। আমাদের দেশে তিনটি সেকশনের উপর সমগ্র উচ্চাভিলাষী বাজেটের ফুঁটানি নির্ভর করে। আর তা হলো , ” আরএমজি ( গার্মেন্টসের টাকা) / রেমিটেনস ( প্রবাসীদের টাকা ) / কৃষি ( মেহনতি মানুষের ঘামের টাকা ) “। সরকারের অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যেনুযায়ী আপাতত বাজেটে যা পরিষ্কার, তাহলো “এটা ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূলের বাজেট”। কেননা বাজেটের অত গভীরে না গিয়েও বলা যায়, কিছু কিছু থোক বরাদ্দ যা কিনা খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ( ইচ্ছাকৃত খেলাপি) জন্য আছে, আবার লুটেপুটে খাওয়া ব্যাংকগুলোকে এই বাজেটেই জনগণের টাকায় রক্ষার ব্যবস্থা করা। আবার লক্ষ কোটি টাকা যারা গায়েব করে দিলো, তাদেরকেই আবার তথাকথিত খেলাপি বলে রক্ষার নামে এই বাজেট বেশ আকর্ষণীয় বটে। অথচ ” আরএমজি/রেমিটেনস/কৃষি” এই তিন শাখার মেহনতি মানুষের জন্য এই বাজেট বন্ধুসুলভ হতে পারলো না ! এই তিন প্রধাণ শাখাতেই গরিবের ঘাম । এই ঘাম ছাড়া, কিসের প্রবৃদ্ধি আর কিসের উচ্চাভিলাষী ??? তবে এই বাজেটের একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে যে, মান্ধাতা আমলের মত হাতের আঙুলে ছ্যাঁবের পর ছ্যাঁব লাগিয়ে আমাদের আগের অর্থমন্ত্রীরা যেভাবে দিস্তার পর দিস্তা কাগজ উল্টিয়ে বাজেট পেশ করতেন , এটার একটা পরিবর্তন অবশ্য ছিলো। এবারই প্রথমবারের মত অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই সংসদে বাজেট পেশ করলেন, এটাও একটা নতুনত্ব বটে। শুনেছি প্রধানমন্ত্রী নিজেও কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। দুজনের জনের জন্যেই দ্রুতর সুস্বাস্থ্য কামনা করি ।
সব শেষে বলবো , বাজেট কোনো আসমানি কিতাব নয়, এটার পরিবর্তন/ পরিবর্ধন হয় বা এবারও হবে নিশ্চয়ই, তাই অনুরোধ থাকবে, সম্ভব হলে ঘাম ঝড়ানো মেহনতি মানুষের দিকে আরো একটু বেশি নজর দিলে দশের যেমন ভালো , ঠিক সরকারেরও ভালো।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

