মহান স্বাধীনতা দিবস ২০১৯” উপলক্ষে,যুক্তরাজ্যে বসবাসরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন (জুয়াক) এর আয়োজনে, সেমিনার ও শিশুকিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ।
২৪ মার্চ রবিবার, লন্ডনে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রাণকেন্দ্র গ্রিনস্ট্রীটের ক্যাফে গ্রিনে “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের ভুমিকা” এই সেমিনারের আয়োজন করা হয় । জুয়াকের আহ্ববায়ক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনের সভাপতিত্বে, সিনিয়র যুগ্ম আহ্ববায়ক ডঃ সাবের শাহের পরিচালনায়, সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্দালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জনাব আবু তাহের গিয়াসউদ্দিন আহমেদ খিজির ।
সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠানের শুরুতেই শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা ও শহীদদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয় । এরপর সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত । পরবর্তী প্রজন্মের হাতে বাংলাদেশের গর্বের প্রতীক জাতীয় পতাকা তুলে দেন প্রধান অতিথি । জনাব আবু তাহের গিয়াসউদ্দিন আহমেদ খিজির তার আবেগঘন বক্তব্যের এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারনে বলেন ,”বিশ্ববিদ্দ্যালয়ে ভর্তির কিছুদিনের মাঝেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে, জীবনবাজি রেখে অস্ত্রহাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আট জন অকুতভয় ছাত্র ।তিনি বলেন ১৯৬৬-সালে স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে রেখে কেরানীগঞ্জ থানার কলাতিয়ায় আমার মামা রতন, গগন, মাখনদের বাড়ীতে নিউক্লিয়াসের কেন্দ্র স্থাপন করেন সিরাজুল আলম খান , আমার মামারা তাদের থাকা খাওয়া ও অন্যান্য সহযোগিতা করেন , আমি তখন থেকেই স্বাধীনতার চেতনায় প্রভাবিত হই , ৭১ সালের ২৬ শে মার্চ এই বাড়ীতেই আশ্রয় নেন আওয়ামীলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতারা এর মধ্যে ছিলেন সিরাজুল আলম খান , তোফায়েল, রাজ্জাক ,কাজী আরিফ, শেখ মনি, শাহজাহান সিরাজ, খসরু , ক্যাপ্টেন বেগ প্রমুখ ।
১৪ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা যখন নয়ারহাট হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সকলে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাদেরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেসময় বাংলাদেশের সব জায়গায় কিছু না কিছু রাজাকার ছিল । কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় একমাত্র জাহাঙ্গীরনগরে কোন রাজাকার ছিলোনা । আমরা জাবিয়ানরা এখনো হৃদয়ে এই চেতনাটুকু লালন করছি” ।
ডঃ সাবের শাহ বলেন “ জুয়াক চলবে মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শে । এখানে স্বাধীনতা বিরোধীদের কোন ঠাই নাই” ।
সেমিনারে বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব, দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বর্তমান প্রজন্ম কে উদ্বুদ্ধ করতে এধরণের অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন জুয়াকের সাবেক সভাপতি আসমা শাহ এবং জুয়াকের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য সচিব পারভেজ মল্লিক । এছাড়া পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে এবং বাংলাদেশের প্রতি ভালবাসা ও মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে, শিশু কিশোরদের জন্য “হৃদয়ে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ” বিষয়ক এক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
রঙ তুলির আঁচড়ে খুদে আঁকিয়েরা বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধকে ফুটিয়ে তোলে । এতে প্রথম স্থান অধিকার করে সাবিহা, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ফারি্ন ও যৌথভাবে তৃতীয় স্থান অধিকার করে যথাক্রমে সারাহ এবং মীম ।প্রধান অতিথি ক্ষুদে সোনামণিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে পরিবার পরিজন নিয়ে এই অনুষ্ঠানে আন্তরিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন জাবিয়ানরা । বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রিয় অগ্রজের কাছ থেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিতাস জানতে পেরে অনুজরা হন আরও সমৃদ্ধ। আর শিশু কিশোরেরা জানতে পারেন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা । মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারনে বার বার ফিরে আসে প্রিয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের অবদানের কথা । পারভেজ মল্লিক বলেন-“একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি খুবি গর্বিত । আমাদের যেমন বাংলাদেশের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভালবাসা আছে,
আমাদের সন্তানদের কেও তা শিখাতে হবে ।মুক্তিযুদ্ধের কথা
মুক্তিযোদ্ধাদের কথা আমাদের সন্তানদেরকে বলতে হবে” ।
জুয়াকের আহ্ববায়ক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন “ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা এমফিল ও পিএইচডি তে “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের ভুমিকা” টপিক নিয়ে গবেষণা করলে তাদেরকে জুয়াকের পক্ষ থেকে স্কলারশিপ প্রদান করা হবে । তিনি আরো বলেন জুয়াককে গতিশীল করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন আমরা করবো” ।
সেমিনারে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হাবিবে আলম চৌধুরী , লায়লা নুর পলি , আলিম আল রাজি , ফারহানা ইয়াসমিন চমন , গোলাম মোরশেদ ঠাকুর, মাহবুবা নাজরীনা জেবিন, ইফতেখার ইফতি, ফারহানা করিম খান, মোহাম্মদ সায়েম, নাজমুস সাকিব, সজীব ভুঁইয়া, শাহ মানসুরুল হক শৈবাল, শহিদুল আলম শিশির, ঊর্মি, অরণি হক, উম্মে সায়মা মনিকা সহ আরো অনেকে ।
সেমিনার শেষে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন সঙ্গীত শিল্পী পান্না ইকবাল , আলিম আল রাজি, উম্মে সায়মা মনিকা এবং একা ।

